
অজয় দাশগুপ্ত ||
১৫৩
বছর আগে ১৮৬৫ থেকে ১৮৬৭ সাল ধারাবাহিকভাবে লেখার পর ১৮৬৯ সালে রুশ ভাষার
সেরা লেখক লিও বা লেভ তলস্তয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস আলোর মুখ দেখে- যার বাংলা
হবে যুদ্ধ ও শান্তি। এটি উপন্যাস মনে করলে উপন্যাস, মহাকাব্য মনে করলে
মহাকাব্য। তলস্তয় কখনো যুদ্ধকে মহৎ মনে করেননি। বরাবর এটিকে আখ্যায়িত
করেছেন মানুষ হত্যার কৌশল হিসেবে, আখ্যায়িত করেছেন পাগলামি বলে। তার দেশের
সমরনায়ক রাষ্ট্রনায়ক এত বছর পর আবার ওই পাগলামির ভেতর দিয়ে দুনিয়াকে ফেলেছে
ঘোর বিপাকে।
যুদ্ধ ও মানব ইতিহাস অনিবার্য। কিন্তু শান্তি যে এর চেয়েও
বেশি প্রার্থিত। তবে কেন যুদ্ধ হয়। এর উত্তর তলস্তয় দিয়েছেন তার অন্যতম
নায়ক প্রিন্স আন্দ্রুর জবানে- যখন সে সরকারি চাকরি, সুন্দরী স্ত্রী আর
জমিদারি ছেড়ে যুদ্ধে রওনা হয়; তখন তার বন্ধু পিয়ের তাকে জিজ্ঞেস করছে
আন্দ্রু কেন যুদ্ধে যেতে চায়। তার জবাব- ‘আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। কারণ এখানে যে
জীবনযাপন করছি, সেটি আমার ভালো লাগছে না!’
আমরা ধর্মের ইতিহাসেও যুদ্ধ
দেখি। উপমহাদেশের দুই মহাকাব্য রামায়ণ আর মহাভারত মূলত যুদ্ধনির্ভর।
রামায়ণের চেয়েও ভয়াবহ বাস্তবতার লড়াই আছে মহাভারতে। দর্শন ও ধর্মের অনুপম
আখ্যান গীতা গ্রন্থটি মূলত কিছু শ্লোক। এই শ্লোকগুলো রথের সারথী শ্রীকৃষ্ণ
আর তার রথের আরোহী যুদ্ধরত বীর অর্জুনের কথোপকথন। সে কথোপকথনে অর্জুন
বারবার যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হওয়ার কথা বললেও তাকে ধর্মযুদ্ধে অনুপ্রাণিত করা
হয়। এর মানে এই কখনো কখনো যুদ্ধ এবং যুদ্ধ জয় অনিবার্য। যেমন- অনিবার্য
ছিল বদরের যুদ্ধে জয়লাভ।
আমাদের দেশেও একটি মারাত্মক রক্তাক্ত আর
প্রাণঘাতী যুদ্ধ হয়েছিল। এটি আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তান। অভিন্ন
দেশ হওয়ার পরও স্বার্থ আর বল প্রয়োগের সর্বনাশা খেলায় নিরস্ত্র আমাদের ঠেলে
দেওয়া হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর অহিংস প্রচেষ্টাগুলো একের পর এক
নস্যাৎ করে দিয়ে পাকিস্তানের সেনারা যুদ্ধ ডেকে আনে। এর পরিণতিতে তখনকার
ভয়াবহ সামরিক শক্তির দেশ নামে পরিচিত পাকিস্তান নিজেই ভেঙে দুই টুকরা হয়ে
যায়। ওই যুদ্ধে আমাদের লাখো মানুষ প্রাণ হারানোর পাশাপাশি ধর্ষিত হয় হাজারো
মা-বোন। আমাদের চেয়ে শরণার্থী হওয়ার গল্প ভালো কারা জানেন? কারা বোঝেন দেশ
ও মাটি ছেড়ে এক কাপড়ে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার কষ্ট? ৯ মাসব্যাপী ওই যুদ্ধে
আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, যুদ্ধের মতো পাপ ও ভয়াবহ পরিণতি আর কিছুতে নেই। এর
পরও যুদ্ধ হয়।
ইতিহাস বলে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল সভ্য যুগের সর্বপ্রথম
অসভ্য যুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্ব ছিল প্রায় চার বছর। ২৮ জুলাই
১৯১৪ থেকে ১১ নভেম্বর ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলে এই যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধের কারণে
প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের মধ্যে
এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ শুধু মারাই যায় আর বাকিরা আহত হয়। তবে যুদ্ধ মূলত
শুরু হয় অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় আর সার্বেরিয়ার মধ্যে। পরে দুই দেশের পক্ষ হয়ে
নানা দেশ তাদের মনের ঝাল মেটানোর জন্যই এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর পর আরেক
ভয়াবহ যুদ্ধের নাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ইতিহাস ও সভ্যতার চরম অপমান করা হয়
এই যুদ্ধে। এই যুদ্ধে দুনিয়া জানতে পারে একনায়ক কী এবং পাওয়ার গেম কতটা
ভয়াবহ হতে পারে। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলে এই যুদ্ধ। এই ভয়াবহ যুদ্ধে
আনুমানিক ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ মারা যায়। তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল
রাশিয়ার নাগরিক। নিহতের এই বিশাল সংখ্যার মূল কারণ ছিল গণহত্যা আর অস্ত্রের
ব্যাপক ব্যবহার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারিগর হিটলার। নাৎসি বাহিনীর
পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। মিত্রপক্ষে ছিল
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, রাশিয়া আর চীন। জার্মানির সঙ্গে ছিল ইতালি
আর জাপান। এই যুদ্ধে প্রথমে রাশিয়া অংশগ্রহণ না করলেও পরে জার্মানি
রাশিয়াকে আক্রমণ করে যুদ্ধের ময়দানে ডেকে আনে।
অন্যদিকে মনে করব
ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা। এটিই হচ্ছে প্রথম যুদ্ধ- যাতে আমেরিকা হেরে যায়।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ ১৯৫৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সংঘটিত
সবচেয়ে দীর্ঘ সামরিক সংঘাত। সাম্যবাদী শাসন বা কমিউনিস্ট শাসন- সবদিকে যেন
ছড়িয়ে না পড়তে পারে, এ লক্ষ্যেই আমেরিকা এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত
নিয়েছিল। যুদ্ধ মূলত শুরু হয় দক্ষিণ আর উত্তর ভিয়েতনামের মধ্যে। আর এতে
দক্ষিণ ভিয়েতনামের পক্ষে ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য পাঠায়। ফলে যে
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সূত্রপাত হয়, এতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হতে
পারেনি। এই যুদ্ধে প্রায় ৩২ লাখ ভিয়েতনামি মারা যান। তাদের সঙ্গে আরও প্রায়
১০ লাখ থেকে ১৫ লাখ লাও এবং ক্যাম্বোডীয় জাতির মানুষ মারা যায়।
মার্কিনিদের প্রায় ৫৮ হাজার সেনা নিহত হয়। যুদ্ধ মানেই এমন কোনো পরিণতি।
তবু দেশে দেশে যুদ্ধ, অশান্তি আর ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটেই চলেছে।
আমরা যারা
এই সময় বেঁচে আছি, আমাদের চোখের সামনে এক ভয়ঙ্কর মহামারী খেলছে। এর খেলা
এখনো ফোরায়নি। ওই কবে প্লেগ বা অন্য কোনো মহামারী দেখেছিল দুনিয়া। এর পর যা
যা হয়েছে, সেগুলো কোনো কোনো এলাকা বা দেশের বাইরে ছড়াতে পারেনি। এবার যে
করোনা মহামারী, তা সর্বগ্রাসী। আমেরিকা, ইউরোপ থেকে আফ্রিকার গরিব দেশ-
সবাই এর আঘাতে কাহিল। এই যে যুদ্ধ যুদ্ধ বলে ঝাঁপিয়ে পড়া রাশিয়া, এরও
করোনার আঘাতে ছিন্নভিন্ন বাস্তবতা। তবু যুদ্ধ করা থামেনি। ইউক্রেনেও কোভিড
রোগী আছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
সবাই জানেন, পৃথিবী অনেক
এগিয়েছে। তা যতই এগিয়ে যাক, এর দানবরা থামেনি। নানা দেশে বিভিন্ন নামে তারা
বারবার আক্রশে দখল করে, মাটি অপবিত্র করে। আমরা তলস্তয়ের লেখায় পাই- ‘লড়াই
করতে করতে আর চিৎকার করতে করতে আমরা যখন ছুটছিলাম, ভীত-ক্রুদ্ধ মুখে এক
টুকরো ন্যাকড়ার জন্য যখন ফরাসিটি লড়াই করছিল... অসীম আকাশের বুকে মেঘেদের
ভেসে চলা তার থেকে কত আলাদা! এই উঁচু আকাশটা আগে কেন চোখে পড়েনি? শেষ
পর্যন্ত ও আকাশকে দেখতে পেয়ে আমি কত খুশি। হ্যাঁ, ওই অসীম আকাশ ছাড়া
সবকিছুই বৃথা, সবই মিথ্যা। ও ছাড়া আর কিছু নেই, কিছুই নেই। এমনকি ওই আকাশও
নেই, স্তব্ধতা আর শান্তি ছাড়া আর কিছু নেই।’
এই শান্তির জন্য সম্রাট
অশোক সব ছেড়ে ভিখারি হয়েছিলেন। শান্তির জন্য শ্রীচৈতন্য ঘর ছেড়েছিলেন। আর
বুদ্ধ তো নিজেই এক শান্তির ইতিহাস। তবু শান্তি কেন সুদূর পরাহত? আর কতটা
এগোলে সভ্যতা এবং মানুষ বলবে আর আমরা যুদ্ধ চাই না। আর আমরা রক্ত চাই না,
আমাদের শান্তি ছাড়া কিছু চাই না। কবে হবে তেমন এক পৃথিবী?
অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক, সিডনি