ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
মার্চের উত্তাল দিনগুলিতে কুমিল্লা
Published : Wednesday, 2 March, 2022 at 12:00 AM
মার্চের উত্তাল দিনগুলিতে কুমিল্লাআবুল কাশেম হৃদয় ||
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সারাদেশে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের অধিকার লাভের পর ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন ‘‘৬ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা হবে এবং এ বিষয়ে আপোষ নেই’’। পরদিনই পাকিস্তান পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভূট্টো তার বিরোধিতা করেন। পিপলস্ পার্টির প্রতিকূল মনোভাব ও পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।
   ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন। সব কিছু ঠিকঠাক। আওয়ামী লীগের শাসনতন্ত্র কমিটি ও সংসদীয় দলের বৈঠকও অব্যাহত থাকে, কিন্তু হঠাৎ ১ মার্চ রেডিওতে ইয়াহিয়া খানের স্বকণ্ঠে বিবৃতি প্রচারিত হলো- বলা হলো ‘পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখা হলো।’ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ বিক্ষোভ ফেটে পড়ে সারা দেশের মানুষ। কুমিল্লায়ও তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ মিছিল হয় এবং যে কোন পরিণতির জন্য কুমিল্লার জনগণও প্রস্তুতি নিতে থাকে। আওয়ামী লীগ অধিবেশন স্থগিত রাখার প্রতিবাদে রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করে। কুমিল্লার জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এসব কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। শুধু তাই নয় কুমিল্লা প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও সকল কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করতে থাকে। এ কারণে কুমিল্লার জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের কোন দ্বন্দ্ব বা সংঘাত হয়নি। এ দিন এমপিএ এডভোকেট আহাম্মদ আলীর বাসভনে তাঁর সভাপতিত্বে জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করার প্রেক্ষিতে কুমিল্লার স্কুল কলেজের ছাত্র/ছাত্রীরা বিভিন্ন পর্যায়ে মিছিল ও সভা করে। ২ মার্চ কুমিল্লা জেলায় সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। সর্বস্তরের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে যোগ দেয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলনে। এ দিন এমপিএ আবদুর রশিদ ইঞ্জিনিয়ারের বাসভবনে অধ্যাপক খোরশেদ আলমের সভাপতিত্বে এক সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আ, স, ম আবদুর রব উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলার পতাকা। যে পতাকার শিল্পী কুমিল্লার ছাত্রলীগ নেতা শিব নারায়ণ দাস। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট দোহা দিবসে ইকবাল হলে এ পতাকা তৈরি করা হয়। পরিকল্পনা করেন সিরাজুল আলম খান।
   ৩ মার্চ হরতাল ও অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন সকালে ভৈরব থেকে লাকসামগামী একটি লোকাল ট্রেন কুমিল্লায় থামিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। দুপুরে সর্বদলীয় এক গণ মিছিল হয়। মিছিলে শিব নারায়ণ দাসের নিয়ে আসা স্বাধীন বাংলার পতাকা বহন করেন অধ্যাপক খোলশেদ আলম এম এন এ। শান্তিপূর্ণ মিছিল শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিল শেষে জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের এক সভায় পরবর্তী দিনগুলোতে হরতাল পালন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ব্যাপারে আলোচনা হয়। সারা দিন হরতালে সকল স্কুল কলেজ, অফিস আদালত, যানবাহন, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিসের কর্মচারীরা নিজ নিজ কাজ থেকে বিরত থাকে। লাকসামের কাছে দৌলতগঞ্জ টেলিফোন এক্সচেঞ্জকে প্রদেশের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এদিন বিকালে টাউন হলে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার প্রতিবাদে ভিক্টোরিয়া কলেজের নব নির্বাচিত ছাত্র সংসদের ভিপি শাহ আলমের সভাপতিত্বে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।
   ৪ মার্চও সরকারি অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজে তালা ঝুলতে থাকে। যানবাহন চলাচল এবং বাসগৃহ ও ওষুদের দোকান ছাড়া সড়ক সংলগ্ন প্রায় সব ঘরের দরজা বন্ধ থাকে। সকাল দশটায় কুমিল্লা মহিলা কলেজ, মৃণালিনী ছাত্রীনিবাস ও কলেজ ছাত্রীনিবাসের ছাত্রীদের এক বিরাট মিছিল বেগম সেলিনা বানুর নেতৃত্বে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিলটি মহিলা কলেজ শহীদ মিনারে এক সমাবেশে মিলিত হয়। সন্ধ্যায় চর্থা থেকে একটি মশাল মিছিল বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
   ৫ মার্চ হরতাল ও অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত থাকে। কুমিল্লা কোটবাড়িস্থ কারিগরি মহাবিদ্যালয় ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের ছাত্রদের যৌথ উদ্যোগে শাহ আলম মজুমদারকে আহবায়ক ও আবু বাছেদকে সাধারণ সম্পাদক করে ৮ সদস্য বিশিষ্ট সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।
   ৬ মার্চ হরতাল ও অসহযোগ আন্দেলনের শেষ দিনে কুমিল্লা শহরের সবচেয়ে বড় এবং অসংখ্য মিছিল বের হয়। মিছিলে স্কুল কলেজের ছাত্র, সরকারি কর্মচারী, মিল কারখানার কর্মচারী ও সাধারণ জনগণ অংশ নেয়। একটি মিছিল শহরে প্রদক্ষিণ করে ফরিদা বিদ্যায়তনে এবং অপর একটি মিছিল টাউন হলে সমাবেশ করে। এদিন শহরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।
   ৭ মার্চ। স্বাধীনতা ঘোষণার দিন। ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে উত্তাল জন সমুদ্র। বেলা ২ টার মধ্যে লক্ষ লক্ষ লোক আসে বজ্রকঠিন শপথ নিয়ে। ৩ টা ২০ মিনিট আসলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করলেন ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ঢাকা বেতার মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে সরাসরি প্রচার হচ্ছিল। টিক্কা খান মাঝপথে তা বন্ধ করে দেয়। হঠাৎ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ  বেতার মাধ্যমে প্রচার বন্ধ হয়ে যাওয়াতে কুমিল্লার জনমনে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়। অস্থিরতার মধ্য দিয়ে সময় কাটে স্বাধীনতা পিপাসু কুমিল্লার জনগণের।
   ৮ মার্চ কুমিল্লা টাউন হলে এক বিরাট জনসভা হয়। এতে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের উদ্ধৃতি দেন এবং শান্তি ও শৃংখলা বজায় রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান। বিকালে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ব্যবসায়ীদের খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত না করার আহবান জানানো হয়। এ ব্যাপারে কুমিল্লা জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা ও ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের সহ সভাপতি শাহ আলম ও জি, এস, মোঃ আকবর কবির বিবৃতি দেন।
   এদিন থেকে সারাদেশে এক ঐতিহাসিক অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। সকল সরকারি ও বেসরকারি ভবন, অফিস, শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন বাংলার পতাকা ও কাল পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকালে কুমিল্লা শহরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। ঝলমলে রোদে প্রতিটি বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ যেন স্বাধীনতার ঘোষণা!
   বরুড়াতে অহিংস আন্দোলনের পক্ষে আব্দুল হাকিমের উদ্যোগে বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। আব্দুল হাকিম, ডাঃ আব্দুল রহিম, দেওয়ান মেধা উদ্দিন, সামছুল হুদা, সুবাস দত্তসহ শত শত কৃষক- ছাত্রযুবক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী থানা সদরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ ও জঙ্গী শ্লোগানে ঐ দিন বরুড়া মুখরিত হয়ে ওঠে। তীব্র আন্দোলনের জন্য চারজনকে আহবায়ক করে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। তাঁরা হচ্ছেন, ১। ডাঃ আব্দুল রহিম ২। দেওয়ান মেধা উদ্দিন ৩। মমতাজ উদ্দিন ৪। সামছুল হুদা। চারজনকে আহবায়ক থাকার চমকপ্রদ রহস্য হলো যদি শত্রুবাহিনী কমিটির কাউকেও ঝটিকা আক্রমণে হত্যা অথবা গুম করে, তাতে নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা দেবে না। আর সকলের সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে। সংগ্রাম কমিটির আহবায়কমণ্ডলী স্বেচ্ছাসেবক কমিটি গঠন করেন। স্বেচ্ছাসেবক কমিটির প্রধান সিংগুর কবির আহম্মদ মজুমদার। তাঁর নেতৃত্বে থানার ১৫টি ইউনিয়নে ২শ’ স্বেচ্ছাসেবক ছাত্র-কৃষক-যুবক সংগঠিত হয়।
   ১১ মার্চ বৃহস্পতিবার ৩০০ কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙ্গে বের হয়ে যাওয়ার সময় নিরাপত্তা কর্মীদের গুলিতে ৫ জন নিহত এবং অনেক হতাহত হয়। তবে কেউ বের হয়ে যেতে পারেনি। এদিন জেলা ছাত্রলীগের নেতা আনসার আহমদের সভাপতিত্বে মোগলটুলীতে এক সভা হয়।
   ১২মার্চ বিকাল তিনটায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে বামইশা স্কুলে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। আবদুল মতিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তৃতা করেন কোতয়ালি থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অলি আহমদ, ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্রসংসদের ভি,পি শাহ আলম, জি, এস, আকবর কবির, সহিদুল হক চৌধুরী প্রমুখ। সভায় যে কোন ত্যাগ স্বীকার জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহবান জানানো হয়।
   ১৩ মার্চ দাউদকান্দি স্কুলে এক জঙ্গী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আবদুর রশিদ ইনজিনিয়ার এম,পি,এ এর সভাপতিত্বে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত এবং ঘরে ঘরে দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক মোঃ আবদুল মান্নান প্রমুখ। দাউদকান্দির দুটি কলেজে মহিলা ও পুরুষ স্বেচ্ছাসেবকদের দুটি পৃথক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়।
   বিকাল তিনটায় বেলতলি স্কুলে আওয়ামী লীগের এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অধ্যাপক খোরশেদ আলম, ভিক্টোরিয়া কলেজের জি,এস, আকবর কবির প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এদিন কুমিল্লার আওয়ামী লীগের নেতারা দু’জন কয়েদির মুক্তির জন্য জেল ভাঙ্গার হুমকি দেয়। উল্লেখিত কয়েদি দু’ জনকে জাতীয় পতাকা পুঁড়িয়ে ফেলার জন্য শমসের নগর থেকে গ্রেফতার করা হয়।  এদিনই জেলা ন্যাপের এক সভা তৎকালীন সভাপতি শাহ আবদুল অদুদের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বেগম সেলিনা বানু, খন্দকার শাহজাহান, কাজী মমতাজ উদ্দিনসহ অন্যান্য ন্যাপ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ১৪ মার্চ বাগমারা হাই স্কুলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আদায়ের বজ্র শপথ নিয়ে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভায় কুমিল্লাবাসীকে স্বাধীনতার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকার আহবান জানিয়ে বক্তৃতা করেন আবদুল আউয়াল এম, পি,এ, আবদুর রশিদ ইনজিনিয়ার এম,পি,এ, অধ্যাপক মোঃ আবদুর রউফ, আবুল কালাম মজুমদার প্রমুখ। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন আবেদ আলী।
।। বাকি অংশ আগামীকাল পড়ুন।।