ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
তাকাতে হবে তাদের দিকে ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধা’
Published : Saturday, 26 February, 2022 at 12:00 AM
তাকাতে হবে তাদের দিকে ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধা’মামুন রশীদ ||
তিনজনের সংসার, পরিবারের কর্তার মাসিক আয় পঞ্চাশ হাজার টাকা। তিনিও হিমশিম খাচ্ছেন সংসার চালাতে। তারও নাভিশ্বাস উঠছে। সঞ্চয় তো দূরের, ভদ্রভাবে বেঁচেবর্তে থাকাই কষ্টকর। এ রকম আয়ের একজনের সংসার চালানোর হিসাবের বর্ণনা এসেছে একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে।

সেই প্রতিবেদনটি বেশ কয়েকদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরেফিরে বেড়াল। সেই সঙ্গে আন্তর্জালের মাধ্যমে কিছু মানুষের কিছু হা-হুতাশও ভেসে বেড়াল। কিন্তু সমস্যার গভীরে কেউ গেল কিনা বোঝা গেল না, সমস্যারও সমাধান হলো না। এরই মাঝে প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে, টিসিবির পণ্য বিক্রি করা ট্রাকের পেছনে বাড়ছে মানুষের ভিড়। সেই ভিড় মধ্যবিত্তের, মাঝে মাঝে সেখানে উঁকি দিচ্ছেন নিম্নবিত্ত। তারও চেয়ে করুণ, সেই ভিড়ের মাঝের মুখগুলো নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইছে, আশপাশের মানুষ থেকে। সমস্যাটি কতটা গভীর ও ভয়াবহ সে ইঙ্গিত কিন্তু মিলছে খোদ সরকারের তরফ থেকেও।

সম্প্রতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত আরও একটি প্রতিবেদন বলছে, সরকার আসছে রোজায় দেশের এক কোটি দরিদ্র পরিবারকে কম দামে কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনিতেই সরকার টিসিবির মাধ্যমে খোলা ট্রাকে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করেছে, দীর্ঘদিন ধরেই কার্যক্রমটি পরিচালিতও হচ্ছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন, তাই সেবার পরিসরটি বাড়ানো। দেশে বর্তমানে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি। এ সংখ্যার ধারণা খোদ সরকারের তরফ থেকেই সংবাদপত্রের মাধ্যমে পাওয়া।

ধারণ করা হচ্ছে, রোজায় এভাবে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে উপকৃত হবে প্রায় চার কোটি মানুষ। যারা সবাই দরিদ্র। করোনার প্রকোপে মানুষের আয় কমে যাওয়া এবং পণ্যমূল্য বাড়ার কারণেই সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন রাখতে চাই, বাজারে তো জিনিসপত্রের কমতি নেই। ব্যবসায়ীরাও বলেনি যে, সরবরাহে ঘাটতি আছে। তার পরও কেন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম? কেন দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি ঘটছে অস্বাভাবিক হারে? গত বছরের অক্টোবরে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৫৩ থেকে ৭ টাকা বাড়িয়ে করা হয় ১৬০ টাকা। তিন মাসের মাথায় ফের প্রতি লিটারে বাড়ানো হয় ৮ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে প্রায় দশ টাকা। গত সপ্তাহেই যেখানে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪০-৪৫ টাকায়, চলতি সপ্তাহে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫-৬০ টাকায়। একই অবস্থা তো সবজি ও মাছের বাজারেও। কিন্তু কেন এই অস্বাভাবিকতা? এমন তো নয় যে, এক মাস আগেও দ্রব্যমূল্য সাধারণের নাগালের মধ্যে ছিল। বরং তখনো নাগালের বাইরে ছিল, আর আজকে তা আরও বাইরে চলে যাচ্ছে। আর তাই টিসিবির পণ্যবাহী ট্রাকের পেছনে ভিড় বাড়ছে। সারি লম্বা হচ্ছে। পরিচিত মানুষের মুখ বাড়ছে। যারা নিজেকে আড়াল করতে চাইছেন, লজ্জায়। সেই লজ্জা কি নীতিনির্ধারকদের স্পর্শ করছে?

করছে যে না, তাও বোঝা যায়, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো কার্যকরী উদ্যোগ না দেখে। এ ধরনের উদ্যোগ আমরা আগেও দেখিনি, এখনো দেখছি না। দেখি বা জানি শুধু, মাঝে মাঝে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রীর বৈঠকের খবর। যার বিবরণ সংবাদপত্রে পড়ার সুযোগ হয়, টিভি পর্দায় চোখ রাখলে দেখারও সুযোগ হয়। কিন্তু তার সুফল কখনো মিলেছে, এমনটি না দেখা না পড়া কোনোটিরই সুযোগ হয়নি। বরং এ ধরনের বৈঠকের পর প্রতিবারই দাম কমার পরিবর্তে দাম বাড়ার ঘটনাই মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। প্রতিবছর রমজানে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে। রমজানে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়া নিয়ে কথাবার্তা একটু বেশি হয়। লেখালেখিও হয় অন্য সময়ের চেয়ে বেশি। তাই কয়েক বছর ধরে রমজানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটার প্রবণতা কমেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, দাম বাড়ছে না। বরং অপকৌশল হিসেবে রমজানের এক-দুই মাস আগে দাম বাড়ানোর প্রবণতা কাজ করছে।

এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আসছে এপিলে রমজান শুরু, তাই জানুয়ারি থেকেই দাম বাড়ানোর যে প্রবণতার শুরু, ফেব্রুয়ারিতে এসে সেই পারদ আরও ঊর্ধ্বগামী। তবে প্রতি রমজানের আগে আগে এই যে দাম বাড়ানোর প্রবণতা তা কিন্তু রমজান শেষে কমে আসে না। বরং রমজানের শুরুতে যে দাম বাড়ানো হয়, রমজান শেষেও সেই একই দাম থাকে। আর পরের বছর সেই দামের সঙ্গে যোগ হয় বাড়তি দাম। সাধারণ মানুষের সমস্যা এখানেই। কারণ বছর বছর তাদের বাড়তি দামের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম করতে হয়। এই সংগ্রামের সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনার প্রভাব। গত প্রায় দুই বছরে করোনার প্রকোপে অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়েছে। অসংখ্য মানুষের আয় কমেছে। অসংখ্য মানুষ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। এ সংক্রান্ত যেসব জরিপের ফল সংবাদমাধ্যমে আসে, প্রকৃত প্রস্তাবে চাকরি হারানো, বেতন কমে যাওয়া এবং গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হওয়া মানুষের সংখ্যা তার চেয়েও অনেক বেশি। করোনার প্রথম ধাক্কায় যারা শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, যারা কর্মহীন হয়েছে, তাদের বড় অংশই আর মূল স্রোতে ফিরতে পারেনি। যাদের আয় কমেছে, তারা আর আগের আয়ের রেখাটিকে ধরতে পারেনি। কিন্তু তাদের ওপর ঠিকই সিনবাদের দৈত্যের মতো চেপে বসেছে জিনিসপত্রের দামের বাড়তি বোঝা। ফলে মানুষের অসহায়ত্ব কমেনি, বরং বেড়েছে। যা খালি চোখেই আজ দৃশ্যমান।

সরকারের সফলতা অনেক। যত উন্নয়ন প্রকল্প এবং উন্নয়ন যা আজ দৃশ্যমান, যা আজ আর স্বপ্ন নয়, তেমন ঈর্ষণীয় অসংখ্য সাফল্যের পরও দিন শেষে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ কিন্তু তার নিজের জীবন দিয়েই সফলতা ও ব্যর্থতার হিসাব কষে। আমরা উন্নয়নশীল দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় প্রবেশ করলেও আমাদের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের যে সংখ্যা, তাদের সর্বোচ্চ সংখ্যাই কিন্তু মাথাপিছু আয়ের যে হিসাব, তা থেকে অনেক অনেক গুণ পিছিয়ে। তাই তাদের হিসাব-নিকাশের কথা শোনার জন্য দেয়ালে কান পাততে হবে। দেয়ালের এই ভাষা বুঝতে অসমর্থ হলে, আগামীতে এত সাফল্যের পরেও পাশা উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা সামনে ঝুলবে না, তাই বা কে বলতে পারে?

কারণ সাধারণ মানুষের অভিযোগ, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। সরকার সবকিছুতেই আন্তরিক। মানুষকে ভালো রাখতেও সরকারের আন্তরিকতার কমতি নেই। সরকারপ্রধানের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে আমাদের যে অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা বিষয়ে সুনাম তা নিয়েও সাধারণের দ্বিমত নেই, কিন্তু আড্ডায়, হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে বা দেয়ালেও কান পাতলে যে কথাটি ভেসে বেড়াতে শোনা যায়, শুধু জিনিসপত্রের অহেতুক দাম বাড়ায় যে মুনাফাখোরদের কাছে সবাই জিম্মি, তাদের বিরুদ্ধেই কোনো উদ্যোগ নেই।

আমরা সব সময়ই বলি, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। তাই আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, যে মানুষটি সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও পরিবারের সদস্যদের মুখে ঠিকমতো আহার জোগাতে পারছে না, তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। তার আয়ে সংসার খরচ কুলাচ্ছে না। জিনিসের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে তার আয় বাড়ছে না। তখন সেই মানুষটি তার আগামীর হিসাব যে কঠোরভাবে করবে, তাও কিন্তু স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে সামষ্টিক উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তি তার নিজের দিকেই তাকাবে। যতই আমরা মাথাপিছু আয় বাড়ার গল্প শোনাই না কেন, সাধারণ মানুষের কাছে তা শুভঙ্করের ফাঁকি। এ কিন্তু নিতান্ত সাধারণ মানুষের কাছেও স্পষ্ট।

মঙ্গা শব্দটি এক সময় ছিল উত্তরবঙ্গের আতঙ্ক। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়, এ অঞ্চলে মানুষের একটি বড় অংশকে যেতে হয়েছে এই ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে। যা উত্তরের জনপদকে বিপর্যস্ত করেছে। আশার কথা সরকারের আন্তরিকতায় কয়েক বছর ধরে মঙ্গার প্রকোপ যেমন কমেছে, সেই সঙ্গে কমেছে এ অঞ্চলের মানুষের অসহায়ত্বও। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে শহরেও ধেয়ে আসছে বিপর্যয়ের শঙ্কা, তাতে করে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা শব্দটির নতুন রূপ যে জনজীবনে দেখা দেবে না, তাই বা কে বলতে পারে? টিসিবির পণ্যবাহী ট্রাকের পেছনে মানুষের দীর্ঘ সারি কী ইঙ্গিত দেয়? ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ/ মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ? (কৃষকের ঈদ : কাজী নজরুল ইসলাম)। এই মানুষগুলো কি উন্নয়নের জোয়ারের বাইরে থাকা?

মামুন রশীদ : কবি ও সাংবাদিক