
ঘুষ
লেনদেনের মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বরখাস্ত হওয়া পরিচালক
খন্দকার এনামুল বাছিরকে আট বছরের কারাদণ্ড ও ৮০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং
পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানকে তিন বছরের কারাদণ্ড
দেওয়া হয়েছে। বুধবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক শেখ নাজমুল আলম এ
রায় দেন। এ রায়ে সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ পুলিশ বাহিনী ও দুর্নীতি
দমন কমিশনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
দেখা যায়, সাবেক
ডিআইজি মিজান একটি অপরাধ ঢাকতে আরেকটি অপরাধের আশ্রয় নিয়েছেন। আর দুদক
কর্মকর্তা বাছির দুর্নীতি দমন করতে গিয়ে নিজেই দুর্নীতি করেছেন। মামলার
বিবরণে জানা যায়, এক নারীকে জোর করে বিয়ের পর নির্যাতন চালানোর অভিযোগে
২০১৯ সালে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মিজানকে। এর
চার মাস পর দুদকের তৎকালীন পরিচালক এনামুল বাছির তাঁর সম্পদের অনুসন্ধানে
নামেন। অনুসন্ধানকালেই ডিআইজি মিজান দাবি করেন, তাঁর কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা
ঘুষ নিয়েছেন দুদকের ওই কর্মকর্তা। তদন্তে ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়
এবং আদালতের রায়ে দুজনকে ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়। ঘুষ
গ্রহণকারীর শাস্তির মেয়াদ বেশি হয়েছে এ কারণে যে রক্ষক নিজেই ভক্ষকের
ভূমিকায় নেমেছেন। যাঁর দায়িত্ব দুর্নীতিবাজকে ধরা, তিনিই উৎকোচের বিনিময়ে
অপরাধীকে রেহাই দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়,
‘সরকারের দুটি সংস্থার উচ্চপর্যায়ের দুজন কর্মকর্তার মধ্যে ঘুষ লেনদেনের
ঘটনা জাতিকে অবাক করেছে।’ ঘুষের ঘটনায় জাতি যতই অবাক হোক না কেন, অপরাধীরা
যে মোটেই অনুতপ্ত নন, তা ধারণা করা যায় সাবেক ডিআইজি মিজানের আচরণে।
আদালতকক্ষ থেকে তাঁকে পুলিশ ভ্যানে তোলার সময় তিনি ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়েছেন।
নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য যিনি তদন্ত কর্মকর্তাকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন,
তাঁর কাছ থেকে এ প্রতিক্রিয়া পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। সাবেক ডিআইজি বলেছেন,
দুদকে এ রকম আরও বাছির আছেন। দুদকে যেমন আরও বাছির আছেন, তেমনি পুলিশ
বিভাগেও আরও মিজান থাকা অসম্ভব নয়।
দুদকের দায়িত্ব হলো কারও বিরুদ্ধে
দুর্নীতির অভিযোগ এলে কিংবা দুর্নীতিসংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ পেলে তাঁর
ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু তারা কটি
ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা নিয়েছে? বাছিরের ক্ষেত্রেও সংস্থাটি স্বতঃপ্রণোদিত
হয়ে মামলা করেনি, ঘুষদাতার অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়।
উৎকোচ গ্রহণের
দায়ে যখন দুদকের একজন কর্মকর্তা কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, তখন সংস্থাটির
ভেতরের অবস্থা কী? দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে গিয়ে সম্প্রতি চাকরিচ্যুত
হয়েছেন উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন। তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তি ও
গোষ্ঠীর দুর্নীতির তদন্ত করছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিধিভঙ্গের অভিযোগ আনা
হলেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। দুদকের এ
সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের ১০ জন আইনজীবী রিটও
করেছেন।
দুদকের সিদ্ধান্তের কারণে জনমনে ধারণাই হবে যে সংস্থাটি
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী নয়। বরং যেসব
কর্মকর্তা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালান, তাঁরা হয়রানি ও চাকরিচ্যুতির
শিকার হবেন। আর সেই সংস্থাটিতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের কাছেও এ বার্তা
পৌঁছে যাবে যে দুর্নীতিবাজকে ধরা তাঁদের প্রধান কাজ নয়, প্রধান কাজ হলো
‘বিধি’ মেনে চলা। এতে দুদকের ওপর জনগণের আস্থা যে আরও কমে যাবে, সে বিষয়ে
সন্দেহ নেই।