
অধ্যাপক ডা: মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ||
সম্মেলনের সূচনায় বারংবার বলা হয়েছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সীমিত রাখতে না পারলে ধরিত্রি ভয়াবহ রূপ নিবে। কিন্তু সে লক্ষ্য অর্জনের গ্রিনহাউস গ্যাস উদগিরণের পরিমাণ বর্তমান অবস্থা থেকে ৪৫ শতাংশ কমানোর আশাবাদ ব্যক্ত করলেও বিভিন্ন দেশের প্রতিশ্রুতিতে তা কমবে মাত্র ১২ শতাংশ। কপে জাতিসংঘ জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এ হিসেবটাই তুলে ধরেছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহায়তার অর্থায়ন বাধাগ্রস্থ হয়ে আছে বলা হলেও জীবাশ্ম জ্বালানির ইতিটানা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর ক্ষতিপূরণের প্রশ্নে দেশগুলোর মধ্যে মত ভিন্নতা রয়ে গেছে। নাগরিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং স্লোগান দিয়ে সম্মেলন কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে গেছেন। জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় জরুরী ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নিমিত্তে বিক্ষুদ্ধ তরুণ এবং ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তাগিদ সত্ত্বেও কপ-২৬ ঘোষণাপত্রের দ্বিতীয় খসড়াকেও হয়ত: ঢিলেঢালা সমাধানের রূপরেখা বলা যেত কিন্তু ১২.১১.২১ শুক্রবার ভোরে প্রকাশিত এ খসড়াটিও দিনের শেষে সকল দেশ গ্রহণ করতে পারেনি।
পরিবেশবাদী কর্মীরা সম্মেলনের একেবারে শুরুর দিন থেকেই উন্নত দেশগুলোর নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, তাঁরা যেন ২০১০ সালে নির্ধারিত কার্বন নি:সরণের মাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্ধেক কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন এবং বাস্তব পদক্ষেপ নেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ধনী দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করারও জোর দাবি জানাচ্ছিলেন তাঁরা। কার্বন নি:সরণ কমাতে গত ১০.১১.২১ইং বুধবার পর্যন্ত নেতাদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি না পেয়ে তাঁরা জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের নিকট লিগ্যাস পিটিশন দাখিল করার উদ্যোগ নেন। পিটিশনে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে মহাসচিবের প্রতি ৩ মাত্রার জরুরী অবস্থা ঘোষণার আহ্বান জানান। পরিবেশকর্মীরা জলবায়ু নিয়ে বিশ্বনেতাদের তাৎক্ষনিক ও সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয় তদারক করার জন্য একটি টিম গঠন করতে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতি আহ্বান জানান। এব্যাপারে উগান্ডা থেকে আসা কর্মী ভানেসা নাকাতে বলেন, “আমরা প্রতিশ্রুতিতে হাবুডুবু খাচ্ছি। শুধু প্রতিশ্রুতি জনদূর্ভোগ থামাতে পারে না। তাৎক্ষনিক ও নাটকীয় পদক্ষেপ আমাদের বর্তমান নারকীয় অবস্থা থেকে টেনে তুলতে সক্ষম।”
দুই সপ্তাহ ধরে চলা আলোচনায় তৈরি হওয়া চুক্তির খসড়ায় জীবাশ্ম জ্বালানীর জন্য ক্ষতিগ্রস্থ দেশ ও জনসাধারণকে আর্থিক সহায়তা দানের কথা প্রাধান্য পায়। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, মানব সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ এ জীবাশ্ম জ্বালানী। যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত জনকেরি ১২.১১.২১ইং শুক্রবার সম্মেলনে বলেন, সরকারগুলো শত শত বিলিয়ন ডলার জীবাশ্ম জ্বালানীর পেছনে ব্যয় করছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঠেকানোর চেষ্টা করাটা যেন ‘উন্মাদনার সংজ্ঞা’। এদিকে অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন তাঁর জলবায়ু নীতির কারনে দেশ ও দেশের বাহিরে ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছেন। সমালোচনার মুখেই ১৩.১১.২১ইং শনিবার বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সস্তা কিছু আরও টেকসই সমাধান দেয়ার আহ্বান জানান। এরই মাঝে চীন হচ্ছে বিশ্বের শীর্ষ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ। দেশটি উল্লেখযোগ্য পরিমানে তেল ও কয়লাও উৎপাদন করে থাকে। তেল, গ্যাস ও কয়লার জন্য ভর্তূকি দেয়ার বিষয়টি এবারের জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। যেখানে বিজ্ঞানীরা বিশ্ব উষ্ণায়নকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌছতে সম্মেলনের সময়সীমা অতিক্রম করে আলোচনা অব্যাহত রাখেন। জীবাশ্ম জ্বালানীতে ভর্তূকি বন্ধে জাতিসংঘের নেয়া সিদ্ধান্ত ঠেকাতে সৌদি আরব, চীনসহ কয়েকটি দেশ জোর চেষ্টা চালায়। দেশগুলো স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো সম্মেলনে জাতিসংঘের খসড়া ঘোষণাপত্র থেকে এ সংক্রান্ত ভাষা ব্যবহারের বিরোধিতা করে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ ও দরিদ্র দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে মতৈক্য না হওয়ায় ১২.১১.২১ শুক্রবার নির্ধারিত দিনে গ্লাসগোয় জলবায়ু সম্মেলন সমাপ্তি ঘোষণা সম্ভব হয় নেই। যদিও নতুন করে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে কতটা সময় লাগতে পারে সে ব্যাপারে কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না তারপরও যত দ্রুত সম্ভব “বিশ্বের জন্য কল্যাণকর” ঘোষণার মধ্য দিয়ে সম্মেলন শেষ করতে সকল পক্ষের সর্বাত্মক চেষ্টা ছিল। এদিকে ঝুলে থাকা বিষয়গুলো নিয়ে মতৈক্যে পৌছানোর আহ্বান জানিয়েছেন কপের প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা। ১৩.১১.২১ইং স্থানীয় সময় বিকেলে তাঁর নির্ধারিত প্ল্যানারি সেশনকে স্থগিত করে তিনি বলেন, “যা সামনের দিকে এগিয়ে নেবে তা হলো একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্যাকেজ ঘোষণা। প্রত্যেকেই তার বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন এখানে। আমি আশা করি, আলোচনার টেবিলে এখন যা আছে, সবাই তার গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন। যদিও প্রতিটি দিক বিবেচনায় সবাই সবকিছুকে স্বাগত জানাবেন না। কিন্তু সমষ্টিগতভাবে একটা প্যাকেজ ঘোষণা সত্যিকার অর্থে সবাইকে সামনের দিকে এগিয়ে নেবে।”
বিবিসি জানায়, রাতভর আলোচনাশেষে স্থানীয় সময় ১৩.১১.২১ শনিবার সকালে সম্মেলনের তৃতীয় খসড়া প্রকাশ করা হয়। এতে কয়লার ব্যবহার থেকে সরে যাওয়ার বিষয়টিকে জোরালোভাবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নি:সরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে দেশগুলোকে তাদের করণীয় ঠিক করে জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা নতুন করে প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে। আর্থিক সহায়তার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে কিন্তু সুনির্দিষ্ট পরিমানের উল্লেখ না থাকায় ভুক্তভোগী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি ঘোষিত হয়েছে। দেয়া হয়েছে একাধিক প্রতিশ্রুতি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমূহ হচ্ছে-
১. আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বন উজাড় বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ব্রাজিলসহ শতাধিক দেশের নেতৃবৃন্দ। এসময়ের মধ্যে নতুন করে বনায়নের কাজ আরম্ভেরও ওয়াদা করেছেন তাঁরা।
২. বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রিতে আটকে রাখতে একযোগে কাজ করতে ঘোষণা দিয়েছেন চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। এ মতৈক্যকে এ সম্মেলনের ‘চমক’ হিসেবে অখ্যায়িত করা হয়েছে।
৩. ৪০টির বেশি দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে কয়লার ব্যবহার বন্ধে ঐকমত্য প্রকাশ করেছে। যদিও কয়লা ব্যবহারকারী শীর্ষ দুইদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এব্যাপারে কোন প্রতিশ্রুতি দেন নাই।
৪. ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে গ্রিন হাউস গ্যাস মিথেনের নির্গমন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তারা এ লক্ষ্যে পৌছাবে। বায়ুমন্ডলের মিথেন কমানোর বিষয়টিও দ্রুততম সময়ে তাপমাত্রাকে নিম্নমুখী রাখার একটি পূর্বশর্ত।
৫. একটি জোট আত্মপ্রকাশ করেছে এবারের সম্মেলনে। তারা বিভিন্ন দেশকে গ্যাস ও তেল ব্যবহার বন্ধের তারিখ নির্ধারণসহ জীবাশ্ম জ্বালানি অনুসন্ধানে নতুন করে লাইসেন্স প্রদানে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি আদায়ে নিবেদিত থাকবে।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ
ও সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা অঞ্চল