
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
সপ্তম অধ্যায়
১৯১৮ সাল থেকে ‘বিশ্বভারতী’ শব্দটি ব্যবহৃত হলেও ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। ১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় রূপে পরিণত হয়। এখন প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় ব্যয়ভার কেন্দ্রীয় সরকারই বহন করে, মনে রাখতে হবে- একটি মানুুষ, একটি মহৎ আদর্শকে রূপায়িত করতে কি আর্থিক দৈন্যকে স্বীকার করে, সর্বস্ব ব্যয় করেছেন, তারই সঙ্গে দেশ-বিদেশের মহৎ প্রাণ, উদার প্রাণ মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন, তবেই সৃষ্টি হয়েছে আজকের এই ‘বিশ্বভারতী’।
পাঁচটি বালক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজের সীমাবদ্ধ সংগতি এবং অন্যের দানের ওপর নির্ভর করে।
বিশ্বভারতীর দুটি অঙ্গ। শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতন। উভয়ে মিলেই বিশ্বভারতী। শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়েই কবির একটি ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। শ্রীনিকেতনে আর একটির। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
‘যতদিন পল্লীগ্রামে ছিলেম, ততদিন তাকে তন্ন তন্ন করে জানবার চেষ্টা আমার মনে ছিল। কাজের উপলক্ষে এক গ্রাম থেকে আর এক দূর গ্রামে যেতে হয়েছে। শিলাইদহ থেকে পতিসর, নদীনালা বিলের মধ্য দিয়ে-তখন গ্রামের বিচিত্র দৃশ্য দেখেছি। পল্লীবাসীদের দিনকৃত্য, তাদের জীবনযাত্রার বিচিত্র চিত্র দেখে প্রাণ ঔৎসুক্যে ভরে উঠত।... ক্রমে সেই পল্লীর দুঃখ দৈন্য আমার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠল, তার জন্য কিছু করব এই আকাক্সক্ষায় আমার মন ছটফট করে উঠেছিল। তখন আমি যে জমিদারী ব্যবসা করি, নিজের আয়ব্যয় নিয়ে ব্যস্ত, কেবল বণিকবৃত্তি করে দিন কাটাই- এটা নিতান্ত লজ্জার বিষয় মনে হয়েছিল। তারপর থেকে চেষ্টা করতুম- কী করলে এদের মনের উদ্বোধন হবে। আপনাদের দায়িত্ব এরা আপনি নিতে পারবে। আমরা যদি বাইরে থেকে সাহায্য করি, তাতে এদের অনিষ্টই হবে। কী করলে এদের মধ্যে জীবন সঞ্চার হবে, এই প্রসঙ্গই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল...।’
রবীন্দ্রনাথ পূর্ব বাংলার গ্রামে গ্রামে পল্লীবাসীদের পানীয় জলের অভাব, রোগের প্রভাব, যথোচিত অন্নের দৈন্য স্বচক্ষে দেখেছিলেন। তখন থেকে তাঁর মন বাংলার পল্লী ও পল্লীবাসীর চিন্তায় ভারাক্রান্ত হয়েছিল।
অন্তরের প্রেরণায় রবীন্দ্রনাথ দুটি পথ প্রত্যক্ষ করলেন। এক, গ্রামীণ অর্থনীতি পরিবর্তন এবং সর্বজনীন শিক্ষা। গ্রামীণ আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য কৃষিকার্য ও কুটিরশিল্পের উন্নতি সাধন। কবির তৎকালীন ভাবনার বাস্তবরূপই হলো ‘শ্রীনিকেতন’। শান্তিনিকেতন থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে সুরুল গ্রাম, বেশ বর্ধিষ্ণু গ্রাম। গ্রামের এক প্রান্তে একটি প্রাচীন কুঠিবাড়ি, পরিত্যক্ত। চারদিকে ঝোপজঙ্গলে পূর্ণ। ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঐ বাড়ি ও জমি জমিদারদের কাছ থেকে খরিদ করলেন। ঝোপ জঙ্গল পরিষ্কার করে বাড়িটি সংস্কার করে ১৩২১ (১৯১৪) সনের পয়লা বৈশাখ গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সংলগ্ন জমিতে চাষ এবং গো-পালন দিয়ে কাজ শুরু হলো। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ওখানে থেকে কাজ আরম্ভ করলেন। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছা ছিল যে পুত্র রথীন্দ্রনাথ শ্রীনিকেতনের দায়িত্বে থাকবেন এবং তিনি শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের দেখাশুনা করবেন। ‘শ্রীনিকেতন’ নামকরণের মধ্যে কবি যা বলতে চেয়েছিলেন তা হলো পল্লীজীবনের সর্বাঙ্গীন ‘শ্রী’ ফিরিয়ে আনাই হবে এই কেন্দ্রের লক্ষ্য। কবি লিখেছেন-
আমার জীবনের যে দুটি সাধনা, এখানে হয়ত তার একটি সফল হবে। কবে হবে, কেমন করে হবে তখন তা জানতাম না। অনুর্বর ক্ষেত্রেও বীজ পড়লে দেখা যায় হঠাৎ একটি অঙ্কুর বেরিয়েছে কোন শুভলগ্নে, কিন্তু তখন তার কোনো লক্ষণ দেখা যায় নি। সব জিনিষের তখন অভাব। তারপর আস্তে আস্তে বীজ অঙ্কুরিত হতে চলল। এই কাজে আমার বন্ধু এলম্হার্ষ্ট আমাকে খুব সাহায্য করেছেন। তিনিই এ জায়গাকে একটি স্বতন্ত্র কর্মক্ষেত্র করে তুললেন।... আমি একলা। সমস্ত ভারতবর্ষের দায়িত্ব নিতে পারব না। আমি কেবল জয় করব একটি বা দুটি গ্রাম। আমি যদি দুটি তিনটি গ্রামকে মুক্তি দিতে পারি অবজ্ঞা, অক্ষমতার বন্ধন থেকে, তবে সেখানেই সমগ্র ভারতের একটি ছোট আদর্শ তৈরি হবে।’
প্রথম দিকে গ্রামের লোকের সন্দেহ ছিল যে এত মাতামাতি অল্পদিনের জন্য। কিন্তু ক্রমেই সে ভুল ভাঙতে থাকে। তাই ১৩৩৩ সনে প্রবাসী লিখেছেন-
‘বিশ্বভারতীর অন্তর্গত শ্রীনিকেতনের সার্বিক উৎসব সম্প্রতি হইয়া গিয়াছে। ইহা বোলপুরের নিকটস্থ সুরুল গ্রামে স্থিত। ইহার দ্বারা সুরুল ও নিকটবর্তী অন্য অনেক গ্রাম উপকৃত হইতেছে। বাংলাদেশ গ্রাম প্রধান। গ্রামগুলির নূতন ও আনন্দময় জীবন দিতে হইলে গ্রামের লোকদিগকে পরস্পরের প্রতি সদ্ভাবপূর্ণ এবং পরস্পরের সহযোগী করিতে হইবে। জ্ঞান দিতে হইবে, চাষের উন্নতি করিতে হইবে এবং তন্তুবায়, চর্মকার প্রভৃতি শ্রেণীর লোকদের শিল্পের উন্নতি সাধন করিতে হইবে। শ্রীনিকেতনের কর্মীরা, কেবল মৌখিক উপদেশ দ্বারা নহে, পরন্তু কাজ করিয়া এবং কাজ করিতে শিখাইয়া এই সমুদয় দিকে গ্রামবাসীদিগকে স্বয়ং নিজের হিত নিজে করিতে সমর্থ করিতেছেন। এই জন্য ইহার কাজের উন্নতি বিস্তৃতি ও স্থায়িত্ব ও সাফল্য সর্বতোভাবে বাঞ্ছনীয়।
প্রথমে ৫০ বিঘা জমি ও একটি পুকুরকে কেন্দ্র করে শ্রীনিকেতনে কাজ শুরু হয়, পরে অবশ্য শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের পার্শ্ববর্তী ৭০০ একর জমি, ডাঙা বিশ্বভারতীর অনুকূলে সরকারি অধিগ্রহণ করা হয় এবং কাজের পরিধি ব্যাপ্তি লাভ করে। শ্রীনিকেতনের আদর্শ ও কর্মনীতি ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয়। তা হলো-
১. পল্লীবাসীদের সঙ্গে স্নেহের ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করা, তাদের উন্নত জীবন যাপনে এবং সমস্যার সমাধানে সহযোগিতা করা।
২. গ্রাম ও গ্রামবাসীদের, তাঁদের কৃষিকার্যের সমস্যাগুলি দেখা, শ্রেণীকক্ষে আলোচনা করা এবং কৃষিবস্তুর তার প্রয়োগ প্রদর্শন করা।
৩. পাঠ্য বিষয়বস্তুর মূল বক্তব্য গ্রামবাসীদের মধ্যে সঞ্চারিত করা। স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা এবং সাফাই সম্পর্কে সচেতন করা। উন্নত প্রথায় চাষ, পশুপালন, তাঁত শিল্পের উন্নয়ন এবং সহযোগিতার নীতিতে উদ্বুদ্ধ করা।
৪. সর্বাঙ্গীণ শিক্ষাবিস্তার, ব্রতীবালকদল গঠন, তাদের শিক্ষাদান, যাতে দেশ ও জাতির প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠ হয়।
৫. দরিদ্র, অর্ধশিক্ষিত, বঞ্চিত মানুষের সেবায় ছাত্র ও কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করা।
৬. প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রী হাতে কলমে এমনভাবে কাজ শিখবে যাতে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যোগ্যতার সঙ্গে বাঁচতে পারে।
৭. কৃষি, পশুপালন, হাঁস মুরগী পালন, তাঁত শিল্প, চর্ম শিল্প প্রভৃতি গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নতির সহায়ক বিষয়গুলি সহযোগিতার নীতিতে শিক্ষালাভ করতে পারে।
এই সব উদ্দেশ্য ও কর্মনীতি রূপায়ণের জন্য প্রথম দিকে তিনটি ধারায় কাজ চলত। কৃষি, শিল্প এবং অন্যান্য বিষয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা এবং গবেষণার মাধ্যমে হাতে কলমে কাজ শেখা। অন্যদের শিক্ষণ দেওয়া এবং গ্রামাঞ্চলে তা সম্প্রসারিত করা। প্রথম দিকে সতেরোটি গ্রামে এই কাজ আরম্ভ হয়। এক একজন কর্মীর ওপর এক একটি গ্রামের দায়িত্ব থাকত।
কুটির শিল্প ও কারুশিল্প চর্চাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে ‘শিল্পভবন’। ১৯২৭ সাল থেকে বয়ন, চামড়া, পাকা করার কাজ, কাঠের কাজ, গালার কাজ, বই বাঁধাই, কাগজ তৈরি, মাটির তৈরি নানা দ্রব্য, বাটিক এর কাজ শিখানো হতো। একসময় বয়ন শিল্পের তৈরি ধুতি, শাড়ি, গামছা, আসন, কম্বল, গালিচা, সতরঞ্চির চাহিদা ছিল যথেষ্ট। চর্ম শিল্পে তৈরি হতো চামড়ার ম্যানিব্যাগ, মেয়েদের হ্যান্ড ব্যাগ, বটুয়া, মোড়ার-ঢাকা এবং বেল্ট এর প্রচুর চাহিদা ছিল। এখনও সীমিত হলেও এ ধারাবাহিকতা রয়েছে এবং নতুন পণ্যের আমদানী হয়েছে। শ্রীনিকেতনে নারী শিক্ষার জন্য ‘প্রাথমিক বালিকা বিদালয়’, বয়স্কা মেয়েদের জন্য মহিলা সমিতি গ্রামে গ্রামে কেন্দ্র গড়ে ওঠে এবং গ্রামীণ শিক্ষা-বিস্তারের জন্য ‘চলন্তিকা’ গ্রন্থাগার ছিল। এ গ্রন্থাগার থেকে কয়েকটি গ্রামে বইপত্র আদান প্রদান চলত। এ ধারণা থেকেই হয়ত অধ্যাপক আবদুল্লা আবু সাঈদ ‘বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র’ গড়ে তুলেছেন। একই আদর্শে পল্লী গ্রামের দরিদ্র ও নারীদের কর্মসংস্থান, কর্মমুখী ও সচ্ছল করার আদর্শে ড. মুহাম্মদ ইউনূছ গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা অনুমান করা যায়। আমি মোটর সাইকেলের পিছনে বসে আড়াই ঘন্টা যাবত যা দেখেছি- তাতে স্পষ্টই মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথ সমবায় পদ্ধতির জনক, গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠির ভাগোন্নয়নের পথ প্রদর্শক, চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতির রূপকার। এজন্য শ্রীনিকেতনের মাধ্যমে ‘কৃষি ঋণ সমিতি’, ‘সমবায় স্বাস্থ্য সমিতি’, ‘লোকশিক্ষা সংসদ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
‘আমার ক্ষমতা সীমিত, আমি বড় জোর দু’একটি গ্রামকে দারিদ্র্য ও অশিক্ষার হাত থেকে মুক্তি দিতে পারি।’
শ্রীনিকেতন দেখে মনে হয়েছে- যে আদর্শ, যে পথ রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতে সেই একই মডেল অনুসৃত হয়েছে। রবীন্দ্র-ভাবনায়-
এই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে
দিতে হবে ভাষা; এই সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুক
ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা
.... ..... ..... .... .... .... ... ......
অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু,
চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু
সাহস বিস্তৃত বক্ষপট।
এই বক্তব্য যে নিছক তাঁর কাব্যকথা ছিল তা নয়, একক চেষ্টায় শ্রীনিকেতনকে কেন্দ্র করে, তার বাস্তব রূপ দিয়ে দেশের সামনে একটি আদর্শ স্থাপন করেছিলেন- শ্রীনিকেতনের সার্থকতা এখানেই।
শ্রীনিকেতনের নিজস্ব উৎসব বলতে ‘শ্রীনিকেতন, প্রতিষ্ঠা-বার্ষিকী (৬ ফেব্রুয়ারি), ‘হলকর্ষণ উৎসব’ (যা ১৯২৮ সালের ১৫ জুলাই থেকে হয়ে আসছে) এবং ‘শিল্পোৎসব’ (১৩২৫ সনের ৩১ ভাদ্র বিশ্বকর্মা পূজার দিন সূচনা হয়।)। এসব উৎসবের স্থানগুলো দেখে আবেগে আপ্লুত হয়েছি।
(ক্রমশঃ)
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
মোবাইল: ০১৭১১-৩৪১৭৩৫