
অধ্যাপক ডা: মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ||
১৯৭০ থেকে ২০১৬ এর মধ্যে পৃথিবীর পাখী, মাছ, উভচর প্রাণী ও সরীসৃপদের সংখ্যা অন্তত: ৬৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জীবজন্তুর সংখ্যা কমছে প্রতিনিয়ত। মানুষের উপযুক্ত বসবাসের জন্য একটি মাত্র গ্রহই হচ্ছে এ পৃথিবী। ভূপ্রকৃতির যথেচ্ছ ব্যবহার, দখল, দূষণ ও নানাহ ধংসাত্মক কর্মকাণ্ডে বিষাক্ত হয়ে উঠছে পরিবেশ ও প্রকৃতি। হুমকির মুখে পড়ছে মানুষের অস্তিত্ব। পৃথিবীর এ পরিণতির অসংখ্য কারণ রয়েছে এর মধ্যে পাঁচটি কারণ রয়েছে যেগুলোকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা এটাও স্বীকার করেছেন সবাই মিলে পাঁচটি কারণ মোকাবেলা করতে পারলেই বেঁচে যাবে পৃথিবী।
কিছুদিনের মধ্যেই চীনের কুনমিংএ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জলবায়ু বিষয়ক কপ-২৬ সম্মেলনের প্রথম ধাপের বৈঠক। বিশ্বের জীববৈচিত্র ও প্রকৃতি ধংসের কারণসমূহ এড়াতে নানাহ কৌশল ও নীতি নিয়ে আলোচনা করবেন বিভিন্ন দেশের সরকার ও নীতি নির্ধারকরা গুরুত্বপূর্ণ এ বৈঠকটিকে সামনে রেখে ইন্টার গভার্ণমেন্টাল সাইন্স পলিসি প্লাটফর্ম অন বায়োডাইভারসিটি এন্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস (আইপি-বিইএস) প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র ধংসের পাঁচ প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। কারণগুলো হচ্ছে- (১) ভিন্ন প্রজাতির আগ্রাসন (২) ভূমির বিরূপ পরিবর্তন, (৩) প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার, (৪) দূষণ ও (৫) জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্লেষকদের ধারনা জীববৈচিত্র রক্ষায় সফল হতে হলে বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের এ পাঁচটি কারণ অবশ্যই মোকাবেলা করতে হবে।
ভিন্ন প্রজাতির আগ্রাসন: আটলান্টিক মহাসাগরের দক্ষিণ গফ আইল্যান্ডে ইদানীংকালে রোডেন্ট ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে গেছে। দ্বীপটিতে বাসা করে যে সকল পাখী বসবাস করে তাদের হাজার হাজার ডিম ও ছানা খেয়ে ফেলছে এসব ইঁদুর। উনিশ শতকের কোন এক সময় নাবিকদের নৌকায় করে এ প্রজাতির ইঁদুর পৌছে গিয়েছিল দ্বীপটিতে। এভাবে মানুষের হাত ধরে এক অঞ্চলের বিশেষ এক প্রজাতি অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত হচ্ছে। ফলে স্থানীয় প্রজাতিগুলির প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিশেষ ঐ প্রজাতি। এ ধরনের আরও অনেক সমস্যা আছে যা বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের বিশেষ নজর দেয়া উচিত।
ভূমির বিরূপ পরিবর্তন: বিশ্বের জনবসতি বাড়ার কারণে খাদ্য চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু ধরিত্রীর সম্পদের পরিমাণ সীমিত এবং ভূমির পরিমানও এর ব্যতিক্রম নয়। নিয়ত জনসংখ্যা বাড়ার কারণে তাদের খাদ্যের যোগান দিতে বহুদিন যাবত পড়ে থাকা অনাবাদী জমি/ভূমিকে কৃষির আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে ঐ সকল স্থানে বসবাসকারী জীবজন্তু তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে। উদাহরণসরূপ বলা যায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার প্রেইরি নামক বিস্তীর্ণ তৃণভূমি নষ্ট করে আবাদী জমি সৃষ্টি করা হচ্ছে। উইসকনসিন- মেডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বিষয়টি উঠে এসেছে। ঐ গবেষণায় বলা হয়েছে ২০০৮ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত শুধু এ আট বছরে ঐ অঞ্চলের প্রায় ৪০ লক্ষ হেক্টর জমি নতুন করে চাষাবাদের আওতায় আনা হয়েছে। পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে এ প্রবণতা বন্ধ করা একান্ত প্রয়োজনীয়।
প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার: খনিজ পানির অধিক ব্যবহারে এর উত্তোলন বেড়ে গেছে যার ফলে জীববৈচিত্রের নতুন সংকট সৃষ্টি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞমহল ভাবছেন। বিশ্বের প্রায় অনেক দেশসমূহে কৃষিকাজে ব্যবহারের নিমিত্তে ও খনি কোম্পানিগুলো খনি থেকে অধিক হারে পানি তুলছে। ফলত: নদী-খাল-বিলসমূহ শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে মিঠাপানির বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। মাছ ধরা আর গাছ কাটা থেকে শুরু করে বন্যপ্রাণী শিকার, তেল, গ্যাস ও পানির মত প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপক ও যথেচ্ছ ব্যবহারে পৃথিবীর গোটা প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র ধংস হচ্ছে।
দূষণ: অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়নের বিস্ফোরন, বনাঞ্চলের সংকোচন, কৃষিকাজে ব্যাপক রাসায়নিকের ব্যবহার এবং যেখানে সেখানে দূষিত বর্জ্যরে নিক্ষেপে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। ডব্লিউডব্লিউএফ বা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড ফর নেচার প্রতি দুই বছর অন্তর লিভিং প্লানেট নামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত ২০২০ এ প্রকাশিত ডব্লিউডব্লিউএফ প্রতিবেদনটিতে জানিয়েছে, ১৯৭০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত গোটা বিশ্বে মাছ, পাখি, উভচর প্রাণী ও সরীসৃপদের সংখ্যা নিদানপক্ষে শতকরা ৬৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জলাভূমি বা নদীতে থাকে এমন প্রাণীর সংখ্যা প্রায় ৮৪ শতাংশ কমেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন: জলবায়ু পরিবর্তনের এবং অতিরিক্ত কার্বন নি:সরণের ধারা অব্যাহতভাবে চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনকে বিশ্বের সবচে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৭৫০ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ধরিত্রীর বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড ২৮০ পিপিএম থেকে বেড়ে প্রায় ৪১০ পিপিএম এ উঠেছে। এ সময়ের মধ্যে গড় তাপমাত্রা পৃথিবীতে প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যদি আর ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে তবে বাস্তুতন্ত্রের প্রবল আঘাত লাগবে। আইপিসিসি বলেছে, ২০১৭ সনে বাতাসে যত কার্বন ডাই অক্সাইড ছিল, আগামী এক দশকের মধ্যে তাকে অন্তত: ৪৯ শতাংশ কমাতে হবে।
নভেম্বর’২১ এ অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৬। কার্ডিফে ১৪.১০.২১ এ অনুষ্ঠিত ওয়েলস এসেম্বলির ষষ্ঠ সেশনে জলবায়ু সংকট নিয়ে ৯৫ বছর বয়সী রানী ২য় এলিজাবেথ কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, “আমি শুধু কপ-২৬ সম্মেলন সম্পর্কে শুনেই আসছি। কারা কারা আসছেন আমার ধারনা নাই। কারা আসছেন না আমরা শুধু তা জানি। মনে হচ্ছে এটা বেশি আশাব্যঞ্জক হবে না।” তিনি আরও বলেন, “তারা যখন কথা বলে সেটি সত্যিই অনেক বিরক্তিকর। তারা বলে কিন্তু কাজ করে না। রাণীর নাতি প্রিন্স উইলিয়ামস ১৩.১০.২০২১ এ বিবিসিকে দেয়া এক স্বাক্ষাতকারে মহাকাশ পর্যটনের সম্ভাবনাময় বিষয়টিকে প্রত্যাখান করে বলেন, আমাদের আগে জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে। কপ-২৬ সম্পর্কে প্রিন্স উইলিয়ামস বলেন, “আমি মনে করি, খুব স্পষ্ট ও সৎভাবে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এগুলোর সমাধান কি হতে পারে, তা খুজে বের করা জরুরী। আমরা যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়ার পরিবর্তে আর কোন কথার ফুলঝুরি চাই না।” উইলিয়ামস এর বড় ছেলে আট বছর বয়সি জর্জও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, “আমার ছেলে স্কুলের মাঠ থেকে ময়লা তুলে ডাস্টবিনে ফেলেছিল। পরদিন এসে আবার ময়লা দেখতে পেল। এ নিয়ে সে আমার কাছে পরিবেশের উপর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। যদিও সে আবারও ঐ ময়লা তুলে ডাস্টবিনে ফেলেছে। বৃটিশ রাজপরিবারের তিন প্রজন্মের বিশ্ব জলবায়ু নিয়ে এ হতাশাকে অবশ্যই আমাদের উৎড়িয়ে যেতে হবে এবং অন্য কোথাও গিয়ে বাঁচার জায়গা না খুজে জলবায়ু সম্মেলন থেকেই কিছু মেধাবী ও সুন্দর মনের মানুষ খুঁজে বের করতে হবে যাতে আমাদের এ ধরিত্রীকেই বসবাসের জন্য উপযোগী, পরিবেশ বান্ধবরূপে মেরামত করার মনোনিবেশ করবেন।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও
সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা অঞ্চল