ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
রবিবাসরীয়
Published : Sunday, 17 October, 2021 at 12:00 AM
রবিবাসরীয়




 





কাঁচের কারাগার
রবিবাসরীয়মো. আরিফুল হাসান ||
উত্তর দিক থেকে হাঁটা শুরু করে সে। হাঁটতে হাঁটতে আবার বট গাছটার কাছে ফিরে আসে, যেটি থেকে সে পথ হারিয়েছিলো। যাওয়া হচ্ছিলো সুরেশ্বরপুর। পথমাঝে দীর্ঘবিস্তৃত বটের ছায়ায় প্রাণ জুড়িয়ে নিতে দু পলক বসেছিলো। কখন যেনো ঘুম পেয়ে গেলো তার। এমন ঝিরিঝিরি বাতাস, এমন গভীর সবুজস্বর্গ ছায়া, চোখের পাতা কি না লেগে আর পারে। আপনাতেই মুদে এসেছিলো দুই চোখ। তারপরে যখন সে ঘুম থেকে উঠলো এবং দেখলো সে সূর্য অস্ত যেতে আর বাকি নেই তখন থেকেই সে গন্তব্যহারা। সে ভুলে গেলো সুরেশ্বরপুরের নাম, সে ভুলে গেলো কোথা থেকে সে এসেছে। একটা স্মৃতিহীন বিভ্রান্তির ভেতর সে মাঠের এপাশ থেকে ওপাশে, ও পাশ থেকে এ পাশে চক্কর কাটতে থাকলো। বারবার ঘুরে ফিরে শুধু বটগাছটার কাছেই সে ফিরে আসে এবং যখনই আসে দুদণ্ড তার এখানে বসতে ইচ্ছে হয় এবং বসার পরেই তার চোখ লেগে যায়। ঘুম থেকে উঠে দেখে রাত্রি এক প্রহর হয়ে গেছে। সে তখন মরিয়া হয়ে আবারও তার একটি গন্তব্য খুঁজতে হাঁটতে থাকে এবং চাঁদের আলোয় বারবার সে ঘুরেফিরে বটগাছটির তলায়ই ফিরে আসে। এ নিয়ে তিনবার সে চক্কর কেটেছে এবং চক্কর কাটতে কাটতে এখন রাত মধ্যপ্রহর যাই যাই করছে, কিন্তু তার গন্তব্য খোঁজা হলো না। এমনকি মনেও পড়ছে না সে ঠিক কোথা থেকে রওনা দিয়েছিলো। একটি মানুষ যে হঠাৎ করে তার সমস্ত স্মৃতি হারিয়ে ফেলতে পারে এ বিষয়টি তাকে আনন্দ দিচ্ছিলো আবার শঙ্কিতও করছিলো যুগপৎ। শেষমেষ চতুর্থ বার যখন যে গাছটার কাছে ফিরে আসে তখন ফিঁকে একটি চাঁদ পশ্চিম দিগন্ত থেকে ছুটে এসে পূর্ব দিগন্তে অস্ত যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো। পথিক এবারও ঘুম ঘুম অনুভব করে। তার মনে হয়, দু-দণ্ড যদি এখানে বসা যায়, এই অবারিত বৃক্ষছাউনির নিচে, যদি মন স্থির করে বসা যায়, তাহলে হয়তো সে তার গন্তব্য খুঁজে পাবে অথবা তার মনে পড়বে সে স্থানের কথা, যেখান থেকে সে যাত্রারম্ভ করেছিলো।
এবারও তার চোখ লেগে আসে এবং সে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে পতিত হয়। সে দেখতে থাকে, একটি বিরাট বড় নেকড়ে তাকে তাড়া করছে আর সে প্রাণ বাঁচাতে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছে। বেপরোয়া নেকড়েটা কিছুতেই তার পিছু ছাড়ছে না এবং সে ছুটে যাচ্ছে মাঠের পর মাঠ, গ্রামের পর গ্রাম, জনপদ থেকে জনশূণ্য অরণ্যের ভেতর দিয়ে সে ছুটে যাচ্ছে প্রাণ বাঁচাতে। চারপাশে বহমান সময় তার দিনরাত্রির ঈঙ্গিত নিশ্চিত করছে এবং সে দেখতে পাচ্ছে বড় একটি থালার মতো টকটকে লাল সূর্য উঠছে পূর্ব দিগন্তে। মানুষজন ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙ্গে ছাইয়ের মাজন হাতে নিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে নদীর দিকে যাচ্ছে, নদীতে স্নান করে ফিরে যাচ্ছে নববধু কোনো ঘরের, কোনো ঘরের জেলেপুত্র হাতের জালটাকে আকাশে বার কয়েক দুলিয়ে ছুড়ে মাড়ছে জলের মানচিত্রে। বৃহৎ একটি বৃত্ত রচনা করে জালটি টুপ করে ডুবে যাচ্ছে। জেলে টেনে তুলছে টেংরা পুটি মাগুর সমেত ভরপুর জাল। Ñএসবের মধ্য দিয়ে, এই দিবসের শুরুর নির্মল চঞ্চলতার মধ্য দিয়ে সে শুধু প্রাণ বাঁচাতে তীব্রতর ছুটে যাচ্ছে আর আশপাশের মানুষ যেনো কেউই তাকে দেখছে না। সে চিৎকার করে সকলের সাহায্য চাইছে কিন্তু কেউ তার আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না। এমনকি চিতাটিও যেনো কোনো মানুষজনকে দেখতে পাচ্ছে না, না হলে এমন লোকজনের ভেতর দিয়ে সে তাকে দৌঁড়ে নিয়ে যাবে কেনো? লোকটি প্রাণ বাঁচাতে রুদ্ধশ্বাসে কোনো এক মানুষকে আকড়ে ধরছে, যে কিনা চোখের পিচুটি মুছতে মুছতে জলের কাছাকাছি এসে পড়েছে। কিন্তু কি হলো? কই লোকটি? একটি শূণ্যতাকে জাপটে ধরে, অসীম শূন্যতার ভেতর হোঁচট খেয়ে তাড়া খাওয়া লোকটি আবার দৌঁড়াতে থাকে। এক নববধু ভেজা বসনে নদীতীর থেকে ফিরছে, পথিকের হঠাৎ কেনো যেনো মায়া হলো নারিটির জন্য। সে ভাবলো, চিতাটি না আবার ওই বধুটিকেই কামড়ে দেয়। সে প্রাণপণে সরুন সরুন চিৎকার করতে করতে দৌঁড়াচ্ছে কিন্তু নববধুটি তার কথা শুনছে বলে মনে হচ্ছে না। অগত্যা চিতা, পথিক ও নববধুটি একই পথরেখার মধ্যে এসে পড়লে পথিক অবাক হয়ে লক্ষ করে সে বধুটির ভেতর দিয়ে কেমন জল কেটে চলে যাওয়ার মতো চলে গেলো। চিতাটিও বধুটির ভেতর দিয়ে অবলীয়ায় এ পাশে এসে পৌঁছলো। লোকটি আশ্চর্য  হলো যখন সে ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখলো, বধুটিও তেমনি পূর্বচলে তার পথ চলছে ভেজা বসনে। পথিত তিলেক মাত্র না থেমে আবারও দৌঁড়াতে শুরু করলো এবং তার পেছনে আগের মতোই ধাওয়া করতে থাকলো চিতাটি।
আবারও ঘুম ভেঙে গেছে। রাত্রি এখন কতটা তার জানা নেই। শেষবার যখন চোখ লেগে আসছিলো তখন দেখেছিলো ফ্যাকাসে চাদটি পূর্বের আকাশে ডুবে যাবে বলে ভেঙে ভেঙে পড়ছিলো। চাঁদটি ডুবে গেছে। কিন্তু রয়ে গেছে অসংখ্য তারা। তারার আলোয় এক ধরনের মায়াময় একটি দৃষ্টিক্ষেত্র তৈরি হলে সে দেখলো, সে যেই গাছটির নিচে বসেছিলো সে গাছটি কোথায় যেনো হঠাৎ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ভালো ভাবে চোখ কচলে আবারও সে চারপাশে তাকালো। না, নেই। মাথার উপর ঝকঝকে আকাশ তারার আলো বুকে ধরে জেগে আছে। সে আকাশের দিকে তাকায়। বটগাছটা থাকলে এতোটা স্বচ্ছভাবে আকাশ দেখার সুযোগ ছিলো না। পাতার ছাউনিতে আলো ও জলরোধক যে ছাতের নিচে সে বসেছিলো এখন সেখানে শুধুই খোলা আকাশ। সে আবার পূর্ব পশ্চিমে তাকায়। না, দিকটা সে নির্নয় করতে পারছে না। আবার সে আকাশের দ্বারস্ত হয়। কোনো একটি তারাকে নিশানা করে দিক ঠিক করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারার মানচিত্র তার কাছে দুর্বোদ্য ঠেকে। বিস্তৃত প্রান্তরের মাঝে তার দশদিগন্ত কোনো এক দিগন্তহীনতায় মুছে যায়। সর্বশেষ ঘুমের ঘোরে যে স্বপ্নটি সে দেখেছিলো তা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবে। না কোনো চিতাটিতা আশে পাশে নেই। সে আবারও ডানে বামে তাকায়, না, কোনো ক্ষুধার্ত পশু আশেপাশে উৎ পেতে নেই। হাহাকারভরা বিস্তীর্ণমাঠটি শুধুমাত্র তাকে শূন্যকোলে করে পড়ে আছে। মাটি বোধয় ঘুমায়। সে মাটির বুকে কান পাতে। একটি কেমন যেনো নিঃশ্বাসের শব্দ টের পায়। সে বুঝতে পারে, সারাদিন রৌদ্রদাহে দগ্ধ হয়ে এই রাতের মাটি এখন গভীর ঘুমের ভেতর নিস্পন্দ হতে চাইছে। সে নাক ডুবিয়ে ঘুমন্ত মাটির গন্ধ নেয়। ঘাসের শিশিরভেজা ডগা তার নাকের ভেতর গিয়ে সুরসুরি দেয়। হেচ্ছো করে হাঁচি আসে তার। সারা শরীরটা একটা ঝাকুনি দেয়। মাথাটা কেমন যেনো লক থেকে খোলে। হ্যা, রাত এখন গভীর; আর সে মাঠে আছে এও সত্য। কিন্তু তার মাথার উপরে যে বটগাছটা থাকার কথা ছিলো সেটি সে এখনো দেখে না। আবারও সে এদিক ওদিক চায়। দূরে আবছায়ার মতো কি যেনো একটি চোখে পড়ে। সে বসা থেকে উঠে। চোখের উপরে কপালে হাত রেখে সে দৃষ্টিকে নিবদ্ধ করার চেষ্টা করে। হ্যা, আবছায়াটি সে চিনতে পেরেছে। বিকেল থেকে এই রাতশেষের কাহন অবধি বারবার ঘুরে ফিরে সে সেই ছায়াটির কাছেই ফিরে গেছে। আবার ছায়াগাছটির ভেতর থেকে গন্তব্য ও যাত্রারম্ভ খুঁজে পেতে পন্থমেলা দিয়েছে এবং নিস্ফল হয়ে সে আবারও ফিরে এসেছে বটগাছটির কাছেই। পথিক তার কাঁচের কারাগার ভেঙে আবারও এগিয়ে যেতে থাকে বটগাছটির দিকে।



কবি ও রহস্যময়ী বিশ্বজিৎ চৌধুরী
রবিবাসরীয়আলমগীর মোহাম্মদ ||
কবি ও রহস্যময়ী পড়লাম। একটু সময় নিয়েই। কারণ এটা তথাকথিত এক বসায় পড়ার মতো বই নয়। নন-ফিকশন ধাঁচে লেখা এই টেক্সট মূলত সাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরীর নজরুল গবেষণার ফল। নজরুল সাহিত্য ও জীবন নিয়ে লেখা গুরুত্বপূর্ণ কর্ম পাঠ করে এই টেক্সট লেখা -- সেটা সচেতন পাঠকমাত্রই সহজে বুঝতে পারবেন। নজরুল জীবনে ফজিলাতুন্নেছার উদয়, তাঁর প্রেমে নজরুলের বিগলিত হওয়া, পশ্চাৎপদ মুসলিম সমাজে নারী শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা,  সকল বাঁধা পেরিয়ে ফজিলতের উচ্চ শিক্ষা অর্জন এই হলো কবি ও রহস্যময়ীর মূল আলোচ্য।
নজরুল পত্রাবলিতে সবচেয়ে আবেগমাখা যে ক'টা চিঠি আছে তাঁর মধ্যে মোতাহার হোসেনকে লেখা চিঠিগুলো অন্যতম। চিঠিগুলো বন্ধুর কাছে লেখা হলেও, বিষয় ছিল ফজিলাতুন্নেছার প্রতি কবির প্রেম। ফজিলাতুন্নেছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান ছাত্রী। ইডেন কলেজ ও বেথুন থেকে পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন ফজিলত। কিন্তু সেই যাত্রাটা মোটেও মসৃণ ছিল না তাঁর জন্য। একজন মাইনর স্কুলের শিক্ষক বাবার মেয়ে ফজিলতকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল।
ফজিলতের জীবন সংগ্রাম আমাদের বলে দেয় কতটা পশ্চাৎপদ ছিল সেকালের মুসলিম সমাজ। মুসলিম মেয়ে বেপর্দা কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে সেটা সমাজ মানতে পারেনি। গণিত বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নলিনীমোহন না হলে ফজিলতের পড়ালেখাই হতো না। নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়ে, খোঁজখবর রেখে তদারকি না করলে ফজিলাতুন্নেছার পড়ালেখা হয়তো নাও এগোতে পারতো। ফজিলতের স্যারের এই অভিভাবকত্ব ভালো চোখে দেখেননি অনেকেই। এর মধ্যে কাজী নজরুল অন্যতম।
মোতাহার হোসেনকে ভাই ডাকতেন ফজিলাতুন্নেছা। পদার্থ বিদ্যার এই অধ্যাপকের সাথে অনেকটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে অল্পবয়সে মা হারা ফযিলতের। সেই সুবাদে তাঁর বন্ধু কাজী নজরুলের সান্নিধ্যে আসেন ফজিলত। কিন্তু সৃষ্টিশীল মানুষের এই একটা সমস্যা। তাঁরা গুণমুগ্ধ হয়ে প্রেমে না পড়ে পারেন না। নজরুলের সান্নিধ্য বা সাহিত্যে উপভোগ করলেও কবিকে প্রেমের জগতে স্থান দেন না ফজিলত। কারণ  তিনি জানতেন তাঁকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আরেকটা কারণ ছিলো। ফজিলাতুন্নেছা জানতেন নজরুলের ঘর সংসার আছে। তাঁকে সে সংসার ত্যাগে ফজিলাতুন্নেছা উৎসাহিত করেননি। বরং নজরুল যখন নিজেকে ফজিলতের কাছে সম্পর্ণ করেন তখল ফজিলতের স্পষ্ট জবাব;
" কেন ভালোবেসেছেন? আপনার স্ত্রী -পুত্র সংসার আছে, কৃষ্ণনগরে তাঁদের রেখে এসে আরেকজনের কাছে...,  কোনো দায়-দায়িত্ব নেই?"
নজরুলের সংসারে অবশ্যই তাঁর খুব একটা কর্তৃত্ব ছিলো না। তাঁর শাশুড়ী গিরিবালাদেবী কঠিন কর্তৃত্বে সংসার নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাই হয়তো নজরুল ফজিলতকে এভাবে জবাব দেন;
" কৃষ্ণনগরে আমার স্ত্রী পুত্র আছে সত্যি, কিন্তু সংসার আমার নয়, ওটা গিরিবালা দেবীর। "
প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ হওয়া কবি অনেকটা উদ্যমহীন হয়ে পড়েন। প্রত্যাখ্যাত নজরুল ফজিলতকে বলেন,
" আমি আর কোনদিন আসব না। কিন্তু আপনি ক্ষমা না করলে যে শান্তি পাচ্ছি না। ভুল দেবতাও করে। আমি তো সামান্য মানুষ। "  হঠাৎ করে ঢাকা ছেড়ে চলে যান কবি । বন্ধুর  হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়া দেখে মোতাহার হোসেনের উপলব্ধি হলো, " সাড়ম্বর অভ্যর্থনা নিয়ে রাজার মতো এসেছিলেন লোকটা। এখন ফিরে যাচ্ছেন নিঃসঙ্গ কাঙ্গালের মতো। " সেখান থেকে কয়েকটা চিঠি লেখেন ফজিলতের কাছে। মোতাহারকে লেখা চিঠিগুলোতেও ফজিলতের প্রতি তাঁর প্রেমের কথা সরাসরি না হলেও উঠে এসেছিল। বন্ধুত্ব নিয়ে কবি উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। বন্ধুকে মূল্য দিতেন আত্মার আত্মীয়ের ন্যায়।  মোতাহারকে লেখা একটা চিঠিতে কবি লিখেন,
"বন্ধু আমি পেয়েছি -- যার সংখ্যা আমি নিজেই করতে পারব না। এরা সবাই আমার হাসির বন্ধু, গানের বন্ধু,  ফুলের সওদার খরিদদার এরা। এরা অনেকে আমার আত্মীয় হয়ে উঠেছে, প্রিয় হয়ে ওঠেনি কেউ।"
মোতাহারকে লেখা চিঠিগুলো ফজিলতকে পড়তে দিয়েছিলেন তিনি। নজরুলের অভিমান,  দুঃখবোধ এবং বেদনাহত চিঠি পড়ে ফজিলত নিজেও খুব বিচলিত হয়েছিলেন।  ফজিলত যেন বোবা বৃক্ষ। যার কাঁজ হলো কেঁদে যাওয়া, নিয়তিকে মেনে নেওয়া কারণ  তিনি জানতেন তাঁকে পড়ালেখা শেষ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। লেখক বলছেন," কবি কোনদিন জানবে না অবিরল ঢেউয়ের আঘাতে পাথরও ক্ষয়ে যায়।"
 ফজিলতের মনে কবির প্রতি প্রবল শ্রদ্ধাবোধ থাকলেও প্রেমের বিষয়ে তিনি একেবারে ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব ধরে রেখেছিলেন।
নলিনীমোহনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ফার্স্ট   ক্লাস ফার্স্ট হওয়া ফজিলাতুন্নেছা সওগাত পত্রিকার সম্পাদক নাসিরউদ্দিনের সহযোগিতায় বিলেতে পিএইচডি করতে যান। কিন্তু তাঁর সেই ডিগ্রি করা হয়ে ওঠেনি। বাবার অসুস্থতার খবরে দেশে ফিরে আসেন শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুসলমান নারীদের এই অগ্রপথিক। পরে ইডেনে জয়েন করে অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। আরো জানা যায় দাম্পত্য জীবনে খুব একটা সুখী হতে পারেননি তিনি।
শেষের দিকে মান্নান সৈয়দ আসেন মোতাহারের কাছে সাক্ষাৎকার নিতে। মান্নান সৈয়দের মারফত জানা যায় নজরুলের পক্ষ থেকে যে প্রেম সেটা খুব একটা একপেশে ছিলো না। ফজিলতেরও পরবর্তীতে যোগাযোগ ছিলো কবির সাথে। কবির প্রেমের গভীরতা ছিল অতল। তাঁর লেখা সব বই তিনি ফজিলাতুন্নেছাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সঞ্চিতা উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর নামে।
বিশ্বজিৎ চৌধুরীর গদ্য সুস্বাদু। কবি ও রহস্যময়ী নজরুল প্রেমী ও গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য বিশ্বজিৎ চৌধুরী জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি লাভের দাবিদার।