
মিরপুরের
২২ গজে আরেকটি সিরিজ জয়ের উৎসবে রঙিন মাহমুদউল্লাহ-সাকিব আল হাসানরা। এবার
নিউজিল্যান্ডকে উড়িয়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতলো বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার পর
কিউই-বধে আরেকটি ‘প্রথম’-এ বাংলাদেশ। অজিদের বিপক্ষে প্রথমবার কোনও সিরিজ
জয়ের ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। কিউইদের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জেতার ইতিহাস
থাকলেও টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতলো এই প্রথম।
সিরিজের তৃতীয় ম্যাচটি হেরে
অপেক্ষা বাড়ালেও চতুর্থ ম্যাচে এসে কাঙ্ক্ষিত জয় তুলে নিয়েছে লাল-সবুজ
জার্সিধারীরা। এই জয়ে প্রথমবার টানা তিনটি টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতলো
মাহমুদউল্লাহরা। সব মিলিয়ে এই ফরম্যাটে বাংলাদেশের সিরিজ জয়ের সংখ্যা
দাঁড়ালো ৯-এ।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো কুড়ি ওভারের সিরিজ
জয়, তবু বাধভাঙা কোনও উল্লাস নেই। ড্রেসিং রুম থেকে কেউই ছুটে আসেননি ২২
গজে। অপরাজিত থাকা দুই ব্যাটসম্যানও জয়ের উচ্ছ্বাসে গা ভাসিয়ে দেননি। অতীতে
একেকটি জয়ে ড্রেসিং রুম থেকে ছুটে আসতেন ক্রিকেটাররা। একে অন্যকে জড়িয়ে
ধরে জয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করতেন। মূল উইকেটের সামনে আনন্দনৃত্যে মাততো গোটা
দল। আজ (বুধবার) এর কিছুই হয়নি। কিউইদের উড়িয়ে দেওয়াটা যেন স্বাভাবিকই ছিল!
অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর একই পরিকল্পনাতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ
জেতার আনন্দ কেবল হলো প্রেসিডেন্টস বক্সের বারান্দায়। মাহমুদউল্লাহ স্লগ
সুইপে চার মারতেই বিসিবির পরিচালকরা আনন্দে মেতে উঠলেন। বর্তমান কমিটির
এটাই যে শেষ সিরিজ আয়োজন। শেষটা জয়ে রাঙানোতে তাদের আনন্দ যেন খানিকটা
বেশিই!
জিম্বাবুয়ে গিয়ে টি-টোয়েন্টি জিতে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ ঘরের
মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে দিয়ে সিরিজ জিতেছিল। ঘরের মাঠের সুবিধা নিয়ে
টার্নিং উইকেটে নাস্তানাবুদ করেছে অজিদের। ওই সিরিজে একটি ম্যাচ হারলেও ৪-১
ব্যবধানে সিরিজ নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একই মঞ্চে,
একই পরিকল্পনায় এলো আরেকটি সিরিজ জয়ের আনন্দ।
একাধিক ম্যাচের সিরিজে এটি
বাংলাদেশের ছয় নম্বর জয়। তবে একটি টি-টোয়েন্টি আছে, তেমন সিরিজে জয় আছে
আরও তিনটি। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এবার নবম সিরিজ জিতলো। টেস্ট খেলুড়ে
দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে কোনও
সিরিজ জেতেনি বাংলাদেশ। এর আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথমবার ২০০৬ সালে ১-০
ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। এরপর ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে
১-০ ব্যবধানে জয়ের পর একই বছর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ
জেতে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। ২০১৫ সালে পাকিস্তানকে ১-০ ব্যবধানে হারায়
সাকিব-তামিমরা। তিন বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ফের ২-১ ব্যবধানে হারায়
বাংলাদেশ। করোনার আগে ২০২০ সালে জিম্বাবুয়েকে ২-০ ব্যবধানে হারায়
মাহমুদউল্লাহরা। এরপর চলতি বছর জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়ে স্বাগতিকদের বিপক্ষে
২-১ ব্যবধানে সিরিজ জেতে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ে সফর থেকে ফিরে ঘরের মাঠে
অস্ট্রেলিয়াকে ৪-১ ব্যবধানে হারিয়ে অষ্টম সিরিজ জয়। আর এবার কিউইদের
বিপক্ষে সিরিজ জিতে সাফল্যের মুকুটে আরেকটি পালক যুক্ত করলো
মাহমুদউল্লাহরা।
ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার পর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে
সিরিজ জিতেও বাংলাদেশের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচ ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চার ম্যাচে
ব্যাটসম্যানদের সংগ্রাম স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। নিজেদের কন্ডিশনে টার্নিং
উইকেটে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে কেউই বড় স্কোর করতে পারেননি। গত ৮
ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটি হাফসেঞ্চুরি এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তৃতীয়
ম্যাচে ৫২ রানের ইনিংস খেলেছিলেন মাহমুদউল্লাহ। সেই স্কোর ছাড়িয়ে যাওয়া
দূরে থাক, ৪০’র ঘরেই যেতে পারেননি কেউ! সর্বশেষ ৮ ম্যাচের দ্বিতীয়
সর্বোচ্চও এসেছে মাহমুদউল্লাহর ব্যাট থেকে। আজ খেলা তার অনবদ্য ৪৩ রানের
ইনিংসের ওপর ভর করেই সিরিজ নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ।
মাহমুদউল্লাহ ছাড়া
বাকি ব্যাটসম্যানদের কেউই প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স করতে পারেননি। ব্যর্থতার
কারণ হিসেবে স্লো উইকেটের ‘দোহাই’ দিচ্ছেন ক্রিকেটাররা। সাকিব, লিটন কিংবা
কোচদের দাবি, মিরপুরের এমন স্লো উইকেটে ব্যাটিং করা বেশ কঠিন। আক্রমণাত্মক
ক্রিকেট তো আরও কঠিন। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে ব্যাটসম্যানদের ধারাবাহিক এমন
রানখরা মোটেও ভালো ইঙ্গিত নয়। ওমান কিংবা আরব আমিরাতের কন্ডিশন বাংলাদেশের
মতো হবে না। ট্রু স্পোর্টিং উইকেটে খেলতে হবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ বেশিরভাগ ম্যাচই স্লো উইকেটে খেলেছে। ফলে
স্পোর্টিং উইকেটে ব্যাটিং অনুশীলনের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
ফলে ঘরের মাঠে
ম্যাচ জয়ের আত্মবিশ্বাস সঙ্গী হলেও আদতে ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস
তলানিতে চলে যাচ্ছে। তার প্রমাণ টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের রানখরা। বিসিবি
হয়তো ওমানে এক সপ্তাহের প্রস্তুতি ক্যাম্প দিয়ে ব্যাটসম্যানদের
আত্মবিশ্বাসী বানানোর পরিকল্পনা করছে। তবে এই অল্প সময় কতটা কাজে আসবে, সেই
প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়ের
আনন্দের মাঝে ব্যাটসম্যানদের মনে শঙ্কা জেগে ওঠা অস্বাভাবিক নয়!