
অবসান চাই পেলেষ্টাইনে, ইজরাইলীদের বর্বরতার
মোহাম্মদ শাহজাহান ||
থামাতে ইচ্ছে করে না, বলতে ইচ্ছে করে চালা,
অনকম্পা দেখাতে ইচ্ছে করে না, আর কত মরবি?
এবার জালা।
তোদের সীমানায়, তোদের প্রতি অত্যাচার
তোদের যায়গা, তোদের বলে ভিটে ছার
বেঁচে ও যখন, বাঁচার মত বাঁচতে পারিস না
মরবি ভেবে মার।
দোষ না করেও দোষ, মাতবর শালারা
খায় ঘোষ।
পৃথিবী জানে, কত ভাবে শইছিস ইজরাইলি
অত্যাচার।
ইজরাইল পেলেষ্টাইনিদের
মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের
সোমালিয়া, ইথিওপিয়ানেরা খেতে পায় না
হৃদয় স্পর্শ করা হা হা কার।
মাতবরেরা, বুঝতে বুঝতে, কাগজ কলমে
লিখতে লিখতে মাইকের ষ্টেন্ড তুলে
বলতে বলতে অধীকার বঞ্চিত মানুষগুলো
মরে হচ্ছে শেষ।
সামাল সামাল অত্যাচারীদের সামাল।
পেলেষ্টাইন একটি দেশ, বসবাসে মানুষ
কেনো শইবে বর্বরতা,
কেনো হবে মানুষ নিধন? পাবেনা মানবতা?
দুর্বলেরে সবলের ঘা, মাতবরেরা করবে তামাশা।
পার পাবেনা নেতা নিয়া হু, সময় বলবে তোমাকে
জাগবে পৃথিবী কোন একদিন,
পেলেষ্টাইনিরা পেলেষ্টাইন থাকবে
অত্যাচারে অত্যাচারে নেতা নিয়া হু
হবি শেষ।
অবসান চাই পেলেষ্টাইনে, ইজরাইলিদের বর্বরতার।
আমাদের বন্ধু সত্য
ইকবাল আনোয়ার ||
আমাদের বন্ধু ছিল সত্যকাম, সংক্ষেপে ডাকতাম সত্য, শৈশবের কথা বলেছি, কাস করতো না সে, বলতো- বইয়ের লেখা মিথ্যা।
বড় ইঁচড়ে পাকা ছেলে।
বিজ্ঞান নাকি একটা বইয়ের মতো, যার সামনের আর পেছেনের পাতাগুলো নেই! ধর্মকাসে দু’একদিন এসেছিলো, নানান প্যাঁচ মেরে ধরলো বলে স্যার বলে দিলেন- এ কাসে তুই আর আসিস না রে!
ইতিহাস নাকি জয়ীদের লেখা কাব্য। আর অঙ্ক! সত্য বলতো, এ জগতে কোন কিছুই কোন কিছুর মতো নয়। তাহেলে একের সঙ্গে অন্যের যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ কী করে হবে?
এতো শৈশবে এমনই ছিলো তার আশ্চর্য ঘোর লাগা কথা!
সত্যকে স্বভাবতই সহ্য করতো না কেউ। সেও থাকতো একা একা। একাই খেলতো কাটাকাটি খেলা- নিজেকে নিজেই কাটে আর হাসে। একা সাঁতার কাটতো, মাঝ পুকুরে ডুবতো-ভাসতো।
কাস না করলে তো আর সার্টিফিকেট মেলে না, তাই সত্য রয়ে গেলো মূর্খ। আমরা স্কুল থেকে কলেজ, সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে প্রায় সকলেই বড় বিদ্যান হয়েছি, প্রতিষ্ঠিত যাকে বলে।
এ বয়সে এসে স্কুলের বন্ধুরা এক হয়ে একটা সংগঠন করেছি। আড্ডায় মিলতে পারলেই হলো, একদম স্কুলের বালক বনে যাই।
আমাদের মধ্যে কয়েকজন তো নাম করা স্কলার, তারা দেশের চেয়ে বিদেশেই বেশি থাকে, তাদের বক্তৃৃতা অনেক দামে বিক্রি হয় বলে শুনি, আমরা গর্ব করে বলি- হবে না? আমাদের বন্ধু না!
এমনই আড্ডায় একদিন এক বন্ধু বলে বসলোÑ আচ্ছা সত্যকাম কোথায় রে, বলতে পারিস?
আমরা আদতে তাকে ভুলেই গেছিলাম। মনে পড়লো সত্যর মা প্রায়ই আমাদের কাছে এসে বলতো, আমার সত্যকে তোমরা দেখছো কি? বলতাম- কোত্থেকে দেখবো? সত্য তো একা একা থাকে!
তখন সত্যের স্বভাব, তার ইঁচড়ে পাকা কথা, দার্শনিক ভাব, এসব মনে পড়লো আমাদের।
কেউ একজন বললো, বছর তিনেক আগে সত্যকে রেলস্টেশনে দেখছে সে।
আরেকজন বললো, নেপাল বেড়াতে গিয়েছে নাকি তাকে পাহাড় চূড়ায় কোনো মন্দিরে দেখেছে।
আমরা সত্যকে দেখার বিষয়টা বিশ্বাস করতে পারিনি। সত্যের সঙ্গে শৈশবেই আমাদের ছেদ পড়ে গেছে। তাকে দেখলেও এখন চিনবো কী করে? বুঝবো কেমন করে- এটাই সত্য তার মুখে নিশ্চয়ই নানা বলি রেখা, হয়তো দাড়ি গোঁফের ভেতর সে লুকিয়ে রেখেছে নিজেকে।
হয়তো সত্য অপুষ্টিতে মারা গেছে, নয়তো তাকে মেরে ফেলেছে কোন বদমাইশ।
কেউ একজন বললো-না রে, আমার মন টানছে, সত্য আজও বেঁচে আছে,
একদিন না একদিন আমাদের সামনে সে এসে বলবে-
আমি সত্য, এসেছি তোমাদের কাছে। দেখোতো চিনতে পারো কিনা ?
আমরা কেউ তখন সত্যকে চিনবো না।
সত্য অভয় দিয়ে তখন বলবে- না চেনারই কথা, নতুন করে চিনলেই হলো।
সেদিন আড্ডা লম্বা হলো। রাত গভীর হলোÑ সত্যের কথা তবু শেষ হতে চায় না।
সেই সত্য যাকে আমরা শৈশবে হারিয়ে ফেলেছি।
অবশেষে সেদিন আমরা সত্যকে ফিরে পাবার আকাখা নিয়ে প্রার্থণা করে যার যার বাড়ি ফিরলাম।
শহর কুতুব
আহাম্মেদ কবীর ||
চাঁদপুরের বড় স্টেশনের আর্মি ক্যাম্পের বাইরে চিৎকার করে উঠলো। ২৯শে এপ্রিলের রাত নয়টায় ডাকা-তিয়া ও মেঘনা নদীর মিলনস্থলের উত্তর দিকের এই আর্মি ক্যাম্প থেকে কুকুরের চিৎকার অনেকটাই মরা-কান্নার মতো মনে হচ্ছিল। কুকুরটা থেমে থেমে চিৎকার দিয়ে চলেছে। ক্যাম্পের কেউ একজন বিরক্ত হয়ে একটা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করলো। তাতে করে হঠাৎ-ই কুকুরের চিৎকার বন্ধ হয়ে গেলা।
ক্যাম্পের গেটে পাহারা দিচ্ছে দুজন সেন্ট্রি। তাদেরই একজন অপরজনকে বললো, কুকুর এভাবে চিৎকার দিলে অশুভ বা অমঙ্গল ভাবা হয়। আসলেকি অমঙ্গল, তুমি কী বলো? অপর সেন্ট্রি জবাব দিলো, পূর্ব পাকিস্তানের লোকেরা এমনটিই বিশ্বাস করে। ওরা হিন্দুদের রীতি-ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত। বলতে পারো-অনেকটাই কুসংস্কারপন্থি। প্রথমজন সায় দিয়ে বললো, ওরা মুসলমান হলেও ভাষাটা বাংলা। বাংলা ভাষা হিন্দুর ভাষা। ভাষার ভিতরে-অন্তরে রীতিতে অথবা বলা যায়, পরতে পরতে হিন্দুয়ানী সংস্কার। দ্বিতীয় সেন্ট্রি বললো, তবে আমাদের সাবধান থাকতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদেরকে বিশ্বাস করা চলবেনা।
ওরা কাঁফের! হিন্দুদের পা-চাটা কুকুর!
ঠিক। ঠিক বলেছো। সেজন্যই ওদের মৃত আত্মা কুকুর হয়ে চিৎকার দিচ্ছে।
আবার গুলির শব্দে থেমেও যাচ্ছে।
অর্থাৎ-আত্মারা গুলিকে ভয় পায়।
দুজনেই একসাথে হেসে উঠলো।
ঠিক সে সময়ে গেটের বাইরে জিপের হর্ন বেজে উঠলো। প্রথম সেন্ট্রি উঁচু সেটের জানালা খুলে দেখলো। দেখেই চিনতে পারলো, ওটা আর্মি ক্যাম্পের চিফ মেজর জুম্মন খানের ব্যবহারের জিপ। একটু আগে বেরিয়েছিল-একজনকে আনতে।
হুডখোলা জিপের ড্রাইভার চিৎকার দিয়ে বললো, আমি ড্রাইভার হাফিজ। মেজর সারের জিপ। গেইট খুলো। মেহমান এনেছি। মেহমান।
জিপের ভেতরে বসা পুলিশের বিশেষ শাখার, বাঙালি অফিসার আবদুল হালিম কিছুটা চিন্তিত হয়ে গেলো। বিশেষ করে ‘মেহমান’ শব্দটা উচ্চারণের জন্য। কারণ সে জানে, পাকিস্তানী আর্মিরা ‘মেহমান’ শব্দটা সাধারণত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করে থাকে। এটা একটা সাংকেতিক শব্দ।
অথচ ড্রাইভার হাফিজ যখন তার বাসায় গিয়েছিল তাকে এখানে আনার জন্য তখন কিন্তু তার কথা বলার ধরণই ছিল ভিন্ন। অনেকটাই আন্তরিক। রহস্যপূর্ণ কোন আচরণ লক্ষ্য করা যায় নি। সে বলেছিল, মেজর সাহেব আপনাকে সালাম দিয়েছেন। একটা জরুরি বিষয়ে কথা বলবেন। আপনি চলুন। চিন্তার কিছু নেই। আপনি চলুন-
হালিম সাহেব কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলেন। তাই আমতা-আমতা করে জানতে চাইলেন, এত রাতে আমাকে ডেকেছেন? রাত তো-হাফিজ শুধরে দিলো, রাত কই? এখন তো মাত্র সাড়ে আটটা বাজে। এক ঘন্টার মধ্যেই আপনাকে পৌঁছে দেবো।
হালিম সাহেব চিন্তা করতে লাগলেন, জে এম সেন গুপ্ত রোড থেকে বড় স্টেশনের আর্মি ক্যাম্পে যাওয়া-আসা করতেই এক ঘন্টা লেগে যাবে। আর কোন বিষয়ে তদন্ত বা মিটিং থাকলো তো গভীর রাত হয়ে যাবে। তাহলে ড্রাইভার একঘণ্টার কথা বলছে কেন?
ভাবতে ভাবতে হালিম সাহেব আর্মি ক্যাম্পে যাবার জন্য তৈরী হতে লাগলেন। পোশাক পরে তার বন্ধু দাঁতের ডাক্তার রহমত ভাইকে সাবধানে থাকতে বললেন। হালিম সাহেবের পরিবারের সদস্যরা গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। এপ্রিলে প্রথম সাপ্তাহে পাকিস্তানী আর্মিরা যখন চাঁদপুর শহর দখল নেয় তখন হালিম সাহেব পুরো পরিবার নিয়ে হাজীগঞ্জে তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সে সময় থেকে তার দরবেশ বন্ধু দাঁতের ডাক্তার রহমত ভাই রাতের বেলা এই বাসাতে এসে থাকতে শুরু করেন। পরে যখন হালিম সাহেব চাকরিতে যোগদেন-তখনো তিনি রাতটা এই বাসাতে কাটাতে থাকেন। ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ রহমত ভাই দাঁতের চিকিৎসার পাশাপাশি আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। তাই তার বিশ্বাস ছিল পাকিস্তানী আর্মিরা তার কোন ক্ষতি করবেনা। অবশ্য প্রথম দিকে তার কোন ক্ষতি করে নি ঠিকই তবে শেষ দিকে অর্থাৎ ডিসেম্বরের তিন তারিখে দুজন আর্মির সাথে তর্ক বিতর্কের এক পর্যায়ে ওরা রহমত ভাইকে গুলি করে। তার অপরাধ ছিল- কার্ফ শুরু হওয়ার পরও সে কেন চেম্বার খোলা রেখেছিল।
পরদিন খবর পেয়ে হালিম সাহেব ঘটনাস্থলে গিয়েও রহমত ভাইয়ের লাশ খুঁজে পায় নি। সবাই ধারণা করে শেষ রাতে ডোম এসে লাশটা নিয়ে যায়। হালিম সাহেব কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। লাশ দাফন কিংবা জানাজা দেয়া সম্ভব হলো না।
সেন্ট্রিরা আর্মি ক্যাম্পের গেইট খুলে দেবার পর ড্রাইভার হাফিজ জিপ নিয়ে সোজা ক্যাপ্টেন পাশার অফিসের সামনে দাঁড় করালো। তারপর জিপ থেকে নেমে হালিম সাহেবকে বললো, ক্যাপ্টেন পাশা সাহেব আপনার সাথে কথা বলবেন। হালিম সাহেব কিছুটা বিস্মিতভাবেই প্রশ্ন করলো, মেজর সাহেবের সাথেনা আমার দেখা করার কথা?
হাফিক উত্তর দিলো, তার আগে ক্যাপ্টেন সাহেবের সাথে কথা বলেন। ওনি আপনার সাথে জরুরি বিষয়ে কথা বলবেন। কথা শেষ হলে আপনাকে আমি মেজর সাহেবের অফিসে নিয়ে যাবো।
ও আচ্ছা। হালিম সাহেব কিছুটা বিরুক্তি প্রকাশ করলেন। কিন্তু মুখে আর কিছু বলা ঠিক হবেনা ভেবে চুপ করে গেলেন। তারপর ক্যাপ্টেন পাশার অফিসে ঢুকলেন।
পাশা আগে থেকেই তার সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে অফিসে বসে ছিল। হালিম সাহেবকে দেখে কিছুটা গম্ভীর ঢঙে বলে উঠলো, ইনটেলিজেন্স অফিসার হালিম সাহেব যে, আসুন আসুন। বসুন।
ধন্যবাদ দিয়ে হালিম সাহেব একটা চেয়ারে বসলেন। ছোট্ট একটা টেবিলের বিপরীত দিকে ক্যাপ্টেন পাশা বসে আছে। অন্যেরা তার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। যেন মনে হয় দুই পক্ষ। এখনই বাকযুদ্ধ শুরু হবে।
ক্যাপ্টেন পাশা কোন প্রকার ভণিতা না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো, আপনার কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের যে লিস্ট আছে অর্থাৎ ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ কিংবা কমিউনিস্ট পার্টির লোকজনের, সেটা আপনি কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন? আমাদেরকে দিচ্ছেন না কেন?
হালিম সাহেব কিছুটা শক্ত ভাবেই জবাব দিলো, আমি লুকিয়ে রাখবো কেন? গত সপ্তাহে আমার অফিসে গিয়ে আপনি তো তন্ন তন্ন করে খুঁজেছেন। আপনি তো জানেন কোন লিস্ট আমার কাছে নেই। তাহলে বারবার একই প্রশ্ন করছেন কেন?-করছি এই জন্য যে,- ক্যাপ্টেন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর রাগ সংযত করে বলতে লাগলো, আপনি ইচ্ছে করেই সমস্ত লিস্ট, কাগজপত্র আওয়ামী লীগের নেতা মিজান চৌধুরীকে দিয়ে দিয়েছেন। বলেন-দেন্নি?
হালিম সাহেব স্বাভাবিকভাবেই জবাব দিলো, সাতই মার্চের ভাষণের পর ওরা জোর করে সব নিয়ে নিয়েছে। আমাদের করার কিছুই ছিলনা। কথাটা আমি আপনাকে অনেকবারই বলেছি। অথচ-
তাকে থামিয়ে ক্যাপ্টেন পাশা প্রশ্ন করলো, মিঃ হালিম-আপনিকি পাকিস্তানকে ভালবাসেননা?
ভাল না বাসলে আমি চাকরি করছি কীভাবে?
উত্তর শুনেও ক্যাপ্টেন আমলে নিলো না। সে তার মতো করেই বলতে লাগলো, বৃহৎ পাকিস্তানের ঐক্য ধরে রাখার জন্য আমর যুদ্ধ করে চলেছি। আপনারা বাঙালিরা যদি সহযোগিতা না করেন তাহলে এটা একটা হিন্দু রাষ্ট্র হয়ে যাবে।...
এমন সময় একজন সৈনিক ভেতরে ঢুকে ক্যাপ্টেন পাশার কানে কানে কী যেন বললো। তারপর হঠাৎ-ই তর্ক যুদ্ধ পরিহার করে ক্যাপ্টেন বলে উঠলো, আপনার সাথে এখন আর কথা বলছিনা। শুধু এটাই বলবো-দেশকে ভালবাসুন। দেশ আপনাকে অনেক কিছু দেবে।
হালিম সাহেবও উঠে দাঁড়ালেন। ক্যাপ্টেন শেষ কথা বললো আপনি মেজর স্যারের অফিসে যান। ওখানে একটা ট্রায়ালের ব্যাপারে স্যার আপনার সাথে কথা বলবে। যান-
ক্যাপ্টেন তার সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলো। হালিম সাহেব জিপে উঠে বসলেন। জিপ ছেড়ে দিলো। কিছুদূর যাবার পরে দেখতে পেলেন টিন শেডের কয়েকটা ঘরের সামনে ক্যাপ্টেন পাশা একটা মেয়েকে জবরদস্তি করছে। জিপ কাছে যেতেই মেয়েটা চিৎকার দিয়ে উঠলো, চাচা আমাকে বাঁচান! আমি নাফিজা। নাফিজা বানু। আপনার মেয়ের বান্ধবী সাবিহার বড় বোন। আমি নাফিজা, আমাকে বাচান!...
মেজর জুম্মান খান কিছুটা দ্বিধার মধ্যে আছেন। ছালা দিয়ে বানানো পোশাক পরা পাগলটাকে মৃত্যুদন্ড দিতে যে ইতস্তত করছিল এর মধ্যে আবার হালিম সাহেব বলছেন-ওনি পাগলটাকে ভালো করেই চিনেন। তার অফিসের বারান্দাতে পাগলটা রাতে শুতে আসতো। সবাই তাকে ‘দরবেশ মামু’ বলেই ডাকে।
যদি দরবেশই হয় তাহলে-পাগলটাকে সবাই ইন্ডিয়ার গুপ্তচর কেন বলছে? মেজর সাহেব পুরোপুরি সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না বলেই পুলিশ অফিসার আবদুল হালিম সাহেবকে ডেকেছেন। চাঁদপুর শহর দখলে নেবার পর থেকেই এই অফিসারকে তার বেশ বিশ্বস্তই মনে হয়েছে। তাইতো কোন বিষয়ে জটিলতা বা সমস্যা দেখা দিলে তিনি এঁর সাথে কথা বলেন।
এই গত সাপ্তাহে লন্ডন ঘাটের ব্যবসায়ী হেদায়েতউল্লাহ হাজির দুই ছেলে রফিক ও শফিককে ধরে আনা হয়েছিল। ওরা গেরিলা ও মুক্তিযোদ্ধা। ওদের বড় ভাই নাকি গ্রামে গ্রামে মুক্তিযুদ্ধ করছে। তাই মেজর সাহেব ভাবছিলেন, দুই একদিন দেখে এই দুইভাই রফিক আর শফিককে মৃত্যুদন্ড দিয়ে দিবেন। কিন্তু পুলিশের স্পেশাল অফিসার আবদুল হালিম নিশ্চয়তা দিয়ে বললেন, ওরা মুক্তিযোদ্ধা নয়। আর এদের বড় ভাই কোন মুক্তিযুদ্ধ করছেন না। সে করাচিতে পড়াশুনা করছে। সমস্ত ব্যাপারটাই মিথ্যা।
ফলে মেজর সাহেব দুই ভাইকে ছেড়ে দিলেন। আর শর্ত দিলেন প্রতি মাসে একবার থানায় এসে হাজিরা দিতে হবে তিনদিন আগের ঘটনা ছিল-বড় বাজারের ব্যবসায়ী বিষ্ণু বাবুকে নিয়ে। সে-ও নাকি ইন্ডিয়ার গুপ্তচর। কিন্তু হালিম সাহেব নিশ্চয়তা দিলেন, বিষ্ণু বাবু পাকিস্তানের পক্ষের লোক। ইন্ডিয়ার সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। সুতরাং তাকেও ছেড়ে দিতে মেজর সাহেব আর দ্বিধা করলেননা।
আজকেও তিনি শুনতে চান, এই পাগলটাকে কি মৃত্যুদ- দেয়া উচিত হবে কিনা?
হালিম সাহেব এবারও নিশ্চয়তা দিয়ে বললেন, ওনি দরবেশ মামু। সবাই ওনাকে শহর কুতুব বলে ডাকেন।
‘শহর কুতুব’-শব্দটা শুনে মেজর জুম্মান খান প্রশ্ন করলেন, এই শব্দটার মানে কী?
উত্তরে হালিম সাহেব বলতে লাগলেন, শহরের কুতুব। মানে হলো-এই চাঁদপুর শহরকে সকল প্রকার বাস্তব ও রুহানি বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য একজন দরবেশকে দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই দরবেশকেই সবাই ‘শহর কুতুব’ বলে। মেজর পাল্টা প্রশ্ন করলেন, দায়িত্বটা কে দেয়ে?
আল্লাহ মালুম। বলেই হালিম সাহেব চোখ বন্ধ করে ফেলেন। মেজর তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে তার সেন্ট্রিকে আদেশ করেন, পাগলটাকে নিয়ে আসতে।
কিছুক্ষণ পর সেন্ট্রি দরবেশ মামুকে নিয়ে প্রবেশ করে। ছালার পোশাকের উপরের অংশ নেই। লুঙ্গির মতো নিচের অংশটা পরে আছে। সারা শরীরে বেতের বাড়ির দাগ।
হালিম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, দরবেশ মামু আপনি কেমন আছেন? ওরাকি আপনাকে মেরেছে ...
দরবেশ মামুর চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরুচ্ছে। সে হালিম সাহেবের কথার কোন জবাব না দিয়ে পরিষ্কার উর্দুতে বলতে লাগলো, পাকিস্তান মুর্দাবাদ! ... লড়কে লেঙ্ড়ে পাকিস্তান- নেহি! ভাঙার জন্য পাকিস্তান। নারীর জয় হেব। নারীশক্তির জয় হবে। পাকিস্তান মুর্দাবাদ। জয় বাংলা-মুজিববাদ। ... মেজর জুম্মান খান তার রাগ সামলাতে পারলেন না। টেবিলের উপরে রাখা বেতটা হতে নিয়ে দরবেশ মামুকে মারলেন। এত জোরে আঘাত করলেন যে, দরবেশ মামু মাটিতে পড়ে গেলেন। হালিম কিছুটা কাতর কণ্ঠেই বললেন, আপনি শহর কুতুবের গায়ে হাত তুললেন! এটা পাপ! এটা অন্যায়! ...
হালিম সাহেব কাঁদতে লাগলেন। তার কান্না দেখে মেজর জুম্মন খান চুপ হয়ে গেলেন। তারপর ঈশারায় বললেন, সবাইকে চলে যেতে।
জিপে ওঠে বাসায় ফিরতে ফিরতে হালিম সাহেব দরবেশ মামুর শেষ কথাটা মনে করতে লাগলেন, বেতের বাড়ি আমার গায়ে মারিসনি। মেরেছিস কচু পাতার উপর!
পরবর্তী কয়েকদিন হালিম সাহেব খুবই কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করতে লাগলেন। শহর কুতুব দরবেশ মামুকে আর কোথাও দেখতে পেলেন না। সেই রাতে জিপে করে তিনি বাসায় ফিরে আসেন। তবে দরবেশ মামুর কী হাল হয়েছিল সেটা জানা সম্ভব হয় নি।
জুন মাসের দিকে আবদুল হালিম সাহেবের অফিস সহকারী রবিউল হোসেন এসে বললেন, স্যার! আপনাকে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখাবে।
কী জিনিস দেখাবে?
চলেন আমার সাথে।
দুজনেই অফিস থেকে বের হয়ে উত্তর দিকের গলি দিয়ে পুলিশের সেকশনের মাঠের পাশে একটা ডোবার কাছে এসে দাঁড়ালো। ওখানে অনেকগুলো কচু গাছ দেখা যাচ্ছে। রবিউল হোসেন কয়েকটা কচু পাতা ছিঁয়ে এনে দেখালো-প্রত্যেকটা পাতার উপর বেতের বাড়ির দাগ। ব্যাপারটা ভালভাবে পরীক্ষা করার পর-হালিম সাহেব বিরবির করে বললেন, মামুর কথাই ঠিক। মামু আসলেই শহর কুতুব! ...