ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
115
জীবন ও জীবিকার সমন্বয়
Published : Monday, 3 May, 2021 at 12:00 AM
জীবন ও জীবিকার সমন্বয়ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ||
বেঁচে থাকার মতো বড় কোনো প্রত্যাশা মানুষের জীবনে নেই। একই সঙ্গে ভালোভাবে বেঁচে থাকাটাও জরুরি। কভিডের মতো বৈশ্বিক মহামারিতে মানুষের জীবন রা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জীবন রা করতে গিয়ে জীবিকার ওপর আঘাত এসেছে। আবার জীবিকা অব্যাহত রাখতে গিয়ে জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। তবে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়লেও মানুষ জীবিকাকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। তাই একদিকে করোনাভাইরাসে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, আরেক দিকে মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য জীবিকার পথ অবলম্বন করতে হচ্ছে। তাতে কঠিন হয়ে পড়েছে মহামারি প্রতিরোধের কাজ। ভাইরাসটির সর্বাত্মক প্রভাবের জীবিকার উপায়—চাকরি, ব্যবসা বা অন্যান্য উৎস কোথাও কোথাও সংকুচিত হয়ে গেছে, কোথাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, কোথাও একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই জীবিকার উপায় না থাকলে মানুষকে অন্যের সহযোগিতা নিয়ে বাঁচতে হয়। এভাবে জীবন ধারণ করা স্বাভাবিক নয়। এ জন্যই ভালোভাবে বেঁচে থাকার প্রশ্নটা আসে। এই সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র ভালো উপায় হলো জীবন ও জীবিকার সমন্বয় সাধন করা। এ ব্যাপারে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। সরকারকেই এই সমন্বয় সাধনের কাজটা করতে হবে।
অনেকে বলছেন যে আগে বেঁচে থাকা দরকার, মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার, তারপর দেখা যাবে কী করা যায়। এটা মোটেও সমাধানের কোনো পথ নয়। কারণ তাতে শেষ রাটা হয় না। মানুষ যদি বাঁচার মতো না বাঁচে এবং মৃতপ্রায় হয়ে বেঁচে থাকে, তার কোনো আয়ের সংস্থান না থাকে, তাহলে চূড়ান্তভাবে জীবন হুমকির মুখেই পড়ে। বলা যায়, জীবন ও জীবিকা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মানে এই দুটি জিনিস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। না চাইলেও যেহেতু জীবিকা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা যায় না, তাই সমন্বয় সাধনটাই সমাধান।
মানুষের জীবিকার জন্য কী কী প্রয়োজন? খাদ্য প্রথমেই আসবে। তারপর স্বাস্থ্য। বাসস্থানের বিষয়ও আসবে। তারপর অন্যান্য প্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যক বিষয়। তার মানে মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করতে হলে মানুষের অর্থের প্রয়োজন, সম্পদের প্রয়োজন। এটা কে আহরণ করবে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলে ব্যক্তি। আর রাষ্ট্র যদি এগুলোর সংস্থান দেয়, রাষ্ট্র যদি খাদ্য বা বাস্তুসংস্থানের ব্যবস্থা করে, তাহলে রাষ্ট্রেরও অর্থের প্রয়োজন। সে অর্থটা কোথা থেকে পাবে? সেটাও মানুষের কাছ থেকেই আসতে হবে। রাষ্ট্রের উৎসই তাই মানুষ। অতএব মানুষের আয়ের সংস্থান যদি বন্ধ হয়ে যাবে, তাহলে রাষ্ট্র অর্থ পাবে কিভাবে? আরেকটি জিনিস দেখতে হবে। সেটা মানুষের মানবিক দিক। মানুষের সুরা দরকার। তার যাতায়াতের ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হয়। মানুষ শুধু খাবারের জন্য বেঁচে থাকে না। মৌলিক চাহিদা ও মানবিক চাহিদা দুটিই তার প্রয়োজন। মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য হলো মানুষের মধ্যে মৌলিক চাাহিদা ছাড়াও অন্যান্য চাহিদা প্রকাশ পায়। এটাই হলো ভালোভাবে বেঁচে থাকা।
এই ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্যই জীবন ও জীবিকর সমন্বয় জরুরি। সমন্বয় সাধনটা কিভাবে করা যায়? প্রথমত, মানুষের জীবিকার উৎসগুলো অবারিত করা। সব রকম অর্থনৈতিক কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে জীবিকার পথ খোলা রাখা। এই দিকগুলো যদি বন্ধ হয়ে যায়, অর্থনীতির চাকাও মন্থর হয়ে যায়। ফলে জীবন রা করার জন্য মানুষ বেশি দূর যেতে পারবে না। তাই জীবন ও জীবিকা সম্পর্কে দুটি জিনিস ল করতে হবে। একটা হলো পিপল সেন্ট্রিক বা মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়ন। অর্থাৎ আমরা যেটা বলি মানুষের জন্য উন্নয়ন এবং মানুষ দ্বারা উন্নয়ন। পিপল সেন্ট্রিক ডেভেলপমেন্ট মানেই হলো মানুষের আয়ের সংস্থান করা, তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যেসব উপকরণ রয়েছে বা পাওয়া যাবে, এমন সব কিছুর ব্যবস্থা করা। স্বাস্থ্য সুরার প্রশ্নটি এ কারণেই আসে।
দ্বিতীয়ত, মানুষের ভবিষ্যৎ বলে একটা কথা আছে। তাকে শুধু বাঁচিয়ে রাখলেই হয় না, তাকে ভবিষ্যতের জন্যও প্রস্তুত করতে হয়। মহামারি থেকে বাঁচানোর জন্য তাকে আপনি আটকে রাখতেই পারেন। কিন্তু এক পর্যায়ে আপনি যখন সব কিছু খুলে দেবেন, তখন জনশক্তি হিসেবে, চালিকাশক্তি হিসেবে জনগণ কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে সেটা দেখার বিষয়। এই মহামারির মধ্যেই অনেক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। আবার অনেকে বেকার হয়ে পড়েছে। এখন তাদের কাজের মধ্যে না রাখলে, তাদের কাজ না দিলে অর্থনীতিকে তার পথে নিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়বে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেল, দেশে নতুন করে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছে। এ েেত্র একটা বিষয় ল করা দরকার। বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি থাকে। সমাজ বা ব্যক্তি জীবনে কিছু ঘটলেই, আয়ের উৎস সামান্য বাধাগ্রস্ত হলেই এবং দুর্ঘটনা, স্বাস্থ্যহানি বা অসুখবিসুখ হলেই সে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। কভিড এই কাজটিই করেছে। মানুষের আয়ের উৎস তিগ্রস্ত হয়েছে বলে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে পর্যায়ক্রমে সে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। এই শ্রেণির সাধারণত সঞ্চয় থাকে না। তাই তার ঘুরে দাঁড়ানোরও সুযোগ থাকে না।
আমার মনে হয়, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কতগুলো পদপে নেওয়া দরকার, যা জীবন ও জীবিকার মধ্যে সমন্বয় সধান করবে। প্রথম পদপেটাই হবে স্বাস্থ্য খাতে। চলমান মহামারি প্রতিরোধ ও কভিড চিকিৎসা দুটিই সমানতালে চালিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বশক্তি দিয়ে এই কাজটি করতে হবে। টিকা দেওয়া, কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যবস্থা করতে হবে। মাস্ক ব্যবহার করুন, দূরত্ব বজায় রাখুন—এটা বললেই হবে না। দরকার হলে কঠিন অর্থদ- দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত হলো চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের সরবরাহটা স্বাভাবিক রাখতে হবে। এ জন্য সব সময়ই যেন এসব পণ্যের মজুদ স্বাভাবিক থাকে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সরকারি খাদ্যগুদামে চালের মজুদ ১৫ লাখ টন থাকার কথা। সম্প্রতি জানা গেল সে মজুদ নেই। যেকোনো পণ্যের মজুদ বা সরবরাহের অভাব থাকলে সেই সুযোগটা কিন্তু মজুদদাররা এবং বিক্রেতারা নেয়। তাই সরকারের পর্যাপ্ত খাদ্যপণ্য মজুদের ব্যবস্থা করতে হয়, যেটাকে আমরা বলি বাফার স্টক। এর দুটি দিক। একটি হলো আপৎকালে জনগণকে সাহায্য করা যায়। আরেকটি হলো পাল্টা ব্যবস্থা অর্থাৎ চেক অ্যান্ড ব্যালান্স। যাতে হোলসেলাররা দাম বাড়াতে চাইলেই তারা জানবে যে সরকারের হাতে অনেক মুজদ আছে। আরেকটা জিনিস হলো উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়। কৃষি খাতে ভর্তুকি, প্রণোদনাসহ যা যা করণীয় করতে হবে।
তৃতীয় পদপেটা হবে অ্যাকসেস টু ফিন্যান্স তথা অর্থায়নের সুযোগ। ছোট ছোট ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাট এগুলোকে টিকিয়ে রাখতে অর্থায়ন প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকার প্যাকেজে থাকার পরও এই অর্থ তাদের কাছে যায়নি। সামনে আরেকটি নতুন প্যাকেজ আসবে। জাতীয় বাজেটও আসছে। ব্যাংকেও প্রচুর তারল্য জমে আছে। এখন তিগ্রস্ত ুদ্র ব্যবসায়ীদের হাতে যেন প্রণোদনার অর্থটা যায়, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করতে হবে। ব্যাংকাররা যুক্তি দেবেন যে রিস্ক ফ্যাক্টর আছে। সে েেত্র সরকার থেকে বলতে হবে যে কিছুটা রিস্কটা তারা বহন করবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এ ধরনের প্রণোদনা রিলিফের চেয়ে অনেক ভালো। আরেকটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে খেয়াল রাখতে হবে, ুদ্র ব্যবসায়ীরা যেন ব্যবসাটা চালিয়ে যেতে পারে। তারা যেন দাঁড়াতে পারে। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যদি না দাঁড়ায়, তা হলে প্রণোদনা দিয়েও লাভ হবে না, বিশেষ করে এখন ঈদের সময় এসেছে। রোজার মাস চলছে। এ সময়টা ুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়ের বিরাট একটি উৎস। তাই তারা যেন ব্যবসা-বাণিজ্য চালু করতে পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে। তা না করে ঢালাওভাবে লকডাউন দিলে লাভ হবে না। সরকারের যেকোনো আদেশে জনগণ দেখতে চায় তাতে তাদের মঙ্গলটা কী।
চতুর্থত পদপেটা হবে সামাজিক সুরা বৃদ্ধি। আমাদের দেশে সেই অর্থে সামাজিক সুরা গড়ে ওঠেনি। বয়স্ক ভাতা কিছু আছে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর টাকা তো ঠিকঠাকভাবে বা ঠিক সময়ে মানুষের হাতে যায় না। যে তালিকা হয়, তাতেও ঝামেলা থাকে, নানা রকম গলদ থাকে। এখন আগামী বাজেটে সামাজিক সুরা ব্যাপক করতে হবে। হেলথ ইনস্যুরেন্সের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
পঞ্চম পদপেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হচ্ছে সামাজিক পুঁজির পৃষ্ঠপোষকতা। জীবন ও জীবিকার যত ভালো সমন্বয় ঘটবে, সামাজিক পুঁজি তত বেশি শক্তিশালী হবে। মানুষে মানুষে সম্পর্ক, সহানুভূতি, সামাজিক সংহতি, সহযোগিতা, সম্প্রীতি, আস্থা, বিশ্বাস, মঙ্গল আকাঙ্া, মূল্যবোধ বজায় রাখা—এই সবকিছুই সামাজিক পুঁজির অংশ। সমাজের এই কাঠামোগুলো যেন ঠিকঠাক থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ জন্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কিভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। সামাজিক পুঁজি যদি দৃঢ় হয়, তাহলে সংকট কাটিয়ে ওঠা যেমন সহজ হয়, তেমনি অর্থনৈতিক কর্মকা- সহজ হয়ে ওঠে। অন্যভাবে বললে, জীবিকার পথ যদি সহজ হয়, তাহলে মানুষের সামাজিক পুঁজিটা অনেক দৃঢ় হয়।
কভিড মহামারি আমরা হয়তো একসময় অতিক্রম করতে সম হব; কিন্তু সমাজ ও জীবনে এর ত বয়ে বেড়াতে হবে অনেক দিন। তাই যত দ্রুত সম্ভব এর প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ যেমন কাম্য, তেমনি সামাজিক ত যেন দীর্ঘকাল বয়ে বেড়াতে না হয় সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ব্যবস্থা হলো জীবন ও জীবিকার সর্বোচ্চ সমন্বয়। তাই যেটা বলে আসছি, এবার গতানুগতিক বাজেট না করে এবারে কভিড থেকে রার পাশাপাশি জীবিকা রায়ও সমান নজর দিতে হবে।

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক





© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩
ই মেইল: [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};