বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন
Published : Wednesday, 3 March, 2021 at 12:00 AM
ইয়াহিয়া
খানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর ১৯৭১ সালের ২ মার্চ
বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারাদেশে চলছিল হরতাল। সেদিন রাস্তায় গাড়ি, রিকশা, স্কুটার
কিংবা একটি সাইকেলও দেখা যায়নি। হাটবাজার, অফিস-আদালত ও কলকারখানায় পূর্ণ
হরতাল পালনের ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ছাত্র, শ্রমিক ও
রাজনৈতিক দলগুলো। সেই হরতাল পুরোদমে পালন করছিল এ দেশের মানুষ।
এদিনে
ঢাকা বিশ্ব্ববিদ্যালয়ের বটতলায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ছাত্রসমাবেশে বাংলাদেশের
মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। পতাকা উত্তোলন করেন ছাত্রনেতা আ স ম
আবদুর রব। সঙ্গে ছিলেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা তোফায়েল আহমদ, আবদুল
কুদ্দুস মাখন ও নূরে আলম সিদ্দিকী। বিশাল এই সভায় স্বাধীন বাংলাদেশ
প্রতিষ্ঠার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার এবং শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে
যাওয়ার সংকল্প ঘোষণা করা হয়। সভার শুরুতে সমবেত ছাত্রসমাজ বঙ্গবন্ধুর
নেতৃত্ব ও নির্দেশ অনুযায়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণ করে।
ঢাকার প্রায় সব ছাত্র, শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল তাদের কর্মসূচি ঠিক করে
নিতে মিটিংয়ের আয়োজন করে। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও ডাকসুর যৌথ উদ্যোগে
বেলা ১১টায় বটতলায় এবং বিকেল ৩টায় পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে
ন্যাপ বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ও বিকেলে পল্টনে মিটিং করে। সেদিন
ন্যাপের কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, ট্রেড
ইউনিয়ন কেন্দ্র্র ও কৃষক সমিতি। বাংলাদেশ জাতীয় লীগের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল
বিকেল সাড়ে ৩টায় বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে। সব দল মিটিং শেষে বিােভ মিছিল
বের করে। মিছিলে গুলি ছোড়া হলে তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুলের ছাত্র আজিজ
মোর্শেদ ও মামুনসহ প্রায় ৫০ জন গুলিবিদ্ধ হন। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজে
ভর্তি করা হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর মারা যান আজিজ।
সন্ধ্যায়
সামরিক প্রশাসক বেতার মারফত ঢাকা শহরে কারফিউ ঘোষণা করে। প্রতিদিন সন্ধ্যা
৭টা থেকে পরদিন সকাল ৭টা পর্যন্ত এই কারফিউ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া
পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা করা হয়। এ সংবাদে তাৎণিক প্রতিক্রিয়ায় এক
সংবাদ সম্মেলনে তীব্র নিন্দা জানান বঙ্গবন্ধু। তিনি সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার
জন্য জনগণের প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেন, '৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত
প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত গোটা প্রদেশে হরতাল পালন করুন। ৩
মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। এই দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস
হিসেবে পালন করতে হবে। রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে আমাদের কর্মতৎপরতার
বিবরণী বা আমাদের বিবৃতি প্রকাশ করতে দেওয়া না হলে এসব প্রতিষ্ঠানের বাঙালি
কর্মচারীদের বাংলাদেশের ৭ কোটি মানুষের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা নাকচ করে দিতে
হবে। আগামী ৭ মার্চ বেলা ২টায় রেসকোর্স ময়দানে আমি এক গণসমাবেশে ভাষণদান
করব। সেখানে আমি পরবর্তী নির্দেশ প্রদান করব। সংগ্রাম সুশৃঙ্খল ও
শান্তিপূর্ণ উপায়ে চালাতে হবে। উচ্ছৃঙ্খলতা আমাদের আন্দোলনের স্বার্থ ুণ্ণ
করবে এবং গণবিরোধী শক্তি ও তাদের ভাড়াটিয়া চরদেরই স্বার্থোদ্ধার করবে।
সেদিন
কারফিউ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ছাত্রাবাস ও শ্রমিক এলাকা থেকে
ছাত্র-জনতা ও শ্রমিকরা কারফিউর বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে কারফিউ ভঙ্গ করে
মিছিল বের করে। তাদের স্লোগান ছিল- 'সান্ধ্য আইন মানি না', 'জয় বাংলা',
'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো' ইত্যাদি। পুরো শহরে কারফিউ
ভঙ্গ করে ব্যারিকেড রচনা করা হয়। ডিআইটি অ্যাভিনিউর মোড়, মর্নিং-নিউজ
পত্রিকা অফিসের সামনে রাত সাড়ে ৯টায় সামরিক বাহিনী জনতার ওপর গুলিবর্ষণ
করে। বিপুল জনতা কারফিউ ভঙ্গ করে গভর্নর হাউসের দিকে এগিয়ে গেলে সেখানেও
গুলি চালানো হয়। এছাড়া শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে কারফিউ ভঙ্গকারীদের ওপর গুলি
চলে।
গ্রন্থনা : মাহফুজুর রহমান মানিক