
রেজাউল করিম শামিম । ।
এখন
বই পড়তে হয় বেছে বেছে। সময়ের তাড়া থাকেতো। আর এখন বই প্রাধান্যের েেত্র
ইতিহাস, মহান মুক্তিযুদ্ধ বিষয় ভিত্তিক প্রবন্ধগুলো স্থান পায়। আমার েেত্র
এসবের মধ্যে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিপুরা, আসাম আর পশ্চিমবঙ্গ
কেন্দ্রীক ঘটনাবলির উপস্থিতি নির্ভর লেখার পৃথক আকর্ষণ,বিশেষ পছন্দের।
তেমনি একটি বই সম্প্রতি পেয়ে গেলাম। বইটির নাম ‘এক জীবনে’।
অধ্যাপক
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক বইটি লিখেছেন। কুমিল্লার সুপরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব,
শান্তিরঞ্জন স্যার, আমাদের প্রিয় শিকগণের অন্যতম। স্যারের সাথে পরিচয়
দীর্ঘদিনের। আমি যখন কুমিল্লায় ছিলাম, আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠনে তিনি এসেছেন
অনেক। আমাকে তিনি খুবই ¯েœহ করেন। দেখা হলে অনেক কথা হয়। বিশেষ করে পুরনো
দিনের কুমিল্লার অনেক তথ্য রয়েছে ওনার ভা-ারে। ওনার কাছ থেকে শুনেছি, ৬৮
সাল থেকে তিনি শিকতা শুরু করেছেন। ভিক্টোরিয়া আর সরকারি মহিলা কলেজে শিকতার
জীবনতো আমাদেরই দেখা। তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন ২০০৩ সালে।
স্যারের
লেখোলেখির অভ্যাস অনেক আগে থেকেই। গবেষণাসহ এপর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের
সংখ্যা ৬৮টি। আর এধরনের প্রবন্ধের সংখ্যাও চার শতাধিক। স্থানীয় পত্রিকায়
তিনি নিয়মিত কলাম লিখেন। তিনি কুমিল্লার বহুল প্রচারিত দৈনিক ‘কুমিল্লা
কাগজ‘এর উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্যারের লেখা ‘এক জীবনে‘
বইটি ওনার জীবনের খ- চিত্রের অনবদ্য বিন্যাস বলা যায়। তিনি নিজেই বইটি
সম্পর্কে লিখেছেন ‘আতœজীবনী নয়, আতœ অবস্থানের কথা, সমকালের কথা, একজন অতি
সাধারণ ব্যক্তির কথাই বলা হয়েছে’। তবে বইটিতে ৭১ সালের নানা ঘটনাবলি স্থান
পেয়েছে। সেসব সঙ্গত কারণেই আমাকে বেশ আগ্রহ নিয়েই পড়তে হয়েছ। তিনি ৭১এর ৯
এপ্রিল কুমিল্লা ত্যগ করেছিলেন। এর পূর্বাপর ঘটনাবলিতে তিনি অত্যন্ত
বেদনাদায়ক কিছু কথা তুলে ধরেছেন। এরপর থেকে ত্রিপুরার সোনামূড়া থেকে শুরু
করে উদয়পুর, বিশাগড়, বিশ্রামগঞ্জ আর আগরতলা অবস্থানকালে নয় মাসের নানা
ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন। সেখানকার সিংগারবিল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে এইচটি
ইমাম, কাজী রকিব উদ্দিনসহ বিভিন্ন ব্যক্তিত্বর সাথে অবস্থান, সেখানকার
তৎকালীন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য মন্ত্রী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে
সাাৎ,তাঁদের সহজ সরল চলচলতি, জীবন আলেখ্য আর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন,
জিবি হাসপাতালে দেবিদ্বারের এমসিএ ক্যপ্টেন সুজাত আলীসহ অন্যন্য গুলিবিদ্ধ,
আহত ও রোগগ্রস্থদের দেখাশোনা, তাদের আহাজারি, শরণার্থী ক্যাম্পের দুর্দশা
ইত্যদি নান বিষয় উঠে এসেছে। তাছাড়া রেডক্রিসেন্ট অফিসে তাঁর চাকরিকালিন
বিভিন্ন ঘটনা, কুমিল্লা বাদুরতলার দীলিপ কুমার পাল (ভুতু‘দার) ইরাজিতে
বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরির সমাদর, সেখানকার লোকসংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশের
আশ্রয় পাওয়া লোকজনের আধিক্যের কারণে সৃষ্ট সমস্যা, এই পটভূমিতে, বিভিন্ন
নিকট আতœীয়ের বাসায় থাকার বিড়ম্বনা, ‘পাইক্যা পাইক্যা’ শোনার গঞ্জনা
ইত্যাদি কোন কিছুই বাদ পড়েনি। তাছাড়া হাপানিয়া, বক্সনগর, আমতল, কঁকড়াবন,
কুঞ্জবন এলাকার শিবির, সেনা ছাউনি,পাকিস্তানিদের সেল এসে পড়া,স্থানীয়দের
আহত হওয়াসহ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত হওয়ার ঘটনা সাবলিল বর্ণনা রয়েছে। যা
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সেখানকার একটি বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে স্যারের
লেখনির গুনে। বাক্যবিন্যাসে অকারণ অলঙ্করণ বা বাহুল্য নেই। পড়তে যেকেউ
স্বাচ্ছন্দবোধ করবেন। আমার কাছে-তো ত্রিপুরার বিভিন্ন এলাকার নামগুলো বেশ
পরিচিত, ফলে বহু বছর আগে হলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রচ্ছন্ন একটি আবহাওয়া খুঁজে
পাওয়ার মতোই অনুভূতি উপলদ্ধি করতে পেরেছি। এর পূর্বে এসংক্রান্ত আর কোন
লেখাতে এমন করে পাইনি।
এই এক জীবনেই শান্তি রঞ্জন ভৌমিকের জীবন আলেখ্য
যে নানা বৈচিত্রে ভরা তাও ফুটে উঠেছে বইটির প্রতিটি ছত্রে ছত্রে। তিনি যে,
শুধুই শিকতা করেছেন, সাংস্কৃতিক চর্চা করেছেন, বই-পুস্তক লিখেছেন, গবেষণায়,
পত্রিকার লেখালেখিতে লিপ্ত থেকেছেন, তাই নয়। তিনি আধ্যাত্ব জগতের কঠিন
সাধনার সাথেও সম্পৃক্ত রয়েছেন। ঠাকুরপাড়ার রামঠাকুর আশ্রমের প্রায়
প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে জড়িত। তিলে তিলে এর সম্প্রসারণ-সমৃদ্ধির সাথে
ঘনিষ্ঠ ভাবেই সংযুক্ত রয়েছেন। অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথেই তিনি একাজটি করতে গিয়ে
আধ্যাত্ব-জীবনের অনেক অলৌকিক ঘটনার ছোয়াঁচ যে পেয়েছেন, তাও তিনি তার ১৪২
পৃষ্টার বইটিতে লিপিবদ্ধ করেছেন সুনিপুন ভাবেই।
বইটির প্রচ্ছদ পরিকল্পনা
ও অলংকরণ করেছেন মোঃ হারুনুর রশিদ খান এবং ছাপানো হয়েছে ইন্ডাষ্ট্রিয়াল
প্রেস থেকে। প্রকাশক হচ্ছেন দেবাদ্যিত ভৌমিক অন্তর। এবার কুমিল্লা গেলে,
স্যার নিজে বইটি আমার হাতে উপহার হিসাবে তুলে দেন। কুমিল্লা কাগজ কার্যালয়ে
এসময় আমাদের প্রিয়জন জিয়াউদ্দিন ভাইও উপস্থিত ছিলেন। ছিলো আমার আয়েশা
মনিও।
শান্তিরঞ্জন স্যারের আরো সদ্য প্রকাশিত আরো একটি গন্থ ‘বঙ্গবন্ধুই
বাংলাদেশ’ হাতে পেয়েছি। বইটিতে বঙ্গবন্ধুকে জাতিরজনক হয়ে উঠার পূর্বাপর
ঘটনাবলি অত্যন্ত সাবলিল ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। যার মধ্যদিয়ে বইয়ের নামকরণের
যৌক্তিকতা ফুঠে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর মতো একজন ব্যক্তিত্বের বৈচিত্রপূর্ণ এবং
গুরগম্ভরি জীবনী সহজবোধ্য করে তুলে ধরার মধ্যে লেখকের ম্ন্সুীয়ানার ছাপ
পাওয়া যায়। চমৎকার প্রচ্ছদ আর আকার-আকৃর্তির বইটি হাতে নেয়া এবং উপহার
দেয়ার জন্য অনন্য। বইটির প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেছেন সুলতান শাহরীয়ার।
এই
বৈশিষ্টপূর্ণ বইটি কুমিল্লার কাগজ কার্যালয়ে, সম্পাদক আবুল কাশেম হৃদয়,
স্যারের পে উপহার হিসাবে আমার হাতে তুলে দিয়ে কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ করেছে।