
রেনেসাঁস বিষয়ে আলাপ-আলোচনার
ক্ষেত্রে দেখেছি আমাদের দেশে এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে দুইদল
ভাবুক আছেন। একদল আছেন দেশাভিমানী, তাঁদের মতে দেশের রেনেসাঁস দেশের অতীত
থেকে বা দেশের মাটি থেকেই জন্ম নেয়। ইউরোপে যেমন করে রেনেসাঁসের জন্ম
হয়েছিল। সমসাময়িক কালের হাওয়ায় রেনেসাঁসের বীজ বাইরে থেকে উড়ে আসে না। আর
সমাজবাদীদের মতে, রেনেসাঁস কোনো অবস্থাতেই সমাজের উপরের স্তর থেকে হতে পারে
না, সত্যিকারের রেনসাঁস হতে পারে সমাজের নিচের স্তর থেকে। সাম্রাজ্যবাদ,
সামন্ত্রতন্ত্র, দেশি-বিদেশি ধনতন্ত্র মিলেমিশে রেনেসাঁস ঘটাতে পারে না,
রেনেসাঁস ঘটাতে পারে একমাত্র জাগ্রত জনমানস।
ছোটবেলায় এইরকম নেতিবাচক
মনোভাব কিন্তু আমার ছিল না। স্বদেশি যুগের নেতারাও কিন্তু স্বীকার করতেন,
বিদেশি শাসন যতই খারাপ হোক না কেন, সেই আঁধারের ভিতরেও আলোর দেয়ালি
জ্বলেছিল। জ্ঞানের আলো এসেই অজ্ঞানের অন্ধকারকে তাড়ায় ঊনবিংশ শতকে।
ইউরোপে
রেনেসাঁসের সময় এবং সংজ্ঞা নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। পঞ্চদশ শতকে তুর্কদের
কনস্টান্টিনোপল অধিকার এবং গ্রিক পণ্ডিতদের ইতালিতে আশ্রয় লাভের সময় থেকে
ইউরোপে রেনেসাঁসের সূচনা বলে একদল মনে করেন। আবার অনেকেরই বিশ্বাস ইউরোপে
রেনেসাঁসের সূচনা তারও অনেক আগে থেকে। আরবের লোকরা যখন স্পেন অধিকার করে
এবং তাদের সঙ্গের প্রিয় গ্রন্থের আরবি অনুবাদ ইউরোপের নজরে আসে। কয়েকটি
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা সেই সময় হতেই। এঁদের মত যদি মেনে নেওয়া হয় তাহলে
মহাকবি দান্তেকে রেনেসাঁসের সন্তান বলতে হয়। অধিকাংশ কিন্তু এই মতটিকে
গ্রহণ করে না। অথচ এই মতের পক্ষে প্রবল যুক্তি হল মহাকবি দান্তের সময়ে
ইতালিয়ন ভাষায় উত্তরণ লাতিন থেকে। অনুরূপভাবেই আমাদের দেশের ক্ষেত্রে
সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলায় উত্তরণ, অন্যান্য লোকভাষায় উত্তরণ কি একইরকম ঘটনা
নয়? এগুলি যদি এক প্রকারেরই ঘটনা হবে তাহলে তার লক্ষণগুলি যদি রেনেসাঁসের
লক্ষণ না হয়, তাহলে কীসের লক্ষণ? তাই রেনেসাঁসের সর্বজনমান্য সংজ্ঞা দেওয়া
কঠিন কাজ। দিব্য চেতনার পরিবর্তে মানবিক চেতনা, ব্রহ্মজ্ঞানের পরিবর্তে
বস্তুজ্ঞান, মৃত্যু-পরবর্তী বা অতিপ্রাকৃত কার্যকারণের পরিবর্তে লৌকিক বা
প্রাকৃতিক কার্যকারণ, ভক্তির পরিবর্তে যুক্তি, আপ্ত বাক্যের পরিবর্তে
প্রমাণসিদ্ধ বাক্য, অথরিটির পরিবর্তে লিবার্টি- অধিকাংশের মতে এগুলিই হল
রেনেসাঁসের প্রধান লক্ষণ। প্রাচীন গ্রিসে এইসবগুলিই বিদ্যমান ছিল।
খ্রিস্টধর্ম প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে এগুলির বিলোপ ঘটে। বাইবেলই যদি
ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজতত্ত্ব হয় তাহলে মানবমনের বিকাশ ঘটবে কী
উপায়ে? মানুষের কি কেবলমাত্র আত্মাই আছে? মন বলে কিছু নেই? দেহ থাকলে পরে
তাকে তো শরীরতত্ত্বও জানতে হবে। শরীরতত্ত্ব জেনে মানুষের ছবি আঁকতে হবে,
মূর্তি তৈরি করতে হবে। শরীরতত্ত্ব জানার জন্যে শবব্যবচ্ছেদও করতে হয়। অথচ
খ্রিস্টধর্ম প্রবর্তনের ফলে এই সবই নিষিদ্ধ।
প্রাচীন গ্রিসের সঙ্গে এই
বিচ্ছেদ ডেকে এনেছিল একপ্রকার অন্ধকারকে। সেই অন্ধকারের প্রকোপ সবথেকে বেশি
পড়েছিল মনের রাজ্যে। আর দেহের রাজ্যে ঘটিয়েছিল একপ্রকারের অবদমন।
মানবমনকে, বিশ্বপ্রকৃতিকে শৃঙ্খলিত করে যে শৃঙ্খলা তার থেকে মুক্তির জন্যেও
আকুলতা জেগেছিল। এখানে আবশ্যিক হয়ে পড়েছিল আরও একটি ছেদের, আরও একটি
ডিসকনটিনিউটির। এই ছেদ বা ডিসকনটিনিউটি কিন্তু প্রাচীন গ্রিসের সঙ্গে নয়,
ছেদ প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল মধ্যযুগের শাস্ত্র অনুশাসিত বিদ্যার সঙ্গে। এই
ছেদের ফলেই পুরাতন বিদ্যার জায়গায় এল নতুন বিদ্যা, বলা যেতে পারে ওল্ড
লার্নিং-এর স্থানে নিউ লার্নিং। এই নিউ লার্নিংটা একটা নতুন মনোভাব। ধর্মের
সঙ্গে এর কোনো মিল নেই, তার ফলে এর নাম দেওয়া হল হিউম্যানিজিম বা
মানবিকবাদ। এই মানবিকবাদে মানুষই সবকিছুর মাপকাঠি। পৃথিবী একজায়গায় দাঁড়িয়ে
আছে না আবর্তিত হচ্ছে তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে সেটা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে
খ্রিস্টীয় বা ধর্মীয় বিশ্ববীক্ষার কাছে এক জীবন-মরণের প্রশ্ন। পৃথিবী
অস্থির হলে তো সবকিছুই অস্থির।
আমাদের দেশের ইতিহাসে রেনেসাঁস ঘটেছে,
কিন্তু সেই রেনেসাঁস আমাদের ইতিহাস থেকে ধারাবাহিকতার সূত্রে আসেনি। আমাদের
দেশে রেনেসাঁস আবির্ভূত হয়েছে ইউরোপের ইতিহাস থেকে। কিছু সময়ের জন্যে
ইউরোপের ইতিহাসের শামিল হয়েছে বাংলার ইতিহাস। প্রথম দিকে শামিল হয়েছিল
অর্থনৈতিক অর্থে, মাঝে হল রাজনৈতিক অর্থে, আর সবশেষে হল সাংস্কৃতিক অর্থে।
ইচ্ছে করলে শামিল হওয়ার তৃতীয় পর্যায় অর্থাৎ সাংস্কৃতিক অর্থে শামিল
হওয়াটাকে প্রতিরোধ করা যেত। বলতে পারা যেত রেনেসাঁস আমরা চাই না, রেফরমেশন
আমরা চাই না, এনলাইটেনমেন্ট-এর কোনো প্রয়োজন নেই আমাদের। কিন্তু রামমোহন
এবং তাঁর সহযোগীরা বহিরাগত ভাবধারাকে আবাহন করেছিলেন। এই ধারাকে তাঁরা
আবাহন করেছিলেন তার সবথেকে বড় কারণ ছিল সেই ধারা দেশজ না হলেও সেই ধারা ছিল
কালোপযোগী। এই ধারাকে আবাহন না করলে নতুন যুগটাই দেখা দিত না। নতুন ভোরের
আলোর রেখাও আমরা দেখতে পেতাম না।
ইউরোপের রেনেসাঁসের মতোই মধ্যযুগের
আঁধার থেকে আধুনিক যুগের আলোয় উত্তরণ হল আমাদের রেনেসাঁস। আমাদের
ধর্মসংস্কার কিংবা সমাজ-সংস্কারের সঙ্গে স্বতন্ত্র মহিমা সত্ত্বেও আমাদের
রেনেসাঁস সমকালীন। এই ধর্মসংস্কার তথা সমাজ-সংস্কারের সঙ্গে ইউরোপের
রেফরমেশনের তুলনা করা যেতে পারে। আমাদের এনলাইটেনমেন্ট কিন্তু স্বতন্ত্র
নয়, তবে তাও কিন্তু সমকালীন। রামমোহনের মধ্যে এই তিনটিই একসূত্রে গাঁথা
ছিল। ফরাসি বিপ্লবের উদারনৈতিক ধারার দ্বারাও তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন,
ফরাসি বিপ্লবের মহান বাণী সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতাকে তিনি ভালোবাসতেন।
তবে ফরাসি বিপ্লবের অনুরূপ কিছু তাঁর কালে বা তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত হতে
পারেনি।
২
অবগুণ্ঠন আমাদের এই দেশেই সকলের আগে ঘটে। এদেশে রেনেসাঁস
হয়নি বলা যেমন কঠিন, হয়েছে বলাও তেমনই কঠিন। কারণ, বিস্তর পণ্ডিত আছেন
যাঁদের হাতে প্রমাণ রয়েছে যে, পৃথিবী স্থির হয়ে রয়েছে আর রবি, সোম, মঙ্গল,
বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি সকলে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরেই চলছে ঘুরেই চলেছে।
রেনেসাঁস তো একটা সাধারণ শব্দ মাত্র নয়, এটা একটা বিশেষ শব্দ। পঞ্চদশ শতকে
একটা বিশেষ অবস্থায় যে শব্দের প্রয়োগ ইতালিতে ঘটেছিল যে কোনো শতাব্দীতে
যেখানে সেখানে যে কোনো অবস্থায় তার প্রয়োগ করলে অর্থ কি বদলে যায় না? যে
জায়গায় যখন বিজ্ঞান আর শাস্ত্রের ফারাক হয়ে যায় যেমন, সংস্কৃত আর বাংলার
ফারাক কিংবা লাতিন আর ইতালিয়ানের ফারাক, থিয়োলজি আর ফিলোজফির ফারাক সেখানেই
তখন রেনেসাঁস হয়। এই শতকের প্রথমদিকে ঘটে যায় আঁধারের অবগুণ্ঠন উন্মোচন।
এই উন্মোচনের ফলে তার নামটা পর্যন্ত বদলে যায়। চিন কমিউনিস্ট হওয়ার পর
তিব্বত থেকে পালিয়ে আসা এক ব্যক্তি একটি পুঁথি দেখিয়ে আমাদের বলেছিলেন, আমি
প্রমাণ করে দিতে পারি যে পৃথিবীটা গোল নয়, আমার কাছে প্রমাণ আছে!
থিয়োলজির
চেয়ার ছাড়া আর একখানি চেয়ারের সৃষ্টি হয় একদিন জার্মানির মারবুর্গ
বিশ্ববিদ্যালয়ে। চেয়ারটি হয় ফিলজফির। দর্শন তার স্বাধীনতা ঘোষণা করে। পরে
ন্যাচারাল ফিলজফি বলেও একটি আলাদা বিভাগ খোলা হয়। এই ন্যাচারাল ফিলজফিরই
আরেক নাম বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞান থেকেই এখন আলাদা হয়ে গেছে মনোবিজ্ঞান,
সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি। এরা প্রত্যেকেই স্বাধীন। কেবলমাত্র জার্মানির
মারবুর্গেই নয়, ইউরোপের সর্বত্রই, এখন তো পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই।
এই
দেশে থিয়োলজি শিক্ষার নতুন কোনো প্রয়োজন নেই এই কথা প্রথম উপলব্ধি করেন
রামমোহন রায়, তিনি প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন ফিলজফি তথা বিজ্ঞান শিক্ষার।
তিনি নিজে ছিলেন একাধারে জবরদস্ত মৌলবি, প্রগাঢ় খ্রিস্টভক্ত, প্রচণ্ড
বৈদান্তিক। মারবুর্গের তিন শতক আগেকার সেই স্বাধীন মানবিক বিদ্যার
অনুবর্তনই তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা মিলে প্রবর্তন করেছিলেন। মারবুর্গের সেই
স্বাধীন মানবিক বিদ্যার অবশ্য আরও ভাগ ততদিনে হয়ে গেছে। তবে ইউরোপের
বিদ্যালয়গুলিতে তখনো থিয়োলজির সহাবস্থান ছিল। কিন্তু বাঙালি
বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সূচনাপর্ব থেকেই হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের
স্থান সেখানে ছিল না।
সব বিষয়ে কৌতূহল বা অনুসন্ধিৎসা হল রেনেসাঁসের
একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। মানবজীবনকে সর্বপ্রকারে ভরিয়ে দেওয়াও
তার একটি বড় লক্ষণ। ইউরোপের মতো এই লক্ষণ বাংলার ছিল। মানবিক বিষয়ে
অতিপ্রাকৃতের হস্তক্ষেপ অস্বীকার করা রেনেসাঁসের আরও একটি লক্ষণ। আমাদের
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দেখা যায় মধ্যযুগে সৃষ্ট সাহিত্যের পরতে পরতে
দেবদেবীর পদক্ষেপ আর হস্তক্ষেপ। দেবদেবীর কোপে মানুষের সর্বনাশ, দেবদেবীর
আশীর্বাদে মানুষের অভীষ্ট সিদ্ধি এই যে সাহিত্যের নিয়ম তা সংস্কৃতের বদলে
বাংলায় লেখা হয়েছে বলেই কি তা রেনেসাঁসের সূচক?
গ্রিক ল্যাতিনের চর্চা
ইউরোপের বিশ্বদ্যিালয়গুলিতে হত, সেই চর্চার ধর্মীয় ঝোঁক আদৌ ছিল না। সেই
চর্চার প্রবণতা ছিল প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ বা সেকুলার। গ্রিক বা রোমক
দেবতাদের কেউ দেবতাজ্ঞান করত না, তাদের পায়ে মাথা ঠেকাত না। যেন তারা
দেবতাই নয়, মানবমনের কল্পনামাত্র। আর আমাদের দেশে মানুষ বসে আছে দেবতা হয়ে!
সেই দেবতাদের মানবিক বিচার করে এমন বুকের পাটা কার আছে? দেবতারা যে বড়
জাগ্রত! বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যে সংস্কৃত চর্চা হত তাকে কোনো অবস্থাতেই
সমগ্র সংস্কৃত সাহিত্যের চর্চা বলা যায় না, তা ছিল মূলত হিন্দুশাস্ত্রের
অনুমোদিত সাহিত্যের চর্চা। আর বিশবিদ্যালয়ের মধ্যে ছিল সাহিত্যের ভগ্নাংশ
মাত্র। বাংলার লেখকদের রামায়ণ, মহাবাংলা পড়া আর ইউরোপের লেখকদের ইলিয়াড আর
অডিসি পড়া দুইয়ের মধ্যে ভিন্ন ধারা রয়েছে। ইউরোপের মানুষ ইলিয়াড, অডিসি পড়ে
বিশুদ্ধ সাহিত্য হিসাবে আর আমাদের দেশের মানুষ রামায়ণ, মহাবাংলা পড়ে
সাহিত্যস্থলে ধর্মগ্রন্থ হিসাবে। এই পড়ার মধ্যে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ নেই,
লৌকিক-অলৌকিকতার কোনো শ্রেণীবিভাগ নেই- সবই যেন সমান সত্য। কেউ যদি প্রশ্ন
করে বা তর্ক তোলে তাহলে রূপক ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে সহজেই তার মুখে কুলুপ
এঁটে দেওয়া হয়। অথচ প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের একটি বিশিষ্ট ধারাই হল
ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু সেই ধারাটি বিলুপ্তির দিকে ক্রমে পা বাড়িয়েছে, তাকে
নিয়ে বিশেষ চর্চা পর্যন্ত হয়নি। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, বাৎস্যায়নের
কামসূত্র, অশোকের শিলালিপি, মানসায়ের শিল্পসূত্র, ভরতের নাট্যশাস্ত্র এসব
কি হিন্দু কলেজ বা সংস্কৃত কলেজের ছাত্র বা শিক্ষকদের চারপাশে ছিল? টোল,
চতুষ্পাঠীরও বিস্তারের একটা সীমাবদ্ধতা ছিল। তাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারা
যায়, আমাদের দেশে রেনেসাঁসের প্রেরণা এইসবের মধ্যে থেকে আসেনি, এসেছিল আগের
চার শতকের ইউরোপের বিবর্তন থেকে।
এই দেশে বাণিজ্য করতে ইংরেজরা যখন আসে
তার আগেই কিন্তু তারা রেনেসাঁস পর্ব সমাধা করেছে। তখন তারা যাচ্ছে
রেফরমেশনের মধ্যে দিয়ে। অর্থাৎ তখন তারা প্রটেস্টান্ট হয়ে উঠেছে ক্যাথলিক
থেকে। ইংরেজরা যখন এদেশে রাজত্ব হাতে পায় তার আগেই কিন্তু তাদের দেশে
এনলাইটেনমেন্ট পর্ব শুরু হয়ে গেছে আর যে সময়ে তারা বাণিজ্যের জন্যে এদেশে
আসে, সেই যুগটাতে তাদের দেশে শুরু হয়ে গেছে শিল্প বিপ্লবের যুগ। এই
প্রসঙ্গে অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকের দুটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা আমাদের
স্মরণে রাখা প্রয়োজন। প্রথম ঘটনাটি হল আমেরিকার স্বাধীনতা আর দ্বিতীয়
ঘটনাটি হল ফরাসি বিপ্লব। এই দুটি ঘটনার থেকে কিন্তু এই দেশে বাণিজ্য করতে
আসা ইংরেজরা নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি। বস্টন টি পার্টির চা যেতে
শুরু করে দেয় ঢাকা থেকে বস্টনের উদ্দেশে। আর ভারতবর্ষে ফরাসি অধিকৃত
এলাকাগুলিতে শোভা পেতে থাকে ত্রিবর্ণ পতাকা। তুর্কি আফগান মোগল শাসনের
অবসানের পর একদল বিদেশি এই বাংলাবর্ষে এসে বাণিজ্যের ইতিহাসে একটা নতুন
অধ্যায়ের শুরু করল এটাই কিন্তু একমাত্র সত্য নয় এই নতুন বিদেশিদের জীবন
বেয়ে বইতে শুরু করল একটা নতুন স্রোত, সেই স্রোত হল ইউরোপের ইতিহাসের স্রোত।
রেনেসাঁস, রেফরমেশন আর এনলাইটেনমেন্টের স্রোত। সেই স্রোতকে আরও গতিশীল করল
আমেরিকার স্বাধীনতা, আর ফরাসি বিপ্লব। আমেরিকার স্বাধীনতাকেও তো এক অর্থে
বিপ্লব বলে অভিহিত করা যায়। তাহলে দুটিকে একসঙ্গে বলতে হয় যুগল বিপ্লব।
এদেশের মনোলোকেও পরশ লাগল সেই যুগল বিপ্লবের।
৩
আমার নিজের
ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, অষ্টাদশ শতকেই বাংলায় নবজাগরণের উন্মেষ ঘটেছিল, তবে
আমার এই অনুমানের সমসাময়িক প্রমাণ মেলা ভার। একথা তো ঠিক যে, ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির আমলারা যেমন সংস্কৃত চর্চা করতেন, তেমনি ফার্সির চর্চাও তাঁদের
মধ্যে ছিল, আবার বাংলাও তাঁরা চর্চা করতেন। অষ্টাদশ শতকের আগেই এই কলকাতা
শহরের পত্তন হয়েছিল। আর সারা অষ্টাদশ শতক ধরে চলেছে বিদেশি জাহাজের
আনাগোনা। সুদূর ইউরোপ থেকে জাহাজ এসেছে। সেইসব জাহাজে করে এসেছে রাশি রাশি
বিদেশি বইপত্র, এসেছে কাব্য, উপন্যাস, দর্শন, প্রবন্ধ, ইতিহাস ইত্যাদি।
রাজনীতি অর্থনীতিও বাদ যায়নি। ইংরেজদের ঘরে ঘরে, ক্লাবে ক্লাবে বইপত্র জমে
উঠেছে। সেগুলোর কিছুই কি নজরে পড়েনি বাঙালির? ইংরেজদের জন্য যেসব থিয়েটার
গড়ে উঠেছিল, ধনী অথচ শিক্ষিত বাঙালি কি টিকিট কেটে সেসব দেখেনি? লন্ডনের
মানসলোক কি প্রভাব বিস্তার করেনি এই কলকাতার বুকে? বাঙালি কি সেই মানসলোকের
প্রভাবে সাড়া অনুভব করেনি? ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলারা বাঙালি কারিগরকে
দিয়ে বাংলা হরফ তৈরি করিয়েছিলেন। হ্যালহেডের ব্যাকরণ তো বাংলার প্রতি
মনোযোগেরই একটি উদাহরণ বহন করে। কোম্পানির আমলাদের ভাষাচর্চা কিন্তু
ক্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মীয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না। তাঁরা ছিলেন
মানবপ্রকৃতিবেত্তা, ইংরাজিতে যাদের আমরা বলি হিউম্যানিস্ট। মানুষ সম্বন্ধে
তাঁদের ছিল সীমাহীন ঔৎসুক্য। স্যার উইলিয়াম জোন্সের অনুবাদকর্ম তো এই
ঔৎসুক্যেরই ফসল। মানবপ্রকৃতিবেত্তা বলেই তিনি ছিলেন বাংলাতত্ত্ববিদ।
ব্রিটিশ
ভারতে আসা নিষিদ্ধ ছিল খ্রিস্টান মিশনারিদের। শ্রীরামপুরের দিনেমার
কর্তৃপক্ষ তাঁদের আসার সুযোগ করে দেন। বিভিন্ন বাঙালি ভাষায় সেখান থেকেই
বাইবেলের অনুবাদ বের হতে থাকে। এই উদ্দেশ্যটা কিন্তু রেনেসাঁসের দ্যোতক নয়,
উদ্দেশ্যটা মুদ্রণযন্ত্রের সাহায্যে বিভিন্ন বাঙালি ভাষায় পুস্তক প্রকাশ,
যা সহায়ক হয় রেনেসাঁসের। এখান থেকেই বাংলায় সংবাদপত্রও প্রকাশ করা হয়।
দেশের বিভিন্ন বিবরণ সেই সংবাদপত্রে ঠাঁই পায়। এই সংবাদপত্রের প্রথম
প্রসঙ্গটি কিন্তু কিছু আমেরিকা নামক তৎকালীন যুগের এক অজানা ভূখণ্ডের।
মিশনারিদের ধর্মপ্রচার মূল উদ্দেশ্য হলেও বৃহত্তর জগতের জ্ঞানও তারা
পরিবেশন করে। মানুষকে মানুষের জীবন সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা অবশ্যই
মানবপ্রকৃতিবিত্তির অন্তর্গত। সেদিক থেকে বিচার করলে মিশনারিদেরও
মানব-প্রকৃতিবেত্তা বা হিউম্যানিস্ট বলতে হয়। তাদের প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলিতে
ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি যুগের উপযোগী বিষয়কে পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত করা
হয়েছিল। অখ্রিস্টানদের কাছেও এইবিদ্যাসত্র ছিল অবারিত। ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির রাজকর্মচারীদের জন্যে একদিন যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ গড়ে উঠেছিল
অচিরেই তা বাংলা, হিন্দি, উর্দু ইত্যাদি ভার্নাকুলার গদ্য সাহিত্যের
আঁতুরঘর হয়ে উঠল কেরি সাহেবের সহযোগিতায়।
ইতালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স
ইত্যাদি দেশের রেনেসাঁসের অন্যতম বিশিষ্ট কাজ ছিল ইতালীয়, ইংরাজি, ফরাসি
ইত্যাদি ভার্নাকুলারের গদ্যসাহিত্য সৃষ্টি। তাদের সময়ে মাতৃভাষা লাতিন বা
গ্রিক নয়। এ দেশের বেলাতেও আরবি, ফারসি, সংস্কৃত নয়। অবজ্ঞাসূচকই ছিল আগে
ভার্নাকুলার। রেনেসাঁস মর্যাদা দেয় ভার্নাকুলারকে। অবশ্য এই প্রসঙ্গে মনে
রাখা প্রয়োজন যে রেফরমেশনের ফলেই কিন্তু জার্মান গদ্য সাহিত্যের সূচনা।
জার্মান গদ্যের জনক হলেন মার্টিন লুথার। লাতিনের জায়গায় তাদের
বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মাতৃভাষা মাধ্যমের সূচনা সর্বপ্রথম করে জার্মানরাই।
আমাদের
মনে রাখা প্রয়োজন যে, রেনেসাঁস আর রেফরমেশন কিন্তু অভিন্ন বিষয় নয়।
পরলোকের বা পরকালের বা অতিপ্রাকৃতের স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে ইহলোকের তথা
ইহকালের প্রথা প্রকৃতির মধ্যে মানবজীবনের পরিপূর্ণতার অন্বেষাই হল
রেনেসাঁস। অপরপক্ষে খ্রিস্টধর্মের সংস্কার হল রেফরমেশন। মানুষ নিজেই এ
জগতের অজানা নিয়মগুলোকে জেনে নিয়ে এই জগতের মধ্যেই উন্নতির চরমসীমায়
উত্তরীত হতে পারে, প্রাচীন গ্রিকদের ক্ষেত্রে যেমন দেখতে পাওয়া গিয়েছিল।
উন্নতির চরম সীমায় উপনীত হয়ে কত উন্নতমানের কাব্য, নাটক, বিজ্ঞান, দর্শন
তাঁরা পরিবেশন করেছিলেন। কী অপূর্ব ছিল প্রাচীন গ্রিকদের নৃত্য, ভাস্কর্য,
স্থাপত্য। মনে রাখা দরকার যে, রেনেসাঁস কিন্তু ধর্ম বা ঈশ্বর বা খ্রিস্টকে
একবারের জন্যেও বাদ দিতে চায়নি। চেয়েছে ধর্মকে বা ঈশ্বরকে বা খ্রিস্টকে
নতুন করে ভাববার স্বাধীনতা, আঁকবার স্বাধীনতা, গড়বার স্বাধীনতা, করবার
স্বাধীনতা। খ্রিষ্টীয় সংস্কারকরা কিন্তু এতটা স্বাধীনতা সহ্য করতেন না। তাই
সূচনাপর্বে রেনেসাঁস আর রেফরমেশনের মধ্যে একটা বড় ধরনের ফারাক ছিল। এই
ফারাকটা ক্রমে কমে যায়।
