
আছিয়া,
লামিয়া, রামিসা-একের পর এক শিশুর মৃতদেহ ভাসছে চোখে। একের পর এক শিশু
ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, মুখোমুখি হচ্ছে মৃত্যুর। একের পর এক শিশুকে পৈশাচিক
উল্লাসে হত্যা করছে নরপিশাচরা। এ কেমন সমাজ? গণমাধ্যমে রামিসার হত্যাকারী
সোহেল রানার জবানবন্দি পড়ে মনে হলো, অতি স্বাভাবিকভাবে সে শিশুটিকে ধর্ষণ ও
হত্যা করেছে, যেন এটা কোনো ঘটনাই নয়। রামিসার পরিবারের সঙ্গে তার কোনো
শত্রুতা বা ঝগড়াঝাটি কিছুই ছিল না। একটি শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা যেন ইচ্ছা
হলেই করা যায়!
প্রশ্ন হলো, কেন ধর্ষণ ও হত্যাকে এত সহজ বলে ধরে নিচ্ছে
অপরাধীরা? শুধু মেয়েশিশু নয়, ছেলেশিশুরাও প্রায়ই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আমি
‘বলাৎকার’ শব্দটি ব্যবহারের বিপক্ষে। শিশু ছেলে হোক বা মেয়ে, অপরাধ একই;
তাই একই শব্দ উভয় শিশুর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত।
বাংলাদেশে তিন বছরের
শিশু থেকে শুরু করে আশি বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত যে কেউ যখন-তখন ধর্ষণের শিকার
হতে পারে, প্রাণও হারাতে পারে ধর্ষকের হাতে।
রামিসা হত্যাকাণ্ডের
সংবাদের নিচে বেশ কয়েকজনের মন্তব্যও চমকে দেওয়ার মতো। সেখানে একজন লিখেছে,
এত সাজসজ্জা নাকি ভালো না; আরেকজন মন্তব্য করেছে, শিশুটির পর্দা করা উচিত
ছিল; আরেকজন লিখেছে-এই মেয়ে অবশ্যই ক্লাস ফাইভের তরুণী। কী জঘন্য মানসিকতা
এই মন্তব্যকারীদের! এরাও কিন্তু পোটেনশিয়াল বা সুপ্ত ধর্ষক; কারণ তারা মনে
করছে নারী যে বয়সেরই হোক, সে একটি যৌনবস্তু। তাকে চাইলেই ধর্ষণ করা যায়,
চাইলেই মেরে ফেলা যায়।
ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে
হলে দরকার দ্রুত বিচার, কঠোর দণ্ড এবং দ্রুত দণ্ড বাস্তবায়ন। বিচারহীনতার
কারণেই কিন্তু সমাজে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। একজন সম্ভাব্য অপরাধী
যখন দেখে একটি অপরাধের কোনো বিচার হয়নি, বছরের পর বছর ধরে বিচার চলছে,
কিছুদিন পরে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে, তারপর অপরাধী কোনো না কোনোভাবে
জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে কিংবা আইনের ফাঁকফোকড় গলে নিস্তার পেয়ে
যাচ্ছে-তখন সম্ভাব্য অপরাধী উৎসাহিত হয়। সে-ও তার ইচ্ছামতো ধর্ষণের ঘটনা
ঘটায়।
রামিসার হত্যাকারী সোহেল রানা দোষ স্বীকার করেছে। তার স্ত্রী
স্বপ্না স্বয়ং তাকে সাহায্য করেছে এবং স্বপ্না এই ঘটনার সাক্ষীও। রামিসার
মা-ও তার মেয়ের মৃতদেহ সোহেলদের বাসার বাথরুমে নিজের চোখে দেখেছেন; অর্থাৎ,
ঘটনাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। এই ধরনের অপরাধের ঘটনায় এক মাসের মধ্যে
বিচার সমাপ্ত করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা প্রয়োজন। দৃষ্টান্তমূলক এই শাস্তি
যদি জনতা দেখে, তাহলে সম্ভাব্য আরও অনেক ধর্ষক ভয় পাবে; তারা এ ধরনের
অপরাধ করতে সাহসী হবে না।
কোনো আইনজীবীরও উচিত নয় শিশুহত্যাকারী কিংবা
শিশুধর্ষকের পক্ষে মামলা পরিচালনা করা; বিশেষ করে যদি অপরাধীর অপরাধ
সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
বাংলাদেশে অধিকাংশ ধর্ষকের আজ পর্যন্ত কোনো
শাস্তি হয়নি; শাস্তি হয়নি ধর্ষক ও হত্যাকারীদের। এই বিচারহীনতাই নতুন
অপরাধের জন্ম দিচ্ছে।
যে দেশে শিশুরা নিরাপদ নয়, সে দেশ কোনোভাবেই সভ্য
দেশের পরিচয় দাবি করতে পারে না। এ কথা মনে রাখতে হবে, রামিসার হত্যাকারী
সোহেল রানার মতো আরও অনেক ধর্ষক ও ঘাতক সমাজের আনাচে-কানাচে ঘাপটি মেরে
আছে। এই বিকৃত মানসিকতার পিশাচগুলোকেও শনাক্ত করা দরকার। শিশু ও নারীকে
যৌনবস্তু ও ধর্ষকের নিছক বিনোদনের সামগ্রী ভাবার সংস্কৃতিকে প্রতিরোধ করতে
হবে। ধর্ষকের পক্ষে যে সমর্থন জানাবে, তাকেও শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা
করতে হবে। স্কুলের পাঠ্যসূচিতেও নারী ও শিশুর (ছেলে-মেয়ে উভয় শিশুর) মানবিক
মর্যাদার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নারী ও শিশুকে
যৌনবস্তু ভাবার বিকৃত চর্চা থেকে সমাজকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।
অবাধ
পর্নোগ্রাফিও কিন্তু এ ধরনের বিকৃত নরপিশাচের সংখ্যা বৃদ্ধির একটি কারণ।
পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা দরকার। পর্নোগ্রাফি তৈরি,
দেখা এবং এর প্রচারকারীকে কঠোর শাস্তি প্রদান করা দরকার। নারী ও শিশুর
বিরুদ্ধে অশালীন ও অবমাননাকর যেকোনো মন্তব্যকারীকেও শাস্তির আওতায় আনতে
হবে।
জানি না বাংলাদেশে আর কত রামিসা, লামিয়া, আছিয়ার মতো শিশুদের
হত্যার শিকার হতে হবে। প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনার বিচার চাই, দ্রুত বিচার চাই।
অপরাধীর কঠোর দণ্ড দেখতে চাই এবং সেই কঠোর দণ্ডের দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে
চাই। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা অবশ্যই অবিচারের পথ প্রশস্ত করে; বিচারের বাণী
তখন নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। যতদিন এই দেশে সকল হত্যা ও ধর্ষণের বিচার ও
অপরাধীর শাস্তি কার্যকর না হবে, ততদিন এই সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর ভুক্তভোগী
নারী ও শিশুর অভিশাপ বর্ষিত হতে থাকবে; ততদিন কোনো উন্নয়নই অর্থবহ হবে না।
লেখক: শিক্ষক, বাংলাভাষা বিভাগ, ইউননান বিশ্ববিদ্যালয়, চীন।
