একাত্তরের
মার্চে স্বাধীনতার দাবিতে অগ্নিগর্ভছিল পুরো পূর্ব পাকিস্তান। দেশমাতৃকাকে
হানাদারমুক্ত করতে সবাই রাজপথে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে চলছে লাগাতার হরতাল। 'বীর
বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো' স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত
শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ। অহিংস আন্দোলন-সংগ্রামে নয়, সশস্ত্র সংগ্রামেই
একমাত্র মুক্তির পথ, এটা বুঝতে বাঙালি জাতির বাকি রইল না। তাই আন্দোলনের
পাশাপাশি সারা দেশেই গোপনে চলছিল সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি।
কয়েক
শতাব্দীর ঔপনিবেশিক দুঃশাসনের পাথার পেরিয়ে ১৯৪৭ সালে 'পাকিস্তান' নামে
বাঙালির ভাগ্যে যা জুটেছে, তা ভিন্নরূপে আরেক অপশাসন, নির্যাতন আর বঞ্চনা
ছাড়া কিছুই নয়। বাঙালি জাতি ঐ শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি পেতে নেমে পড়ে
রাজপথে।
একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের তৃতীয় দিন দেশব্যাপী চলছিল লাগাতার
হরতাল। তবে এই দিন হরতাল ছিল আট ঘণ্টার। দ্রোহ-ক্ষোভে বঞ্চিত শোষিত বাঙালি
তখন ক্রমেই ফুঁসে উঠছিল ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে।
এক্ষেত্রে
বসে ছিল না কুখ্যাত পাকিস্তানি বাহিনী। তাদের এ দেশীয় দোসর
রাজাকার-আলবদররাও বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন নস্যাতে তৎপর ছিল। কারফিউ
দিয়েও সামরিক জান্তারা সাহসী বীর বাঙালিদের ঘরে আটকে রাখতে না পেরে গোপনে
আঁটতে থাকে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে বাঙালি নিধনের পরিকল্পনা।
আন্দোলনের
পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা দফায় দফায় বৈঠকে বসেন ৭ মার্চের জনসভা
সফল করার জন্য। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)
চলতে থাকে জনসভার প্রস্তুতি। পাশাপাশি ঢাকাসহ সারা দেশেই গঠন হতে থাকে
সংগ্রাম কমিটি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যুব ও ছাত্রনেতারা গোপনে নানা স্থান
থেকে অস্ত্র সংগ্রহ অভিযান চালাতে থাকেন বেশ জোরেশোরেই।
১৯৭১-এর মার্চে
ক্ষুব্ধ বাঙালির মিছিলে মিছিলে ঝাঁঝালো স্লোগানে উচ্চকিত ছিল সারা দেশ।
প্রধান স্লোগান ছিল 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো', 'তোমার
আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা', 'তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ
বাংলাদেশ' ইত্যাদি।
এই দিনটিতে সারা দেশের সকল পাড়া, গ্রাম, মহল্লায়
সংগ্রাম কমিটির পাশাপাশি শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি এবং স্বেচ্ছাসেবক
বাহিনী গঠনের আহ্বান জানানো হয়। এর উদ্যোক্তা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র
সংসদ (ডাকসু) ও আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ছাত্র সংগঠন
ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ ঘোষিত)। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের
(বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ক্যান্টিনে স্থাপন করা হয় ছাত্রদের
যোগাযোগ কেন্দ্র।
একদিকে জনসভার প্রস্তুতি, অন্যদিকে গোটা বাংলাদেশেই
উত্তাল আন্দোলন-বিক্ষোভে রীতিমতো অগ্নিগর্ভ অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রতিটি
বাঙালির চোখেমুখে একই প্রত্যাশা-পাকিস্তানি দখলদারদের হটিয়ে
স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ ছিনিয়ে আনা।
