
রাজ্যটির
নাম ত্রিপুরা। এই ত্রিপুরা দু’টি অংশে বিভক্ত ছিল। পার্বত্য ত্রিপুরা, এখন
ভারতের একটি প্রদেশ। অন্য অংশটি সমতল ত্রিপুরা, যা কুমিল্লা নামে পরিচিত।
বর্তমানে বাংলাদেশের তিনটি জেলা- ব্রাহ্মণবাড়িয়া-চাঁদপুর-কুমিল্লা। আশির
দশকে চারটি মহমুকা জেলা রূপান্তরিত হয়ে যায়। কুমিল্লা জেলাটি দু’টি মহমুকা
নিয়ে গঠিত- কুমিল্লা উত্তর ও কুমিল্লা দক্ষিণ। ফলে বর্তমানে ১৭টি উপজেলা
নিয়ে কুমিল্লা জেলা।
শহর কুমিল্লা এখন সিটি কর্পোরেশন। বলা হতো ঈড়সরষষধ
(ঈঁসরষষধ) রং ঃযব ঃড়হি ড়ভ নধহশং ্ ঃধহশং. ব্যাংকগুলো আছে নতুন নামে,
সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু লোকসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবাসনের প্রয়োজনে ঃধহশং
অর্থাৎ পুকুরগুলো হারিয়ে গেছে। এ বিবর্তন ৫০ বছরের মধ্যে ঘটে গেছে। আদি
কুমিল্লাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কুমিল্লা শহরে ইতিহাস খ্যাত চারটি দিঘি
আজও রয়েছে। বলে রাখি শহর কুমিল্লার ঐতিহাসিক স্থাপনা ত্রিপুরার রাজাদের
অবদান। ইতিহাসের পাঠ নিতে হলে বার বার ত্রিপুরাধিপতিদের কিংবদন্তি কীর্তির
অক্ষয়গাথা গৌরব ও ঐতিহ্যের শিকরে সমৃদ্ধ।
একসময় শহরে কুমিল্লাবাসীর
জলকষ্ট দূর করার প্রয়োজনে মহারাজা ধর্মমানিক্য বাহাদুর ‘ধর্মসাগর’ দিঘিটি
খনন করেছিলেন। ওই ধর্মসাগরের উত্তরপাড়ে রানীর কুঠি তৈরি করা হয়, রাজারা
মাঝে মাঝে আসতেন, বাস করতেন। এখন পাশাপাশি গুলবাগিচা মডেল সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়, কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, আর্ট স্কুল ও কলেজ এবং পশ্চিমপাড়সহ
বিনোদনের জন্য পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। পূর্বপাড়ে কালী বাড়ি, কুমিল্লা
ধীরেন্দ্রনাথ স্টেডিয়াম, ঈদগাহ ও সরকারি জিলা স্কুল অবস্থিত। দক্ষিণ পাড়ে
ব্যাপ্টিস মিশন। ধর্মসাগর কুমিল্লার ঐতিহাসিক জলধার প্রাচীন কুমিল্লা
ঐতিহ্যের ঠিকানা হিসেবে বহুল পরিচিত তার অবস্থান শহরের মাঝখানে। দিঘিটির
অদূরে পুলিশ সুপারের অফিস, জেলা প্রশাসন এবং পশ্চিমে এগুলে জেলা পরিষদ,
কেন্দ্রীয় জেলখানা ও নগর ভবন। তাদেরকে চিনতে হলে ধর্মসাগরকে স্মরণ করতে
হবে।
ধর্মমানিক্য বাহাদুর রানির নামে দিঘি খনন করেন, তার নাম ‘রানির
দিঘি’, তার পশ্চিমপাড়ে শতবর্ষী ভিক্টোরিয়া স্কুল (১৯৮৬) ও ভিক্টোরিয়া কলেজ
(১৮৯৯)। দু’টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা রায়বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায়।
দিঘির পূর্বপাড়ে ফুলার সাহেবের নামে ‘ফুলার হোস্টেল’। দক্ষিণ ও উত্তর পাড়ে
আবাসন। এই রানির দিঘির বেশ কিছু পূর্বে নবাববাড়ি-দারোগাবাড়ি-হোচ্ছামিয়া
মাদ্রাসা (বর্তমানে উচ্চ বিদ্যালয়) পেরিয়ে পূর্বে অবস্থিত নানুয়ার দিঘি।
শুধু পশ্চিমপাড়ে শৈলরানী পৌর বালিকা বিদ্যালয় আর সব পাড়ে আবাসন। ত্রিপুরার
রাজা খনন করেন নানুয়া নামে একজন নর্তকীর নামে। তার পূর্ব-দক্ষিণ পাড়ে সিটি
কর্পোরেশনের মেয়রের বাড়ি থাকায় তা অনেকটা নান্দনিকভাবে সাজানো হয়েছে। মেয়র
ক্ষমতায় নেই, দিঘিটি উজ্জ্বলতার আভিজাত্যে দৃষ্টি নন্দন, জলধার স্বচ্ছ,
পাড়গুলো বাঁধানো, ঘাটলাও ব্যবহার যোগ্য, গাছ-গাছালি দিয়ে পার্কের মতো
সাজানো।
উজির দিঘিটি মূলত দিঘির মত। বড় পুকুর বললে মানায় না, আবার দিঘি
বলতে যা বুঝায় তেমন বিশালও নয়। দিঘির উত্তর পাড়ে সার্কিট হাউস, পশ্চিমপাড়ে
পুলিশ সুপারের বাসস্থান অনেকটা পুরো পাড় নিয়ে। পূর্ব পাড়ে সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়, জেলা প্রশাসনের পরিচালিত কালেক্টরি স্কুল ও কলেজ, ভূমি অফিস এবং
সংলগ্ন কুমিল্লা শহরের প্রধান বাজার- ‘রাজগঞ্জ বাজার’। এ অঞ্চলটি ‘রাজবাড়ি
কমপাউন্ড নামে পরিচিত সবই ত্রিপুরা রাজাদের কীর্তি চিহ্ন।
কুমিল্লা
জেলায় কয়েকটি জলাশয় বা দিঘি রয়েছে, তাদের অন্তরালে রয়েছে ‘মিথ’। যেমন
ময়নামতি দিঘি। রানির ময়নামতির নামে এ দিঘিটি। কথিত আছে রানি ময়নামতিকে এক
দৈত্য বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, তার প্রভাব থেকে কিছুতেই নিজেকে বাঁচাতে বা
রক্ষা করতে পারছিলেন না। তাই শর্ত দিলেন- দৈত্যটি যদি এক রাত্রিতে একটি
দিঘি খনন করতে পারে, তবে ময়নামতি তাকে বিয়ে করবেন। দৈত্যটি তখন একরাত্রে এক
বিশাল দিঘি খননের কাজ শুরু করে প্রায় শেষ পর্যায় যখন, রানি ময়নামতি দেখলেন
যে দৈত্য দিঘি খনন করে ফেলেছে, তখন নিজেই ভোরে মোরগের ডাক দিয়ে জানান দেয়,
ভোর হয়ে গেছে, খনন কাজ অসমাপ্তি। দৈত্য তখন পালিয়ে যায়। সে দিঘিটি এখন
পূর্বের ন্যায় নেই, তবে নামটি রয়ে গেছে।
ময়নামতির দক্ষিণে লালমাই পাহাড়।
একসময় এখানে একটি বিশাল জলাশয় ছিল। নাম ছিল লমলম সাগর বা দিঘি। কথিত আছে
রাম-রাবণের যুদ্ধে লক্ষণ নিহত হয়েছিলেন। তখন দৈববাণী হয়ে যদি হিমালয়ের কাছে
গন্ধমাদন পর্বতে বৈশল্যকরণী গাছ আছে, সে গাছের রস সেবন করলে লক্ষণ বেঁচে
যাবে। তখন রামভক্ত হনুমান বৈশল্যকরণী গাছ আনতে গন্ধমাদন পর্বতে যায়। কিন্তু
গাছটি চিনতে পারে না। তাই পুরো পর্বতটি হাতের তালুতে করে নিয়ে আসে এবং
গাছের রস সেবন করিয়ে লক্ষণকে বাঁচিয়ে তুলে। পরে হনুমান পর্বতটি যথাস্থানে
রেখে আসতে যখন আকাশ পথে যাচ্ছিল, একটু অন্যমনস্ক হওয়ায় কিছুটা অংশ লমলম
জলাশয়ে পড়ে যায় এবং জলাশয়টি ভরাট হয়ে ছোট পাহাড়-এ পরিণত হয়। তখন থেকে লমলম
নামটির পরিবর্তে লালমাই পাহাড় নামে পরিচিতি লাভ করেন।
কুমিল্লা শহর থেকে
পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে দাউদকান্দি উপজেলার গৌরিপুরে একটি দিঘি আছে তার নাম
‘লক্ষণের দিঘি’। কথিত আছে লক্ষণ চন্দ্র দাস নামে একজন সাবরেজিস্টার এই
দিঘিটি খনন করেছিলেন। তার অন্তরালে আছে একটি চমৎকার কাহিনি।
ঐ অঞ্চলের
এক বিধবা মহিলা, সন্তানাদি নেই। একটি গরু ছিল তার। মানুষের বাড়িতে কাজ করত,
কখনো ভিক্ষা করত আর গরুটি পালন করত। একদিন স্কুল মাঠে গরুটি আছে, বিধবা
মহিলা তাকে আনতে যায়। স্কুল ঘরের পাশে দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পায় একজন
শিক্ষক একজন ছাত্রকে পড়া না শিখায় মারছেন এবং বলছেন- ‘কত গরু মানুষ করলাম,
তোকে মানুষ করতে পারলাম না।’ মহিলাটি এ কথা শুনে নিজের গরুটা মাঠ থেকে এনে
শিক্ষককে বলছে- ‘মহাশয়, আমার গরুটা মানুষ করে দেন, আমার কেউ নেই, সন্তানও
নেই।’ শিক্ষকটি একটু লোভী প্রকৃতির ছিলেন। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে আমি মানুষ
করে দিব।’ শিক্ষক গরু নিয়ে গেছেন একসময় বিক্রি করে দিয়েছেন। মহিলা খোঁজ
নিতে যায়, গরুটি মানুষ হয়েছে কীনা দেখতে চায়। শিক্ষকটি বলেন- গরুটিকে মানুষ
করতে কারখানায় পাঠানো হয়েছে। ইত্যাদি।
এভাবে কয়েকবছর চলে যায়। একদিন
বিধবা বৃদ্ধা হয়েছে, বুড়ি বলে সকলে সম্বোধন করেন, শিক্ষক যে গরুটি বিক্রি
করে তাকে ঠকিয়েছে তা জানাজানি হয়ে যায়। এদিকে গৌরিপুর সাবরেজিস্টার অফিসে
নতুন সাব রেজিস্টার এসেছেন। নাম লক্ষণ চন্দ্র দাস। বুড়ি এখন কাজ করতে পারে
না, ভিক্ষাও তেমন পায় না। গাছতলায় বসে কাঁদছে। একজন জিজ্ঞেস করছে- ‘কাদস
কেন ?’ ‘বাবা, ভিক্ষা করতে মানুষের বাড়ি যেতে পারি না, খেতেও পারি না’ বলে
বুড়ি কেঁদেই চলেছে। লোকটি তখন বলছে, ‘বুড়ি, তোমার না একটা গরু ছিল,
শিক্ষককে দিয়েছিল মানুষ করতে। এখন সে মানুষ হয়েছে, এখন সে সাব রেজিস্টার।
তুমি অফিসে গেলে দেখতে পাবে।’ বুড়ি তা বিশ^াস করল এবং সাব রেজিস্টার অফিসে
গিয়ে দেখে চেয়ারে একজন লোক বসে আছে। ভাবল এটাই তার গরু। এখন নাম লক্ষণ। সে
দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকছে- ‘আমাকে চিনতে পারিস, আমি তোর বুড়ি মা।’
ঘটনা হলো-
লক্ষণ দাস ছোটবেলা বাড়ি থেকে হারিয়ে যায়। একজন দারোগা তাকে লালন-পালন করে,
পড়াশুনা করায় এবং লেখাপড়া শেষ হলে সাব রেজিস্টারের চাকরি পায়। সে শুনেছে
তার বিধবা মা ছিল, সে হারিয়ে যায়- তারপরের ঘটনা এতটুকু। বুড়ি প্রায়ই অফিসের
দরজায় বসে থাকে, আর বলে- ‘তুই আমারে চিনিছ না ?’ সাব রেজিস্টার দেখে একজন
বুড়ি দরজায় কয়েকদিন যাবত বসে থাকে, তার দিকে তাকিয়ে থাকে, আর হাত দিয়ে
ডাকে। একদিন বুড়িকে কাছে ডেকে নেয় এবং তার সব কথা শুনে দৃঢ় বিশ^াস হয় এই
বুড়ি তার মা। লক্ষণ দাস তাকে মা হিসেবে গ্রহণ করে বাসায় নিয়ে যায় এবং মায়ের
মত যত্নাদি করে। বুড়ি এখন লক্ষণের মা। একসময় বুড়ি মারা যায়। লক্ষণ দাস
ভাবল- মার জন্য তো কিছুই করা হলো না। কত কষ্ট পেয়েছেন বুড়িমা। তাই তাঁর
স্মৃতিরক্ষার্থে বুড়ি থাকতেই জমি কিনে। একদিন বুড়িমাকে বলল- ‘মা, তুমি এখান
থেকে দৌড়ে উত্তর দিকে যতটুকু যেতে পারবে, ততটুকু জমিতে একটি দিঘি খনন
করব।’ আগেই বলেছি- জায়গাটা গৌরিপুর। কুমিল্লা-ঢাকা মহাসড়কের উত্তর পাশে
পেন্নাই নামে এলাকায়। বুড়ি দৌড়াতে দৌড়াতে যেখানে গিয়ে থামল, সেখান পর্যন্ত
একটি দিঘি খনন করল লক্ষণ দাস। বুড়ি মারা গেল। বুড়িকে দিঘির উত্তরপাড়ে দাহ
করা হয় এবং শশ্মানের উপর মাতৃস্মৃতিস্বরূপ একটি মঠ তৈরি করে প্রতিষ্ঠা পূজা
সমাপন করে লক্ষণ দাস বলল, ‘এবার হারানো মার দুধের দায় পূর্ণ করলাম।’
বিধিবাম- সে বছর বন্যায় উত্তরপাড় মঠসহ জলের স্রোতে ভেঙে একাকার হয়ে যায়।
তারপর যতবারই উত্তর পাড়টি বাঁধতে গেছে, বর্ষায় তা ভেঙে জমি হয়ে গেছে। এ
দিঘির নামকরণ হয় ‘লক্ষণের দিঘি’। এখন দিঘির পাড়ে বসতি, দিঘির তেমন কোনো
চিহ্ন নেই।
দাউদকান্দি উপজেলায় মোহাম্মদপুর গ্রামে আছে দুটি দিঘি। একটি
দিঘি খনন করেন জনদরদী প্রভাবশালী দয়াবান জমিদার কৈলাশ দাশ মুন্সী। দিঘির
উত্তরপাড়ে তার বাড়ি ছিল। এখন হাসপাতাল, পোস্টাপিস, ইউনিয়ন পরিষদের অফিস ও
সরকারি গোডাউন। দক্ষিণ পাড়ে সকালের বাজার, স্থানীয়ভাবে বলা হয় আড়ং,
পশ্চিমপাড়ে জমিদারের প্রয়োজনে মালি-নাপিত ও কাজের লোকের আবাসন, পূর্বপাড়ে
বর্তমানে অনেক লোকের বাস।
অপর দিঘিটি নাম কালাপাহাড়ের দিঘি। কথিত কাহিনি
হলো- চাঁদ সুলতানার সেনাপতি ছিলেন কালাচাঁন। তিনি হিন্দু ছিলেন। যুদ্ধে
পরাজিত হয়ে আত্মরক্ষার্থে এ গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কালাচাঁন দিঘি খনন করে
পশ্চিমপাড়ে বাড়ি ও দেবালয় নির্মাণ করেন। এ অঞ্চল ছিল জঙ্গলায় ভর্তি। বসতি
ছিল বিরল। বানর ছিল প্রচুর।
এ গ্রামের এক মুসলিম পরিবারের সঙ্গে
কালাচাঁনের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। একদিন এক মহিলা তাকে পানের সঙ্গে গো-মাংসের
ছোট্ট টুকরা সুপারির সাথে মিছিয়ে পরিবেশন করে।
কালাচাঁন ছিল ধার্মিক।
দেবালয়ে বহু দেবতার বিগ্রহ ছিল। তিনি নিত্য পূজা দিতেন। পান খাওয়ার পর বাড়ি
এসে যখন দেবালয়ে পূজা দিতে প্রবেশ করেন, দেখেন- সব বিগ্রহ মুখ ফিরিয়ে
রয়েছে। কেন ? সত্য উদ্ঘাটন হওয়ার পর কালাচাঁন ক্ষেপে যান- কেন দেবতারা তাকে
পান খাওয়া থেকে রক্ষা করেননি ? তাই তলোয়ার নিয়ে দেবতাদের তাড়া করলেন,
দেবতারা পালিয়ে আত্মরক্ষা করে, মাটির নীচে লুকিয়ে পড়ে। কালাচাঁন তখন এ কাজে
এতটা মর্মাহত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নাম হয় ‘কালাপাহাড়’। আর খনন
করা দিঘির নাম হয় ‘কালাপাহাড়ের দিঘি’। এ গ্রামে আমার বাড়ি। ছোটবেলা থেকে এ
কিংবদন্তি নাম শুনে বড় হয়েছি। বিশ^াস অবিশ^াসের বিষয় আলাদা। লক্ষণীয় আমাদের
অঞ্চলে কেউ পুকুর বা জলাধার খনন করলে কখনও কখনও পাথরের মূর্তি পাওয়া যায়।
আমাদের দুটি পুকুর আছে। বাড়ির পশ্চিমে ও পূর্বে। পূর্বের পুকুর খনন করার
সময় একটি মূর্তি পাওয়া যায়, তা বর্তমানে কলকাতা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
কেন দিঘি খননের সাথে কিংবদন্তি বা মিথ দীর্ঘদিন পর্যন্ত প্রচলিত কাহিনি চলে
আসছে তার কোনো ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা বা সত্যতা আছে কীনা তা আমার জানা
নেই। কিন্তু কাহিনিগুলো এখনও চলমান ও আলোচিত।
জগন্নাথের দিঘি। তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা আছে। জগন্নাথ দেবের মন্দির এবং মন্দির কেন্দ্রিক উৎসব আয়োজন বছরের নির্ধারিত সময়ে হয়ে থাকে।
কুমিল্লার
চল্লিশ কিলোমিটার দূরে বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত বিখ্যাত
দিঘির নাম ‘গঙ্গাসাগর’। ত্রিপুরা রাজাদের খনন করা দিঘি। আমরা জানি ‘গঙ্গা’
একটি বিখ্যাত নদী, ভারতের জাতীয় নদী হিসেবে গেজেটভুক্ত, আর সাগর তো বিশাল
জলাশয়। এক্ষেত্রে এ দিঘিটির নামকরণ এরূপ কেন করা হয়েছে, তার কোনো তথ্য
পাওয়া যায় না। তবে স্থানীয় মুরুব্বিরা বলেন- এ দিঘিটি খননের পর গঙ্গা নদী
থেকে জল এনে পূরণ করা হয়েছিল, দিঘিটি বৃহৎ বলে সাগরের সাথে তুলনা করে
‘গঙ্গাসাগর’ নামকরণ করা হয়েছে। মিথ হচ্ছে এখানে পূজা-পার্বন ও মেলা হতো,
দিঘিতে স্নান করলে গঙ্গাস্নানের পূণ্য অর্জন হতো- প্রচলিত ধর্মীয় বিশ^াস।
কুমিল্লা
ও চাঁদপুর সংযোগস্থলে কচুয়া উপজেলায় একটি বিরাট জলাশয় ছিল, এখন জনবসতির
ফলে সংকুচিত হতে চলেছে, তার নাম ‘ঘুগড়ার জলা’। সাংবৎসর জলে টইটুম্বুর থাকত,
মৎস্যাধার এবং মৎস্যশিকারী পাখিদের ছিল আনাগোনা বা অভয়রাণ্য। এখনও
সারস-বক-ডাহুক-মাছরাঙ্গা, পানকৌরি, জলজসাপ ইত্যাদি পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। এ
জলাশয়ের সঙ্গে ডাকাতিয়া ও মেঘনা নদীর সংযোগ ছিল। এখন নেই। এ জলাশয়টি
প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়েছে। কুমিল্লা জেলায় যেমন সমতল ভূমির আধিক্য বেশি,
তেমনি জলাধার সমৃদ্ধ এবং ছোট ছোট পাহাড়-লালমাই ও ময়নামতি। ময়নামতি পাহাড়
ঘিরে সেনানিবাস। কয়েকটি
উপজেলা-দাউদকান্দি-হোমনা-তিতাস-মেঘনা-দেবিদ্বার-মুরাদনগর বর্ষাকালে জলমগ্ন
হয়ে পড়ে। সুতরাং ত্রিপুরা রাজাদের কীর্তির অন্যতম জলাধার বা দিঘিগুলো
অনেকটা জনস্বার্থে উঁচু অঞ্চলে খনন করা হয়েছিল। দিঘির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য
হলেও প্রতিটি বাড়ি সংলগ্ন পুকুর অবশ্যই খনন করে জীবনধারনের পক্ষে ঐতিহ্য
সৃষ্টি করেছে। বলা চলে বাড়ি ও পুকুর এবং কিছুটা জঙ্গল প্রতিটি গ্রামকে
সৌন্দর্যমণ্ডিত করে রেখেছিল। সময়ে অনেককিছু পাল্টায়, তথাকথিত আধুনিক
জীবনযাপনের প্রয়োজনে গ্রামগুলো তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে। বিদ্যুৎ-গ্যাস
এবং পাকা বাড়িঘর নির্মাণের ফলে এখন শহরের আদলে বিবর্তিত হচ্ছে। তারপরও
ইতিহাসের স্বাক্ষর হিসেবে যে সব স্থাপনা আজও সময় এবং স্থানকে পরিচিত করে
চলেছে, তাকে অবশ্যই শিখরের টান বলা যায়। তন্মধ্যে দিঘিগুলোর ভূমিকা কম নয়।
পুকুর মিলে শত শত, দিঘি মিলে কতিপয়।
