
নিজস্ব প্রতিবেদক: কুমিল্লার মাঠজুড়ে এখন সোনালি রঙের এক অন্যরকম আবেশ। বাতাসে দুলছে সূর্যমুখীর হাসি, আর সেই হাসির মধ্যেই লুকিয়ে আছে কৃষকের নতুন স্বপ্ন। জেলার বিভিন্ন এলাকায় সূর্যমুখী গাছে ইতোমধ্যে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজ জমিনে যেন সোনালি কারুকাজ করা হয়েছে। এই মনোরম দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
জেলার কৃষকদের মধ্যে সূর্যমুখী চাষ নিয়ে নতুন করে আশার আলো জেগেছে। কৃষি বিভাগের দেওয়া প্রণোদনা ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার অনেকেই এ ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছর জেলার ১৭টি উপজেলায় মোট ৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছিল। চলতি বছর তা কমে ৬ হেক্টরে নেমে এলেও দাউদকান্দি, চান্দিনা ও কুমিল্লা সদর উপজেলায় কৃষি প্রণোদনার মাধ্যমে নতুন জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সরিষার মতো সহজভাবে সূর্যমুখী বীজ থেকে তেল উৎপাদনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক কৃষক নিরুৎসাহিত হন। আবার সরিষা কাটার পর একই জমিতে দ্রুত ধান চাষ করা সম্ভব হলেও সূর্যমুখী তুলনামূলক দীর্ঘমেয়াদি ফসল হওয়ায় ধান চাষে কিছুটা দেরি হয়। ফলে লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও প্রতি বছর এ চাষ কমে যাচ্ছে।
তবে কৃষকদের দাবি, সূর্যমুখী বীজ থেকে তেল উৎপাদনের সহজ ব্যবস্থা করা গেলে এই ফসল দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। এতে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
কুমিল্লা সদর উপজেলার আড়াইওড়া গোমতীর চরে কৃষি বিভাগের দেওয়া বিনামূল্যের বীজ দিয়ে এক কৃষক প্রায় এক মাস আগে সূর্যমুখী চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তার ক্ষেতটি স্থানীয়দের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সেখানে ভিড় করছেন, ছবি তুলছেন, উপভোগ করছেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য।
ব্লকের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা এ কে এম আরিফুজ্জামান বলেন, প্রতি বিঘায় সূর্যমুখী চাষে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হলেও আয় হতে পারে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তাছাড়া ফুল কাটার পর গাছ শুকিয়ে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়, যা জমির উর্বরতা বাড়ায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন জানান, সূর্যমুখী চাষে সার, কীটনাশক ও সেচের প্রয়োজন কম। ফলে কম খরচে ভালো লাভ করা সম্ভব। পোকামাকড়ের আক্রমণও কম হয়, তাই ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। তবে তেল উৎপাদনের সহজ ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকের আগ্রহ কিছুটা কমে যাচ্ছে।কৃষি বিভাগ ইতোমধ্যে এ খাতের সমস্যাগুলো সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে তুলে ধরেছে এবং কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে বিনামূল্যে বীজ ও বিভিন্ন প্রণোদনা অব্যাহত রেখেছে।
সূর্যমুখীর সোনালি ফুলে এখন কুমিল্লার মাঠগুলো যেন সম্ভাবনার নতুন বার্তা দিচ্ছে। কৃষকের স্বপ্ন, প্রকৃতির সৌন্দর্য আর নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা-সব মিলিয়ে সূর্যমুখী হয়ে উঠছে কুমিল্লার কৃষিতে এক নতুন আশার প্রতীক।
