প্রকাশ: রোববার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১:২৭ এএম আপডেট: ১৪.১২.২০২৫ ২:০৭ এএম |
স্মৃতি কখনও
সুখের, কখনও বা দুঃখের। কিন্তু সবার কাছে সব সময় তা মূল্যবান। আমারও এমন
দিন খুব কমই যায় যেদিন বাবার কথা আমার মনে পড়ে না, যদিও তিনি চলে গেছেন
আমাদের ছেড়ে ২৮ বছর হলো। শৈশব থেকে বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত বাবাকে মনে হত রাগী
মানুষ। এখন আমার মনে হয় বাবা হরিশ চন্দ্র দেবনাথ পৃথিবীতে সবচেয়ে জ্ঞানী
মানুষ। হয়তো সব সন্তানের কাছে বাবার স্থানটি সেটাই। যতদিন জীবন আছে বাবা
আমার কাছে বাবাই। একজন স্নেহপ্রবন, কর্তব্য পরায়ন বাবা হিসেবেই তাকে
ভেবেছি। একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে তার চিন্ত-ভাবনা, আবেগ-অনুভূতি,
সুখ-দুঃখ ইত্যাদি নিয়ে কখনও ভাবিনি। তার ভেতরের অন্তর্গত সত্ত্বা সম্পর্কে
আমরা কি ততটা সচেতন ছিলাম। তাঁর চাপা স্বভাবের কারণে বাইরের আচরণ দেখেই
তাকে বিচার করতাম। ভেতরটা জানার চেষ্টা বোধ হয় সেভাবে করিনি। আসলে মনের
গুহিনে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত অভিমানী মানুষ। কিন্তু তিনি তা চাপা দিয়েই
চলেছেন সারা জীবন।

কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার মকলিশপুর গ্রামে
একটি অভিজাত পরিবারে তার জন্ম। ১৯৭১ইং সালের পূর্বে পরিবারে অভাব অনটন না
থাকলেও পাকহানাদার বাহিনী বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেওয়া ও বিভিন্ন কারণে পরিবারে
দারিদ্র স্পর্শ করতে লাগল। বড় ভাই স্বাধীনতার পূর্বে বি.এ পাশ করেও
পরিবারের প্রতি উদাসীন ছিলেন। কারণ উনি ছিলেন একটু বেশি সাংস্কৃতিক মনা।
গান-বাজনা বেশি পছন্দ করতেন। বাবা চেয়েছিলেন প্রতিটি সন্তানকে সুশিক্ষিত
করে তুলতে।
বাবার এই ইচ্ছা পূর্ণ করেছিলেন নানা স্তরে সংগ্রাম করে কঠোর
পরিশ্রমের দ্বারা। বাবার প্রজ্ঞা, জ্ঞান, মেধা, পরিশ্রমের ধারের কাছে কি
আমরা যেতে পেরেছি? একবারেই নয়। তাঁর গুণাবলির ছিটে ফোটাও পাই নি। বাবার
সারা জীবনের সংগ্রামের কথা ভাবলে সত্যিই বিস্ময় জাগে মনে। এছাড়া আমার ধারনা
তার অন্তদৃষ্টি এতটাই পরিপক্ক ছিল, সমসাময়িক মানুষের সঙ্গে চিন্তশীলতার
আদান-প্রদানের সুযোগ সব সময় তার হতো। তিনি ছিলেন নিভৃতচারী একজন সাধক। যার
ফল তিনি জীবনের শেষ ভাগে দেখিয়েছেন। বাবার মৃত্যুদিনে আমি একা বাড়ীতে
গিয়েছিলাম। বাবা বললেন তুমি একা এসেছ। এখনই আবার গিয়ে বৌমা ও দাদুকে
(অরুণকে) নিয়ে এসো। আমি তাড়াতাড়ি রওনা দিলাম। বাবা বললেন না খেয়ে যাও। আমি
বাসায় এসে দ্রুততার সঙ্গে তাদেরকে নিয়ে আবার বাড়ী ফিরলাম। বাবা অরুণকে
(আমার বড় ছেলে) দেখে বললেন দাদু এসেছ। অরুণ নামটিও আমার বাবার দেয়া নাম।
এটি ছিল আমার ছেলেকে দাদু নামে ডাকার বাবার শেষ দিন। ঐদিনই যে বাবা
জড়জাগতিক মায়া ছেড়ে আমাদের ফেলে চলে যাবেন বুঝতে কষ্ট হয়েছিল। বাবার যে
কতশত গুণ ছিল ভাবলে অবাক হতে হয়। মেয়েরা সাধারণত রাঁধতে শিখে মা কিংবা বড়
বোনের কাছে। আমি জীবনে প্রথম অংক শিখেছি বাবার তত্ত্বাবধানে। বলতে গেলে
হাতে ধরে অংকের প্রতিটি ধাপ শিখিয়েছেন তিনি আমাকে। যার ফলশ্রুতিতে
বিদ্যালয়ে থাকাকালিন প্রতি বছর অংক দৌড় প্রতিযোগীতায় ১ম পুরষ্কার পেতাম।
তাঁর
প্রয়ানের ৫/৭ মিনিট পূর্বে বাবার বিছানার কাছ থেকে বাহিরে গিয়েছিলাম। বাবা
আমাকে খুঁজলেন। বড় ভাই আমাকে ডাকলেন, আমি এসে বাবার পূর্বের দেয়া কথামত
আমার হাতটির উপর বাবার মাথাটি উঠালাম। বাবা মাথাটি আমার হাতের উপর রেখে চলে
গেলেন। কিন্তু তিনি তো আর ফিরে আসবেন না। তাকে ছাড়াই ২৮ বছর চলতে হল।
প্রতি বছরই ঐ দিনটি আসে আর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। ‘গধহ চৎড়ঢ়ড়ংবং, এড়ফ
উরংঢ়ড়ংবং’ এই চরম সত্যটিকে অস্বীকার করি কীভাবে।
লেখক: সাবেক প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত)
চান্দিনা ডাঃ ফিরোজা পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কুমিল্লা।