
বর্তমান
বিশ্বে সফলতার জন্য ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ দক্ষতার বিকল্প নেই। নিজের ভাবনা ও
বক্তব্য স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করতে পারা আজ সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আমাদের শিক্ষায় এটি এখনো অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
এখানে পরীক্ষাকেন্দ্রিক সবকিছু অথচ পরীক্ষায় এসব নেই, আছে শুধু মুখস্থ তথ্য
লেখার পদ্ধতি। তাও বৃহৎ অংশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে সেটি
সাজিয়ে লেখার গুণ একেবারেই অনুপস্থিত। শুধু বিবেচনা আর ভুল এড়িয়ে যাওয়ার
মধ্যদিয়ে তারা পেয়ে যাচ্ছে গ্রেড। ফলে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শেখানোর যে ১২
বছরের রাষ্ট্রীয় প্রজেক্ট সেটি আসলে তেমন কোনো কাজে আসছে না। তার পরও
রাষ্ট্রকে প্রায় ৩ লাখ ইংরেজি শিক্ষককে (প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক)
প্রতিপালন করতে হচ্ছে এবং হবে। শিক্ষার্থীরা পাসও করছে কিন্তু নিজেদের
ব্যবহারের জন্য যে ইংরেজি দরকার তা অর্জন করতে পারছে না প্রাতিষ্ঠানিক
শিক্ষা থেকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কমিউনিকেট করতে পারছে হয় পরিবার থেকে না
হয় আধুনিক সোশ্যাল মিটিয়া থেকে, নয়তো প্রয়োজনের তাগিদে শিখে নিচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা
বাধ্যতামূলক ইংরেজি শেখার পরও কোনো ধরনের কমিউকেট করতে পারছে না, তারা
বাস্তব জীবনে গিয়ে ইংরেজি শেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ফলে ইংরেজি শেখার
জন্য ভর্তি হয় কোচিং সেন্টারে। সেন্টারগুলো যেন এ ভাষা শেখানোর দায়িত্ব
নিয়েছে। তারা আসলে কী করছে? কিছু সিচুয়েশনাল ডায়ালগ শিক্ষার্থীদের মুখস্থ
করাচ্ছে এবং সেগুলো আবার বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরছে। আসলে ভাষা
শেখানোর এটি কোনো পদ্ধতি নয়। কারণ যে সিচুয়েশনগুলো তারা মুখস্থ করাচ্ছে
সেগুলো সব জায়গায়ই যে একইভাবে কার্যকর তা কিন্তু নয়। সিচুয়েশন পরিবর্তন হলে
এ ধরনের শিক্ষার্থীরা কিছু বলতে পারবে না। কারণ সেই ভোকাবিয়্যুলারি নেই,
বাক্য গঠন এবং নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য ন্যাচারাল প্র্যাকটিস
তাদের নেই। সেটি অর্জন করতে হয় ইংরেজি পরিবেশে বিভিন্ন অ্যাকটিভিটির
মাধ্যমে। ভাষার দক্ষতা মনের অজান্তে সাব-কনশাসলি আয়ত্তে চলে আসে। ফলে
যেকোনো পরিস্থিতি শিক্ষার্থীরা মোকাবিলা করতে পারে। শুধু কিছু
ট্রান্সশ্লেসন মুখস্থ করে নয়। আবার অনেকে কিছু ট্রান্সশ্লেসনের বই বের
করেছে, অনেকে ভেবেছে এ ট্রান্সশ্লেসন করলেই বোধ হয় ভালো একজন কমিউনিকেটর
হওয়া যাবে, বিষয়টি তাও নয়। এ ধরনের ট্রান্সশ্লেসন শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে
সারাজীবন করেছে। দু-চার-দশটি ছারা ছারা বাক্য জীবনের প্রকৃত কমিউকেশনে
কাজে লাগে না। কথা বলার সময় বা লেখার সময় সব ধরনের সিচুয়েশন একত্রে ঘটে।
আমাদের নিজ ভাষা থেকেই তা আমরা দেখতে পাই, ইংরেজি আমরা সেভাবে শেখার বা
শেখানোর চেষ্টা করি না।
আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের পাস করা
অর্থাৎ পার করিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম। এটি কখনো শিক্ষার্থীদের ইংরেজি
দক্ষতা অর্জিত হয়েছে কি না, তা দেখার অ্যাসেসমেন্ট নয়। নির্দিষ্ট কিছু
চ্যাপ্টারের প্রশ্ন, নির্দিষ্ট কয়েকটি রিঅ্যারেঞ্জমেন্ট, কয়েকটি প্যাসেজ
থেকে ইনফরমেশন ট্রান্সফার, টেবিল থেকে বাক্য তৈরি করা, নির্দিষ্ট কিছু রাইট
ফর্ম অব ভারব, টেক্সটের নির্দিষ্ট কয়েকটি চ্যাপ্টার থেকে কিছু প্রশ্নোত্তর
তাও সারাজীবন শুধু উত্তর দিতে হয়। শিক্ষার্থীরা কোনো প্রশ্ন তৈরি করতে
পারে না। কারণ, তাদের সে ধরনের প্র্যাকটিস নেই। বহু নির্বাচনি ইত্যাদি কিছু
আইটেমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি দক্ষতা পরীক্ষা করা হয়। আর এ
পদ্ধতিতে লিসেনিং ও স্পিকিং তো নেই-ই। রাইটিংয়ে যেসব আইটেম পরীক্ষায় আসে
সেগুলো বাজারের গাইড বা টেস্ট পেপার খুলে কয়েকটি নামকরা স্কুল বা কলেজের
প্রশ্ন, বিগত দুই তিন বছরের বোর্ডের প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচারা করলেই শুধু পাস
নয়, উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত। এখানে আরেকটি ঘটনা ঘটে, তা হচ্ছে একটি শ্রেণিতে
বা পরীক্ষার হলে দু-চারজন যখন এগুলো পারে, বাকিরা তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন
পদ্ধতিতে নিয়ে তারাও একই ধরনের গ্রেড পেয়ে যায়। আর বোর্ড পরীক্ষায় উদারভাবে
খাতা মূল্যায়ন এবং ভুলত্রুটি এড়িয়ে যাওয়ার কালচার তৈরি হয়েছে বহু আগে
থেকেই। কাজেই প্রকৃত অ্যাসেসমেন্ট হচ্ছে না। এ তো গেল শুধু রাইটিং
প্র্যাকটিসের ক্ষেত্রে, বাকি যে দুটো গুরুত্বপূর্ণ স্কিল তা পরীক্ষায় না
থাকলেও শিক্ষকরা করাতে পারেন কিন্তু কাদের করাবেন, কীভাবে করাবেন?
শিক্ষার্থীরা তো ক্লাসে নিয়মিত আসে না। কারণ পাসের জন্য ক্লাস করার দরকার
নেই, এমনকি ভালো গ্রেড পাওয়ার জন্যও ক্লাস করার দরকার নেই। এখানে আমাদের
কাজ করা দরকার। কিন্তু করবেটা কে?
আর একটি বড় সমস্যা হচ্ছে বাণিজ্যিক
প্রকাশকদের সহজতর থেকে সহজতম ইংরেজি নোট ও গাইড বের করা। সরকারি এবং ইংরেজি
শিক্ষক কমিউনিটির দুর্বলতার সুযোগে এসব প্রকাশক প্রতিটি ওয়ার্ডের বাংলায়
লেখা উচ্চারণ, প্রতিটি ওয়ার্ড ও লাইনের বাংলা অর্থ দিয়ে বাজারে বই ছাড়ছেন।
শিক্ষার্থীরা বুঝতেই পারে না যে তারা ইংরেজি শিখছে না বাংলা শিখছে। বিষয়টি
ইংরেজি শিক্ষকদের প্রথমে বাধা দেওয়া দরকার ছিল কিন্তু প্রকাশকরা বলেন,
বাংলা লেখা না থাকলে ইংরেজি শিক্ষকরা সে বই নিজেরা পড়েন না এবং
শিক্ষার্থীদেরও কিনতে বলেন না। অথচ এভাবে বাংলায় ইংরেজি পড়লে একদিকে যেমন
তাদের প্রাকৃতিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং অ্যাবালিটি এবং ভাষাগত দক্ষতা দুটোই
মারাত্মভাবে দুর্বল হয়ে যায়। আর ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনের বিষয়টি চলে যায়
হিবারনেশনে কিংবা বনবাসে। কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শেখানোর জন্য
প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি করে ল্যাংগুয়েজ ল্যাব প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে
পরামর্শ দিচ্ছেন। মনে হয়, শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো বিষয় আর নেই
যে, সব ইনভেস্টমেন্ট ইংরেজি শেখার জন্যই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারকে তো
সবকিছু বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা দিয়ে ল্যাব বানাতে হবে। তৃতীয়ত, এ ধরনের
বুদ্ধি কি সরকারে যারা আছেন তাদের নেই? সর্বশেষ হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব আছে কিন্তু সেগুলো অকেজো অবস্থায় পড়ে
আছে, ধুলোয় ভরে আছে। কোটি কোটি ডলার লোন করে ইংরেজি ল্যাব বানালে ওই একই
অবস্থা হবে।
আমাদের প্রাথমিক থেকে ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত দৈনন্দিন
বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় স্পিকিং, ফ্রিহ্যান্ড রাইটিং, এক্সটেম্পর স্পিচ ও
ক্লাস প্রেজেন্টেশনের ব্যবস্থা যদি করা যায় তাহলে ধীরে ধীরে অবস্থার কিছুটা
হলেও পরিবর্তন আশা করা যায়। প্রচলিত পদ্ধতিতে যা চলছে তার কোনোটিই যে
কার্যকর নয়, তার প্রমাণ আমরা পদে পদে পাচ্ছি। এগুলো করার জন্য ইংরেজি
শিক্ষকদের নিজেদের দক্ষ করে তুলতে হবে, সেটি বিদেশি বা কোনো সংস্থা
প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের এক্সপার্ট বানিয়ে ফেলবে তার পর আমরা ইংরেজি সেভাবে
পড়াব, এ ধারণা থেকে বের হতে হবে। সরকারকে ধীরে ধীরে ইংরেজির অ্যাসেসমেন্ট
পরিবর্তন করতে হবে। হঠাৎ করতে গেলে আন্দোলন হবে, যা সামাল দেওয়ার অবস্থা
থাকবে না। আমরা যদি আন্তরিকভাবে চাই যে, আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো ইংরেজি
জেনে নিজেদের, সমাজের ও দেশের উন্নয়নে তথা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান
রাখবে, তাহলে তারা যাতে ইংরেজি শিখে আসলেই কাজে লাগাতে পারে, সে ব্যবস্থা
করতে সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট: ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)
