
সম্প্রতি ক্ষুদ্রঋণে কমেছে বিদেশি সহায়তা, বাড়ছে দেশীয় অর্থায়ন। অর্থাৎ ক্ষুদ্রঋণে বিদেশি সহায়তা ১ শতাংশেরও কম। গ্রাহকদের সঞ্চয় ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত, ব্যাংকঋণ ও পিকেএসএফ থেকে প্রাপ্ত তহবিল এখন ক্ষুদ্রঋণের মূল উৎস। ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা এই বড় জনগোষ্ঠীকে স্বস্তি এনে দিয়েছে বেসরকারি খাতের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো। দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলো নারীর ক্ষমতায়নসহ সামাজিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এনজিওগুলো মূলত দেশি-বিদেশি উৎস থেকে পাওয়া তহবিল কাজে লাগিয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে নানা কর্মসূচি ও প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করে থাকে। স্বাধীনতার পর কয়েক দশকে দেশের উন্নয়ন অর্থনীতিতে সংস্থাগুলো বেশ প্রভাব রেখেছে। গত এক দশকে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় এখন আর তহবিলের জোগান দিতে চাইছেন না বিদেশি দাতারা। এ ছাড়া করোনাকালীন বিপত্তি, যুদ্ধসহ নানা কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির চলমান দুঃসময়ও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। বৈদেশিক সহায়তা কেবল আমাদের দেশে কমছে তা নয়; সারা বিশ্বেই এর প্রভাব পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে স্থানীয় উদ্যোগগুলোর সম্প্রসারণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অফুরন্ত সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে আর্থিক খাতে তাদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
সরকারের এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত এনজিওর সংখ্যা ২ হাজার ৫৫৪টি। এর মধ্যে দেশি এনজিও আছে ২ হাজার ২৮৯টি এবং বিদেশি এনজিও ২৬৫টি। এর মধ্যে কিছু কিছু এনজিও আগের মতো কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও বেশ কিছু এনজিওর ক্ষেত্রে তহবিল সংগ্রহ করতে অনেকটা বেগ পেতে হচ্ছে। এ কারণে অনেক সময় দেখা গেছে এনজিওর সংখ্যা কমেছে। অনেকে সনদের শর্তগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারার কারণেও এগুলো ধরে রাখতে পারেননি। আবার অনেকে ক্ষুদ্রঋণ না করে সমবায় সমিতির দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন। এর মধ্যে নানা কারণে যারা পারছেন না, তাদের সনদ বাতিল হয়েছে।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ঋণ নিলে সবাই সফল হবেন, এমন নয়। উদ্যোক্তা মানেই ঝুঁকি নেওয়া। ক্ষুদ্রঋণ নেওয়া প্রান্তিক উদ্যোক্তা ব্যর্থ হলেও সে অর্থ দেশে থাকে; অন্য দেশে চলে যায় না। তাই এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সচেতন হতে হবে।
ক্ষুদ্রঋণ আদায়ে অনেক সময় কঠোরতার অভিযোগ সামনে আসে। এনজিওগুলো অনেক সময় গ্রাহকদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করে। এমনকি ঋণগ্রহীতার বাড়ি থেকে ঋণের টাকা না পেলে জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ শোনা যায়। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোতে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতারা প্রায়ই উপেক্ষিত হন বলে অভিযোগ আসে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এ খাতকে আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে দেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের স্বনির্ভরতা অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পোর্টফোলিও খরচ। বর্তমান ডিজিটাল ব্যবস্থার জন্য পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ শুধু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এ খাতকে গতিশীল করতে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর না করে দেশি অর্থায়ন যাতে বাড়ে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আশা করছি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।
