রোববার ৩০ নভেম্বর ২০২৫
১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২
মেজরিটি মানে টোটালিটি নয়
মযহারুল ইসলাম বাবলা
প্রকাশ: রোববার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫, ১:১৪ এএম আপডেট: ৩০.১১.২০২৫ ২:১৬ এএম |

 মেজরিটি মানে টোটালিটি নয়
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনি ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রের পরিধি অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক। গণতন্ত্র অনিবার্য রূপে সংস্কৃতি। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মূল শক্তিটা থাকে চর্চার ভেতরেই। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চার অভাবে গণতন্ত্র আগাগোড়া ঝুঁকির কবলে ছিল এবং আছে, সেটা নিশ্চয় অস্বীকার করা যাবে না। গণতন্ত্র আমাদের সামগ্রিক জীবনাচারে যেমন, তেমনি সামাজিক মূল্যবোধে, সামাজিক-পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যদিয়ে বিকশিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। সমাজের ওপর যে রাষ্ট্র রয়েছে, সেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্বেই সমাজ চালিত হয়। তাই রাষ্ট্রের ভূমিকাটা তাৎপর্যপূর্ণ বটে। এ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনাকারী রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে যদি গণতান্ত্রিক চর্চা সক্রিয় থাকে তবে গণতন্ত্র বিকাশে সহায়ক হয়। কেননা, রাজনৈতিক দলই জনগণের রায়ে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকে। গণতন্ত্র ব্যক্তির মর্যাদা ও অধিকারকে স্বীকার করার পাশাপাশি সমষ্টিগত মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সমাজে ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির দ্বন্দ্ব তৈরি হয় ব্যক্তির উন্নতি এবং সমষ্টির অবনতির অসম ব্যবস্থার ফলে। গণতন্ত্র ব্যক্তির উন্নতির বিপরীতে সমষ্টিগত উন্নতি ঘটাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। গণতন্ত্র তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিপদাপন্ন হলে রাষ্ট্র ও সমাজে অগণতান্ত্রিকতার প্রকাশ ঘটে এবং চূড়ান্তে ফ্যাসিবাদে পরিণত হয়।
বিশ্বের অসংখ্য দেশেই জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকে। প্রতিটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদকাল চার কিংবা পাঁচ বছর। মেয়াদ অতিক্রমের পর আবার নির্বাচনে জনরায়ে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ গ্রহণ করে। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের ফলে জনগণের প্রদানকৃত ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া দল সরকার গঠনের সুযোগপ্রাপ্ত হয়। প্রদানকৃত ভোট নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে বিভক্ত হওয়ার ফলে যে দলকে বিজয়ী ঘোষিত করা হয়। দেখা যায় মোট প্রদানকৃত ভোটের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে থাকা দলই বিজয়ী হিসেবে সরকার গঠন করে। বাকি ভোট বিভক্ত হওয়ার ফলে একচেটিয়াভাবে ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। প্রদানকৃত ভোট অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে বণ্টনের ফলে ৫, ১২ ও ১৫ শতাংশ, ভাগ হয়ে যে দল সর্বোচ্চ শতাংশ ভোট বা আসন লাভ করে তাদেরই বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়; বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের এটাই মাপকাঠি। তবে যে পরিমাণ ভোট পেয়ে সরকার গঠিত হয়। ওই ভোট বিভক্তিতে ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চয়। বিজয়ী দলের ভোট প্রাপ্তি মোট ভোটের এক তৃতীয়াংশের অধিক নয়। নির্বাচিত দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সম্পূর্ণ নয়। এ সত্যটা চাপা পড়ে যায় বিজয়ী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোয়ারে।
আমাদের দেশে নির্বাচনি ব্যবস্থাকেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে ধরা হয়। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থায় এটি অবশ্যই কার্যকর ব্যবস্থা। এবং সাংবিধানিকও বটে। নির্বাচিত সরকার মাত্রই গণতান্ত্রিক সরকার, আমাদের অভিজ্ঞতা কিন্তু সেটা বলে না। আমাদের অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে মোটেও গণতান্ত্রিকতার বার্তা দেয় না। দেশে একটি নির্বাচিত সরকারের সামন্তরাল একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের আবশ্যিকতা গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার অন্তর্গত। সরকারের ভুলভ্রান্তির সমালোচনা করা এবং সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত হতে বাধ্য করা বিরোধী দলের কর্তব্যের আওতার মধ্যে পড়ে। কেবল বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়, গঠনমূলক বিরোধিতাই কাঙ্ক্ষিত। বিরোধী দলকে সুযোগ দেওয়া সরকারি দলের কর্তব্য। কেননা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও ভূমিকা রাখতে হয় সংসদে এবং রাজপথে। বিরোধী দলবিহীন গণতন্ত্রের বিকাশ অসম্ভব। তাই কার্যকর বিরোধী দলের সরব উপস্থিতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
বিগত সরকারের শাসনামলে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ৪১.৮ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিল। অবশিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ভোট দেয়নি। আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা সর্বাধিক আসনে বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দল দ্বিতীয় অবস্থানেও ছিল না। দ্বিতীয় অবস্থানে ৬২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিল। এই ৬২ জনের মধ্যে মাত্র চারজন ছিল মাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী। অপর ৫৮ জনই আওয়ামী লীগ দলীয় বিভিন্ন পদে নিযুক্ত থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। গত সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি মাত্র ১১টি আসনে জয়ী হয়েছে। কাজেই জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে কোন দল ভূমিকা পালন করবে? এ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিলই। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেলেও তাদের পক্ষে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করা সম্ভব ছিল না। তাই গণতন্ত্রের অভিযাত্রা বিপদসংকুল হয়ে পড়েছিল। সরকারি দলের একক নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য শুভফল বয়ে আনতে পারে না। বিগত সরকার নিশ্চয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। কেননা, তারা মোট ভোটারের এক তৃতীয়াংশের রায় পেয়েছে। দেশের সমষ্টিগত ভোটারের নয়। এ সত্যটি সরকার বিবেচনায় না নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপটে রাষ্ট্র পরিচালনার পথে অগ্রসর হয়েছে, তবে সেটা গণতন্ত্রের জন্য যেমন, তেমনি সরকারের জন্য শুভকর ছিল না।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থায় একক নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নাৎসি ও ফ্যাসিবাদের উদ্ভব ঘটেছিল। সেটা কেবল তাদের দেশের সীমায় সীমাবদ্ধ ছিল না, সারা বিশ্বকে বিপন্ন করে তুলেছিল। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের কবলে পড়েছিল বিশ্ব। কোটি কোটি মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল সারা বিশ্ব। আশার কথা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পরাজয় এবং হিটলার ও মুসোলিনির করুণ পরিণতির মধ্যদিয়ে বিশ্ব নাৎসি ও ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্তি লাভ করেছিল, কমরেড স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েট রাশিয়ার বদৌলতে। কাজেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপদসংকুল হলে সামষ্টিক মানুষকে চরম মূল্য দিতে হয়। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর সংরক্ষণের কোনো সুযোগ থাকে না।
আমাদের সনাতনী ধারণা- নির্বাচিত সরকার মানেই গণতান্ত্রিক সরকার। এ ধারণা যে সঠিক নয়, সেটা আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে জেনে এসেছি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অতি আবশ্যক। কিন্তু প্রশ্ন থাকে জবাবদিহি কার কাছে; আর স্বচ্ছতাই-বা কতটুকু। নির্বাচনে বিজয়ীর প্রধানতম অনুষঙ্গ হচ্ছে ভোট। আমাদের মতো দেশের ক্ষেত্রে দেখা যায় ভোটের অবাধ কেনাবেচা। পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য। রাষ্ট্রের অনিরপেক্ষ ভূমিকা ইত্যাদি। পৃথিবীতে দেখা যায়, বহুদলের স্থলে প্রধান হয়ে পড়েছে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা। দ্বিদলীয় ব্যবস্থায় এ-দল ওই-দল পালাক্রমে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগপ্রাপ্ত হয়। এতে ভোটারদের সামনে দুই দলের বাইরে বিকল্প পছন্দের কোনো দল থাকে না। দুই দলের শাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও তাদের বেছে নিতে হয় দুই দলের একটিকে। অর্থাৎ জনগণই নির্ধারণ করে তারা কোন দল দ্বারা শাসিত হবে। এর বাইরে তাদের সামনে কোনো বিকল্পের অবকাশ থাকে না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্ব শর্ত হচ্ছে সব মানুষের সমঅধিকার ও সমমর্যাদা ও সমান সুযোগ প্রাপ্তি। এ ছাড়া ক্ষমতাকে এককেন্দ্রে আটকে না ফেলে ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া। এ ছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা প্রদান করা। এতে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সব মানুষের স্বাধীনতা, সার্বিক নিরাপত্তার বিকাশকে নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। সমাজতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের মধ্যে নামের ভিন্নতা ছাড়া কোনো বিরোধ-বিভাজন নেই, নেই পার্থক্যও। মূল কথা সব মানুষের মৌলিক অধিকারকে নিশ্চিত করা।
বর্তমান অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান কর্তব্য ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কিন্তু সরকার সাংবিধানিক এখতিয়ারবহির্ভূত নানা বিষয়ে জড়িয়ে কালক্ষেপণ করে তাদের শাসনামল দীর্ঘায়িত করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। নির্বাচন অনুষ্ঠানে দায়িত্ব একান্তই স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের। সরকার কেবল নির্বাচন আয়োজনে কমিশনকে সাহায্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় নির্বাচন কমিশনের সরকারি অনুগত্যের যে সংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে, সেটা গণতন্ত্রের জন্য মোটেও শুভ নয়।
গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় মেজরিটি মানে টোটালিটি নয়, এই সত্যটিকে আমলে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারকে অবশ্যই মান্য করে সমষ্টিগতদের আস্থা অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়াই হবে প্রধান কর্তব্য। এতে সরকারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হয়ে দেশে অবাধ গণতান্ত্রিকতার সূচনা করবে বলেই ভরসা করছি। আমাদের গণতন্ত্রের অভিযাত্রার প্রত্যাশা পূরণে আস্থাশীল হতে চাই।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
তিন দিন ধরে একই অবস্থায় খালেদা জিয়া
দিনব্যাপী মনিরুল হক চৌধুরীর গণসংযোগ : খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় হাজী ইয়াছিনের উদ্যোগে কুমিল্লায় কোরআন খতম ও দোয়া
কুমিল্লায় চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সি পি আর প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদান অনুষ্ঠান
গাঁজাসহ দুই কিশোরকে পুলিশে দিল জনতা
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কোনো ষড়যন্ত্রই আমাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না : হাজী ইয়াছিন
আজ কুমিল্লা জিলা স্কুল এলামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম নির্বাচন
কুমিল্লার তিতাসে ওয়ার্ড বিএনপি নেতা অস্ত্রসহ গ্রেফতার
কুমিল্লায় ৯ দিনব্যাপী বইমেলার উদ্বোধন
ক্রিকেট নিয়ে আমার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও গন্তব্য এক : আসিফ আকবর
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২