
বাংলাদেশে
অনেক বড় বড় ভূমিকল্প হয়েছে। গত ১০০ বছরে ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গল আটকাইভের পরে
বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়নি। বাংলাদেশের ভূখণ্ডের
ভেতরে শ্রীমঙ্গল, এটা কিন্তু ইন্ডিয়ান বর্ডারের কাছে হিলি রিজন, ওইদিকে
প্লেট বাউন্ডারি। ওই ভূমিকল্পটা ছিল ৭ দশমিক ২ থেকে ৭ দশমিক ৬। আর
বাংলাদেশের ভেতরে ৬ দশমিক ৯-এর আটকাইভ আছে। আমরা যদি শ্রীমঙ্গল আটকাইভ বাদ
দিই তাহলে ৭ দশমিক ৬-এর চেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়নি বাংলাদেশে। এটা মানিকগঞ্জে
হয়েছিল ১৮৮৫ সালে। এই আটকাইভের মাত্রা অনেক বেশি। ইন্ডিয়ান প্লেটের ভেতরে এ
রকম ফল্ট হয়। এটা লিনিয়ান ফিচার। এ ফিচারটা ৮০-৯০ কিলোমিটার লম্বায় হয়ে
থাকে। এটা সাধারণত ভাঙা থাকে। ভাঙা থাকলে ডিসপ্লেস হয়। ৭ মাত্রার ওপরে
ভূকম্পন হওয়ার মতো অবস্থা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নেই। ৭ মাত্রার বেশি হলে
ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
গত ২ হাজার বছরের ইতিহাস আমরা
পর্যালোচনা করেছি। তার পর ডাউকি নামে একটা ফল্ট আছে আমাদের নর্দান
বাউন্ডারিতে। ডাউকি ফল্ট হলো বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি
প্রধান ভূ-চ্যুতি বা ফল্ট লাইন, যা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং মালভূমির
দক্ষিণ সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত। এটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকির একটি
প্রধান উৎস এবং উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশ, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের জন্য একটি
বড় উদ্বেগের কারণ। এটি ওই অঞ্চলে বড় ও বিধ্বংসী ভূমিকম্প ঘটাতে পারে।
শিলংয়ে আমাদের বাউন্ডারি। এখানে একটা আটকাইভ ছিল ১৮৯৭ সালে। ১৮৯৭ সালে
আটকাইভটাতে বলা হয়েছে ৮ দশমিক ৭-এ আছে। আমরা ক্যালকুলেট করে দেখেছি ৮ দশমিক
১-এ আছে। ৮ দশমিক ১ ম্যাচিউড হলো ঢাকা থেকে ১২০-১৫০ কিলোমিটার দূরে। এর
ফলে ঢাকা শহরে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। অন্য কোনো ভূমিকম্পে তেমন কোনো
ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
আমরা যদি ঐতিহাসিকভাবে দেখি, ৪০০-৫০০ বছরের মধ্যে ঢাকা
শহরে মেজর আটকাইভে তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। মেজর ক্ষতি হয়েছিল ১৮৯৭ সালে, তা
ছাড়া হয়নি। এ রকম ফেটে গেছে, হেলে গেছে- দু-একটা হতেই পারে। আমাদের ছোট ছোট
সোর্স থেকে আটকাইভ হয়। একটা মেজর হয়ে গেলেই পরেরটা হতে অনেক সময় লাগে।
বলতে গেলে কয়েক শ বছর লেগে যায়। এই যে কয়েকদিন আগের আটকাইভ আমরা দেখেছি
নরসিংদীতে। আবহাওয়া অফিস বলছে নরসিংদীর মাধবদী। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউএসবিএ
বলেছে কালীগঞ্জ। ইউএসবিএ বর্তমানে সঠিক তথ্য দেয়। এরা অনেক অভিজ্ঞ। সত্য
তথ্য দিয়ে থাকে। আমাদের এখানে অনেক সময় ভুল তথ্য পরিবেশন করা হয়। আবহাওয়া
অফিসের ওয়েবসাইডেও তাদের তথ্য দেওয়া নেই, আছে ইউএসবিএর তথ্য। আবার যেটা
নরসিংদীতে বিকেলে হলো তা ইউএসবিএর কপি করে দেওয়া। আবহাওয়া অফিসের ওয়েবসাইডে
নিজস্ব লোকেশন দেওয়া নেই। এজন্য আমি আমার আবহাওয়া অধিদপ্তরের লোকেশনকে
ভরসা করি না। সবাই এর রেফারেন্স দিচ্ছে। কিন্তু এর ওপর ভরসা করতে পারছি না।
এখনো দুটা লোকেশন ইউএসবিএ দিতে পারেনি। দেওয়াও সম্ভব নয়। কারণ দূর থেকে
রেকর্ড করতে হয়। ইউএসবিএ নরসিংদী দিয়েছে ৪ দশমিক ৩, আগেরটা দিয়েছে ৫ দশমিক
৫। এটাই হবে আসলে। যা ফলো করে শীতলক্ষ্যা নদী বরাবর। শীতলক্ষ্যা নদী বরাবর
আমাদের একটা সোর্স আছে। এগুলো ছোট ছোট সোর্স।
আমরা বলি বেজমেন্ট
আর্থ্রাইটিস হয়ে গেলেও ছোট ছোট আফটার শক হতে পারে। এরপর বড় হওয়ার সম্ভাবনা
কম। আরেকটা হবে আমাদের প্লেট বাউন্ডারি। এখানে প্রচুর আর্থ্রাইটিস আছে।
আপনারা দেখবেন বার্মাতেও অধিক আর্থ্রাইটিস আছে। সেখানে ফিকুয়েন্স ও
ইনটেনসিভ প্রচুর আর্থ্রাইটিস। ওখানে প্লেট বাউন্ডারি। ওখানে আমাদের সোর্স
আমাদের থেকে অনেক দূরে। ফলে ইনটেনসিভ অনেক কম হবে। সার্বিক দিক থেকে ইতিহাস
যদি দেখি ৭-এর বেশি আর্থ্রাইটিস ঢাকা শহরের আশপাশে বা বাংলাদেশের ভেতরে
নর্দান ও ইন্টার্ন পার্টে হতে পারে। এটা যে কবে হবে তা সঠিক করে বলা যায়
না। সেটা এখনো হতে পারে, আবার ৫০ থেকে ৬০ বছর পরও হতে পারে। এখানে একটা
আর্থ্রাইটিস হয়ে গেলে পরবর্তীতে কয়েক শ বছর লেগে যায়। এজন্য এতে আতঙ্কের
কিছু নেই। এখন মানুষকে শান্ত থাকতে হবে। এটা হয়ে গেছে।
আশা করি, আর বড়
ধরনের আর্থ্রাইটিস হবে না। মানুষ শান্ত থাকবে। মানুষ যদি আর্থ্রাইটিসে
আতঙ্কিত হয় তাহলে কোনো লাভ নেই। আতঙ্কিত হয়ে আহত হয়েছে। আর্থ্রাইটিসে যা
করণীয় তা করতে হবে। এখানে আমাদের কোনো হাত নেই। আমি যদি বলি, এই যে দু-এক
দিনের মধ্যে ৭ দশমিক ৭ গতিতে ভূমিকম্প হবে। মানুষ তাহলে কী করবে। ৭ দশমিক ৭
গতিতে ভূমিকম্প হলে সব বিল্ডিং পড়বে না। কিছু কিছু বিল্ডিং পড়বে। এটা তো
আমি বলতে পারি না যে, এটা হবে বা হবে না। এটা যদি নিশ্চিত করে বলতে পারতাম
তাহলে অনেকে গ্রামে চলে যেত। তখন ঢাকা শহর খালি হয়ে যেত। ১৮৮৫ সালের পরে বড়
ধরনের আর্থ্রাইটিস হয়নি। গত আর্থ্রাইটিস হয়েছে ৫ দশমিক ৭। এখানে এত বড়
আর্থ্রাইটিস হয়নি। এরপর এত বড় আর্থ্রাইটিস হবে বলে মনে হয় না। এই সোর্সে
হওয়ার সম্ভাবনা কম। এজন্য আতঙ্ক না হয়ে সাধারণ জীবনযাপন করতে হবে। এটাই
আমার কথা। কারণ, আর্থ্রাইটিসে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রস্তুতি একটা
দীর্ঘমেয়াদি। সেই ২০০৯ সাল থেকে আমরা বলে আসছি আর্থ্রাইটিস সম্বন্ধে
প্রস্তুতি নেওয়ার। এতদিন যদি আমরা প্রস্তুতি নিতাম, তাহলে এই আতঙ্কটা
আমাদের থাকত না। আমরা সরকারের ওপর দোষ দিই। আসলে সরকারের ওপর দোষ দিলে হবে
না। যারা ডেভেলপার আছি, যারা বাড়ির মালিক আছি, সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে, আমরা
যারা আছি- আমাদের সবারই দোষ আছে। আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে বিল্ডিং কোড করতে
পারতাম। বিল্ডিং কোড মেনে কাজ করতে পারতাম তাহলে তো হতোই।
আমাদের দেশে
৩০ শতাংশ বিল্ডিং আর্থ্রাইটিস প্রোটেকশনে আছে, আর বাকি বিল্ডিং আর্থ্রাইটিস
প্রোটেকশনের বাইরে আছে। আমাদের আর্থ্রাইটিস বিল্ডিং তৈরি তেমন কঠিন কিছু
না। এটা হলো আমাদের প্রস্তুতি। আমাদের ইমারজেন্সি সোর্স যারা আছেন তাদের
কাজ করতে হবে। আমাদের উদ্ধার করতে হবে। কীভাবে করব, এগুলোর কো-অর্ডিনেশন
থাকতে হবে। আসল কথা মানুষকে সচেতন করতে হবে। এটা আমি অনেক বছর বলে আসছি যে,
স্কুল ও কলেজে অন্তত আর্থ্রাইটিস সম্পর্কে জানানো উচিত। আমরা যদি ২০ বছর
ধরে এসব বিষয় পড়িয়ে যাই, তাহলে এ জেনারেশনটা আস্তে আস্তে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে
গেলে তারা বাকি জীবন এ সম্বন্ধে সচেতন থাকবে। আমাদের সচেতনতার অভাবে একটা
ছোট আর্থ্রাইটিসও অনেক বড় আতঙ্কের সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষতির সৃষ্টি করে।
যেটা আর্থ্রাইটিসপ্রবণ অঞ্চল, সেখানে প্রায়ই ছোট ছোট আর্থ্রাইটিস হয়। তারা
জানে, তাদের বিল্ডিংটা পড়বে না। আমরা তো কোনোদিন এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন
হইনি। আমিও আতঙ্কিত হয়ে গেছি। বাস্তব অভিজ্ঞতা আর পড়ে পড়ে জানা- এর মধ্যে
অনেক পার্থক্য আছে। ৫ দশমিক ৭ আর্থ্রাইটিসে কোনো বিল্ডিং পড়ে না। এটা আমরা
জানি। আরও যদি কিছুটা বেশি হতো, তাতেও তেমন কোনো বিল্ডিং পড়ে যেত না। যদি
ভালো বিল্ডিং হয়। তবুও বলি, আমার বিল্ডিং নতুন। তার পরও যখন ভূমিকম্প শুরু
হলো তখন আমার মধ্যেও ভয় শুরু হলো। বিল্ডিং কি পড়ে যাবে। সর্বশেষ বলি,
বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ না। মাঝারি ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা আছে।
এজন্য আমাদের সচেতন থাকতে হবে। আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।
শেষ কথা,
ভূমিকম্প কোনো উৎস ছাড়া হয় না। ভূমিকম্পের উৎস হলো ফল্ট। শীতলক্ষ্যা নদী
বরাবর একটি লাইনে বারবার নড়াচড়া হচ্ছে। আমার ধারণা, শীতলক্ষ্যা বরাবর এখানে
একটি ফল্ট রয়েছে। তবে আমরা এখনো প্রমাণ করতে পারিনি। এর দৈর্ঘ্য কত, তাও
জানি না। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আমরা বিভিন্ন সময় কথা বলি। বিল্ডিং কোড
আছে। কিন্তু আমরা কোনো প্রয়োগ দেখি না। কোনো সরকার এটাকে প্রয়োগ করার
উদ্যোগ নেয় না। সামনে যে ভবনগুলো হচ্ছে, সেখানেও যদি আমরা কিছু করতে না
পারি! আমি গত ২৫ বছর ধরে কাজ করছি। ২৫ বছর ধরে বলে আসছি। গত ১০-১৫ বছর ধরেও
যদি বিল্ডিংগুলো ঠিকভাবে করা হতো। ভূমিকম্পের ঝুঁকি থাকা এলাকায় ওভারহ্যাং
দেওয়ার নিয়ম নেই। আমরা দিয়ে যাচ্ছি। আমরা নিজেরাই নিয়ম মানি না। আমাদের
লোকবল নেই, টাকা নেই। না হলে আমরা ক্যাম্পেইন করতে পারতাম। আমাদের ৭
মাত্রার ওপরের একটি ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
