রোববার ৩০ নভেম্বর ২০২৫
১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২
রবিবাসরীয়...
প্রকাশ: রোববার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫, ১:১৪ এএম আপডেট: ৩০.১১.২০২৫ ২:১৬ এএম |

রবিবাসরীয়...




সফট ফ্যাসিজম, লজ্জাহীনতা এবং
ইতিহাসের অনিশ্চিত উন্মুক্ততা:
স্লাভো জিজেকের বিশ্লেষণ

রবিবাসরীয়...
কায়সার হেলাল ।।
সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক এবং সাংস্কৃতিক সমালোচক স্লাভো জিজেক প্রায় বছরখানেক পূর্বে অক্সফোর্ড ইউনিয়নে একটি বক্তব্য রেখেছিলেন (ফুটনোটের লিংক দ্রষ্টব্য)। তাঁর এই বক্তৃতায় তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন একটি উদ্বেগজনক কিন্তু অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ। বক্তৃতাটি তিনি কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ‘সুপারপজিশন’ দিয়ে শুরু করেছেন। এই ধারণাকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে তিনি দেখিয়েছেন যে বর্তমান পৃথিবী একটি অনিশ্চিত ও মধ্যবর্তী অবস্থায় ঝুলে আছে যেখানে একইসঙ্গে একাধিক ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উপস্থিত। এবং এখনো কোনো ‘কোলাপ্স’ বা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাই নি আমরা। কোয়ান্টাম সুপারপজিশন নিয়ে হালকা ধারণা না থাকলে জিজেক কী বলতে চেয়েছেন বুঝতে কিঞ্চিৎ অসুবিধা হবে। সহজ কথায় যদি বলি, বিষয়টা হলো, কোয়ান্টাম কণার অনিশ্চয়তা এমন যে পর্যবেক্ষণের আগ পর্যন্ত এসব কণাকে কোনো চূড়ান্ত অবস্থায় সংজ্ঞায়িত করা যায় না। পর্যবেক্ষক এসব কণাকে যে নিয়তে যে অবস্থায় দেখতে পান সেটাই ফাইনাল। জিজেক সাহেব এই তত্ত্ব প্রয়োগ করেছেন ভূরাজনৈতিক পরিণতির ব্যাপারে। তবে তিনি একটি সম্ভাবনার কথা বলেছেন যাকে হয়তো ‘সফট ফ্যাসিজম’ বা নরম ফ্যাসিবাদ বলা যায়। আমরা বোধহয় সেদিকেই এগুচ্ছি। সফট ফ্যাসিজম এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি একসঙ্গে কাজ করে জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্যের মোলায়েম ছদ্মবেশে।
জিজেক মজা করে নিজেকে ‘মডারেটলি কনজারভেটিভ কমিউনিস্ট’ বা মধ্যমপন্থী রক্ষণশীল কমিউনিস্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এখানে। এই আপাত-বিরোধী শব্দবন্ধ আসলে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সূক্ষ্মতার প্রকাশ। তিনি উদারনৈতিক বা মার্কসবাদী উভয় ধরনের ইতিহাসের ‘টেলিওলজিকাল’ বা লক্ষ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা থেকে দূরে সরে আসতে চান। ফুকুয়ামার ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ তত্ত্ব বা গোঁড়া মার্কসবাদের ‘অবধারিত কমিউনিজম’- উভয়ই ধরে নেয় যে ইতিহাসের একটি পূর্বনির্ধারিত কেবলা রয়েছে। জিজেক এই ধারণা সচেতনভাবেই প্রত্যাখ্যান করেন। এবং রোজা লুক্সেমবার্গের বিখ্যাত উক্তি ‘সমাজতন্ত্র না বর্বরতা’ নিয়ে তিনি যে মন্তব্য করেছেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, স্তালিনবাদে আমরা একইসঙ্গে দুটোই পেয়েছিলাম, কিন্তু প্রকৃত সমাজতন্ত্র পাই নি। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস স্থির বা পূর্বনির্ধারিত নয়; এটি খোলা, সম্ভাবনাময় এবং প্রতিযোগী শক্তিগুলোর সংঘাতের ফলাফল।
তাঁর বক্তৃতার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ বোধহয় ‘সফট ফ্যাসিজম’ বা ‘রক্ষণশীল বিপ্লব’র বিশ্লেষণ। তিনি বলছেন যে, আমাদের যুগের সবচেয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে অর্থনৈতিকভাবে পুঁজিবাদী গতিশীলতা এবং দ্রুত উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে; পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে একটি শক্তিশালী কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণও বজায় থাকবে, যার বৈধতা প্রদান করবে আদর্শগতভাবে ‘উদ্ভাবিত’ ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্য। জিজেক এর উদাহরণ হিসেবে চীন এবং ভারতের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবী, শি জিনপিং মার্কসবাদের বদলে কনফুসিয়াস ঐতিহ্যকে প্রচার করছেন যুব সমাজকে আদর্শগতভাবে শিক্ষিত করতে; অন্যদিকে মোদী হিন্দুত্ববাদের আড়ালে অত্যন্ত নৃশংস পুঁজিবাদ চালাচ্ছেন। এই মডেল ক্লাসিক নাৎসি ফ্যাসিজমের মতো হয়তো নয়, বরং এটি আরও সূক্ষ্ম এবং বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য। এই পর্যায়ে বিশ্লেষণটি বাংলাদেশের মতো দেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে কিনা? হবার কথা। বর্তমান সরকারের নরম কর্তৃত্ববাদ এবং ধর্মীয়-জাতিগত পরিচয়ের রাজনীতি আগামী নির্বাচনের পরেও অব্যাহত থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস।
এই আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো জড়মঁব ঝঃধঃব বা বিপথগামী রাষ্ট্র। জিজেক সাহেব এর একটি নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন। সাধারণত পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ভাষায় এই শব্দটি ব্যবহৃত হয় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য। কিন্তু জিজেকের সংজ্ঞা অনুযায়ী জড়মঁব ঝঃধঃব হলো সেই রাষ্ট্র যা নিজের আইনি কাঠামোর মধ্যে নিজেকে পুনরুৎপাদন করতে না পারবার দরূণ নৃশংসতা, অবৈধ পন্থা, ও সহিংসতার উপর নির্ভরশীল থাকে। তিনি বেশ কিছু উদাহরণ দিয়েছেন যা প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। যেমন, রাশিয়ার ভাগনার গ্রুপের মতো আধা-আইনি সামরিক বাহিনী যা রাষ্ট্র দ্বারা সম্পূর্ণভাবে অর্থায়িত হওয়া সত্ত্বেও এদেরকে ক্ষমতা থেকে দূরত্বে রাখা হয়। তারপর, ইসরায়েলের ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে বসতি স্থাপনকারীরা যারা ইসরায়েলি আইনেই অবৈধ এবং এখনকার নিরাপত্তা মন্ত্রী বেন গ্ভিরের মতো ব্যক্তি যিনি ইসরায়েলি আদালতে বিশ বছর আগে বর্ণবাদী অপরাধী হিসেবে দণ্ডিত হয়েছিলেন। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রেও প্রাউড বয়েজের মতো গ্রুপ রয়েছে যারা একইসঙ্গে মুসলিম-বিরোধী এবং ইহুদি-বিরোধী, যাদেরকে প্রকাশ্যে ট্রাম্প দূরত্বে রাখলেও পর্দার আড়ালে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এমনকি, হাইতির মতো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রও এর উদাহরণ, যেখানে ৮০ শতাংশ এলাকা গ্যাং-নিয়ন্ত্রিত।
এই জায়গাটা বেশ চমৎকার। আধুনিক রাষ্ট্রের এইসব সংকট তাদের ’উন্নত’ গণতন্ত্রে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এই মোড়লেরা ‘উন্নয়নশীল’ দেশে গণতন্ত্রের নামতা শেখানোর নামে দুয়েকটা তথাকথিত ‘বিপ্লব’ ঘটিয়ে ফেলে! এবং এই এরাই সেই রাষ্ট্রকে ম্যানিপুলেট করে বিপ্লবোত্তর সুবিধাভোগী কিছু গোষ্ঠিকে পর্দার অন্তরালে থেকে মদদ জারী রাখে। উপরে উপরে কখনও কখনও এইসব গোষ্ঠি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গরম গরম কথা ছুঁড়লেও ভেতরে ভেতরে রাষ্ট্র সেইসব গোষ্ঠি দ্বারা সংগঠিত সহিংসতা বা অবৈধ শক্তির উপর নির্ভর করে টিকে থাকে (নিজস্ব রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় বা বাইরে গিয়ে হলেও)। জিজেক এই অবস্থাকে ‘র‌্যাডিকেল ওপেননেস’ বা চরম উন্মুক্ততা বলে বর্ণনা করেছেন। যদিও আমরা জানি বর্তমান পরিস্থিতি অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না, কিন্তুকোন দিকে যাবে তাও পুরোপুরি অনুমান করা যাচ্ছে না।
এই প্রসঙ্গে জিজেক তাঁর প্রিয় দার্শনিক হেগেলের দিকে ফিরে গিয়ে ‘রেট্রোঅ্যাক্টিভিটি’ বা পূর্ববর্তী-ক্রিয়াশীলতার ধারণা ব্যাখ্যা করেছেন। মার্কসের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলছেন যে ‘মানুষের শরীরবিদ্যা বনমানুষের শরীরবিদ্যা বোঝার একটি পদ্ধতি (ঞযব ধহধঃড়সু ড়ভ সধহ রং ধ শবু ঃড় ঃযব ধহধঃড়সু ড়ভ ঃযব ধঢ়ব)।’ অর্থ্যাৎ, পুঁজিবাদ আমাদের পূর্ববর্তী সমস্ত সামাজিক ব্যবস্থা বোঝার একটা চাবি দেয় বটে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে পুঁজিবাদ পূর্বনির্ধারিত ছিল। বরং, একবার পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে আমরা পুনরায় পুরো ইতিহাসকে এমনভাবে লিখি যেন সবসময়ই এটি পুঁজিবাদের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল। জিজেকের মতে, মার্কস এখানে চরমভাবে টেলিওলজি-বিরোধী।
জিজেক ডেভিড গ্রেবারের কাজের উল্লেখ করে বলেছেন যে, ইনকা সভ্যতায় শুধু শিশুবলি নয়, অবিশ্বাস্য রকম স্থানীয় গণতন্ত্রও ছিল, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা জয়ী হবার পর সেই সম্ভাবনা ‘কোলাপ্স’ হয়ে গেল। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো যে, যা ঘটেছে তা বোঝার জন্য সবসময় ফোকাস করতে হবে যা ঘটতে পারতো কিন্তু ঘটেনি’র উপর। কারণ, যা ঘটতে পারতো তা সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে যায় না। এটি হয় প্রতিক্রিয়াশীল স্বপ্ন হিসেবে বা অত্যন্ত প্রগতিশীল স্বপ্ন হিসেবে টিকে থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন বা ১৯৯০’র গণঅভ্যুত্থানের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো নতুনভাবে দেখতে উস্কানি দেয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) নিয়ে প্রচলিত বিতর্কের বাইরে গিয়ে তিনি বলছেন- ‘প্রশ্নটি এআই কি মানুষের মতো চিন্তা করতে পারবে?’ নয়, বরং ‘মানুষের চিন্তাই কী একমাত্র প্রোটোটাইপ?’ কিনা সেটি। কারন, আমরা ধরে নিই যে কোনো বুদ্ধিমত্তা মানেই মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা। অথচ হয়তো একেবারে অন্যরকম ধরণের চিন্তা বা ‘স্পিরিচুয়ালিটি’ সম্ভব যা মানুষের মাপকাঠিতে বোঝা যাবে না। তাই প্রশ্নটা তিনি অন্যদিকে সরিয়ে দুটি মানবিক বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেছেন যা তাঁর মতে এআই’র পক্ষে অনুকরণ অসম্ভব। প্রথমটি হলো দৈনন্দিন আচার-অনুষ্ঠান বা রিচুয়াল। জিজেক তাঁর নিজের উদাহরণ দিয়ে বলছেন যে হাত ধোয়ার পর জল পড়ছে না দেখেও তিনি হাত দিয়ে চেক করেন আদৌ জল পড়া থেমেছে কিনা। আগাথা ক্রিস্টি প্রতিদিন লেখা শেষে গোসল করতেন এবং একটি আপেল খেতেন। এই ধরনের অভ্যাসগুলোর কোনো গভীর মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। এগুলো ‘অর্থের শূন্য উপস্থিতি’ বা নিছক অর্থের ভাণ। মনোবিশ্লেষণ করে এই কথা বলা ভুল হবে যে আগাথা ক্রিস্টি ভাবতেন তিনি স্বর্গের ইভ, তাই তিনি আপেল খেতেন, ইত্যাদি। না, এটি শুধুই অর্থের প্রহেলিকা যার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনের স্পষ্ট বিশৃঙ্খল অর্থহীনতাকে প্রতিহত করি।
জিজেকের দ্বিতীয় উদাহরণ আরও চমৎকার এবং তা হলো গালিগালাজ নিয়ে। তিনি বলছেন যে গালিগালাজ মানে ভাষায় আমাদের অস্বস্তির প্রকাশ। এটি তাঁর মতে অশ্লীলতা নয়। এটি মূলত ভাষার ভেতরে নিজের অক্ষমতার বিরুদ্ধে একধরণের প্রতিবাদ। আমরা ভাষার ভেতরে বাস করি, ভাবি, অনুভব করি; তবু ভাষা কখনোই আমাদের পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না, আমরাও আমাদের ভেতরের বিক্ষোভকে ঠিক মতো প্রকাশ করতে পারি না। যখন আমরা কোনো কিছুকে ভাষায় ধরতে পারি না তখনই আমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে অশ্রাব্য গালি। এ যেন ভাষার ভেতরেই ভাষার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এ জায়গাটা এতটাই মানবিক যে তিনি সন্দেহ পোষণ করেন- অও কি সত্যিই এই লজ্জা, অস্বস্তি আর ভাষাগত অপ্রতুলতার এমন ঘন অভিজ্ঞতা ধারণ করতে পারবে? জিজেক তাঁর ধর্মীয় বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনার কথা উল্লেখ করে বলছেন- তাঁর বন্ধুরা তাঁর সঙ্গে একমত হয়েছিলেন যে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর বলা উচিত ছিল ‘ওহ্ জেসাস ক্রাইস্ট, আমি কোথায়?’ অর্থ্যাৎ, যিশু নিজেই নিজের নাম নিয়ে গালি দিলে বিষয়টি জোরালো হত। হাহাহা!
তাঁর এই বক্তৃতার আরেকটি শক্তিশালী এবং উদ্বেগজনক অংশ হলো ‘শেমলেসনেস’ বা লজ্জাহীনতার বিশ্লেষণ। জিজেক বলছেন যে, তরুণ বয়সে বামপন্থীরা ভাবতো ক্ষমতাবানরা মর্যাদাপূর্ণ, আর তারা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে বিদ্রোহ করবে। কিন্তু আজ ক্ষমতাধররা নিজেরাই এমন অশ্লীল যা তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। তারা সম্পূর্ণ ভুল প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল। ট্রাম্প, বরিস জনসন- এরা প্রকাশ্যে মিথ্যা বলেন, অশ্লীল আচরণ করেন, এবং সেটাই তাদের জনপ্রিয়তার ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ তাদেরকে ঠিক এই কারণেই বোধহয় ভালোবাসে।
জিজেক ইসরায়েলের দুটি উদাহরণ দিয়েছেন যা তাঁর দৃষ্টিতে এই লজ্জাহীনতার চরম প্রকাশ। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে তিনি ইহুদি-বিদ্বেষী নন এবং ইসরায়েলি পক্ষও দেখেন। তাঁর চেষ্টা নিরপেক্ষ থাকার। প্রথম ঘটনা হলো ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে একটি বিতর্কের সূত্রপাত, যেখানে জেরুজালেমের দক্ষিণের একটি কারাগারে হামাস বন্দীদের উপর গার্ডরা অত্যন্ত নৃশংস নির্যাতন করেছিল। মলদ্বারে সূঁচযুক্ত বড় ধাতব দণ্ড ঢুকিয়ে দেওয়ার ফলে অনেক বন্দী রক্তপাতে মারা যায়। ভিডিও ক্লিপ আছে, কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু যা জিজেককে হতবাক করেছে তা হলো বিতর্কের প্রধান সুর ছিল- ‘এটা লজ্জার যে আমাদের গার্ডদের এই কাজের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছে। হামাস সদস্যরা মানুষেরও অধম, আমরা তাদের সঙ্গে যা খুশি করতে পারি।’
দ্বিতীয় ঘটনা আরও হৃদয়বিদারক। ইলান মিসরাই নামে একজন সৎ শালীন ইসরায়েলি সৈনিক গাজা থেকে ফিরে আসেন যেখানে তাকে বুলডোজার দিয়ে ভয়াবহ কাজ করতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি শত শত মৃত এবং জীবিত ফিলিস্তিনিকে পিষে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি এমন মনোসংকটে ভুগছিলেন যে তিনি আত্মহত্যা করেন। অন্তত সৈনিকটির স্পষ্টতই কিছু শালীনতা ছিল, কিন্তু সরকারি আইডিএফ মনোবিজ্ঞানীর প্রতিক্রিয়া ছিল কীভাবে সৈন্যদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় যাতে এই ধরনের কাজে তাদের নৈতিক সমস্যা না হয়! ভাবা যায়! জিজেক বলছেন এই লজ্জাহীনতা তাঁর কাছে চূড়ান্ত পতন। তিনি তীব্রভাবে বলছেন যে, ভণ্ডামি এই ধরনের প্রকাশ্য লজ্জাহীনতার চেয়ে ভালো। অন্তত ভণ্ডামিতে একটি মান থাকে, কিন্তু নৃশংসতা যখন প্রকাশ্যে স্বীকৃত এবং সমর্থিত হয়, তখন সমাজ আরও গভীর সংকটে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে জিজেক তাঁর গুরু জাক লাকাঁর দিকে ফিরে যান। ফ্রান্সের ১৯৬৮ সালের ছাত্র আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে লাকাঁ ১৯৬৯-৭০ সালে ‘দ্য আদার সাইড অব সাইকোঅ্যানালাইসিস’ শিরোনামে একটি সেমিনার দেন। সে সময়ে অনেকেই ভেবেছিলেন যে মূল সমস্যা যেহেতু ‘পিতৃতান্ত্রিক দমন’; তাই সবধরনের নিষেধ ও বাধা ভেঙে দেওয়া এবং সব ইচ্ছা মুক্ত করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু ছাত্র বিদ্রোহকে সমর্থন করার বদলে লাকাঁ বলেছিলেন যে তাদের যা অভাব রয়েছে তা হলো লজ্জা। এখনকার অনুমোদনবাদী সংস্কৃতিতে, যেখানে সবকিছু করা যায়, বলা যায়, দেখা যায়, সেখানে ফলাফল হিসেবে জন্ম নিচ্ছে ‘সার্বজনীন বিকৃতি’ বা সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা পারভার্সন। লাকাঁ এখানে এমন কিছু উল্লেখ করছেন যা ফ্রয়েড ইতিমধ্যেই জানতেন। ফ্রয়েডের ভাষায়, পারভার্শন হিস্টিরিয়ার চেয়ে অনেক কম বিদ্রোহী। একজন পারভার্ট নিজের কল্পিত ফ্যান্টাসিকে হুবহু বাস্তবে পেতে চায়। সে নিয়ম ভেঙ্গেও মূল কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ না করে খুব ভালোভাবে সিস্টেমের মধ্যে কাজ করতে পারে। অন্যদিকে হিস্টিরিয়াকে পুরুষতান্ত্রিক ভাষায় অনেক সময় কেবল ‘নারীদের ন্যাকামি’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হলেও এটিই আসলে একপ্রকার অবচেতনের বিদ্রোহ ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রশ্ন। ‘আমাকে তুমি কী বানাতে চাও?’- এই অসন্তোষই আসলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে। জিজেক জানাচ্ছেন যে মহান পরিবর্তনগুলো আসে হিস্টিরিয়া থেকে, পারভার্সন থেকে নয়।
তো জিজেকের এই বক্তৃতা আমাদেরকে কী সবক দিতে চায়? তিনি ঘোষণা করছেন যে ইতিহাস আমাদের পক্ষে নেই। বিশ্ব কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে থাকলেও সফট ফ্যাসিজমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হয়। রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব আইনি কাঠামোর বাইরে সহিংসতার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে- এ তো এখন চাক্ষুষ একদম। এবং বিপদের কথা হলো, এসব নৃশংসতা ও অনৈতিকতা প্রকাশ্যে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। কিন্তু জিজেক হতাশাবাদী নন; তিনি বাস্তবতাবাদী। কোয়ান্টাম সুপারপজিশনের রূপক মনে করিয়ে দেয় যে এখনো একাধিক ভবিষ্যৎ সম্ভব। এটি নতুন সমাজতন্ত্রও হতে পারে। কোন সম্ভাবনায় আমরা কোলাপ্স করব তা নির্ভর করছে আমাদের রাজনৈতিক কর্ম এবং নৈতিক পছন্দের উপর। বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটেও এই বক্তৃতা আমার নিকট ভালোই প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। আমরা এই অঞ্চলে দেখছি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান, নিও-লিবারেল পুঁজিবাদ এবং কর্তৃত্ববাদের সংমিশ্রণ, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ, এবং প্রকাশ্য মিথ্যা ও অশ্লীলতার রাজনৈতিক ব্যবহার। ফলে ভাবতে হবে। প্রচুর ভাবতে হবে।
বক্তব্যটির ইউটিউব লিংকঃ  https://youtu.be/OSYjmH_WPQQ?si=e_BwPBQ9a_oq2bjk
লেখকঃ চিকিৎসক, অনকোলজি গবেষক, চিন্তক
২১ নভেম্বর, ২০২৫; চীন












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
সর্বশেষ সংবাদ
তিন দিন ধরে একই অবস্থায় খালেদা জিয়া
দিনব্যাপী মনিরুল হক চৌধুরীর গণসংযোগ : খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় হাজী ইয়াছিনের উদ্যোগে কুমিল্লায় কোরআন খতম ও দোয়া
কুমিল্লায় চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সি পি আর প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদান অনুষ্ঠান
গাঁজাসহ দুই কিশোরকে পুলিশে দিল জনতা
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
কোনো ষড়যন্ত্রই আমাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না : হাজী ইয়াছিন
আজ কুমিল্লা জিলা স্কুল এলামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম নির্বাচন
কুমিল্লার তিতাসে ওয়ার্ড বিএনপি নেতা অস্ত্রসহ গ্রেফতার
কুমিল্লায় ৯ দিনব্যাপী বইমেলার উদ্বোধন
ক্রিকেট নিয়ে আমার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও গন্তব্য এক : আসিফ আকবর
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: newscomillarkagoj@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২