কুমিল্লার
চান্দিনায় কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না ড্রেজিং করে মাটি উত্তোলন। কৃষি জমি থেকে
মাটি উত্তোলন ও কৃষি জমি ভরাট উভয়ই চলছে সমঝোতার মাধ্যমে। বেপরোয়া ওই
ড্রেজার ব্যবসায়ীরা যেন কিছুই তোয়াক্কা করছেন না। দিন রাত সমান তালে চলে
উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার। এবার ড্রেজিং চলছে সড়ক ও সড়ক রক্ষার বাঁধ
ঘেঁষে!
উপজেলার শুহিলপুর ইউনিয়নের শালিখা গ্রামে জাহাঙ্গীর কাজী বাড়ি
সংলগ্ন পুকুরে রিটেইনিং ওয়াল ঘেঁষে ড্রেজিং করায় যে কোন মুহুর্তে ধ্বসে
পড়তে পারে ওই সড়ক রক্ষার বাঁধ সহ পাকা সড়ক। বিচ্ছিন্ন হওয়ার শঙ্কা দেখা
দিয়েছে কয়েকটি গ্রামের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার।
জানা যায়- ইলিয়টগঞ্জ
থেকে বড়াইয়াকৃষ্ণপুর সড়কের উজিরপুর এলাকায় যুক্ত হওয়া উজিরপুর-রাগদৈল প্রায়
আড়াই কিলোমিটার সংযোগ সড়কটি এক কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাকাকরণের কাজ
চলছে। ওই প্রকল্পে সড়কের পাশের থাকা কয়েকটি পুকুরের রিটেইনিং ওয়ালও
ইতিমধ্যে করা হয়েছে। কয়েকটি রিটেইনিং ওয়ালের মধ্যে শালিখা সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয় ও বশিকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঝামাঝি সড়কের জাহাঙ্গীর
কাজীর বাড়ি সংলগ্ন পুকুরের রিটেইনিং ওয়ালও একটি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা
যায়- ওই পুকুরে রিটেইনিং ওয়াল ঘেঁষে ড্রেজিং মেশিন স্থাপন করে মাটি উত্তোলন
করছেন জাহাঙ্গীর কাজীর ছেলে মোস্তফা কাজী। কয়েক দিন যাবৎ ওই স্থানে
ড্রেজিং করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা অভিযোগে বলেন-
এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করা ছিল খুবই কষ্টের। সরকার কয়েকটি গ্রামের মানুষের
নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে এক কোটি ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে রিটেইনিং ওয়ালসহ
সড়কটি পাকা করণের কাজ শুরু করে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা কাজী
বিবেক বহিঃর্ভূত ভাবে রিটেইনিং ওয়ালের সাথে ড্রেজিং করছে। এতে যে কোন সময়ে
ধ্বস পড়বে প্রায় ৪ লাখ টাকার রিটেইনিং ওয়াল। সাথে সাথে পাকা সড়কটিও পুকুরের
গর্ভে চলে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র
জানায়, অল্প কিছুদিন আগেই জনগণের ভোগান্তি দূর করতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল
অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটি পাকাকরণের উদ্যোগ
নেয়। বর্তমানে সড়কটিতে ইট, কংক্রিট ও বালু ফেলে উন্নয়ন কাজ চলমান। এর আগে
সড়কটি রক্ষায় একটি প্যালিসেডিং ওয়াল নির্মাণ করা হয়, যাতে বৃষ্টির পানি ও
পুকুরের চাপ থেকে সড়কটি নিরাপদ থাকে।
শালীখা গ্রামের একাধিক বাসিন্দা
ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন- ড্রেজার দিয়ে যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে, এতে রাস্তার
নিচের মাটি ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে। সরকার কোটি টাকা ব্যয় করে রাস্তা বানাচ্ছে,
আর কয়েকজন লোক নিজেদের স্বার্থে সেটা ধ্বংস করছে। আমাদের বাচ্চারা এই
রাস্তা দিয়ে স্কুলে যায়। রিটার্নিং ওয়াল ভেঙে গেলে রাস্তাটিও ভেঙে যাবেÑতখন
যানবাহন চলাচলই বন্ধ হয়ে যাবে। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে রাস্তা
ভেঙে গেলে পুরো এলাকার মানুষ বিপদে পড়বে। অবিলম্বে ড্রেজার মেশিন অপসারণ ও
বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয় সিএনজি চালক
মো. ইউসুফ ভূঁইয়া বলেন- রাস্তা ভেঙে গেলে আমাদের মতো চালকদের সবচেয়ে বেশি
ক্ষতি হবে। কারণ প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে বশিকপুর, রাগদৈল, সাচার ও জয়নগরসহ
প্রায় ১০-১২টি গ্রামের সাধারণ মানুষ ও বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতা, স্কুল,
কলেজের শিক্ষার্থী যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করি। কিছু লোক নিজের লাভের জন্য
সেটাকে নষ্ট করছে। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তখন আমাদের আর চলাচলের কোনো রাস্তা থাকবে না।
এ বিষয়ে মোস্তফা কাজী
বলেন- আমি কোনো অবৈধ বালু উত্তোলন করছি না। আমার নিজস্ব পুকুরে ঘরবাড়ি
নির্মাণের জন্য বালু তুলছি। এতে রাস্তার কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
এ
ব্যাপারে চান্দিনা উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম বলেন- যে কোন
সড়ক নির্মাণের জন্য আমরা রক্ষাপ্রদ কাজ করে থাকি। উক্ত সড়কটি আমাদের
দপ্তরের আওতাধীন এবং এখানে উন্নয়নকাজ বর্তমানে চলমান। স্থানীয়ভাবে কেউ যদি
অনুমোদনবিহীন রাস্তার পাশের পুকুরে বালু উত্তোলন করে থাকেন, তা অবশ্যই
সড়কের স্থায়িত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সড়ক রক্ষার বাঁধের আশপাশে
মাটি সরে গেলে ওয়াল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সময়ের সঙ্গে ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি, আমরা মাঠ পর্যায়ে প্রতিনিধি পাঠিয়ে পরিস্থিতি
যাচাই করা হবে। প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসনকে জানাবো জড়িতদের বিরুদ্ধে
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে যাতে সড়কটি নিরাপদ থাকে।
চান্দিনা উপজেলা
নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন- অবৈধভাবে ড্রেজার
দিয়ে বালু উত্তোলন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সড়কের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি
আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি। এলজিইডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত
মাঠে তদন্ত টিম পাঠানো হবে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে
প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
