সোমবার ৩০ জানুয়ারি ২০২৩
১৭ মাঘ ১৪২৯
জ্যামিতিক প্রাণে নাগরিক কুসুম
কাজী মোহাম্মদ আলমগীর
প্রকাশ: রোববার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৩, ২:১৫ পিএম আপডেট: ২২.০১.২০২৩ ২:১৭ পিএম |

জ্যামিতিক প্রাণে নাগরিক কুসুমপিয়াস মজিদ চলতি  সময়ের বাংলা কবিতার তরুণ তুর্কি কবিদের একজন। পিয়াস মজিদের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থের পূর্বগ্রন্থ ‘অফ টফিক’। বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে দৈনিকে লিটল ম্যাগে পিয়াস মজিদের কবিতা পাঠ করেছি, আসলে পড়েছি। একটানা ‘মারবেল ফলের মওসুম’, ‘মির্জা গালিব স্ট্রিট’ ‘এইসব মকারি’.. .. .. ইত্যাদি।
অনেকদিনের জমে থাকা ব্যক্তিগত উপলব্ধির কথা কবির অন্যান্য পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করবো বলে এই সাড়েতিন কাহন, সাতের অর্ধেক। আমরা কারো সাথে চলছি অবস্থায় বলি-সাতে যাচ্ছি। কবিতা পাঠেও একেই অভিজ্ঞতা। কবির অনুপস্থিতে কবির সঙ্গে চলা। তার ভাবনাস্পর্শে ব্যর্থ বা অব্যার্থ হওয়া। পিয়াস মজিদ তাঁর কবিতায় পাঠককে সাথে নিয়ে ছয় পাড় হয়ে সাতে নিয়ে ছেড়ে দেন। পাঠক ইচ্ছে করলে আটে যেতে পারেন; আটকে যেতেও পারেন, ছয়ে নামতে পারেন। প্রশ্ন, নয়ে নয় কেন?
‘সাথে’-‘সাতে’ অথবা ‘নয়ে’- ‘নয়’ শব্দসমূহ প্রায় সহোদর হয়েও  ব্যঞ্জনার্থে প্রশ্ন ও উত্তরের মতো মুখোমুখি অথবা চিন-অচিন- পরিচিত-অপরিচিত-ঈশ^র বনাম শয়তানের মতো। কবিয়ালদের সেই ‘চাপান’ ‘উতরান’ এর মতো।
ভারতচন্দ্র রায় (১৭৬০) মারা গেছেন। ভারতচন্দ্র রায় লিখেছিলেন Ñ ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ পিয়াস মজিদ বলেন- ‘ দূর হয়ে যা যত অভাবের প্লাবন’। আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস  লিখেন - ‘দুধ ভাতে উৎপাত’ (গল্প)।
ঋণগ্রস্ত জীবনের ভবিতব্য কিস্তিতে বন্দি। রক্তাক্ত অ্যালেন পো’র মার্জার। কবি নথিতে ডুবে থাকে। কবিতা আর হয় না। এই হয়না’র ভেতরেও কবিতা হয়।  কবিরাই অমরত্বের কারবারি।
পিয়াস মজিদ জিজ্ঞেস করেন ‘কে কবে তোমাকে বলে বিভূতির কারবারি শুধু এক ভারবি !’
কিস্তি নামক অভাবের অজগর থেকে শুরু করে  গরম গরম তন্দুরি খাওয়া পর্যন্ত যে জীবন এর মধ্যে কবি (ভারবি) প্রচলিত নন্দন তত্ত্বের বিরুদ্ধে নিজেকে দাঁড় করাতে চেয়েছেন। তিনি দীর্ঘ কোন  আ- ‘বেদন ’ নির্মীত বেদনা’  তে স্থিত হলেন না, দীর্ঘ কোন আ-‘রামে’ও না। যার ফলে এই কবিতার নির্দিষ্ট কোন কেন্দ্র নেই। রয়েছে উজ্জ্বল অসংখ্য প্রান্ত ।  পিয়াস মজিদের কবিতা প্রান্ত প্রধান কবিতা। তাঁর কবিতার অথের্র দ্বৈরাজ্য সেইসব কবিতার একগেঁয়েমী থেকে মুক্তির পথ করে দেয়, তাঁর অন্যান্য অসংখ্য কবিতার বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। সেইসব কবিতা মানে, অধ্যাত্মিক, মরমী, গুরুবাদী, অতীন্দ্রিয়বাদী  ইত্যাদি নামধেয় বহুল চর্চিত কবিতার দুর্ভাগ্য অথবা সুভাগ্য থেকে তিনি মুক্ত। তাঁর কবিতায় জীবন জ্যামিতি হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে স্বপ্রতীপ - বিপ্রতিপ - বিন্দু - চন্দ্রবিন্দু , (চন্দ্রবিন্দু তো চাঁদেরই জ্যামিতি। )
তিনি জোরালোভাবে বলেন, ‘জীবনানন্দের দীর্ঘ ছায়াতল থেকে বংলা কবিতার মুক্তি প্রয়োজন।’ তিনি একদিন যানবাহনে চল্তি গতি অনুভবের ভেতরে ছন্দ অনুভব করে বলেন, ‘এই গাড়িটির চলার মধ্যে এক ধরনের ছন্দ রয়েছে।’ সুতরাং ছন্দও কবির  বোধের বিষয়।
পিয়াস মজিদ কবিতার চলতি পথে নতুন সব শব্দ তৈরি করেন, শব্দে শব্দে প্রেম বাঁধান, বিয়ে দেন, বিরহ ঘটান, তালাক দেন। হয়ে ওঠেন কবিতার মিস্ত্রি, মিস্ত্রি থেকে প্রকৌশলী, প্রকৌশলী থেকে ঈশ^র তারপর নাগরিক ঈশ^র, ফুটান তিনি নাগরিক কুসুম। মন, ভ্রমণ,লাফ, আলাপ, আড্ডা,খাদ্য, স্মৃতি, স্বর, ঈশ^র, রাম আরাম, ভূ, প্রভূ, পাঠ, কাঠÑকাস্টÑকেষ্ট. .. ইত্যাদি  থেকে তিনি নিতে থাকেন এবং দিতে থাকেন। তখন এমনসব বিষয় তাঁর  চেতনাস্পর্শে কবিতা হয়ে যায়, পাঠককে যা ভাবনায় নিমজ্জিত করে।
তাহলে দেখুনঃ
১. খাঁটি গরুর দুধÑ বিশুদ্ধ বিষ ।
২. যৌথ শয়তানি Ñ পবিত্র লিবিডো খামার
৩.ভাষার সুরÑ ভাষার বজ্জাতি
৪. (সেতার) সাধেÑ বাধ সাধে
৫.নারীর ঘুমÑ পুরুষের প্রসার
৬. মনের মেঘÑ বখিল দিগন্ত
৭. এবিসিডি অন্ধকারÑ আলোর বস্তা
শুধুমাত্র ‘অফ টফিক’ গ্রন্থের প্রথম কবিতা,  ‘তন্দুরি খাওয়ার প্রহর’ এর শরীরে এতো বেশি  বাইনারী অপোজিশন, এতোসব বিপ্রতীপ অবস্থান । ভালো মন্দ শয়তান ঈশ^র, এসবের দেখা পেয়েছে কবি সুবিধাভোগী অসুস্থ নাগরিকদের মধ্যে । এসব মানুষের কোন কেন্দ্র নেই। ওরা লম্ফ মারে। তাদের চিন্তাকে কবিতায় ধারণ করার শিলান্যাস কে করবে? করতে হলে যে ঘেরজাল লাগে, এ জাল প্রান্ত ধরে টেনে টেনে এগুতে হয়Ñ এ বোধি সওয়ার হয়েছে পিয়াস মজিদের গ্রে-ম্যাটারে।
২.
পিয়াস মজিদ তাঁর ভ্রমন ও অধীত বিদ্যাকে কবিতায় ব্যবহার করেন নির্দ্বিধায়। কবিতাকে করেন অপর-পর ভূমি ব্যক্তি ও সংস্কৃতির যোগ সেতু। তাতে যোগ হয় সাম্প্রতিক অতীতের সঙ্গে বর্তমানের বঙ্গ দেশের কোন কবি বা পাঠকের আন্ত-ভৌগলিক দ্যোতনা। তিনি অবলীলায় স্থনের নাম ব্যক্তির নাম গ্রন্থের নাম কবিতার শরীরের সেঁটে দেন অথবা বিষয়টিই হয়ে ওঠে পৃথক কবিতা।
কথার চেয়ে মেসাল উত্তম। চলুন দেখি।
‘জানো নাকি? তাসখন্দে এলে
এই বাড়িতে তলস্তয় থাকতেন।’
১.উজবেক গাইড অবদুল্লাহ ২.যুদ্ধ ও শান্তি ৩. অন্না কারেনিনা ৪, সাড়ে তিন হাত .. মাটি.. .. ৫. ‘একমাত্র মরতে গিয়েই বুঝতে পারা যায়/ বেঁচে থাকতে পড়া তলস্তয়ের মৌল ধর্ম।’
মেসালের সবটা দেয়া হলো একটি মাত্র কবিতাঃ ‘তাসখন্দে, তলস্তয়ের বন্ধ বাড়ির সামনে’ থেকে।
৩.
প্রাচীন বিশ^াস (মিথ), প্রচলিত গল্পকে ভেঙ্গে ফেলতে দক্ষ ওস্তাদ পিয়াস মজিদ। অনারস খেয়ে দুধ খেতে নেই। এ বিশ^াসটিকে তিনি প্রথমে যুক্তির বারুদে উড়িয়ে দিয়ে এর কাঠামোতে আপন কাঙ্খাটিকে স্থাপন করেন। তিনি বলেনঃ ‘ একপ্লেট আনরস খেয়ে/ গ্লাসভরা দুধে চুমুক মেরে/ বসি তোমার/ দাউ দাউ উপকুলে। এবার তোমার/ আচারের বয়াম থেকে/ চেখে দেখতে হয়/ জীবনের যাবতীয়/ মরনঘন স্বাদ।’ (কবিতাঃ জীবনের জাদুঘরে)
চাঁদে একজন বুড়ি আছেÑ তাও আমাদের শৈশবের শুনা মা খালা দাদির মুখের গল্প। ভেঙে ফেলতে হবে, কাঠামো ঠিক রেখে ভাঙতে হবে এ গল্পকে অথবা কাঠামোসহ সবটা বিনির্মাণ করলে কী দাঁড়ায় আমরা দেখে নিতে পারি।
‘‘ চাঁদের বুড়ি রুটি বেলেছে রাতভর;/ সেই আলোতে ঘুমন্ত পৃথিবী রান্না করেছে/ হাসির ফোয়ারা, কান্নার কারুকাজ।/সূর্য উঠলে; এখন সব খাবার বিতরণের পালা/ চাঁদের বুড়ির কথা কেউ আর মনে রাখে না;/যদিও দিনের পৃথিবীর দিকে দিকে/ রাতভর তারই বেলা রুটির ভাগ-বাটোয়ারা! ’’
(কবতিাঃ চাঁদের বুড়ি বেলছে রুটি)
৪.পথের পাশে ফুটে আছে নাম না জানা তাজা ফুল।
পিয়াস মজিদ পথ থেকে নেন, চলতে চলতে নেন। পথকথা কবিতায় সংশ্লেষ করান। রাস্তাঘাট, বন্ধুর মুখ, এক মিনিটের স্মৃতি, ঝরা পাতার  বেদন বুঝতে চান।  
শহীদুল জহির,গার্সিয়া মার্কেজ, মান্দেলাস্তাম, বুকোস্কি,তলস্তয়,ময়মনসিংহ, জামালপুর, মেলান্দহ, শেরপুর ঢাকা, গুলিস্তান , মীরহাজীরবাগ, কক্সবাজার, মিরপুর সারে এগারো, মাওয়া সদরঘাট, লালবাগ কেল্লা, জুরাইন, পোস্তাগোলা, কলম্বিয়া Ñ এসব তাঁর কবিতার শরীরে স্থান পেয়ে যায়, কবিতার সহায়করুপে।
শুরু করেছিলাম শব্দের সতীনত্ব নামের ( সাতে- সাথে, নয়ে-নয়), একধরনের খেলা দিয়ে । সতীন,এক সঙ্গে ঘর করে, চরম শত্রু বটে, বন্ধু হলে ‘বিস্ময়’। তবু কি পিয়াস মজিদকে বুঝা গেলো ? আমার অপূর্ণতা রয়ে গেলো।
কবিতা সম্পর্কে পিয়াস মজিদ  নীলকণ্ঠ পাখি। এরকম বলার শানেনুযুল জানা দরকার।
‘‘ অনুভবের জাল পেতে, দৃশ্যের গায়ে
লুকানো শব্দ শিকারের অপরাধকে
 নাম দেয়া হলো ‘কবিতা’।’’ (কবিতাঃ চক্ষুঘটিত নয়।)
পিয়াস মজিদের কবি সত্তা, ‘কবি সুনাম’ তাঁর কাব্য সম্ভারকে ঢেঁকে আছে। অগ্রভাগের যোদ্ধরা এভাবে প্রাণ দেন। প্রচলিত পথে চললে বেঁচে (?) যেতেন!
আমি একজন পাঠক হিসেবে বলতে চাই, পাঠের পুরাতন অভ্যাসসমূহ থেকে বের হয়ে না এলে পিয়াস মজিদের কবিতার  কেন্দ্রহীন প্রান্ত সৌন্দির্যের  দ্রোহ বুঝতে না পরার স্বোপার্জিত গোপন স্লাগাতে নিমজ্জিত থেকে যাবো । পিয়াস মজিদের কী করার আছে ? সবটা পাঠকের মর্জি। তাঁর অস্তিত্ব কামনা করছি- কবিতায় এবং কবিতায়।
অফ টপিক
প্রকাশন : চন্দ্রবিন্দু
মোমিন রোড চট্টগ্রাম
দ্বিতীয় মুদ্রণ. ২০২৩ বইমেলা
প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত
মূল্য ২৪০ টাকা













সর্বশেষ সংবাদ
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে আবারও নৌকায় ভোট চাই: প্রধানমন্ত্রী
চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা
কোভিড: দিনে শনাক্ত ১৬ রোগীর সবাই ঢাকার
ব্রাহ্মণপাড়ায় বিষপানে শ্রমিকের আত্মহত্যা
মাদরাসায়ে সাওতুল কোরআন চকবাজার কুমিল্লার উদ্যোগে কৃতি হাফেজদের সংবর্ধনা
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
চতুর্থ ক্রিকেটার হিসেবে মাশরাফীর ‘সেঞ্চুরি’
বাড়ছে না সময়, বাণিজ্য মেলার পর্দা নামছে মঙ্গলবার
রাতের তাপমাত্রা আরও কমবে
পাকিস্তানে বাস খাদে পড়ে নিহত ৪১
সেই সারাহের চোখে পৃথিবী দেখছেন তারা দুজন
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২ | Developed By: i2soft