.
 
Publish Date: 30 Nov -0001 00:00:00

হুমায়ূন আহমেদ স্যার, এভাবে কেন চলে গেলেন ?
Share
কিংবদন্তিসম ব্যক্তিত্ব, জননন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ স্যারের প্রেমে কখন কীভাবে পড়েছিলাম আজ আর মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে ১৯৯৩ সালের ২২ জুলাই হুমায়ূন আহমেদ স্যারকুমিল্লায় এসেছিলেন। যোগ দিয়েছিলেন কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংগঠন জনান্তিক নাট্য সম্প্রদায়ের নাট্য উৎসবে। সে নাট্য উৎসবে হুমায়ূন আহমেদ স্যারের ১৯৭১ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিলো। হুমায়ূন আহমেদ স্যারের কুমিল্লায় আসা উপলক্ষে দুদিনের বইমেলাও হয়েছিলো। এতে হুমায়ূন স্যার উপস্থিত থেকে তাঁর ভক্তদের অটোগ্রাফও দিয়েছিলেন। সেই সাথে তিনি জনান্তিক নাট্য সম্প্রদায়ের কর্মীদের নাট্য প্রশিক্ষণও দিয়েছিলেন কুমিল্লা টাউন হল মঞ্চে। জনান্তিকের একজন নাট্যকর্মী হিসেবে এসব আয়োজনে আমার সরব উপস্থিতি ছিলো। হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সাথে পরিচয় সেখানেই। সে সময়ের দৈনিক ইনকিলাবের কুমিল্লা প্রতিনিধি এম জি মাহফুজ এবং সাংবাদিক আবদুল আজিজ মাসুদ লেখক হুমায়ূন আহমেদ স্যারের একটি সাক্ষাতকার নেন। কেননা সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে কোথাও কেউ নেই ধারাবাহিক নাটকে বাকের ভাই চরিত্র নিয়ে দেশ তোলপাড়। হুমায়ূন স্যারের জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে। দুই সাংবাদিক যখন সাক্ষাতকার নিচ্ছিলেন তখন হুমায়ূন স্যারের কাছে গিয়ে বললাম- স্যার আমার এলাকা (কাঁসারীপট্টি) অনেক অনগ্রসর। শিক্ষিতের হার কম। সেখানে একটি পাঠাগার করতে চাই। আপনাকে সহযোগিতা করতে হবে। হুমায়ূন স্যার বললেন- ঠিক আছে, করো, আমি হেলপ করবো। এরপর হুমায়ূন স্যার জনান্তিক নাট্য সম্প্রদায়ের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। জেলা শিশু একাডেমীর সংগঠক প্রয়াত অধ্যাপক মুকসুদ আলী মজুমদার, জেলা কালচারাল অফিসার বশীর-উল-আনোয়ার, সংগঠক ফরিদ উদ্দিন সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ প্রমুখরা সেখানে ছিলেন। জনান্তিকের নাট্য কর্মী হিসেবে এবং হুমায়ূন স্যারের লেখা ১৯৭১ নাটকের শিল্পী হিসেবে আমিও ছিলাম। হুমায়ূন স্যারের সাথে এভাবেই পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। এরপর হুমায়ূন স্যারের নামেই হুমায়ূন আহমেদ পাঠক ফোরাম প্রতিষ্ঠা করি। এই পাঠক ফোরামের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান করেছিলাম পুরাতন মৌলভী পাড়ায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রয়াত আ. হ. ম মহসিন সাহেবের বাসায়। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিলুপ্ত কুমিল্লা পৌরসভার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান প্রয়াত কামাল উদ্দিন চৌধুরী। ছেলের বন্ধু হওয়ায় তিনি আমাকে খুব আদর করতেন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর এটি ছিলো কামাল উদ্দিন চৌধুরীর প্রথম অনুষ্ঠান। হুমায়ূন আহমেদ পাঠক ফোরাম প্রতিষ্ঠা ও আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানের কাগজপত্র, ছবি, পত্রিকার খবরে নিয়ে সোজা চলে গেলাম হুমায়ূন স্যারের দেয়া ঠিকানা ঢাকার এলিফেন্ট রোডের এলিফেন্ট এপার্টমেন্টে। স্যার থাকতেন সেভেনসি ফ্ল্যাটে। এপার্টমেন্টের অভ্যর্থনা কক্ষে আমাকে বসিয়ে রেখে নিরাপত্তা কর্মীরা স্যারের সাথে যোগাযোগ করে আমাকে উপরে নিয়ে যান। স্যারের বাসার নাম গুলতেকিন আহমেদ। স্যার এসে আমাকে বসার ঘরে নিয়ে যায়। বসার ঘরটিতে কোন সোফা ছিলোনা। এক পাশে টিভি, একটি কম্পিউটার আর স্যারের আঁকা একটি বিশাল ছবি। স্যারের সাথে কথা বলার সময় হুমায়ূন স্যারের মেয়ে বিপাশা মিষ্টি ও পানি এনে আমাকে দেয়। হুমায়ূন স্যার আমাকে বসিয়ে কিছুক্ষণের জন্য কক্ষে যান। এমন সময় বিপাসার আরবী শিক্ষক আসে। সে আরবী পড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। স্যার ফিরে আসেন। আমি বললাম স্যার আমার পাঠাগারের জন্য বই দরকার। তিনি আমাকে পাশের একটি কক্ষে নিয়ে গেলেন। কক্ষটিতে হুমায়ূন স্যারের লেখা বই সুবিন্যাস্ত করে সাজানো। স্যার বললেন-যত বই লাগে নিয়ে যাও। আমার হাতে তখন ছিলো একটি স্কুল ব্যাগ। জিন্সের কাপড়ের। আমি পুরো ব্যাগ ভরে বই নিলাম। ব্যাগ তুলতেই হাতল ছিড়ে যায়। কথা শেষ করে স্যারের সহযোগিতায় লিফট পর্যন্ত আসি। স্যার লিফটে তুলে দিয়ে বিদায় নিলেন আমি নিচে নেমে আসি। অনেক কষ্টে ব্যাগ ভর্তি বই নিয়ে কুমিল্লায় ফিরে আসি। এরপর বেশ কয়েকবারই স্যারের বাসায় যাওয়া হয় আমার। পরে পাঠক ফোরাম টিকিয়ে রাখতে না পারায় স্যারের সাথে যোগাযোগও কমে যায়। হুমায়ূন আহমেদ স্যার আমার জীবনের গতিপথ নির্ধারনে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রখেন। কেননা স্যারের সাথে দেখা, বইয়ের প্রতি ঝোঁক বেড়ে যাওয়া। ঢাকায় যায়া আসা আমাকে আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলে। তাছাড়া দেশের একসময়ের শীর্ষ দৈনিক জনকন্ঠে আমার চাকুরী শুরু হয় হুমায়ূন আহমেদ স্যারের খবর দিয়ে। সে চাকুরী আমার জীবন পাল্টে দেয়। ২০০০ সালের মার্চে সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনশনে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর হুমায়ূন আহমেদ স্যারের সাথে তাঁর লক্ষ লক্ষ ভক্ত সিলেটে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। সে সময় কুমিল্লা থেকেও কিছু ভক্ত ট্রেনে করে সিলেট রওনা দেয়। এ খবর আমি দৈনিক জনকন্ঠে প্রথম পাঠিয়েছিলাম সেটি ছাপা হয়েছিল। আর এ খবরেই আমার যোগ্যতা প্রমাণ করে। আমি জনকন্ঠে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যাই। হুমায়ূন স্যার চলে গেলেন। কিন্তু অসমাপ্ত থেকে গেছে তাঁর অনেক স্বপ্ন। অসাধারণ মানুষটি এভাবে চলে যাবেন তা কেউ ভাবতে পারেনি। আমিও না। বিশেষ করে বৃহদান্ডে ক্যানসার ধরাপরার পর কেমো থ্যারাপি দিয়ে যখন ২০দিনের জন্য বাংলাদেশে আসেন তখন তাকে অনেক আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে। অনেক সাহসী মানুষ মনে হয়েছে। তিনি চলে যাবেন না ফেরার দেশে- এটা কী তখন কেউ মনে করেছে। হুমায়ূন স্যার কী মনে করছেন ? স্যার কেন এভাবে চলে গেলেন- বাংলা সাহিত্যকে এতিম করে দিয়ে।
 
The Sire Design Mantain & Developed by RiverSoftBD