.
 
Publish Date: 30 Nov -0001 00:00:00

লাকসামের বেলতলী বধ্যভূমি :স্বাধীনতা সংগ্রামের নিদর্শন
Share
কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশনের পাশে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসগাঁথা নিদর্শন বেলতলী বধ্যভূমি। মাটি খুঁড়লেই বেরিয়ে আসবে মানুষের হাঁড়-কংকাল। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক সেনারা বিভিন্ন বয়সের প্রায় ১০ হাজার বাঙালি নারী-পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে মাটি চাপা দেয় এখানে। স্বাধীনতার ৩৭ বছরেও এ বধ্য ভূমিটিকে চিহ্নিত করা হয়নি। করা হয়নি সংরক্ষণ। লাগানো হয়নি স্মৃতি রক্ষার্থে একটি সাইন বোর্ডও। লাকসাম রেলওয়ে জংশনের লাগোয়া দক্ষিণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তৈরী বাংকারের পাশে প্রায় দুই হাজার ফুট এলাকা জুড়ে এ বধ্যভূমি। এ বধ্যভূমির ইতিহাস জানা এবং পাক সেনাদের নির্যাতনের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষীদের অনেকেই এখন বেঁচে নেই। বেঁচে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধা প্রত্যক্ষদর্শী ও জাদুঘরের গবেষণা সুত্রে জানা যায়, পাক বাহিনী দেশের অন্যান্য এলাকার মত ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল লাকসাম এলাকা দখল করে। স্বাধীনতার ৩৬ বছরেও সংরক্ষণ করা হয়নি এরপর পাক বাহিনী লাকসাম রেলজংশনের পশ্চিম দক্ষিণে পাশে অবস্থিত থ্রী এ সিগারেট ফ্যাক্টরীতে ক্যাম্প স্থাপন করে। এ ক্যাম্পকে পাক বাহিনী কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের পর যুদ্ধকালীন সময়ে এটাকে ইষ্ট জোনের সাব ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। এ ক্যান্টনমেন্টের অধীনে ছিল লাকসামসহ কুমিল্লার দক্ষিণ এলাকা, চাঁদপুর, ফেনী ও নোয়াখালী অঞ্চল। এসব অঞ্চল থেকে পাক বাহিনী শ শ যুবক-যুবতীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ ট্রাকে করে তুলে নিয়ে আসত। এদের মধ্যে যুবতীদের উপর যৌন নিপিড়ন শেষে হত্যা করা হতো। এখানে সব বয়সের লোকদের হত্যার পর ধরে আনা লোকদের মাটিচাপা দেয়া হতো। বিশেষ করে ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর এবং বরিশাল অঞ্চলের ট্রেনে আসা যাত্রীদের পাক সেনারা ধরে নিয়ে যেন ঐ খ্রি এ সিগারেট ফ্যাক্টরীতে। সেখানে তাদের উপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যার পর বেলতলী বধ্যভূমিতে মাটি চাপা দেয়া হতো। ৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় লাকসাম রেলজংশনে ঝাড়দারের কাজে নিয়োজিত উপেন্দ্র মালির সহযোগী ও ভাগিনা শ্রীধাম চন্দ্র দাস (৫৫) তার দেখা সে সময়ের ঘটনা সম্পর্কে এ প্রতিনিধিকে জানান, ৭১ এর ১৫এপ্রিল পাক সেনারা লাকসাম আক্রমণ করে। পরদিন লাকসাম জংশন ফ্লাটফরমে কয়েকটি বাঙালীর লাশ বিক্ষিপ্ত ভাবে পড়েছিল। তৎকালীন রেলওয়ে স্যানিটারী ইন্সপেক্টর আমাকে ডেকে লাশগুলো সরানোর আদেশ দেন। স্বাধীনতার ৩৭ বছরেও সংরক্ষণ করা হয়নি আমি নিজেই লাশগুলো রেলওয়ে জংশনের দক্ষিণে নিয়ে মাটি চাপা দেই। শ্রীধাম আরও জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চাঁদপুর টোবাকো কোম্পানীর কারখানায় স্বচক্ষে দেখেছেন পাক সেনাদের চরম নিষ্ঠুরতা, অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ। সেখানে চাকুরী নেয়ার দুদিন পর দেখলাম পাক সেনারা হত্যা করলো মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেকসহ একদল বাঙ্গালীকে। তখন ঐ লাশগুলোকে মাটি চাপা দেয়া হয় এ বেলতলী ব্যাংকারের পাশেই। তিনি জানান, ওই সময় সিগারেট ফ্যাক্টরী বিভিন্ন কক্ষে হানাদাররা আটকে রেখেছিল শতাধিক বাঙ্গালী মেয়েকে। তাদের ধর্ষণের পর হত্যা করা হতো। তিনি জানান, সারাদিন বেলতলীতে গর্ত খুঁড়ে রাখতাম। পরদিন সকালে সিগারেট ফ্যাক্টরী থেকে লাশগুলো এনে এখানে মাটি চাপা দিতাম। ওই সময় আমি মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেকের লাশ মাটি চাপা দেবার সময় স্থানটি চিহ্নিত করে রাখি। পরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে স্থান থেকে তাঁর লাশ তুলে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে নেয়ার ব্যবস্থা করি। তিনি বলেন, নিজের জীবন এবং মা-বাবা জীবনের নিরাপত্তার জন্য আমি বাধ্য হয়ে তখন লাশ মাটি চাপা দেবার কাজটি করেছি। কত লাশ দুহাতে মাটি চাপা দিয়েছি তার হিসাব মেলাতে পারছিনা। শ্রীধাম জানান, সে সময়ে কথাগুলো মনে হলে এখনো রাতে ঘুম আসে না। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা জানান, ৯৯ সালে ঢাকার একদল সাংবাদিকের অনুরোধে শ্রী ধাম দাস। স্বাধীনতার ৩৭ বছরেও সংরক্ষণ করা হয়নি বেতলীর বধ্যভূমি খুঁড়ে বের করে আনেন বেশ কটি মাটি চাপা দেয়া মানুষের হাড়,গোড়-কঙ্কাল-কারোটি। এ সময় উদ্ধার করা বেশ কটি মাথার খুঁলি ও কিছু হাড় বর্তমানে ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। মুক্তিযোদ্ধারা আরও জানান, ৯৯ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ লাকসাম থানা কমান্ডের একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে সংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ১৮-১-৯৯ইং তারিখের সাবিস/শা-উ:-১/৯৯-১ নং স্মারক মোতাবেক কুমিল্লা জেলা প্রশাসন ২৫-২-৯৯ তারিখে লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বধ্যভূমির জায়গাটি অধিগ্রণের নির্দেশ দিলেও তাও কার্যকর হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন ননী, নজীর আহমেদ ভূইয়া, আবদুল বারী মজুমদার, আবদুল মান্নান এবং সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা গবেষক আবুল কাশেম হৃদয় সাংবাদিক আবুল বাশার খান, তাবারক উল্লাহ কায়েস, রফিকুল ইসলাম হিরাসহ অন্যান্যরা জানান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পরিচালক আক্কু চৌধুরী ২০০০ সালের দিকে জানিয়েছিলেন ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন অব হিস্টোরিক সাইট মিউজিয়াম অব কনসেস এর সহয়তায় ঔ বছর লাকসামের ও বগুড়া এ তিনটি বধ্যভূমি খনন কাজ শুরু হবে। সে সময় বেশ কজন বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক এ বধ্যভূমির চিত্র ধারণ করে নেন। এরপর আর কাজ এগুয়নি। অযত অবহেলায় মাটি চাপা পড়ে আছে। স্বাধীনতাকামী হাজারও বাঙ্গালীর লাশ এ বেতলী বধ্যভূমিতে অরক্ষিত। স্বাধীনতাকামী লাকসামসহ কুমিল্লা মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সংগঠকগণ সরকারের নিকট অবিলম্বে এ বধ্যভূমি সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানান।
 
The Sire Design Mantain & Developed by RiverSoftBD