ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
94
মূলকথা” ‘ভা-র-সা-ম্য’
Published : Tuesday, 30 June, 2020 at 12:00 AM
মূলকথা” ‘ভা-র-সা-ম্য’শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
ইদানিং ‘ভারসাম্য’ কথাটি ব্যাপক উচ্চারিত হচ্ছে। আভিধানিক অর্থ হলো ‘উভয় দিকের ভারের সমতা’। ইংরেজি শব্দ ইধষধহপব, পাশাপাশি অপর শব্দ ‘ভারসহ’ অর্থাৎ ভার সইতে পারে এমন।
বাজারে যখন জিনিসপত্র ওজন করে বিক্রি হয় তখন নিক্তির উভয় অংশের ভারের সমতা নির্ধারণ করতে হয়। তাতে কারচুপি করলে এবং ধরা পড়লে সংঘর্ষ অনিবার্য। এমন কি এ ক্ষেত্রে ধর্মের দোহাই দেয়া হয়। মাপে কম দিলে পরকালে জবাবদিহি করতে হবে-এরূপ কথাও শোনা যায়। স্বর্ণকার তা মানে না। তারা নাকি মায়ের কানের স্বর্ণও চুরি করে। এছাড়া কোনো স্বর্ণের জিনিস তৈরি করালে তা যে খাদ দেয়া হয়, পরে স্বর্ণের সঙ্গে একাকার হিসেবে উচ্চ মূল্য নিয়ে নেয়। এ ফাঁকিটা ক্রয়কারী দীর্ঘদিন ধরতে পারেনি। অর্থাৎ ভারসাম্য না থাকলে সে ক্ষেত্রে অনৈতিক বিষয়টি স্থায়ী হয়ে যায়। আদালতে প্রবেশ মুখে একটি নারী মূর্তি নিক্তি সমান অর্থাৎ ভারসাম্য অবস্থায় ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মূর্তিটির আবার কালো কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধা। তাতে আইনের সুদূর প্রসারী বক্তব্য প্রতীকী হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ আইন অন্ধ। সকলের জন্য সমান। সুতরাং চোখ খোলা থাকলে পরিচিত জনের জন্য পক্ষীয় স্বার্থরক্ষায় দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তবে বিচারালয়ে সকলেরই চোখ-কান খোলা থাকে। তারপরও ন্যায়-অন্যায়ের বিষয়টি আইনের নিক্তি দিয়ে সেখানে মাপার চেষ্টা হয়। নি¤œ আদালতের বিচার উচ্চ আদালতে ঠিক নাও থাকতে পারে। অনেকক্ষেত্রে থাকেও। যার পক্ষে রায় ঘোষণা হয়, তিনি বলেন- বিচার পেয়েছি। বিপক্ষ বলেন- বিচার পাইনি, আদালত ন্যায় বিচার করেননি। ইত্যাদি। তারপরও আদালতে ভারসাম্য বিষয়টি নানাভাবেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে আসছে।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যেখানে ভারসাম্য রক্ষিত হয়, সেখানে একধরনের স্বস্তি বিরাজ করে। তা সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বা ব্যক্তিক জীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভারসাম্য না থাকলে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। এভাবে চিন্তা করতে করতে একসময় উপলব্ধি হলো শুধু গ-িবদ্ধ জীবন যাপন নয়, সৃষ্টির তাৎপর্যেও ভারসাম্য বিষয়টি প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল। অনেকেই বলে থাকেন যে, এখন পৃথিবীর মধ্যে ভারসাম্য বিষয়টিতে সংকট দেখা দিয়েছে। কথাটি বলা হয়-প্রাকৃতিক ভারসাম্য দারুণভাবে ব্যাহত হয়ে গেছে। যেমনটি প্রকৃতি থাকার কথা, তা অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে। আর নষ্ট করার দায়িত্বে যারা ভূমিকা রাখছে, তারা নাকি মানুষ বা মানবসমাজ। তাহলে প্রশ্ন- মানুষ কি এতটাই দায়িত্বজ্ঞানহীন ? জোর গলায় বলা না গেলেও কথাটি যে সত্যি তা বলতেই হবে। যেমন- প্রতিটি নদীর উৎপত্তি কোনো পর্বত থেকে। পর্বতের চূড়ায় জমাটবাঁধা বরফ গ্রীষ্মকালে সূর্যতাপে গলে জলধারা সৃষ্টি হয়, জলের ধর্ম-নি¤œগামী। তাই জল নীচের দিকে প্রবাহিত হতে গিয়ে যে পথপরিক্রমা সৃষ্টি করে- তা-ই নদী এবং তারও একটি গন্তব্যস্থল হলো বিশাল সমুদ্রে। কারণ, এই সমুদ্রের জলই খরতাপে বাষ্প হয়ে আকাশে উড়ে বায়ু প্রবাহে পর্বতের চূড়ায় স্থান লাভ করেছিল। এই জন্যই পর্বতের চূড়ায় বরফ, সমতলে প্রবাহিত নদীর ¯্রােত এবং আকাক্সিক্ষত সমুদ্র যাত্রা, প্রকৃতির অপার লীলা। এ বিষয়ে দ্বিমত হয়ত থাকার কথা নয়। কিন্তু মানুষ অর্থাৎ সমতলে বসবাস করা মানুষ নিজের স্বার্থে বা প্রয়োজনে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নদীকে শাসন করেছে, করছে। এতে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বাধা সৃষ্টি হয়েছে। নদী শুধু নদী নয়, তা পৃথিবীর একটি চলমান অংশ। নদীর জল শুধু জল নয়, তা জীবের প্রাণ রক্ষাকারী, জলজ প্রাণির আভাসস্থল, শস্য উৎপাদনের উর্বরতার সামগ্রী বহনকারী, বুকের উপর দিয়ে চলাচল করার জন্য মহাপথ। নদী সভ্যতা বিনির্মাণে সহযোগী, জীবিকা নির্বাহের সহায়কারী, নদী জীবের জীবনধারণের সহায়ক ঐশ্বরিক অধিষ্ঠান। এই নদী যখন হারিয়ে যায়, নদীকে যদি স্তব্ধ করে দেয়া হয়, তাতে লাভ-ক্ষতি হিসাব করতে গেলে দেখা যায়, যে স্বার্থে বা প্রয়োজনে নদীকে শাসন করা হয়েছে তাতে ক্ষতির পরিমাণ বেশি, ভারসাম্য রক্ষিত না হলে সংঘর্ষ অনিবার্য। ধরা যাক, আমাদের দেশ অর্থাৎ বাংলাদেশ হলো নদীমাতৃক দেশ। এখন ভূগোল বইয়ে নদীর নাম পাওয়া যায়, কবিতা-সাহিত্যে কত নদীর নাম উল্লেখ আছে, বাস্তবে হারিয়ে গেছে। ঢাকা শহরে নাকি অনেক খাল, তার অস্তিত্ব কি আছে ? যে মানুষ খাল দখল করে সুরম্য অট্টালিকা-শপিংমল-কারখানা তৈরি করেছে, বর্ষকালে সামান্য সৃষ্টি হলে কী অবস্থা দাঁড়ায়, তাতো দৃশ্যমান। এভাবে প্রকৃতির প্রতিটি স্বাভাবিকতায় তথাকথিত উন্নয়নের নামে, সভ্যতা বিকাশের নামে পাহাড় কেটে ফেলেছে, মাটি খুঁড়ে সুউচ্চ অট্টালিকা তৈরি করে পৃথিবীটাকে ঢেকে ফেলেছে, আকাশকে ধোঁয়ায় বিবর্ণ করে দিয়েছে, বনজঙ্গল কেটে কেটে পশু-পাখিকে বাসস্থান হারা করে ফেলেছে, ফলজ-বনজ-ভেষজ বৃক্ষরাজি আজ কোথাও নেই। বাঁচবার জন্য যে প্রাকৃতিক নিয়মের অক্সিজেন, তা শেষ করে দিয়েছে। এখন মানুষ জল পান করে বোতল কিনে, শ্বাস-প্রশ্বাস নেয় অক্সিজেনের সিলিন্ডারের মাধ্যমে। পাখিরা গান গায় না, বসন্তের বাতাস প্রবাহিত হয় না, প্রকৃতির সঙ্গে রসিকতা করে ছাদ-কৃষি করে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটায়, আকাশ দেখা যায় না, শহরগুলোতে মাটি খুঁজে পাওয়া যায়। কত বলব আর।
মোটকথা, এখন আর কোথাও ‘ভারসাম্য’ নেই। এই ভারসাম্যহীনতার পরিণতি কি- তা তথাকথিত মানুষ উপলব্ধি করতে পারেনি বলেই নির্যাতিত প্রকৃতি প্রতিশোধ স্পৃহায় ক্ষেপে গেছে। পৃথিবীর ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে মানবগোষ্ঠি, তারা প্রকৃতির নিয়মকে মানছে না। অর্থাৎ যিনি এই পৃথিবী বা জগৎ সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কোনো নিয়মকানুন মানুষ মানছে না। মানুষই এখন প্রকৃতি তথা পৃথিবীর প্রধান শত্রু বা প্রতিপক্ষ। মানুষ প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করে না, ধ্বংস করে, প্রকৃতির ভারসাম্যকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। মানুষই ঘোষণা দিয়েছে, তারা নতুন পৃথিবী বানাবে বা সৃষ্টি করবে। মানবঘোষিত পৃথিবীর রূপরেখায় নদী নেই, পাহাড়-পর্বত নেই, আকাশ নেই, বাতাস নেই, চন্দ্র-সূর্যও নেই। পৃথিবীর যে তিনভাগের দুভাগ জলাধার অর্থাৎ সমুদ্র তাকেও মানুষ ভাগাভাগি করে নিয়ে গেছে। সৃষ্টিকর্তার অবশিষ্ট কিছুই আর রইল না। সুতরাং পৃথিবী আমার, প্রকৃতি আমার, সৃষ্টি আমার অর্থাৎ মানুষের। ¯্রষ্টা অন্য অর্থে প্রকৃতি আজ নি:স্ব রিক্ত-অস্তিত্বহীন। যে দাঁড়িপাল্লায় এতদিন ভারসাম্য রক্ষিত হতো, একদিকে পাল্লা উধাও হয়ে গেছে, এখন মিটার দিয়ে মাপামাপি। সংখ্যা দিয়ে ওজনের হিসাব। আমরা অর্থাৎ মানুষরা নতুন পৃথিবী তৈরি করে সাজানো গোছানো প্রায় শেষ পর্যায়, তখনই সম্পত্তিহারা জমির মালিক তার কাগজপত্র নিয়ে হাজির হলো- নোটিশ পাঠাল- কোভিড-১৯ কে দিয়ে। সাথে করোনা ভাইরাস। এই নোটিশ পেয়ে মানুষ প্রথমে পাত্তাই দিল না। যখন নোটিশের কার্যকারিতা শুরু হলো, তখন এমন একটা ভাব দেখাল, তা সাময়িক, ঠিক হয়ে যাবে। বিস্তারিত না বলতে পারলেও, এখন বুঝ ঠেলা। মাপে কম দিয়েছ, ভারসাম্য রক্ষা করনি, নিক্তি ধ্বংস করে দিয়েছ। এখন শুধু দেশে দেশে মৃত মানুষের সংখ্যা গণনা বা আদমশুমারি চলছে। করোনার আক্রোশে আক্রান্ত লোকসংখ্যার হিসাব করা হচ্ছে, তাদের রক্ষা করার ঔষধ নয়, প্রতিরোধ করার পন্থা বের করার প্রয়াস নেয়া হচ্ছে। যিনি বা যারা এ দায়িত্ব নিচ্ছেন, তিনি বা তারাও আতংকিত, ভীতসন্ত্রস্ত। প্রকৃতিকে যে পরিমাণ ঠকানো হয়েছে, কড়াগ-ায় যেন হিসাব করেই প্রতিশোধ নিবে। পরকালের জন্য বিচারের অপেক্ষা করবে না প্রকৃতি। এখন নগদ বিচার।
প্রশ্ন করি- হে বিজয়ী মানুষ, আজ কেন ঘরের ভেতর লুকিয়ে লুকিয়ে বাঁচতে চাচ্ছ ? নাক-মুখ বেঁধে নিজেকেই প্রতিপক্ষ বা শত্রু ভাবছ ? নিজের কোনো অঙ্গকেও বিশ্বাস করছ না। নদী নেই, অথচ জলের ব্যবহার করছ বার বার। যে প্রশ্নগুলো করছি বা করতে পারছি না, তা কিন্তু অন্য কাউকে নয়, অন্তর্গত নিজেকেই করছি। ব্যক্তি আমি বিচ্ছিন্ন কেউ নই। দায় ভারের যন্ত্রণা, অনেকটা পাপের প্রায়শ্চিত্ত বটে। প্রেমিক মানুষ আজ নিষ্ঠুর মানুষ, ভালোবাসার মানুষ আজ স্বার্থপর মানুষ। প্রেমিকার কাছে যেতে পারি না, ভালোবাসার মানুষের সঙ্গ-সুখ উদযাপন করতে পারি না, অপাপবিদ্ধ শিশুকে আদর দিতে পারি না। রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলোকে দেখতে পারছি না। একটা মৃতপুরীতে বাকহীন আবদ্ধ জীবমাত্র আমি। দেহের ভারসাম্য নেই, মনের ভারসাম্য নেই, সামাজিক ভারসাম্য নেই, চিন্তাচেতনার ভারসাম্য নেই। এবং সর্বোপরি কোথাও কেউ নেই। প্রতিটি মানুষ বড়ই একা।
‘......... কিছু নাহি
পারি পরশিতে, শুধু শূন্যে থাকি চাহি
বিষাদব্যাকুলে।
রবীন্দ্রনাথের বাণী আজ মিথ্যে হতে চলেছে, প্রিয়জনের প্রার্থিত আহ্বান আর শোনা যায় না। তিনি যখন বলেন-
কী গভীর দু:খে মগ্ন সমস্ত আকাশ,
সমস্ত পৃথিবী ! চলিতেছি যতদূর
শুনিতেছি একমাত্র মর্মান্তিক সুর
‘যেতে আমি দিব না তোমায়।’
এরূপ আহবান তো এখন নি:শেষ হয়ে গেছে। যে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করেছিল মানুষ, করোনায় আক্রান্তে মৃত্যুবরণ করলে তাকে বা তার মৃতদেহটাকেও দেখতে দেয়া হয় না। কতটা ভারসাম্যহীন নির্মমতা। একদিন মানুষ বলেছিল-
....তবু প্রেম বলে,
‘সত্য ভঙ্গ হবে না বিধির’ আমি তাঁর
পেয়েছি স্বাক্ষর দেওয়া মহা অঙ্গীকার
চির অধিকারলিপি।’
বলেছে- ‘মৃত্যু, তুমি নাই।’- হেন গর্বকথা,
তখন ‘মৃত্যু হাসে বসি, মরণপীড়িত সেই
চিরজীবী প্রেম আচ্ছন্ন করেছে এই
অনন্ত সংসার, বিষন্ননয়ন-’ পরে
অশ্রুবাষ্প-সম, ব্যাকুল আশঙ্কাভরে
চিরকম্পমান।
এ সবকিছু আজ ঘটছে ভারসাম্যতা নষ্ট করার কারণে। বড় দেরি হয়ে গেছে। মানুষের হাতে অবশিষ্ট আর কিছু নেই। এখন প্রকৃতিই ভারসাম্য রক্ষা করবে। এর পরিণতি কতটুকু তা মানুষ জানে না, জানবার শক্তিটুকুও নেই। আজ মানুষ বড়ই অসহায়।






© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};