ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
1076
কিছুকথা : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন নিয়ে
Published : Tuesday, 11 February, 2020 at 12:00 AM
কিছুকথা : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন নিয়েশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
১৯৬৭ সালে এম,এ পাশ করার পর ১৯৬৮ সালের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন হওয়ার কথা ছিল। তখন উপাচার্য ছিলেন ড. মোঃ ওসমান গণি। তিনি ইংরেজিতে লিখতেন উৎ. গ.ড়. মযধহর। ইকবাল হল তখন ছাত্রলীগের প্রধান আস্তানা। জগন্নাথ হলের ছাত্র, ইকবাল হল ও এস এম হলের ছাত্ররা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করত। এদিকে অর্থনীতি বিভাগের ড. মাহমুদকে নিয়ে মামলা হয়ে গেছে এবং বিচারপতি জনাব মুর্শেদ অনুকূলে রায়ও দিয়েছেন। তাই ছাত্ররা উপাচার্যের বাসার সামনে দিয়ে যাতায়াত কালে ‘মাস্টার্স অয়েল ঘানি’ বলে স্লোগান দিতে দিতে মুখরিত করে রাখত সকাল ও বিকাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য গর্ভনর মোনায়েম খান। সমাবর্তনের আয়োজনের পূর্ব মুহূর্তে ছাত্রলীগ-ছাত্রইউনিয়নসহ ছাত্রসমাজ আন্দোলনে নেমে যায় এবং কোনোভাবেই সমাবর্তন করতে দেয়া হবে না বলে ঘোষণা দেয়। কারণ, মোনায়েম খানের হাত থেকে কেউ সনদ নিতে চায়নি। রেজিস্ট্রেশন করেও জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অনুষ্ঠান থেকে চিরতরে বঞ্চিত হতে হলো। তাই ৫৮ বছর পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনের আমন্ত্রণ পেয়ে পুলকিত হলাম এবং আমন্ত্রণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলাম। কীভাবে যাব-প্রথম মনে পড়ল অজিত গুহ কলেজের অধ্যক্ষ হাসান ইমাম মজুমদারের কথা, তিনি নিশ্চয়ই আমন্ত্রণ পেয়েছেন, তাঁর গাড়ি আছে। যোগাযোগ করায় তিনি জানালেন ২৭ তারিখ যুক্তরাজ্যের হাই কমিশন অফিসে তাঁর ভিসার জন্য সাক্ষাৎকার আছে, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যেতে পারছেন না। পরে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জামাল নাসের এর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি সাদরে আমার আবদার গ্রহণ করলেন এবং সমাবর্তনে অংশ গ্রহণ করি।
বাংলাদেশ আমার মাতৃভূমি, কুমিল্লা আমার মাতৃ-জঠর। আর কুমিল্লার সবকিছুই আমার জীবনের অংশ বিশেষ। ২৭ জানুয়ারি ২০২০খ্রিঃ, সোমবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রথম সমাবর্তন’ উপলক্ষে আমার প্রথম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া। কাজেই আমার অনুভূতি ও আনন্দ অন্যরকম। এছাড়া সমাবর্তন উপলক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব মোঃ আবদুল হামিদ, সমাবর্তন-বক্তা মাননীয় অর্থমন্ত্রী জনাব আ হ ম মোস্তফা কামাল, বিশেষ অতিথি মাননীয় শিক্ষা উপমন্ত্রী জনাব মহিবুল হাসান চৌধুরী, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মুঞ্জরি কমিশনের মান্যবর চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ সহ মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিবৃন্দ, কর্মরত সরকারি, পুলিশ, সেনাবাহিনির সদস্যবৃন্দ এবং সর্বোপরি সনদপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত, মনে রাখার মত। দারুণভাবে উপভোগ্য ছিল সামগ্রিক অনুষ্ঠানটি।
    মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আচার্য অর্থাৎ চ্যান্সেলর, অনুষ্ঠানের সভাপতি। তিনি যখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে যোগদান করেন, লিখিত বক্তব্য পাঠের ফাঁকে যাপিত স্বত:স্ফূর্ত প্রাসঙ্গিক কিছু বক্তব্য স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কিশোরগঞ্জের ভাষায় বলেন। লিখিত বক্তব্যের চেয়ে স্বাধীন বক্তব্যই সামগ্রিক অনুষ্ঠানকে মুগ্ধকর করে তোলে। এজন্য তিনি সত্যিকার অর্থেই জনপ্রিয় চ্যান্সেলর। সে সব কথা শোনার জন্য শ্রোতার উৎসুক্য হয়ে থাকে এবং সে সকল কথাই তখন মনে হয় আসল কথা, অভিভাবকের নির্দেশমূলক কথা। এমন কি তিনি হালকা করে বললেও তার গভীরতা অতলস্পর্শী। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনে তিনি লিখিত বক্তব্যের বাইরে যে কথাগুলো বলেছেন, তা একবার স্মরণ করতে চাই।
১.    ২০০৬-২০০৭ থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবর্ষ শুরু। তখন থেকে যত পরীক্ষা হয়েছে ¯œাতক সম্মান ও ¯œাতকোত্তর পর্যায় তাদের থেকে ১৪ জন ছাত্র-ছাত্রী ‘চ্যান্সেলর পদক’ পেয়েছে। তন্মধ্যে ১১ জন ছাত্রী ৩জন মাত্র ছাত্র। মাননীয় রাষ্ট্রপতি বললেন-কুমিল্লা এসে আবারো প্রমাণ পেলাম যে মেয়েরা আসলেই এগিয়ে আছে। ১৪টি স্বর্ণপদক দিলাম, তার মধ্যে ১১টি নিলো তারা। তাহলে ছেলেরা এতদিন কি করেছে? ছেলেরা মেয়েদের পিছনে পড়ে কিন্তু এতটা পিছিয়ে পড়ে নাকি? ‘ডাল মে কিছু কালা হ্যায়।’
২.    মাননীয় রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন-কুমিল্লা হচ্ছে দেশে মাদক পাচারের অন্যতম রুটগুলোর একটি। তিনি আহবান জানিয়েছেন-‘তাই তোমাদেরকে (ছাত্রদের) অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে এবং তোমরা যেইসব অবৈধ মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলো।’
তিনি মাদকের বিভিন্ন নামের কথা উল্লেখ করে বলেন। ‘আমার বাপের জন্মেও তার নাম শুনি নাই।’ তাই শিক্ষার্থীদেরকেই মাদকের বিরুদ্ধে একটি নীরব সামাজিক বিপ্লব শুরু করতে হবে। মানুষকে ভালো করতে মাদকের বিরুদ্ধে প্রেরণামূলক প্রচারণা চালিয়ে তোমাদেরকে সমাজে পরিবর্তন আনতে হবে, অন্যথা দেশটা ধ্বংস হয়ে যাবে।
৩.    পারিবারিক ছোটখাট ঘটনা রসালোভাবে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করে রাশভারি অনুষ্ঠানকে বিনোদনের আনন্দঘন আমেজ ছড়িয়ে দিয়ে সমাবর্তনকে ভিন্নমাত্রায় উপভোগ্য করে তুলেছিলেন।
আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব মোঃ আবদুল হামিদ ১৯৭০ সাল থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগ পর্যন্ত ৪০ বছর যাবত কিশোরগঞ্জের তাঁর নির্বাচনি এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। রাজনৈতিক জীবনে ডিপুটি স্পিকার, স্পিকার এবং এখন দ্বিতীয়বারের মত রাষ্ট্রপতি। কিন্তু মন্ত্রী ছিলেন না। কিন্তু তিনি মন্ত্রীদের নিয়োগ অনুমোদন করেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীদের শপথ বাক্য পাঠ করান।
তিনি শিক্ষাগত জীবনে কোনোদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পাননি, রাজনীতি করতেন বলেই ১৯৬১ সালে মেট্রিক পাশ করেও ১৯৬৯ সালে বি,এ পাশ করেছেন, স্বাধীনতার পর সংসদ সদস্য হয়ে আইন পরীক্ষায় দু’বার অংশ গ্রহণ করে পাশ করেছিলেন। অথচ তিনি এখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য তথা চ্যান্সেলর। তিনি উচ্চতর ডিগ্রিগুলোর অনুমোদন-দাতা। একেবারে সাদামাটা জীবনযাপন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চলাফেরা। তাই রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়মতান্ত্রিক বাধ্যবাদকতা যেন তাঁর অনেক স্বাভাবিকতাকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, রসিকতাচ্ছলে তাও মাঝে মাঝে উল্লেখ করে  বন্দিজীবনের সাথে তুলনা করতেও সংকোচবোধ করেন না। তখন মনে হয় মুক্ত বিহঙ্গের মত পাখা ঝাপটাচ্ছেন, কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্বেত্ত উড়তে পারছেন না। মাঝে মাঝে তাই নিজের গ্রামের বাড়ি চলে যান-রিক্সা-সিএনজি-নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ান। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে হাফ ছেড়ে বাঁচেন হয়ত বা।
সত্যিই, আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি একজন প্রাণখোলা অকৃত্রিম জনপ্রিয় আপনজন এবং ভাগ্যবান ব্যক্তি। তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা।
    জ্ঞানার্জনের কোনো সীমারেখা নেই। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা হলো সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে ওঠা। কিন্তু অভীষ্ঠলক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রকৃতপক্ষে তখন থেকেই শুরু হয় জীবন-সংগ্রাম। মাঝে মাঝে মনে হয় জ্ঞানচর্চার জন্য হয়ত বা নির্জনস্থানের দরকার। আগেকার কালে মুনি-ঋষিরা বনে-জঙ্গলে গিয়ে ধ্যান করতেন, জ্ঞানচর্চা করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন রমনা এলাকা ছিল নির্জন একটি জায়গা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যখন ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাও রাজশাহী শহর থেকে দূরেই ছিল। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তো গহীন বনেই জন্ম লাভ করেছিল। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও ঢাকা নগরী থেকে অনেক দূরে নির্জন স্থানে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কর্তাব্যক্তিদের উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উপলক্ষ্যে প্রথম গিয়ে আমার তা-ই মনে হলো-কুমিল্লা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে লালমাইয়ের এক নির্জন এলাকায় ধ্যানমগ্ন হয়ে জ্ঞান-অন্বেষণের জন্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। ছোট ছোট পাহাড়, পাহাড়ের পাদদেশ, আঁকাবাঁকা পথ, চড়াইউৎরাই ঢেউখেলানো সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠে শ্রেণি কক্ষে প্রবেশ। দিনের বেলায় সাড়ে সাত হাজার ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি, কর্মব্যস্ততা, পঠনপাঠন, কাশ করা-এক জমজমাট কর্মচাঞ্চল্য-কলকাকলির দিনমান অতিবাহন। কিন্তু পড়ন্তবেলায় ছাত্র-ছাত্রী যারা ছাত্রাবাসে থাকে, সন্ধ্যের পর রাত্রি যখন ঘনিয়ে আসে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশটা কেমন থাকে, নীরবতার সৌন্দর্য কি উপভোগ করার মতো? ভাবতে ভালো লাগে, আবার লোকালয়ের দিকে তাকিয়ে মনটা যেন কেমন করে, তারপরও জ্ঞানার্জন বলে কথা।
    যে কথা বলে ইতি টানছি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে মান্যবর উপাচার্য প্রফেসর ড. এমরান কবীর চৌধুরী একটি সফল নান্দনিক সমাবর্তনের আয়োজন করে সকলের ধন্যবাদার্হ হয়েছেন। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকুক এটা প্রত্যাশা করি। কোনো রাজনীতি বা গোষ্ঠিদ্বন্দ্ব যেন তা বাধাগ্রস্থ করতে না পারে কুমিল্লাবাসী হিসেবে আন্তরিককভাবে প্রত্যাশা করি।








© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};