ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
218
বৃহত্তর কুমিল্লার “আশুগঞ্জের মেঘনা নদী-বক্ষে” বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষার রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন
Published : Sunday, 8 December, 2019 at 12:00 AM
বৃহত্তর কুমিল্লার “আশুগঞ্জের মেঘনা নদী-বক্ষে” বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষার রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেনঠাকুর জিয়াউদ্দিন আহমদ ||
১৯৪৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার সাবেক ত্রিপুরা জেলার (বর্তমানে বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা অঞ্চল) ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার নবীনগর থানার কৃষ্ণনগর হাই স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে বিখ্যাত গায়ক আব্বাসউদ্দিন আহমদ ও অন্যান্য বিশিষ্ট বৃক্তিবর্গসহ যোগদান করেছেন। অনুষ্ঠান শেষে বঙ্গবন্ধু এবং সংগীত শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদ কৃষ্ণনগর থেকে নৌ-পথে মেঘনা নদী দিয়ে আশুগঞ্জ রেলষ্টেশনে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে আসেন। আসার সময় নৌকায় মেঘনা নদী-বক্ষে সংগীত শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদ ভাটিয়ালী সংগীত পরিবেশন করেন এবং তিনি বঙ্গবন্ধুকে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা, ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যবস্থার গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”-তে লিখিয়াছেনঃ- “এই সময় সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার নবীনগর থানা কৃষ্ণনগরে জনাব রফিকুল হোসেন এক সভার আয়োজন করেন কৃষ্ণনগর হাইস্কুলের দ্বারোদঘাটন করার জন্য। আর্থিক সাহায্য পাওয়ার জন্য জনাব এন. এম. খান সিএসপি তখনকার ফুড ডিপার্টমেন্টের ডাইরেক্টর জেনারেল ছিলেন, তাঁকেই নিময়ন্ত্রণ করা হয়েছিল, তিনি রাজিও হয়েছিলেন। সেখানে বিখ্যাত গায়ক আব্বাসউদ্দিন আহম্মদ, সোহরাব হোসেন ও বেদারউদ্দিন আহম্মদ গান গাইবেন। আমাকেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। জনাব এন.এম. খান পাকিস্তান হওয়ার পূর্বে এই মহকুমায় এসডিও হিসাবে অনেক ভাল কাজ করার জন্য জনপ্রিয় ছিলেন। আমরা উপস্থিত হয়ে দেখলাম এন. এম. খান ও আব্বাউদ্দিন সাহেবকে দেখবার জন্য হাজার হাজার লোক সমাগম হয়েছে। বাংলার গ্রামে গ্রামে আব্বাসউদ্দিন সাহেব জনপ্রিয় ছিলেন। জনসাধারণ তার গান শুনবার জন্য পাগল হয়ে যেত। তার গান ছিল বাংলার জনগণের প্রাণের গান। বাংলার মাটির সাথে ছিল তার নাড়ির সম্বন্ধ। দুঃখের বিষয়, সরকারের প্রচার দপ্তরে তার মত গুণী লোকের চাকরি করে জীবিকা অর্জন করতে হয়েছিল। সভা শুরু হল, রফিকুল হোসেন সাহেবের অনুরোধে আমাকেও বক্তৃতা করতে হল। আমি জনাব এন.এম. খানকে সম্বোধন করে বক্তৃতায় বলেছিলাম, “আপনি এদেশের অবস্থা জানেন। বহুদিন বাংলাদেশে কাজ করেছেন, আজ ফুড ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর জেনারেল আপনি, একবার বিবেচনা করে দেখেন এই দাওয়ালদের অবস্থা এবং কি করে এরা বাঁচবে! সরকার তো খাবার দিতে পারবে না  যখন পারবে না, তখন এদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিতেছে কেন?” দাওয়ালদের নানা অসুবিধার কথা বললাম, জনসাধারণকে অনুরোধ করলাম, স্কুলকে সাহায্য করতে। জনাব খান আশ^াস দিলেন তিনি দেখবেন, কিছু করতে চেষ্টা করবেন। তিনি সন্ধ্যায় চলে যাবার পর গানের আসর বসল। আব্বাসউদ্দিন সাহেব, সোহরাব হোসেন ও বেদারউদ্দিন সাহেব গান গাইলেন। অধিক রাত পর্যন্ত আসর চলল। আব্বাসউদ্দিন সাহেব ও আমরা রাতে রফিক সাহেবের বাড়িতে রইলাম। রফিক সাহেবের ভাইরাও সকলেই ভাল গায়ক। হাসনাত, বরকতও ভাল গানই গাইত। এরা আমার ছোট ভাইয়ের মত ছিল। আমার সাথে জেলও খেটেছে। পরের দিন নৌকায় আমরা রওয়ানা করলাম, আশুগঞ্জ স্টেশনে ট্রেন ধরতে। পথে পথে গান চলল। নদীতে বসে আব্বাসউদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তার নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলিও যেন তার গান শুনছে। তারই শিষ্য সোহরাব হোসেন ও বেদারউদ্দিন তার নাম কিছুটা রেখেছিলেন। আমি আব্বাসউদ্দিন  সাহেবের একজন ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।” আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্ট করেছিলাম।” (তথ্যসূত্র: শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-১১০-১১১)

এই ঘটনাটি লেখক আনিসুল হক তাঁর “এখানে থামো না” উপন্যাসে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ- শেখ মুজিব নদীপারের মানুষ। শৈশব থেকেই নদীতে নদীতেই চলেছেন, ঝাঁপ পেড়েছেন, নেয়েছেন, বড় হয়েছেন। বাইগার খাল, মধুমতী নদী, পদ্মা। এই নদীপথে কত কত মানুষের সঙ্গে তিনি চলেছেন। আব্বার সঙ্গে গেছেন মাদারীপুর। তার নেতা সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সঙ্গে ছোট্ট নৌকায় উঠে গেছেন গোপালগঞ্জে। নির্বাচনের কাজে। আব্বাসউদ্দীনের সঙ্গে গেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আশুগঞ্জ ষ্টেশনে যাওয়া-আসার জন্য নৌকায় উঠতে হয়েছে। নৌকায় আব্বাসউদ্দীন অনুচ্চ কণ্ঠে গান ধরেছেন। ভাটিয়ালি গান। সেই গান শুনতে শুনতে মুজিবের মনে হচ্ছিল, সমস্ত চরাচর যেন নীরব মনোযোগের সঙ্গে কান পেতে আব্বাসউদ্দীনের গান শুনছে। যেন নদীর ঢেউ গুলোরও শুনছে এই মরমি শিল্পীর অপরূপ কণ্ঠস্বরের মায়াভরা সুর-তান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আশুগঞ্জ যাওয়ার পথে মেঘনাবক্ষে আব্বাসউদ্দীন আহমদ তার ব্যাকব্রাশ করা চুলে মেঘনার পানিভেজা আঙুল চালাতে চালাতে পানখাওয়া পাতলা ঠোঁটে বিড়বিড় করে বলেছিলেন, মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ঘড়যন্ত্র চলছে। বিরাট ষড়যন্ত্র। বাংলা যদি রাষ্ট্রভাষা না হয়, তাহলে বাংলার বিপুল কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতি শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গান তুমি ভালোবাসো, তার মাধুর্য নষ্ট হয়ে যাবে, মর্যাদা নষ্ট হয়ে যাবে। গান থাকবে না, ভাষা থাকবে না, কবিতা থাকবে না। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে। কথা দাও, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে তোমরা আপ্রাণ চেষ্টা করবে। বলো, করবে।’
আব্বাস ভাই, আপনি তো আমার মনের কথাই বলেছেন। আমার মধুর বাংলা ভাষা আমার মায়ের ভাষা। কত গান, কত কবিতা, শুনলে চোখে পানি আসে। এই জাতির কৃষ্টি তো আমাদের রক্ষা করতেই হবে। আমি আপনাকে কথা দি্িচছ, আামি আমার জীবন দিয়ে হলেও বাংলা ভাষার মর্যাদা রাখব। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হবে।’ তরুণ মুজিব সেদিন বলেছিলেন আজ তিনি বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, শুধু বাংলা রাষ্ট্রবাষা হবে না। বাংলা ভাষার রাষ্ট্রও হবে।” (তথ্যসূত্র: আনিসুল হক, এখানে থেমো না, ঈদ সংখ্যা ২০১৯, প্রথম আলো, পৃষ্ঠা- ২২২-২২৪)।

স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থাপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদীরা ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট ভারত উপ-মহাদেশকে দ্বিখন্ডিত করে পাকিস্তান নামক একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্র স্থাপন করে। এই রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল তথা “পূর্ব বাংলা” ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের একটি উপনিবেশ মাত্র। পশ্চিমাঞ্চলের শাসকরা পূর্ববাংলার জনগণকে নির্মমভাবে অর্থনীতিক শোষণ, অত্যাচার করে এবং বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালী জাতির মর্যাদাহানি করছিল। বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালি জাতির সার্বিক মুক্তির জন্য ১৯৪৮ সাল থেকেই রাজনৈতিক সংগ্রাম শুরু করেন। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বর্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও শাসক গোষ্ঠীর পরাজয়ের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বাঙ্গালি জাতি চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে। স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র স্থাপিত হয়। আশুগঞ্জের মেঘনা নদীর বক্ষে বঙ্গবন্ধু যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা প্রকৃতপক্ষে পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের গবেষক-লেখকদের প্রতি আমাদের সবিনয় অনুরোধ তাঁরা বিস্তারিত লিখবেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর প্রতি বিজয়ের মাসে বৃহত্তর কুমিল্লাবাসীর বিন¤্র শ্রদ্ধা। “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু”
লেখক: অনুসন্ধানী পাঠক ও সংকৃতিকর্মী, অবসরপ্রাপ্ত রিডার, পুলিশ সুপার-এর কার্যালয়, কুমিল্লা-চাঁদপুর-লক্ষীপুর-ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা।








© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};