ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
108
ঠিকানা সন্ধানে
Published : Tuesday, 8 October, 2019 at 12:00 AM
ঠিকানা সন্ধানেশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
একটি স্মৃতি।
আমার মাকে ১৩ বছর বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়। বাবার বয়স ১৮+। তিনি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। দাদু বাবার পড়ার খরচ নির্বাহ করতে অপারগ হয়ে পড়ায় জনৈক আত্মীয়ের পরামর্শে ও সহযোগিতায় পড়ার খরচ প্রাপ্তির নিশ্চিয়তায় আমার মা -বাবার বিয়ে। মায়ের বাবা ধনী ব্যক্তি ছিলেন, অনেক জমি তাঁর, ধান-পাট বিক্রি করেন। এছাড়া ছয়টি পুকুর, ছয়টি ছাড়া বাড়ি, প্রচুর আম-কাঁঠাল-নারকেলের বাগান। অভাব নেই। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে মা ঘরে বসে সময় কাটাতেন। সুতরাং বিয়ে দেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় পথ ছিল না। আমাদের অভাবের সংসারে মা কতটা বেমানান বলে মনে হলেও কোনোদিন মা এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি, নিজের অদৃষ্টকে মেনে নিয়েছেন স্বাভাবিকভাবে। সে স্মৃতির কথা বলব।
    বছরে মা দু’বার মামা বাড়িতে নাইয়র যেতেন। প্রতিবারই দেখেছি- দাদু (নানা) সকালের দিকে মাকে নিতে এসেছেন। পান- তামাক খাওয়ার পর মেয়েকে নিতে এসেছেন, তা বেয়াই- বৈয়াইনকে অনুরোধের সুরে আবেদন জানাতেন। প্রথম প্রথম না শোনার ভান, কৃত্রিম কাজে ব্যস্ততা এবং এক সময় দাদা বলতেন- ‘বেয়াই, এটা আমার ব্যাপার না, আপনার বৈয়াইনকে বলেন।’ বেয়াইনের কাছে কথা পারলে তিনি বলতেন আপনার বেয়াইকে বলেন। আর এখন গেলে বাড়ির কাজ করবে কে? এভাবে দুপুর গড়াত, মা এসব বিষয়ে নির্লিপ্ত কিন্তু দু’কান খাঁড়া- কী কথাবার্তা হচ্ছে তা শুনতেন এবং মনে মনে শ্বশুর-শাশুড়ির সুমতির জন্য ইষ্ট দেবতাকে প্রার্থনা করতেন। এর মধ্যে দুপুরে খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে। অনুমতি মিলছে না, মা খুবই উচাটনে। বাপের বাড়ি যেতে তো প্রস্তুতির প্রয়োজন। অনেক অনুনয় বিনয়ের পর যখন সম্মতি পাওয়া গেল ৮/১০ দিনের জন্য এবং মাকে পৌঁছিয়ে দেওয়ার শর্তে, তখনই বাবা স্কুল থেকে বাড়ি এলেন। বাবা স্কুল থেকে বিকেলে ফিরে এলেও খাওয়া-দাওয়া করতেন না। তিনি এসেই সংবাদটি জেনে উদাসীন হতেন, মা প্রস্তুতি নিয়েছেন, আমাকে জামাটি পরিয়ে দিয়েছেন। যথারীতি গুরুজনদের প্রণাম জানিয়ে বাবার সম্মুখে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে অস্পষ্ট ভাষায় বলতেন- ‘একবার যাইয়েন’।
     দাদু (নানা) মা ও আমাকে নিয়ে বিকেলে রওয়ানা হয়েছেন, বেয়াই-বৈয়াইন থেকে বিদায় বার্তা জানিয়ে। আমাদের পশ্চিম পুকুরের দক্ষিণপাড় ধরে পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলে নাপিতবাড়ি, তারপর বালুর পুকুরপাড়, যতীন্দ্রের বাড়ি এবং সুরেরবাগ, ডেক্রিখলা পার হলে বরকোটা বিটেশ্বর গ্রামের মাঝ দিয়ে সড়ক পথে মাদলা হয়ে দাদুর গ্রাম নোয়াদ্দায় প্রবেশ এবং প্রায় ৩ মাইল পথ মাড়িয়ে মামাবাড়ি, মায়ের বাপের বাড়ি। আমরা যখন মাহাম্মদপুর থেকে রওয়ানা হই- মা যেভাবে হাঁটতে শুরু করতেন, আমি দৌঁড়ে দৌঁড়ে মার পিছু নিতাম। রীতিমত দম নিতে হতো। দাদু কাপড়ের পুটলাটি নিয়ে অনেক পিছনে আস্তে আস্তে আসতেন। এ তিন মাইল মা যেন উড়ে চলে আসতেন, এতটুকু হয়রান হতেন না, বাপের বাড়ি চলে এসে দিদিমাকে (নানী) প্রণাম করে জড়িয়ে ধরে শুধু কান্না আর কান্না। এ কান্নার ভাষা আমার জানা ছিল না। তাতে আনন্দ কতটুকু, অভিমান কতটুকু, কষ্ট কতটুকু, প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তি কতটুকু - তা কিছুই বুঝতাম না। যে ৮/১০দিন মা বাপের বাড়ি থাকতেন, কত কথা জমা ছিল, তা শেষ হতে চায় না। স্নান করার সময় পান না, খাওয়ার তাগাদা অনুভব করেন না, চোখে ঘুমও যেন হারিয়ে গছে। শুধু দিদিমার পেছনে পেছনে, বাড়ির এধার-ওধার হাঁটাহাঁটি, গুনগুন করে গান-মুক্ত বিহঙ্গ। এরই মধ্যে বাবা একবার এসে ঘুরে গেছেন। বাবা যখন মামাবাড়ি আসেন, মা বাবার কাছে গিয়ে বাড়ির খোঁজ খবর নেন, অন্যরকমভাবে কথা বলেন, অনেক কথা বলেন, হেসে হেসে কত কথা বলেন - এ মা বাড়ির মা নন, মামা বাড়ির মা। মা-বাবার এ সান্নিধ্য - আমাকে তৃপ্তি দেয়, আনন্দ দেয়- কোথায় যেন আনন্দ অনুভূতি অনুভব করি। চিরকালীন এ অবস্থায় বজায় থাউক, মনে মনে প্রার্থনা করি। এখানে মা বাবাকে একান্তভাবে পেয়ে যান, কত আপন লোকটিকে কাছে পেয়ে আনন্দ সাগরে ভাসতে থাকেন। মা হাসেন, প্রাণভরে হাসেন। এভাবে বাড়িতে মা বাবাকে কখনো কোনোদিন মিশতে দেখিনি, বৃদ্ধবয়সেও।
আর যেদিন মা স্বামীবাড়ি ফিরবেন, আমার মা অন্যরকম হয়ে যান। মুখে হাসি নেই, কথায় মনোযোগ নেই, কাপড় গুছানোর তাগাদা নেই, মেয়েকে শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যাবেন দাদু (নানা), সেজন্য দিদিমা (নানী) নানা জিনিস গুছিয়ে দিচ্ছেন, কাজের লোকটি মাথায় করে পৌছিয়ে দিবে। কী জিনিস নিবে বা নিতে চায় মা- দিদিমার কথায় সায় নেই। একসময় চোখের জলে আর্ত চীৎকার করে দিদিমার গলা জড়িয়ে অস্পপষ্ট কত কথা বলে মা আমাকে নিয়ে দাদুর সাথে রওয়ানা দিচ্ছেন- দাদু ও কাজের লোকটি এগিয়ে গেছে, মা তখনও বের হতে পারেননি- অর্থাৎ বের হতে চাচ্ছেন না। বলি- ‘মা, চলো। দাদু এগিয়ে গেছে।’ যে তিন মাইল বাপের বাড়ি আসার সময় ক্ষণিকের সময় ব্যয় করতে হয়েছে, স্বামীরবাড়ি শ্বশুরবাড়ি যেতে পথ আর ফুরায় না। আমি মার পেছন পেছন দৌঁড়িয়ে মামাবাড়ি গিয়েছি, নিজের বাড়িতে আসতে মাকে বলতে হয়েছে, তাড়াতাড়ি চলো, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দাদু তো ফিরবেন আবার।
    গ্রামবাংলার এই শাশ্বত চিত্র আজ আর নেই। ১৩ বছর বয়সে বিয়ে অর্থ্যাৎ বাল্যবিবাহ। অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেকালে তো উপযুক্ত পাত্রী। কু-ফলের মধ্যে-সু-ফল খোঁজ করব না, কিন্তু আজকাল সু-ফলের মধ্যে যে কু-ফল লুকিয়ে আছে, তা তো সহ্য করতে পারি না। ১৩ বছরে মার বিয়ে হওয়াতেই কি বাপের বাড়ির প্রতি এতটান? এই মা বৃদ্ধ বয়সে যখন আমার কাছে আছেন, তখন প্রতিদিনই বলতেন- ‘আমাকে বাড়ি রেখে আয়।’ বলতাম- ‘বাড়িতে তো কেউ থাকে না, তুমি একা কীভাবে থাকবে?’ বলতেন, ‘তের বছর বয়সে শ্বশুরের ভিটায় এসেছি, এটা আমার শ্বশুর আর স্বামীর ভিটা, আমি একা থাকতে পারব। তোর বাসায় থাকব না, থাকতে ভালো লাগে না। আমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দে।’ আমি হতবাক হয়েছি, বাস্তবতা কিছুতেই মানতে চাননি। শ্বশুর-স্বামীর ভিটায় যাবেনই। বাবাকে তো আনতে পারেনি। কাজের লোক নিয়ে একা থেকেছেন জীবনের শেষদিনটি পর্যন্ত। মাটির এ মায়া কত গভীরে, তা উপলব্ধি করি নিজের ঘরটির দিকে তাকিয়ে। যেখানে যাই, কত আদর-যতœ পাই। থাকার কত না সুব্যবস্থা, খাওয়া-দাওয়া কতই না বাহারি আয়োজন। কিন্তু নিজের বাসার (বাড়ির) মতো তো নয়। এখানে যে শান্তি-স্বস্তি-আরামবোধ-স্বাচ্ছন্দ্য- অন্যকোথাও আছে কি? নেই- নেই- নেই।
মা বাবার বাড়িতে (স্বামীর ভিটায়) থাকার তীব্র আকাক্সক্ষা, তীব্র আকর্ষণ- অনেক সময় মেনে নিতে পারিনি। বুঝাতে চেষ্টা করেছি- অনেক বাস্তবতার যুক্তি দেখিয়ে সেকেলে বলে উষ্মাও প্রকাশ করেছি। এখন বুঝি- এটা ছিল আমার পক্ষে অমানবিক, হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর প্রস্তাব। আজ আমি তা তীব্রভাবে অনুধাবন করছি। তাই বাবার বাড়ির সবটুকু বিক্রি করতে গিয়ে প্রাণটা কেঁদে উঠেছে। কিন্তু কোনো ভাই বা আমি যে আর গ্রামের বাড়িতে থাকব না। তাই বাবা-মার শ্মশানসহ পাঁচ শতক জায়গায় চারদিকে রক্ষা দেয়াল, তার উপরে লোহার বেড়া দিয়ে ঘেরাও করা হয়েছে। ঘরটি আধা পাকা করে নতুন করে তুলেছি, বাবা-মার শ্মশান পাকা করে বেঁধে টাইলস বসিয়ে ‘শ্মশান স্মারক’ স্থাপন করে দিয়েছি। বাড়ির গেইট তৈরি করে বাবার নামে অর্থাৎ ইন্দুভূষণ ভৌমিক এর পরিচিতি মূলক ‘ইন্দুপুরী’ বাড়ির নামফলক লাগিয়ে দিয়েছি। আমরা বলতে পারছি, পারব- আমার বাবার বাড়ি আছে, এখানে বাবা-মা বাস করতেন, এখনও বাস করেন। তাঁরা ঘুমিয়ে আছেন পরম তৃপ্তি নিয়ে যেমনটি মামাবাড়িতে ছোট বেলায় মা-বাবার আনন্দময় মুহূর্তটি দেখেছিলাম। ঠিক তেমনিভাবে আছেন তাঁরা। আমরা অর্থাৎ ভাইবোনরা যতদিন বেঁচে থাকব, বাবার বাড়িতে যাব, তাঁদের দেখা না পেলেও সান্নিধ্য পাবো, তাঁদের কথা শুনতে না পারলেও পরোক্ষভাবে মাথায় অদৃশ্য হাতের ¯েœহ-স্পর্শের ছোঁয়া পাব। মনে করব, করি- আমাদের বাবা-মা ‘ইন্দুপুরী’তে আছেন, ভালোই আছেন, অবিকল আগের মতো।
রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন-
    ‘সব ঠাঁই মোর ঘর আছে, আমি সেই ঘর মরি খুঁজিয়া।
দেশে দেশে মোর দেশ আছে, আমি সেই দেশ লব যুঝিয়া’।।  

আমি বলি-
আমি বাবা-মার ঘরই খুঁজব দেশে দেশে ‘দেশ’ খুঁজব না। আমার দেশ বাংলাদেশই আমার দেশ। বাবার ঘরই আমার ঘর। এই ঘরই খুঁজে বের করব। এ ঘর আছে ‘ইন্দু-পুরী’ নামক ইন্দুভূষণ ভৌমিকের কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার মাহাম্মদপুর গ্রামে। এখানে চিরকাল আমার বাবা ইন্দুভূষণ ভৌমিক ও মা প্রভাবতী ভৌমিক সুখে-আনন্দে বাস করছেন, করবেন।
    ‘যদি চিনি, যদি জানি বারে পাই, ধুলারেও মানি আপনা-
ছোটে বড়ো হীন সবার মাঝারে করি চিত্তের স্থাপনা।’     





© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], new[email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};