ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
112
একটি আদর্শ ঃ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ
Published : Thursday, 12 September, 2019 at 12:00 AM
একটি আদর্শ ঃ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
সমকালের উপকণ্ঠে একজন কিংবদন্তী রাজনৈতিক অভিভাবক আদর্শবান জাতীয় নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ২৩ অগাস্ট ২০১৯, শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৮।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা: আলহাজ কেয়াম উদ্দিন ভূইয়া, মাতা: আফজারুন্নেছা, পিতা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। তিনভাই, তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। পিতার পদবি ‘ভূইয়া’ হলেও তিনি নিজের নামের সঙ্গে সে পদবিটি সংযোজন করেননি। হয়ত এ পদবিটির মধ্যে এক ধরনের বুর্জোয়া গন্ধ ছিল। এটা আমার অনুমান।
লেখাপড়া করেছেন হোসেনতলা স্কুল, জাফরগঞ্জ রাজা ইনস্টিটিউশন, দেবিদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেবিদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন প্রধান শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন শ্রদ্ধাভাজন বসন্তচন্দ্র দাশকে এবং ভিক্টোরিয়া কলেজে তাঁর অধ্যক্ষ ছিলেন পরম বৈষ্ণবাচার্য শ্রদ্ধাভাজন রাধাগোবিন্দ নাথ। মোজাফফর আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে ¯œাতক সম্মান ও ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে উত্তীর্ণ হন। পরে ইউনেস্কোর ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সরকারি কলেজে অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ঢাকা কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। তখন ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ হলেন সালাম-রফিক-জাব্বার-বরকত প্রমুখ। এই উত্তাল সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেই বুঝেছিলেন যে, তাঁর জন্য শিক্ষকতা পেশা সঠিক নয়। কারণ, মননে বাল্যবয়স থেকেই একটি আদর্শিক চেতনা অন্ত:করণকে অনুসন্ধানী করে তুলেছিল। তিনি তাঁর আত্মজীবনী ‘সময়ের কণ্ঠস্বর’ গ্রন্থে লিখেছেন-
১.    ‘প্রবল বৃষ্টি-বাদলে কামলারা মাছ ধরে। .... দুপুরে খেতে বসলাম সবাই। আমাদের পাতে বড় বড় কৈ। কামলাদের পাতে কুচি চিংড়ি। ক্ষুব্ধ হলাম। উঠে পড়লাম বাসন ঠেলে। মাছ ধরল ওরা, কষ্ট করল ওরা, অথচ পাবে না ভোগের অধিকার? এই ক্ষুব্ধতা আজও মনে ধারণ করে আছি।
২.    ব্রিটিশ আমলে ত্রিপুরার (কুমিল্লা) চান্দিনায় মহাত্মা গান্ধী আসবেন। ... সেই কিশোর বয়সে তিনিও চান্দিনা গেলেন গান্ধীকে দেখতে। লিখেছেন- ‘ দেখতে পেলাম একজন মানুষ। মহাত্মা গান্ধী। পায়ে খড়ম, পরনে গামছা, গা খালি, হাতে লাঠি, কোমরে ঘড়ি। বক্তৃতা না বাণী, ‘দাঙ্গাবাজি ছোড় দো, হিন্দু মুসলমান ভাই হো, এক হো ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদকা খতম কর।’
৩.    ‘স্কুলে বিতর্ক সভা। বিষয় ‘ত্যাগে আনন্দ, না ভোগে আনন্দ’। বিপুল ভোটে পাশ হয় ‘ত্যাগে আনন্দ; আমি খুশি।’
৪.    ‘আমি (তখন) নবম শ্রেণির ছাত্র। বইপুস্তক ও পুরুষজনদের মাধ্যমে পলাশীর যুদ্ধ, কাইভ, সিরাজদ্দৌলা, মীরমদন, মোহনলাল, মীরজাফর, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ, সিপাহী বিদ্রোহ, জালিওয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকা- বিরাট ষড়যন্ত্র মামলা, ক্ষুদিরামের ফাঁসি, অভিরামের দ্বীপান্তর, শান্তি-সুনীতির ইংরেজ শাসক হত্যা, সূর্যসেনের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতা সংগ্রামে গান্ধী- এসবের সঙ্গে পরিচিত হয়ে চলেছি।
এখন মনে হয় ওই বয়সই সত্যিকার রাজনীতি বোঝার বয়স। এ বয়সে মানুষ অন্যায়, অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়। এ বয়সই মন একটা আদর্শ আঁকড়ে ধরতে চায়। এ বয়স বিপ্লবী মনোভাবের জন্ম দেয়। এ বয়স মানুষকে প্রতারণা, রাজনীতির নামে ব্যবসা ও ধাপ্পাবাজি আকর্ষণ করে না। এ বয়স বিশ্বাস করে রাজনীতি ব্রত, দেশসেবা ও জনসেবা।’
শেষ জীবনেও এই উপলব্ধি থেকে একবিন্দুও সরে আসেননি কিংবদন্তী আদর্শিক মহানায়ক। এ প্রসঙ্গে তাঁর মৃত্যুর পর স্মৃতিকথায় ¯েœহাভাজন পিয়াস মজিদ লিখেছেন-
‘(এবার) জননেতা মোজাফফর আহমদ বললেন, ‘বাড়ির সিকিউরিটি তোমরা বয়সে ছোট হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের ‘আপনি’ বলল আর এই লোকগুলো বয়স্ক কিন্তু গরিব খেটে খাওয়া, ময়লা জামা পরা দেখে ‘তুমি’ বলেছে। শুধু তাই নয়, আমার গৃহকর্মী মেয়েটা তোমরা ঘরে ঢুকতেই খাবারের কথা জানতে চাইল আর এই লোকগুলো ১-২ ঘন্টা বসে থাকলেও জানতে চায়নি ওরা কিছু খাবে কি না। কেন জান? ...
ওই সিকিউরিটি, এই গৃহকর্মী- এরা বুঝেছে বয়সে ছোট হলেও তোমরা ধোপদুরস্ত, আমার শ্রেণির লোক। তাই তোমাদের আপনি বলা, আসতে না আসতে খেতে বলা আর ওই ময়লা জামার মেহনতি মানুষেরা বয়সে বড় হলেও তারা বাড়ির কর্তার একই শ্রেণির মানুষ না...’
সমকালে রাজনীতির চোরাগলির নানা পথের কথা শুনে থাকি। আর এসব পথ ধরে অনেকে বিশেষ একটি আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হয়ত বা রাজনীতি করার মহাসড়কে অভিযাত্রা শুরু করেন। তারপর যখন চৌমাথায় গিয়ে পৌঁছেন, তখন পেছনের রাস্তা হারিয়ে ফেলেন, ক্ষণিক থেমে সুবিধাজনক পথ ধরে হাঁটতে থাকেন অথচ এই পথে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়নি। তারপর কতকথা- রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, রাজনীতিতে শত্রু-মিত্র সমান্তরাল, যে শত্রু তিনি মিত্র হয়ে যান, মিত্র শত্রু বনে যান। রাজনীতি রাজার নীতিও নয়, নীতির রাজাও নয়, রাজনীতি হলো ক্ষমতা আরোহণের সোপান। আর সোপান ধরে যত উপরে ওঠা যায়, আবার পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙ্গার সম্ভবনাও নিরন্তর। কাজেই রাজনীতিতে আজ যে রাজা, পরের দিন তিনি নিঃস্ব, অনেকটা উপেক্ষিত, ঘৃণিত, অপাক্তেয়। আর যিনি নীতি আদর্শে প্রতিষ্ঠিত রাজা, তিনি কুঁড়েঘরে বাস করলেও তিনিই সর্বজন স্বীকৃত সর্বকালের সর্বমান্যতায় অমলিন স্মরণীয় যুগ পুরুষ। এই মুহূর্তে আমি একমাত্র অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছাড়া আর দ্বিতীয়জনকে খুঁজে পাচ্ছিনা।
অনেকে যখন বলে যে, নীতি আদর্শ ধরে রেখে আজীবন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ কি পেলেন? অন্ধ আর মূর্খরা তা দেখতেও পাবে না, বুঝতেও পারবে না। সুতরাং তাদের প্রশ্নটি তাদের মধ্যেই বিরাজিত থাকুক। তবে এ সংখ্যাটি নেহাৎ কম নয়। এখন যারা রাজনীতি করেন, তাদের মধ্যে শতকরা নব্বই জন কিন্তু এ প্রশ্নের ঘোরেই আছেন।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ যখন মনে প্রাণে বুঝলেন, শিক্ষকতা পেশা তাঁর জন্য নয়, তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে পুরোপুরিভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। রাজনীতিতে নেতা মানলেন রাশিয়ার লভোস্কিকে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের অধীনে দেবিদ্বার আসনে নির্বাচন করলেন। নির্বাচনে মুসলিম লীগের জাঁদরেল প্রার্থী মন্ত্রী মফিজউদ্দিনকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে সংসদ সদস্য হলেন। এভাবে জাতীয় রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করলেন।
রাজনীতি করতে হলে একটি আদর্শিক প্লেটফর্ম থাকতে হয়। ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগ বিরোধী নানা দল সম্মিলিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিল। তাতে শেরে বাংলা-হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী-মাওলানা ভাসানী ফ্রন্টের নেতৃত্বে ছিলেন, তাঁরা নিজেরা নিজস্ব নীতি-আদর্শে এক ছিলেন না। সুতরাং যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পর স্ব স্ব অবস্থানে সরে যেতে থাকে। একসময় ১৯৫৭ সালের ২৫ ও ২৬ জুলাই ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক সম্মেলনের মাধ্যমে ন্যাপ জন্মলাভ করে। ন্যাপ গঠিত হয় বাম-প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে। এভাবে গরিব ও কৃষককে সমাজতন্ত্রের আদর্শে দীক্ষিত করা ও সমাজতন্ত্রের সমর্থক বানানোর কাজে ন্যাপের নেতাকর্মীরা আত্মনিয়োগ করেন। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এই নীতি-আদর্শে নিবেদিত হয়ে অন্যতম নেতৃত্বের শীর্ষ পদে আসীন হলেন। তিনি আজীবন বিশ্বাস করতেন- ‘সমাজতন্ত্রই হলো শোষণমুক্তির একমাত্র পথ।’ সমাজতন্ত্রের আদর্শে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠি নাখোশ ছিল প্রচ-ভাবে। তাই ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব সরকার তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ারা ও হুলিয়া জারি করে। তিনি আত্মগোপনে চলে যান। প্রায় আট বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে প্রকাশ্য রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা দাবি-নামা জাতির কাছে উত্থাপন করেন। রাজনীতি তখন অন্যমাত্রায় মেরুকরণ হতে শুরু করেছে। তখনকার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ লিখেছেন-
‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার চেয়ে দুই বছরের বড়। তাঁর সঙ্গে আমার আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। মুজিবের উদার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, গুছিয়ে কথা বলতেন। আমি, আসাবউদ্দিন সাহেব ও মোহাম্মদ তোহা যখন নেতা খুঁজছিলাম তখন মুজিব সাড়া দিয়েছিলেন। মুজিব আমাকে বললেন, বামপন্থীরা আমার সঙ্গে আসবে তো? আর দাদারা কী করবে। দাদারা মানে আন্ডারগ্রাউন্ডের নেতা। তখন আমি মুজিবকে দাদাদের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিই। দাদারা মুজিবকে বলল, পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হলে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে সুবিধা হবে। তুমি এগিয়ে যাও। আমরা তোমার সঙ্গে আছি, অতএব আজকের রাজনীতি পরিবর্তনে সৎ, মেধাবী ও যোগ্য যুবকদের এগিয়ে আসতে হবে। শেখ মুজিবকে দেখেছি শোষিত মানুষের পক্ষের লোক হিসেবে।’
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন ৬-দফা ঘোষণা করেন, মওলানা ভাসানী তা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হন। কিন্তু মোজাফফর আহমদ সাহেব বুঝানোর পর মওলানা সরাসরি গ্রহণ করেন। শুধুমাত্র ৬-দফার সঙ্গে সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী কিছু ধারা যোগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে ন্যাপ দু’ভাগ হয়ে যায়। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। যেহেতু অন্য ন্যাপ-এর নেতৃত্বে ছিলেন মওলানা ভাসানী। সেজন্য ন্যাপ (ভাসানী) ন্যাপ (মোজাফফর) নামে পরিচিতির ক্ষেত্রটি রচিত হয়। বলা হয়- ন্যাপ (ভাসানী) চীনপন্থী এবং ন্যাপ (মোজাফফর) মস্কোপন্থী। আর মণিসিংহের কমিউনিস্ট পার্টি দৃশ্যত পাকিস্তানে নিষিদ্ধ ছিল, তাঁর ছাত্রফ্রন্ট ছাত্র ইউনিয়ন ন্যাপ (মোজাফফর) এর অঙ্গ দল হিসেবেই যুক্ত ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।
উল্লেখ্য ১৯৬৯-এ আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য মোজাফফর আহমদকে কারাবরণ করতে হয়। পরে মুক্তি লাভ করে আইয়ুব খান আহুত রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিল বৈঠকে তিনিও প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেন এবং প্রবাসী সরকারের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিবাহিনী গঠন, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন সদস্যদের সমন্বয়ে ১৯ হাজার সদস্যের বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন, মুক্তিবাহিনী ও গেরিলা বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং তাদের জন্য অস্ত্রশস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহ, স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক সমর্থন লাভের জন্য বুদাপেস্ট শান্তি সম্মেলন ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। তিনি লিখেছেন-
‘বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে মুজিব নগর অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সোভিয়েত দূতাবাসে গিয়ে তাদের সমর্থক পাওয়ার জন্য আমাকে খুঁজছিলেন, কা-ারিবিহীন জাতির কাছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতে অবস্থিত বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবিরে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি।’
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ রাজনীতি করেছেন আদর্শকে সমুন্নত রেখে। এক্ষেত্রে তিনি আপস করেননি কখনো। তিনি বলেছেন-
‘আমি অনেক সময় ‘একলা চলরে’ নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি। এতে অনেকে ভুল বুঝলেও দেশ ও দেশের মানুষের জীবনমান উন্নতকরণে কখনো পিছপা হইনি।’
আমরা দেখেছি- ২০১৫ সালে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’টি বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর মনে হয়েছে- তিনি যেমনভাবে দেশ ও জনগণকে সেবা করতে চেয়েছিলেন, তা করতে পারেননি, বা তা করার সুযোগ পাননি। এই চারিত্রিক দৃঢ়তা তাঁকে আদর্শিক রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। তিনি আদর্শবান রাজনীতিবিদ ছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু একসময় বলেছিলেন-
‘তুমি কর্মী ধরে রাখো আদর্শ দিয়ে আর আমাকে রাখতে হয় পারমিট দিয়ে।’
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের কতিপয় উপলব্ধির কথা উল্লেখ করতে চাই তাঁরই বয়ানে।
১.    ‘নেতৃত্ব মানে আমাদের দেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ ডিগ্রিধারী দুর্নীতিবাজদের বোঝাচ্ছিনা। এজন্য যোগ্য, সৎ ও মেধাবী নেতৃত্ব প্রয়োজন, যা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে ছিল।’
২.    তারা ক্ষমতার রাজনীতি করে। নীতি ও আদর্শ বর্তমান রাজনীতি থেকে নির্বাসিত হয়েছে। সর্বত্র হতাশা বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষের কথা দুই দলের (আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেই বুঝাচ্ছেন) নেতাদের মাথায় নেই। ... ভালো কাজ বলতে যা বোঝায় তা আন্দোলনের মাধ্যমেই হয়েছে।
৩.    ‘সু’ মানে ভালো আর ‘শীল’ মানে নাপিত, অর্থাৎ সুশীল মানে ভালো নাপিত। আমাদের দেশের সুশীল সমাজের বর্তমান অবস্থা হচ্ছে ভালো নাপিতের মতো।
৪.    বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের মনের কথা বুঝতেন, তাই তিনি জাতির পিতা হয়েছেন। জনতা যা চায় তারা তা-ই পায়।
৫.    দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি হতাশ নই। দেশ এবং রাজনীতি কলুষমুক্ত করতে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ শতায়ু হতে পারেননি। ৯৮ বৎসরে চলে গেলেন। দৃশ্যত বার্ধক্যই তাঁকে কাবু করেছিল। তিনি যখন নিজেকে প্রশ্ন করেন- ‘অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আমি কি এখন কান্ত?’ তাঁর জীবনে কান্তি এসেছে নানাভাবে, কিন্তু তা আবার স্বল্পসময়েই দূর হয়ে গেছে। বলেছেন-
‘পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়নি কখনো। অনেক কিছুই গ্রহণ করছি সহজভাবে। আবার কিছু কিছু জিনিস মেনে নিতে পারিনি। প্রতিবাদ করেছি।... স্বাভাবিক অর্থেও আমি তরুণ নই। আমার বেশ বয়স হয়েছে। আমার মনে সজীবতা আজ অক্ষুণœ।’
কতটা মনের শক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং যাপিত আদর্শের প্রতি দৃঢ় অবস্থানে আস্থাশীল ছিলেন তিনি, উপর্যুক্ত উক্তিতে তা-ই স্পষ্ট হয়ে যায়।
তবে তিনি বিশ্বাস করতেন- সমাজ পরিবর্তনশীল। ইতিহাস, বিজ্ঞান, অভিজ্ঞতা এ সাক্ষ্যই বহন করে। ‘শোষণমূলক’ সমাজ ব্যবস্থা বহাল থাকবে যতদিন, ততদিন একে বদল করার রাজনীতিও থাকবে। সংগ্রামও চলবে।’
তাঁর মৃত্যুর আগে না বুঝলেও এখন বুঝতে পারছি-
‘অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ একটি নাম, একটি ইতিহাস, একটি আদর্শ।’ কোনো কোনো মৃত্যু দূরে ঠেলে দেয়, আমরাও ভুলে যাই সময়ের আবর্তে। আবার কতিপয় মৃত্যু জীবনাদর্শে স্থায়ী আসন পেতে বসে অজান্তে। মোজাফফর আহমদের মৃত্যুটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করতে চাই।
শ্রদ্ধাভাজন আদর্শবান নির্লোভ জননেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আপনি চলে গেলেন অনেক অপেক্ষার পর, আপনি যেমনটি চেয়েছিলেন, তেমনটি হয়ত দেখে যেতে পারলেন না, আভাসটুকু পেয়েছেন কিনা তাও জানি না। যদি সমাজ বদলের জন্য সংগ্রামের প্রয়োজন হয়, তার দায়িত্ব কাদের কাছে রেখে গেলেন বা দিয়ে গেলেন, চারদিকে তাকিয়ে তো কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা। আপনি যে বলেছেন-
‘আমি দেখতে পাই, সমাজতন্ত্রের তথা শোষণমুক্ত সমাজের উজ্জ্বলতার ভবিষ্যৎ। আমি সংশপ্তক। আমি খুঁজে ফিরি পরশপাথর নিবেদিতপ্রাণ কর্মী।’
তারা কোথায়? তারপরও একটি প্রশ্ন। জানি আপনি উত্তর দেয়ার অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন। সেভাবে উত্তরও প্রত্যাশা করি না। প্রশ্নের মধ্যেই উত্তরটা খুঁজে নেব।
‘হে সংশপ্তক, বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় শেখ হাসিনার প্রতি আপনার আশীর্বাদ, প্রত্যাশা ও বিশ্বাস- নির্ভরতা আছে কি?’





© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};