ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
68
আশুরা আন্তধর্মীয় ঐক্যের প্রতীক
Published : Tuesday, 10 September, 2019 at 12:00 AM
মুফতি তাজুল ইসলাম   ||
আরবি পঞ্জিকার প্রথম মাস মহররম। এ মাসের রয়েছে অনেক ফজিলত ও মাহাত্ম্য। আল্লাহর কাছে যে চারটি মাসে যুদ্ধবিগ্রহ করা হারাম, মহররম তার মধ্যে অন্যতম। এর দশম দিনকে ‘ইয়াওমে আশুরা’ বলা হয়। আশুরার দিনটি মানব ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও একটি স্মরণীয় দিন। মুসলমানরা এ দিনটিকে রোজা পালন ইত্যাদির মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে আদায় করে থাকে। রাসুল (সা.) বলেছেন, রমজানের ফরজ রোজার পর উত্কৃষ্ট রোজা মহররম মাসের আশুরার রোজা। (সহিহ মুসলিম)
এদিনে কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় রয়েছে। করণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-
আশুরার দিনে আমল হিসেবে তিনটি কাজ করা যায়। প্রথমত, রোজা রাখা। এ আমলটি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আশুরা উপলক্ষে দুদিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। মহররমের ১০ তারিখের আগে বা পরে এক দিন বাড়িয়ে রোজা রাখার কথা হাদিস শরিফে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো এবং ইহুদিদের সাদৃশ্য বর্জন করো। তোমরা আশুরার দিবসের সঙ্গে তার আগে এক দিন বা পরে এক দিন সিয়াম পালন করো।’ (শরহে সহিহ ইবনে খুজায়মা, হাদিস : ২০৯৫)।
অন্য হাদিসে এসেছে, ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘একবার লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! ইহুদি ও নাসারারা ১০ মহররম দিনটিকে সম্মান করে। তখন রাসুল (সা.) বলেন, আগামী বছর বেঁচে থাকলে আমরা ৯ মহররমসহ রোজা রাখব।’ বর্ণনাকারী বলেন, ‘পরের বছর মহররম আসার আগে তাঁর ওফাত হয়ে যায়।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৩১, আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৩৭)
দ্বিতীয়ত, আরেকটি আমল হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর তা হলো, আশুরার দিনে যথাসাধ্য খাবারে প্রশস্ততা প্রদর্শন করা। যথাসম্ভব ভালো খাবার খাওয়া। হজরত আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবারে প্রশস্ততা প্রদর্শন করবে, সে সারা বছর প্রশস্ততায় থাকবে।’ (তাবরানি, মুজামে কবির, হাদিস : ১০০০৭; বায়হাকি, হাদিস : ৩৭৯৫)
এ হাদিসের বর্ণনা সূত্রে দুর্বলতা আছে। তবে হাফেজ ইবনে হিব্বান (রহ.)-এর মতে, এটি ‘হাসান’ বা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের হাদিস।
তৃতীয়ত, আরেকটি আমল যুক্তিভিত্তিক প্রমাণিত। আর তা হলো আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের শাহাদাতের কারণে তাঁদের জন্য দোয়া করা, দরুদ পড়া ও তাঁদের কাছ থেকে সত্যের ওপর অটল থাকার শিক্ষা গ্রহণ করা। এই তিনটি কাজ ছাড়া আশুরায় অন্য কোনো আমল নেই।
মহররম আসার সঙ্গে সঙ্গে হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের ওপর মাতম করা ও নিজ দেহে ছুরিকাঘাত করা গর্হিত অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘শোকে বিহ্বল হয়ে যে ব্যক্তি গাল চাপড়ায়, কাপড় ছিঁড়ে ও জাহেলি যুগের মতো আচরণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (বুখারি হাদিস : ১২৯৭)
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ফতোয়া অনুযায়ী, আশুরার শোক পালনের ক্ষেত্রে শরীর রক্তাক্ত করা হারাম। এমনকি গোপনে এ কাজ করতেও নিষেধ করেছেন তিনি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন, এ ধরনের কাজ শোক প্রকাশ নয়, বরং শোক প্রকাশের ধ্বংসসাধন। এ ছাড়া তিনি পোশাক খুলে বা খালি গা হয়ে শোক প্রকাশ করারও বিরোধিতা করেছেন। বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চলে আশুরা ও মহররমের শোক প্রকাশের নামে অনেকেই নানা পন্থায় শরীরকে রক্তাক্ত করেন। এ বিষয়টি মহররমের পবিত্রতা ও শোক প্রকাশকারীদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করছে। (যঃঃঢ়://ঢ়ধৎংঃড়ফধু.পড়স/নহ/হবংি/রৎধহ-র৪৬৬৮৩)
আশুরা দিবসকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে ইতিহাসের নানা তথ্য-উপাত্ত ও ঘটনাপ্রবাহ। নবী-রাসুলদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আশুরার মর্যাদাবাহী অসংখ্য ঘটনা, উপাখ্যান, বিবরণ ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে খুঁজে পাওয়া যায়। ‘মাওজুআতে ইবনে জাওজি’-এর বর্ণনামতে, আশুরার দিনে সংঘটিত ঘটনাবলি বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। তবে হাদিস শরিফে আশুরার ইতিহাস সম্পর্কে এসেছে-ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখত। তিনি তাদের বললেন, ‘এটি কোন দিন, তোমরা যে রোজা রাখছ?’ তারা বলল, ‘এটি এক মহান দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা (আ.)-কে মুক্তি দিলেন এবং ফেরাউনের পরিবারকে ডুবিয়ে মারলেন। তখন মুসা (আ.) শোকর আদায় করার জন্য রোজা রাখলেন (দিনটির স্মরণে আমরা রোজা রাখি)।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমরা মুসার অনুসরণে তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার। তখন তিনি রোজা রাখলেন এবং রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৩৯৭; মুসলিম, হাদিস : ১১৩০)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘এটি সেদিন, যেদিন নুহ (আ.)-এর নৌকা ‘জুদি’ পর্বতে স্থির হয়েছিল। তাই নুহ (আ.) আল্লাহর শুকরিয়াস্বরূপ সেদিন রোজা রেখেছিলেন।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২/৩৫৯)
ইতিহাসের ঘটনাপরম্পরায় ৬০ বা ৬১ হিজরির ১০ মহররম সংঘটিত হয় কারবালার হৃদয়বিদারক, মর্মস্পর্শী ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ। মুজামে কবিরে এসেছে : জুবাইর ইবনে বাক্কার বলেন, হুসাইন ইবনে আলী (রা.) চতুর্থ হিজরির শাবান মাসের পাঁচ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। আর তাঁকে আশুরার জুমার দিনে ৬১ হিজরিতে শহীদ করা হয়েছে। তাঁকে সিনান ইবনে আবি আনাস নাখায়ি হত্যা করে। তাতে সহযোগিতা করেছে খাওলি ইবনে ইয়াজিদ আসবাহি হিময়ারি। সে তাঁর মাথা দ্বিখ-িত করেছে এবং উবাইদুল্লাহর দরবারে নিয়ে এসেছে। তখন সিনান ইবনে আনাস বলেন, ‘আমার গর্দানকে স্বর্ণ ও রৌপ্য দ্বারা সম্মানিত করুন। আমি সংরক্ষিত বাদশাহকে হত্যা করেছি, আমি মা-বাবার দিক দিয়ে উত্তম লোককে হত্যা করেছি।’ (তাবরানি, মুজামে কবির, হাদিস : ২৮৫২)
উপরোক্ত ঘটনাপ্রবাহ থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, আশুরা মানেই কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা নয়, বরং আশুরার ঐতিহ্য আবহমানকাল থেকেই চলে এসেছে। এর ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে সেই সুপ্রাচীনকাল থেকে। ইসলামের আবির্ভাবেরও বহু আগ থেকে। এমনকি আশুরার রোজার প্রচলন ছিল ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগেও! হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক দিন রাসুল (সা.)-এর কাছে আশুরার দিবস সম্পর্কে আলোচনা করা হলে তিনি বলেন, এই দিন জাহেলি যুগের লোকেরা রোজা রাখত...(মুসলিম, হাদিস : ২৬৪২)
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, জাহেলি যুগে মক্কার কুরাইশ বংশের লোকেরা আশুরার রোজা রাখত এবং রাসুল (সা.)-ও আশুরার রোজা রাখতেন। (মুসলিম, হাদিস : ২৬৩২)
কাজেই আশুরার সুমহান ঐতিহ্যকে ‘কারবালা দিবসের’ ফ্রেমে বন্দি করা শুধুই সত্যের অপলাপ নয়; একই সঙ্গে দুরভিসন্ধিমূলকও!
আন্তধর্মীয় ঐক্যের প্রতীক আশুরা
আশুরার আরেকটি বিশেষ দিক আছে। অজ্ঞতা কিংবা উদাসীনতার দরুন অনেক সময় সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করা হয় না। সেদিকটি হলো, আশুরা আন্তধর্মীয় ঐক্যের প্রতীক। হাদিস শরিফ ও ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, বড় বড় প্রায় সব ধর্মের লোকেরা আশুরাকে সম্মান করে, শ্রদ্ধার চোখে দেখে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ইহুদিরা এই দিনে রোজা রেখে মুসা (আ.)-এর অনুসরণ করে। এ ছাড়া খ্রিস্টানরাও এই দিনকে মর্যাদার চোখে দেখে। খ্রিস্টানরা আশুরার দিনকে ঈসা (আ.)-এর জন্মদিন মনে করে। মুসতাদরাকে হাকেমে এসেছে : জাবির (রা.) জায়দ আম্মি থেকে বর্ণনা করেন, ‘ঈসা ইবনে মারয়াম আশুরার দিনে জন্মগ্রহণ করেন।’ তবে আল্লামা জাহাবি (রহ.) বলেন, এ বর্ণনার সনদ দুর্বল। (হাকেম, হাদিস : ৪১৫৫)
অন্যদিকে মূর্তি পূজারি আরবদেরও দেখা গেছে যে তারা এই দিনকে বিশেষ মর্যাদা দিত। জাহেলি যুগে মক্কার কাফিররা এই দিনে কাবার গিলাফ পরিবর্তন করত। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘সাহাবায়ে কেরাম রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার দিনে রোজা রাখত। সেদিন ছিল কাবাকে গিলাফ পরিধান করার দিন।’ যখন আল্লাহ রমজানের রোজা ফরজ করলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যারা রোজা রাখতে চায়, তারা রোজা রাখবে, আর যারা ছেড়ে দিতে চায়, তারা যেন ছেড়ে দেয়। (বুখারি, হাদিস : ১৫৯২)
এসব বর্ণনার আলোকে বোঝা যায়, আশুরা আন্তধর্মীয় ঐক্যের প্রতীক। সুতরাং বলা যায়, আশুরা আন্তধর্মীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়।
লেখক : শিক্ষক, দারুল আরকাম, টঙ্গী, গাজীপুর।







© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};