ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
265
কুমিল্লার দুই কৃতী রাজনীতিবিদ গুরু শিষ্যঅধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম
Published : Sunday, 25 August, 2019 at 12:00 AM
কুমিল্লার দুই কৃতী রাজনীতিবিদ গুরু শিষ্যঅধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও অধ্যাপক মফিজুল ইসলামএডভোকেট গোলাম ফারুক

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ উপমহাদেশের বাম গণতান্ত্রিক রাজনীতির 'বটবৃক্ষ' ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তিন যুগের শাসনামলের প্রত্যক্ষদর্শী কিংবদন্তী রাজনীতিবিদ-- মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ মুজিব নগর প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক সংগঠক অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ৯৮ বছরে চলে গেলেন। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ছিলেন এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ জননেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ।
অধ্যপক মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন  বাবা স্কুল শিক্ষক আলহাজ্ব কিয়ামউদ্দিন ভূঁইয়া, মা আফজেরুন্নেছা ধর্মপরায়ণ নারী। অধ্যাপক মোজাফফর আহম্মদ একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি হোসেনতলা স্কুল, জাফরগঞ্জ গঙ্গামন্ডল রাজ ইনিস্টিটিশন, দেবিদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট হাই স্কুল ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তী পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্মানসহ অর্থনীতি শাস্ত্রে এম,এ এবং পরে পরিসংখ্যান বিষয়ে ইউনেস্কো ডিপ্লোমা লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কৃতী ছাত্র মোজাফফর আহমদ ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম কলেজ ও ঢাকা কলেজসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজ অধ্যাপনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেন ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনা কালে অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম এর ছাত্র ছিলেন। ১৯৩৭ সাল থেকেই তিনি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালে মহান ভাষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্ত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৫৪ সালে স্বেচ্ছায় চাকুরি ছেড়ে দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের পর ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তার নিজ আসন দেবিদ্বার-চান্দিনা নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রভাবশালী মুসলিম লীগ প্রার্থী ও তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী মফিজউদ্দিন সাহেবকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগের বিরোধীতা সত্ত্বেয় পূর্ববঙ্গ গণপরিষদ ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আঞ্চলিক ‘স্বায়ত্ত শাসন’ এর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তখন একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের শ্বায়ত্তশাসনের দাবিকে জোড়ালো সমর্থন দেন এবং পূর্ববঙ্গ গণপরিষদে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব পাশ হয়। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের শ্বায়ত্ত শাসনের দাবিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জোড়ালো সমর্থন দিয়েছিলেন, তখন আতাউর রহমান প্রধানমন্ত্রী।
পাকিস্তনির সামরিক শাসন সেনা প্রধান আইয়ূব খান ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর সারা পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে অপসারণ করে স্বৈরাচারী আইয়ূব খান প্রবর্তিত সামরিক শাসনামলে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করা হয় এবং তাকে ধরিয়ে দেবার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। এ অনিবার্য কারনেই তাকে "আতœগোপন জীবন" বেছে নিতে হয়। এ বৈরি পরিবেশে থেকেও তিনি স্বৈরাচারী আইয়ূব খানের শাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন সংগঠিত করেন। দীর্ঘ ৮ বছরের আতœগোপনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে ১৯৬৬ সালে পুরনায় প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফিরে আসেন। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি তদানিন্তন অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনে নেতৃত্ব দান এবং ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি (ডাক) গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালনের ফলশ্রুতিতে তাকে কারাবরণ করতে হয়। পরবর্তিতে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি আইয়ূব খান আহুত রাওয়ালপিন্ডির "গোল টেবিল" বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি অনন্য অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্ধি ছিলেন। তদানিন্তন মুজিব নগর অস্থয়ী সরকারের "উপদেষ্টা পরিষদের" একজন অন্যতম সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে ও জনমত গঠনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক সফর করেন। এই সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন।
তিনি যদি তৎকালীন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোর ক্রেমলিন নেতাদের (কমিউনিস্ট পার্টির ও রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট লিউ ব্রেজনেভ, রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সী কোসেগিন) কাছে সাহায্যের জন্যে বার বার ছুটে না যেতেন বা দৌড়-ঝাঁপ না দিতেন তাহলে এত অল্প সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হতো না । তিনি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্যের জন্যে বুদাপেস্টে ৭০ জাতি গ্রুপের জোটনিরপেক্ষ সম্মেলন অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সাহায্য - সহায়তা পেয়েছিলেন । তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্য পাবার জন্যে পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক দেশ'গুলোতে ব্যাপক সফর করেন এবং সাহায্য ও সমর্থন আদায় করেন । মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য সময়ে তিনি মুক্তিবাহিনী গঠন করেন ও তাদের জন্য অস্ত্র-সস্ত্র সংগ্রহ এবং তাদের প্রশিক্ষণের জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্হা গ্রহন করেন । ঐ উল্লেখযোগ্য সময়ে তিনি ন্যাপের নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করেন । সশস্ত্র লড়াইকে এগিয়ে নিতে তিনি তখন ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বিত ১৯ হাজারেরও অধিক বিশেষ গেরিলা বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা অংশ গ্রহন  ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয় । ১৯৭১ সালে তৎকালীন মুক্তির সংগ্রামে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খানকে সাহায্যের জন্য তৎকালীন মার্কিন (যুক্তরাষ্ট্রের) প্রেসিডেন্ট নিক্সন যুদ্ধ জাহাজ 'এন্টারপ্রাইজ' নামের সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিলো । তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের সাহায্যের জন্যে একটি 'ব্লাস্টিক ক্ষেপনাস্ত্রবাহী' যুদ্ধ জাহাজ, সাবমেরিনসহ রণতরী পাঠিয়েছিল ভারত মহাসাগরে । এ ক্ষেত্রেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের আলোচনা ও সমযোতার কারনে তা সম্ভব হয়েছিলো । তখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো সপ্তম নৌবহর পিছু হটে যায় । দুর্বল পাকিস্তানী সামরিকজান্তার ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেনেন্ট জেনারেল আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী তখন পরাজিত হয়ে সাড়ে ৯৭ হাজার সৈনিকসহ ঢাকার রেসকোর্স মায়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আতœসমর্পণ করে-- আত্মসমর্পণের দলিলে সাক্ষর করে । এর মধ্যদিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যূদ্ধয় ঘটে । ১৯৭৯ সালে তিনি জাতীয় পরিষদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন । ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ন্যাপ-কমিউনিস্ট এবং দেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন । স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রাক্কালে তিনি আবারও কারারুদ্ধ হন । অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এর বিস্তৃত সফর তালিকায় রয়েছে- যুক্তরাজ্য, জার্মানী, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরীয়া, অস্ট্রীয়া, দক্ষিণ ইয়েমেন,লিবিয়া, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য'সহ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের বহুদেশ । পার্টির কর্মী, সমর্থক এবং জনগণের মধ্যেও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাদির উপড়ে তিনি অনেক বই ও পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন-- বর্তমানে তার গবেষণার বিষয় "নতুন শতাব্দীতে নতুন সভ্যতার জন্ম নিচ্ছে যার প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে রাশিয়ায় এবং ব্যথা ছড়াচ্ছে অন্যান্য দেশসহ বাংলাদেশেও" "সমাজতন্ত্র কি এবং কেন", প্রকৃত গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার কথা", "অমার্কসবাদী সমাজতন্ত্র" ইত্যাদি তাঁর প্রকাশিত বই । ঘটনাবহুল বিশ্বব্যবস্হায় আজকের দিনে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক দর্শণ এবং দুরদর্শিতা সমধিক বাস্তবানুগ ও সময়োপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে । দেশপ্রেমিক কর্মীবাহিনী গড়ে তোলার জন্য মদনপুরে তার প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের একমাত্র রাজপতিক শিক্ষায়তন সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ সকল প্রগতিশীল মহলের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি গত ২৩ শে আগষ্ট ২০১৯খ্রি: সন্ধ্য ৭.৩০ মিনিটি ইন্তেকাল করেন।
অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম:
কুমিল্লায় রাজনৈতিক অঙ্গণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম মফিজুল ইসলাম। অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম ১৯২৬ সালে কুমিল্লা জেলার বুড়িচং থানাধীন (বর্তমানে উপজেলা) বাকশীমূল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোঃ বন্দে আলী মিয়া ছিলেন তহশীলদার এবং মাতা আতারুন্নেসা ছিলেন গৃহিনী। ১৯৪৩ সালে তিনি ইউসুফ বহুমুখী কারিগরী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন। ১৯৪৬ সালে চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। তাঁর সাহচর্য অধ্যাপক মফিজুল ইসলামকে বাম রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার কার্যকরী ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৪৬ সালেই তিনি চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম ছাত্রলীগ সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫০ সালে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। চট্টগ্রামের আবু তোরাব হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ^দ্যিালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
এরপর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার দায়ে সরকারি চাপের মুখে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব ছেড়ে দেন এবং লাহোরস্থ ‘দি পাকিস্তান টাইমস’ এর চট্টগ্রাম সংবাদদাতার কাজ করেন। তাঁরই উদ্যোগে ও পরিচালনায় ১৯৫২ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সরকার বিরোধী বাংলা দৈনিক ‘আমার দেশ’ ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। ৬ মাস পর সরকারি চাপের মুখে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি ১৯৫৩ সালের গোড়ার দিকে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। এর আগে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি প্রথমে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীনে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এ নির্বাচনে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নাগাইসের বঙ্গশার্দুল মেজর আবদুল গণি। পশ্চিম জার্মানীর বন শহরে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাঁকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান এবং সেখানেই তিনি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৫৪ সালে অধ্যাপক মফিজুল ইসলামের উদ্যোগে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি এ কলেজের প্রথম উপধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন এবং একই সালে তিনি পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার চট্টগ্রামস্থ সংবাদপত্রদাতার কাজ করেন। কিন্তু কিছুদিন পর প্রদেশব্যাপী ৯২-ক ধারা জারি হলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৯৫৫ সালের জুন মাসে তিনি মুক্তি পান। পুনরায় ১৯৫৫ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত পুলিশ ধর্মঘটের সময় তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং ৯ মাস পর তিনি মুক্তিলাভ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন।
পূর্ব বাঙলার স্বায়ত্ব শাসনের দাবিতে আওয়ামীলীগের কাগমারী সম্মেলনে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়অমীলীগ থেকে কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থীরা বেরিয়ে এলে অধ্যাপক মফিজুল ইসলামও তাদের সাথে বেরিয়ে আসেন এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৫৭ সনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ গঠিত হলে তিনি ন্যাপে যোগদান করেন এবং কুমিল্লা জেলা ন্যাপ এর সভাপতি হন। একই বছর অর্থাৎ ১৯৫৭ সালে বঙ্গশার্দুল মেজর আবদুল  গণির আকস্মিক মৃত্যুতে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক শূন্য আসনে (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আবার উপ-নির্বাচন হয়। অধ্যাপক মজিফুল ইসলাম এ নির্বাচনে ন্যাপের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। আওয়ামীলীগ মনোনয়ন দেয় নবীন আইনজীবী এডভোটে আমীর হোসেন কে। এ নির্বাচনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামীনীগের সব বাঘা বাঘা নেতারা বুড়িচং-ব্রাহ্মণবাড়ার বিভিন্ন জনসভায় যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধু এ উপলক্ষে ১৫-২০ দিন ব্যাপক প্রচার অভিযান পরিচালনা করেন। ন্যাপ প্রার্থী অধ্যাপক মফিজুল ইসলামের পক্ষে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ প্রচার প্রচারণা করেন। ১৯৫৮ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে এডভোকেট আমীর হোসেনের কাছে অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম ১,৭৯৫ ভোটে পরাজিত হন।
অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম এনডিএফ এর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৮-৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন ও গণ অভ্যুত্থানে অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম অনন্য ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে জাতীয় লীগ গঠিত হলে অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম তাতে যোগদান করেন এবং এক পর্যায়ে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া নির্বাচনী এলাকা থেকে ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৭০ ও ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনী অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলীয় প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। এরপর অধ্যাপক মফিজুল ইসলাম রাজনৈতিক আর কোনো দলের সাথে সম্পর্ক রাখেননি। কুমিল্লার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট আইনজীবী মফিজুল ইসলামের পরবর্তী জীবন অনেকটা নিরবে- নিভৃতেই কেটেছে। সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ে তিনি সোভিয়েত রাশিয়া, আফগানিস্তান ফেক্টস এন্ড ফ্রিকসান’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং তা বহুল আলোচিত হয়। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে 'উবমৎবব ঋঁহপঃরড়হধষ ঊহমষরংয.' অফাধহপবফ ঊংংধু', 'চৎরহপরঢ়ষবং ড়ভ ঈড়সসবৎপরধষ ঊহমষরংয'. 'ঋঁহফধসবহঃধষং ড়ভ চড়ষরঃরপধষ ঊহমষরংয'. ‘মৌলিক অর্থনীতি, ‘বাণিজ্যিক পত্র সংযোগ’ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ষধি সধফব ঊধংু.' ঝঃধহফধৎফ ঋঁহপঃরড়হধষ ঊহমষরংয'. সোভিয়েত ইউনিয়ন: স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ইত্যাদি। তাঁর রচিত প্রতিটি গ্রন্থই তথ্য সমৃদ্ধ ও পাঠক  সমাদৃত।
সারাজীবনে মানুষের কল্যাণে কাজ করলেও তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন তেমন সুখময় ছিল না। চট্টগ্রাম থাকাকালে এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কন্যাকে তিনি বিয়ে করেন। কিন্তু সেই বিয়ে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এ বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি কুমিল্লায় এসে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দিয়ে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। বাসা নেন অশোকতলার প্রফেসর পাড়ায়। তার বাসায় বিপরীত পাশে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইংরেজি বিভাগের খ্যাতনামা প্রফসর লায়লা নূরের বাসা। দু’জনই গুণীজন। দুজনে বৈবাহিক বন্ধনেও আবদ্ধ হন। কিন্তু এ বিয়েও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এরপর অধ্যাপক মফিজুল ্সলাম প্রফেসর পাড়ার বাসাটি ছেড়ে দিয়ে বাগিচাগাঁওয়ে খান মঞ্জিলের পাশের ‘বাইতুল ইসলাম’ বাসাটি ভাড়া নিয়ে সেখানে চলে আসেন এবং আবার বিয়ে করেন। এর মধ্যে আইন পেশায় তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। অনেক কঠিন মামলার আর্জিও তিনি এমনভাবে সাজাতেন যে মামলাটি তার পক্ষে চলে আসতো।
সংসারে স্বচ্ছলতা এলে তিনি রাণীর বাজার রাসস্থলী আশ্রমের বিপরীতে একখন্ড জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন। তাঁর তৃতীয় স্ত্রীর ঘরে চার কন্যা জন্মলাভ করেন। তারা সবাই এখন প্রতিষ্ঠিত। সেই বাড়িটির আগের অবয়বও এখন আর নেই। এখানে গড়ে ওঠেছে ৯ তলা বিশিষ্ট বিশাল ইমারত। শুধু নেই বিশাল মনের সেই মানুষটি। এমনিভাবে কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ৩ টায় তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি দেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ৪ কন্যা, আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।







© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};