ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
রোদ-বৃষ্টির বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং আমারও স্মৃতি
Published : Saturday, 10 March, 2018 at 12:00 AM
রোদ-বৃষ্টির বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং আমারও স্মৃতিপ্রবীর বিকাশ সরকার  ||

আমীরুল ইসলাম বাংলাদেশের একজন সুপ্রতিষ্ঠিত ছড়াকার এবং শিশুসাহিত্যিক। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার লেখা পড়ার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে থাকাকালীন তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না।

আমীরুল ইসলামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় জাপানে বেশ কয়েক বছর আগে। কোনো একটা অনুষ্ঠানে তিনি জাপানে এসেছিলেন। তখন সামান্য কিছু সময়ের জন্য ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম। আড্ডা দিয়েছিলাম সম্ভবত টোকিওর তাকিনোগাওয়া মিলনায়তনে তারপর একটি রেস্টুরেন্টে। সঙ্গে ছিল তখন জাপানপ্রবাসী ছড়াকার বদরুল বোরহান, লেখক ও সাংবাদিক ইনসানুল হক, সাংবাদিক রাহমান মনি আরও কে কে যেন মনে পড়ছে না।

আবার তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল টোকিওতে ২০১৫ সালে। নতুন প্রজন্মের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল ‘চ্যানেল আই’ এর একটি টিম সপ্তাহখানেকের জন্য জাপান এসেছিল রবীন্দ্রনাথ এবং জাপান সম্পর্কে একটি অনুষ্ঠান তৈরি করার জন্য। এটা কবিগুরুর জন্মবার্ষিকীতে সম্প্রচারিত হবে। এই দলের সঙ্গে চ্যানেল আই এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে আমীরুল ইসলামও ছিলেন। দলনেতা ছিলেন পরিচালক-নির্দেশক শহিদুল আলম সাচ্চু। আর অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। জাপান প্রবাসী সাংবাদিক রাহমান মনির অনুরোধে এই দলকে গাইড করার কাজটি সম্পাদন করার সুযোগ পেলাম। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত কয়েকটি স্থানে শুটিং হলো শিল্পী বন্যার গানের। যা সম্ভবত দু’বাংলায় এর আগে কখনো হয়নি। এবারই প্রথম বৃহত্তর বাঙালি এই জায়গাগুলো দেখার সুযোগ লাভ করবেন। অবশ্যই ঋণ স্বীকার করতে হয় বিশিষ্ট জাপানি রবীন্দ্রভক্ত শ্রীমতী ওওবা তামিকোর প্রতি কারণ তিনি অসামান্য সহযোগিতা করেছেন। আর দারুণ এক সুযোগ হয়েছে এবার জাপানশীর্ষ রবীন্দ্রগবেষক অধ্যাপক কাজুও আজুমার বিধবা পতœী মাদাম কেইকো আজুমার সঙ্গে শিল্পী বন্যার অনেক বছর পর পুনরায় সাক্ষাৎ। বর্তমানে তিনি ৮০ বছরে পদার্পণ করেছেন। সাক্ষাৎ হয়েছে অনেক বছর পর বিশ্বভারতীর সঙ্গীতভবনের প্রাক্তন ছাত্রী ওকুদা ইউকার সঙ্গেও। জাপানি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ইউকার মনে হয় এটাই হবে বাংলাদেশের কোনো টিভি চ্যানেলে প্রথম আবির্ভাব। অবশ্য তাকে নিয়ে লিখিত আমার একটি নিবন্ধ ২০১১ সালে সাপ্তাহিক ২০০০-এ প্রকাশিত হয়েছিল। সেটা আমার ‘জাপানে রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে গ্রন্থিত আছে। যাক, এই সবই ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে।

আমীরের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথম দিনই তার একটি বই আমাকে দিলেন শহিদুল আলম সাচ্চু। ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের রোদবৃষ্টি’ গ্রন্থটির নাম। বুকলেট আকৃতির ছোট্ট বইটির পৃষ্ঠাসংখ্যা মাত্র ৫৬। কাব্যিক নামের এই গ্রন্থটি ছোট্ট হলেও আদিগন্ত বিস্তৃত এক সাগরকে ধারণ করে আছে। বিগত দিনের অজ¯্র স্মৃতিময় কৃষ্ণচূড়ার ওড়োওড়ি।

মাত্র ৪টি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধের সমাহার এই অমূল্য গ্রন্থটি, যথাক্রমে: একজীবনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আড্ডা, সায়ীদ স্যার, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং....এবং বই এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।

স্বাধীনতাত্তোর এক ঝাঁক সৃজনশীল তরুণ-তরুণীর উত্থান ঘটেছে এই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আলোকিত জঠর থেকে। তাদেরকে হৃদয়ে লালন এবং সুশিক্ষার আলোকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতিভায় পরিণত করেছেন পিতৃসম অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যিনি ছিলেন তখন মর্যাদাসম্পন্ন ঢাকা কলেজের অধ্যাপক। অগাধ আধুনিক জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের বরপুত্র অধ্যাপক আবু সায়ীদ যে সারস্বত প্রতিষ্ঠানটি একুশ শতকের আলোকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে এমনটি এশিয়ায় আর কোথাও আছে বলে আমার ধারণায় নেই। এটা মনে হয় বলাই বাহুল্য যে, ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ প্রাচ্য-প্রতীচ্য এবং নবীন-প্রবীণ জগতের একটি শ্রেষ্ঠ মিলনকেন্দ্র। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘আলোর ঝর্নাধারা’--আর এই ঝর্নাধারায় যারা অবগাহিত, পরিশুদ্ধ এবং পরিশীলিত হয়েছেন তারাই আজকে সাহিত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত, নাটক, সংবাদপত্র, টিভি প্রভৃতি ক্ষেত্রে স্ব স্ব মহীমায় কর্মরতÑÑসমুজ্জ্বল। লেখকের বর্ণনাটাই তুলে ধরি:
“৮০ দশকের শেষভাগে কিংবা ৯০ দশকের পুরোটা জুড়ে কেন্দ্রের আড্ডা-মুখে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু নাম কি লিপিবদ্ধ করা যায়?
   খ্যাতিমান নাট্যশিল্পী ও নাট্য অনুবাদক খায়রুল আলম সবুজ, রম্যলেখক প্রয়াত বিপ্লব দাশ, কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, নাট্যশিল্পী শিরীন বকুল, ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, ডকু-নির্মাতা কাওসার চৌধুরী, এম.পি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব চয়ন ইসলাম, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী লিলি ইসলাম, সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা, কাজী মোস্তাফিজুর রহমান, প্রথম আলোর উপ-সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, আহমাদ মাযহার, পারভেজ হোসেন, শহিদুল আলম, নাসরীন জাহান, কামরুল হাসান মঞ্জু, মুন্নি সাহা, লায়লা আফরোজ, আবদুন নূর তুষার, আসলাম সানী, রেজাউদ্দিন স্টালিন, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, ভাস্কর রাসা, শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরী।”

নিঃসন্দেহে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ছিল জ্ঞানচর্চার আড্ডাস্থল। সময়টাকে মূল্যবান করে তোলার সুপরিকল্পিত পাঠশালা। আমীরুলের ভাষাতেই পড়া যাক:
“এরকম অসংখ্য নামের তালিকা উল্লেখ করা যায়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অঙ্গনে অঙ্গনে প্রাঙ্গণে চত্বরে ছাদে আড্ডা প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে ঘনীভূত হতো। ছাদে আড্ডা জমে উঠতো দুপুরের খাবারের পর। খুব কম টাকায় পরিচ্ছন্ন খাবার খাওয়া যেত কেন্দ্রের ক্যান্টিনে। বড় থালায় মাছ ভাত ডাল ভর্তা সবজি---একটা আভিজাত্য ফুটে উঠতো। সায়ীদ স্যারের সব কাজেই অভিনবত্ব থাকে। স্যার চেনা পথে কখনো হাঁটেন না। কেন্দ্রের ছাদের ক্যান্টিনের মেনুও ছিল অন্য রকম। নারকেলের নাড়–, মুড়ি ভর্তা, ডালপুরি, লুচি ভাজি---এইসব ছিল সান্ধ্যকালীন নাশতা। দুপুরের ভাত--ডাল তরকারি, মাছ বা মাংশ। কখনো কখনো নেগুনভাজি, খিচুড়ি, মোহনীয় খাদ্যসম্ভার। সবই সায়ীদ স্যারের পরিকল্পনা। এই খাইদাইয়ের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা আরও রমণীয় হয়ে উঠতো। আড্ডা তো আড্ডাই। আড্ডা তো সেমিনার বা আড্ডার পাশাপাশি দেশের প্রথিতযশা ব্যক্তিরাও হঠাৎ আলোর ঝলকানির মত হঠাৎ আড্ডা জমিয়ে তুলতেন। সেইসব প্রখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকাও অনেক দীর্ঘ---অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমদ, সাংবাদিক আবেদ খান, তার সহধর্মিণী উপস্থাপক সনজীদা আখতার, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ, উপস্থাপক আনিসুল হক, ফকির আলমগীর, হানিফ সংকেত, ইয়ার মোহাম্মদ খান, কামরুন্নেসা হাসান, নাজমা চৌধুরী, ফাহমিদা মজিদ মঞ্জু, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, হাশেম খান, মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, অনুপম হায়াৎ, তাসলিমা নাসরীন, আবু কায়সার, রফিকুন নবী, আখতার হুসেন, তারেক মাসুদ, তারেক শাহরিয়ারÑÑনামের তালিকা শেষ হবে না।”

এদের সংস্পর্শে থাকলে উদীয়মান তরুণপ্রজন্ম কেন মননশীলতায় ঋদ্ধ হবে না? বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এখানেই সার্থক যে, বহু তরুণ-তরুণীর প্রতিভা, মেধার স্ফূরণ ঘটাতে পেরেছে।

আমীরুল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রজাত সাহিত্যপ্রতিভা। নিজেই বলছেন:
“ছবির মতো সেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। নতুন কেউ কেন্দ্রে এলেই বিস্মিত হতেন। কিন্তু আনন্দের ব্যাপার হচ্ছে---আমরা প্রতিদিন আসতাম। প্রতিদিন নতুন করে কেন্দ্রকে ভালোবাসতাম। নতুন করে প্রতিদিন কেন্দ্রের প্রেমে পড়তাম।
   এই ভালো লাগার, প্রথম প্রেমে পড়ার অনুভূতি নিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আমাদের হৃদয়ে বেঁচে আছে।
   প্রায় পনেরোটা বছর একটানা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছি। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি কোন কিছুর পরোয়া করিনি। বাংলা মোটরের সেই সরু গলি দিয়ে প্রবেশ করতাম। তারপর কানন ঘেরা বাগান বাড়ির মতো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নিরিবিলি ছায়াহিম পরিবেশে দিন কাটাতাম।”

এমন পরিবেশ তখন ঢাকায় ছিল না বললেই চলে। উচ্চশিক্ষা বিদ্যাপীঠগুলোর ক্যাম্পাসগুলো তখন রাজনৈতিক সন্ত্রাসের অভয়আশ্রম। সেই সময় এমন একটি আলোকিত মানুষ গড়ার কাজে আত্মনিবেদিতপ্রাণ সেই কিংবদন্তিতুল্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পর্কে আমীরুল ইসলামের মূল্যায়ন তাৎপর্যপূর্ণ:
“সায়ীদ স্যারের সাথে থাকা মানেই আনন্দময় মধুর, উজ্জ্বল, স্বপ্নময় সময় কাটানো। সায়ীদ স্যারের সঙ্গসুধায় আমরা প্রতিদিন নতুন মানুষে রূপান্তরিত হতাম। উজ্জীবিত হতাম। নতুন কিছু করার স্বপ্নে বিভোর হতাম। সায়ীদ স্যারের শিক্ষায় আমরা দীক্ষিত হতাম। সায়ীদ স্যারের নন্দনকান্তি হাস্যসুধারস এখনো কানে ঝনঝন করে বাজে। স্যারের কৌতুকপ্রিয়তা, পরিহাসপ্রিয়তা, গল্পকথনের অবিশ্বাস্য ক্ষমতা, জ্ঞানচর্চার সহজাত দক্ষতা আমাদের মোহবিষ্ট করে রাখতো। এখনো রাখে।”

এর চেয়ে অম্লমধুর সত্যকথন বা নিস্পৃহ বাস্তব মূল্যায়ন আর কী হতে পারেÑÑআমীরুল সেই মাত্রা ছাপিয়ে যাননি দেখে স্বস্তিলাভ করি।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মানেই হচ্ছে বই আর গ্রন্থাগার। বইয়ের পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলার এমন যন্তরমন্তর প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আর নেইÑÑভবিষ্যতেও হবে কিনা সন্দেহ থেকেই যায়। আমীরুলরা সৌভাগ্যবান যে এমন একটি মানবিক গুণাবলীর বিকাশমুখী মানমন্দিরে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের বিখ্যাত সব লেখকের গ্রন্থাবলীর রসাস্বাদন গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হওয়ার মহাসুযোগ লাভ করেছেন।

গ্রন্থের শেষ প্যারাটি প্রণিধানযোগ্য:
“আগামী দিনের সুখী, সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্যে বইপড়–য়া যুবসমাজের প্রয়োজন। এই মহতী ব্যক্তি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আমাদের জীবনকে প্রাণিত করেছেন, উজ্জীবিত করেছেন, মরুর বুকে সামান্য জলস্পর্শ করে দিয়েছেন---এই কৃতজ্ঞতার কোন ভাষা নেই। সত্যিকার অর্থে বইয়ের ভুবনে আমরা প্রবেশ করেছি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের হাত ধরে।”

বই পাঠ করলে বই রচনা করতে আগ্রহ জন্মে। আগ্রহ জন্মে সাহিত্য ম্যাগাজিন প্রকাশের। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে অসাধারণ একটি শিক্ষামূলক ম্যাগাজিন ‘আসন্ন’ প্রকাশিত হতো। যার চমৎকার সংখ্যাগুলো সম্পাদিত হতো আমীরুলের হাতে পেছনে থাকতেন তার গুরুজন আবু সায়ীদ স্যার। ‘আসন্ন’র কিছু সংখ্যা আমি ঢাকা থেকে আনিয়েছিলাম। এখনো জ্বলজ্বল করছে সেই ছবিগুলো।

০০২০০
যখন তরুণ ছিলাম দেশে থাকতেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কথা আমরা মফস্বলে থেকে জানতে পারি। তখন রাজধানী ঢাকা যাওয়ার সুযোগ ছিল কম। তাই যাওয়া হয়নি আমার কোনোদিন। আমীরুলের গ্রন্থটি তাই আমার কিছু স্মৃিত উসকে দিল চাপাপড়া ছাইয়ের ভেতরে।

১৯৯৪ সালের কথা। আমি তখন ‘মানচিত্র’ নামে একটি ম্যাগাজিন সম্পাদনা করি জাপানে। প্রথম দিকে জাপানেই ছাপা হতো কম্পিউটার প্রযুক্তিতে। ১৯৯৪ সালে মানচিত্র বাংলাদেশ থেকে মুদ্রিত হয়ে জাপানে আনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রথম সংখ্যাটি এপ্রিল মাসে বৈশাখী সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল। সমস্ত প্রি-প্রেসের কাজ হয়েছিল পুরানা পল্টনের ‘গ্রাফিক স্ক্যান’ প্রতিষ্ঠানে, ছাপা হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানেরই নিচে অবস্থিত ‘গ্রাফটোন প্রিন্টিং’ ছাপাখানায়। অত্যন্ত আকর্ষণীয় এই সংখ্যাটি দারুণ পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল দেশ-বিদেশে। প্রচ্ছদের চমৎকার ছবিটি সরবরাহ করেছিলেন কুমিল্লার খ্যাতিমান কবি, গল্পকার ও চিত্রশিল্পী সৈয়দ আহমাদ তারেক।

ম্যাগাজিন যখন ছাপা হয় তখন আমি ঢাকায়। মানচিত্রের সহকর্মী কবিবন্ধু সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গিয়েছিলাম কিছু কপি বিতরণ করার জন্য। এতটুকু মনে আছে তখন দুপুর হয়-হয় কেন্দ্রের একটি বড়সড় কক্ষে কীসের যেন একটি অনুষ্ঠান চলছিল। প্রচুর তরুণ-তরুণীর সমাগম ঘটেছিল। দুলাল এবং আমি তাদের হাতে মানচিত্র দিয়েছিলাম। সবাই হাতে নিয়ে মুগ্ধদৃষ্টিতে প্রচ্ছদটি দেখছিল এই দৃশ্যটি এখনো মনোবৃক্ষে দোলা দেয়।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অন্যতম প্রাণপুরুষ প্রথিতযশা কূটনীতিক মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস। তার নাম উল্লেখ করেছেন আমীরুল ইসলাম তার গ্রন্থে। আশি দশকের শেষদিকে কায়েস ভাই টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রথম সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন আমার জাপানপ্রবাসী বন্ধু রফিকুল আলম। দুজনেরই বাড়িই ময়মনসিংহে সেই সুবাদে তারা পরস্পর পরিচিত। কায়েস ভাই ছিলেন আমাদের অত্যন্ত প্রিয়জন---খুবই কাছের মানুষ। যেকোনো সমস্যা সমাধানে আমরা তার কক্ষে হাজির হতাম। একবার কায়েস ভাইয়ের সঙ্গে আমার জাপানি স্ত্রীসহ নৈশভোজে গিয়েছিলাম মেগুরো শহরের একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে। তখন নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। সেই থেকে তার সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একবার তিনি তার বাসায় আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তখন তার অনন্য রবীন্দ্রপ্রীতি, সাহিত্যসাধনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে সম্যক ধারণা আমার জন্মে। আমীরুলের বইটি পড়ার পর বুঝতে পারি কী রকম মননশীল মানুষেরা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রটি গড়ে তুলেছিলেন! কায়েস ভাইয়ের মুখে আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কথা একাধিকবার শুনেছি। কেন্দ্রটিতে প্রাণপ্রাচুর্যের অভাব না থাকলেও অর্থকড়ির সংকট ছিল যেটা আমীরুল বলেছেও তার গ্রন্থে। কায়েস ভাই অনুরোধ জানিয়েছিলেন সহযোগিতা করার জন্য। কেন্দ্রের আর্থিক সাহায্যকল্পে তিনি তার বন্ধু জাদুকর জুয়েল আইচকে জাপানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং একটি জাদুপ্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন বেশ ঘটা করে কিন্তু সেটা সাফল্য লাভ করেনি।

প্রায় ২১ বছর পর কায়েস ভাইয়ের সঙ্গে আবার জাপানে দেখা হলো ২০১০ সালে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে এসেছিলেন তখন। তার পুরনো বন্ধু রবীন্দ্রগবেষক অধ্যাপক কাজুও আজুমা স্যারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলে আমি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। স্যার তখন খুবই অসুস্থ এবং মৃত্যুপথযাত্রী। কায়েস ভাই বিষণœ এবং অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিলেন সেই সাক্ষাতের সময়।

এরপর দুহাজার কত সালে মনে নেই পুনরায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নাম শুনতে পাই টোকিওতে তারিখটা সম্ভবত ২০০৭ হতে পারে। বন্ধুবর খ্যাতিমান ফটোগ্রাফার আনিসুর রহমান, সাংবাদিক আবদুল ওদুদ প্রমুখ মিলে টোকিওতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শাখা গঠন করেছিলেন। এর উদ্বোধন উপলক্ষে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার জাপানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। এক অনড়াম্বর আয়োজনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রের শুভ উদ্বোধন হয় টোকিওর একটি রেস্টুরেন্টে সন্ধেবেলা। আমিও আমন্ত্রিত হয়ে সেখানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম। এই প্রথম স্যারের সঙ্গে করমর্দন করার সুযোগ লাভ করি। সত্যিকথা বলতে কী, যে ব্যক্তিত্বকে শুধু বিটিভিতে উপস্থাপক হিসেবে দেখেছি আতরুণ, দেখেছি পত্রপত্রিকায় তার সঙ্গে যে প্রবাসে দেখা হবে এটা কখনো কল্পনা করিনি। আরও কী সৌভাগ্য আমার---সেই সময়টা ছিল টোকিও বৈশাখী মেলার। এক রোববারে মেলা অনুষ্ঠিত হলে তিনি মঞ্চে আমন্ত্রিত হন। তার কিছু কথা আমরা শুনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো। সেবার আমার ছড়াগ্রন্থ ‘অবাক কাণ্ড’র (বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, ২০০২) জন্য প্রবাসী লেখক হিসেবে টোকিও বৈশাখী মেলা উদযাপন কমিটি কর্তৃক সম্মাননা সনদপত্র গ্রহণ করি স্যারের হাত থেকে। এই বিরল ঘটনায় আমি অপার আনন্দিত এবং গৌরবান্বিতবোধ করি। এজন্য উদযাপন কমিটিকে জানাই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ এই স্লোগান যার ভূষণ ও স্বপ্ন সেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আমি কোনো সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও স্বপ্নসুন্দর মানুষ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার তার সতীর্থ মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস এবং স্যারের সন্তানতুল্য সুযোগ্য অনুসারী আমীরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ হওয়াটা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে আমার অদৃশ্য একটা বন্ধন রয়েছে বলে আজ প্রতীয়মান হয়।  
জাপান প্রবাসী লেখক ও গবেষক   
  




Loading...

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};