ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
51
সাংবাদিক ও শিশু সংগঠক গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর সংগ্রামী জীবন
Published : Friday, 12 January, 2018 at 12:00 AM
সাংবাদিক ও শিশু সংগঠক গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর সংগ্রামী জীবনমোতাহার হোসেন মাহবুব ||
শ্রদ্ধাভাজন গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর সাথে আমার পরিচয় হয় ১৯৭৭ সালের কোন এক সময়- আমি তখন ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। লেখাপড়ার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা করি। মোস্তফা ভাই তখন দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক হিসেবে কুমিল্লায় সুপরিচিত; সুপ্রতিষ্ঠিত। শুনেছি, দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে তিনি কুমিল্লা সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সাথে পরিচয়ের বেশ কিছুদিন পর জানতে পারি তিনি কুমিল্লা পূর্বাশা ও মধুমিতা কচি-কাঁচার মেলারও অন্যতম সংগঠক। তখন কুমিল্লা সংস্কৃতি অঙ্গনে অনেকগুলোও সংগঠন সক্রিয়। পরিদর্শিতা উপস্থাপনেও পিছিয়ে ছিল না এসব সংগঠন। এক্ষেত্রে কুমিল্লা পূর্বাশা ও মধুমিতা কচি-কাঁচার মেলার কার্যক্রমও অনস্বীকার্য। এ প্রসঙ্গে একটু পরে বলছি। এরআগে সাংবাদিক ও শিশু সংগঠক গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে বলা প্রয়োজন।
গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর পিতা সেকান্দর আলী চৌধুরী, মাতা আজিজুন্নেসা চৌধুরী । পিতা ছিলেন স্কুল পরিদর্শক ও মা স্কুল শিক্ষক। গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ১৯৩৬ বঙ্গাব্দের ২ ফাল্গুন কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার (তৎকালীন থানা) চন্দনা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ২ ভাই ৩ বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর ছেলেবেলা কাটে গ্রামের বাড়িতে। বাড়ি থেকে তিন মাইল দূরে চরবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি পশ্চিমগাঁও বিএন হাই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন লাভ করেন। ওই বছরই নাঙ্গলকোট সোন্দাইল এম এ স্কুলে বিশ টাকা বেতনে শিক্ষকতা জীবন শুরু করলেও পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৪৯ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা ‘বঙ্গশার্দুল’ খ্যাত মেজর আবদুল গণির সান্নিধ্যে আসেন। যোগদান করেন সেনাবাহিনীতে। সেখানে রোমান ও উর্দু ভাষায় শ্্েরণিতে পাঠদান করতেন। অল্পদিনেই পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা তাঁর সংগ্রামী মনোভাব টের পায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর কথা বলার অভিযোগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। সেনাবাহিনী থেকে বেরিয়ে এসে গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জীবন সংগ্রামে লিপ্ত হন । সংসার চালানোর তাগিদে ১৯৫০ সালে চট্টগ্রামের অপরিচিত জনপদে কখনো হকার, কখনো শ্রমিক,এমনকি দিনমজুরের কাজও করেছেন। সংসারে মা-বাবা, ভাই-বোন। তাদের খরচ যোগাতে ব্যস্ত গোলাম মোস্তফা চৌধুরী কখনো ডাব বিক্রি করেছেন, প্রচ- শীতে ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে ভোরে বিক্রি করতে বেরিয়েছেন পোনা মাছ। টাইপের কাজ করেছেন, কখনো-বা সন্দীপে নারকেলের ব্যবসা করেছেন। আবার পতেঙ্গায় সাম্পানে, কয়লার ডিপোতে শ্রমিকের কাজ করেছেন।
একসময় চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে আসেন ভৈরব রেলস্টেশনে। পার্শ্বেলের লিস্ট নোট ফরওয়ার্ডিং লেখার চাকরি শুরু করেন। দিনে উপার্জন হতো তিন থেকে সাত/আট টাকা। কিছু টাকা জমা হলে তা পাঠাতেন গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার জন্য। এভাবে চলে কিছুদিন। রেলওয়ে নেতৃবৃন্দের সাথে এক পর্যায়ে ঘনিষ্টতা বাড়ে। সম্পর্ক হয় পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগের সাথে। ১৯৫১ সালে ভৈরবে হাকিম শাহ রেলওয়ে ইন্সটিটিউটে পঞ্চাশ টাকা বেতনে লাইব্রেরিয়ান পদে যোগদান করেন। পাশাপাশি রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগে স্বেচ্ছাসেবক এবং তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক তখন সাপ্তাহিক পত্রিকা। তিনি এতে নিয়মিত খবর পাঠাতেন এবং বিক্রি করতেন। ইত্তেফাক পরিবারের সাথে এভাবেই তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৫২ সালেই মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তৎকালীন প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্টতা জন্মে। তখন তিনি পুলিশের কোপানলে পড়েন। ১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালে পরপর কয়েকবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। কিশোরগঞ্জ সাব জেল ও ময়মনসিংহ জেলে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নির্বাচিত এমপি বিপ্লবী কর্মী মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর সাথে কুলিয়াচর থানায় পরিচয় হয়। এ বিপ্লবী কর্মী বত্রিশ বছর কারাবরণ করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ও মওলানা ভাসানীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে কাগমারী সম্মেলনের প্রচার কাজ করতে গিয়ে মানিক মিয়া, জহির উদ্দিন, আবুল হাসেম, ইয়ার মোহাম্মদ খান, খয়রাত হোসেন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শামসুল হকসহ তৎকালীন রাজনীতিবিদদের সাথে গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর হৃদ্যতা বাড়ে। ওই সময় পশ্চিমাদের মধ্যে সীমান্তগান্ধী খান আবদুল গাফ্ফার খান, মিয়া ইফতেখার উদ্দিন লুনখোর, গুনজায়েশ খান প্রমুখের সাথেও পরিচয় ঘটে।
গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ছিলেন ভৈরব থানা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক। ১৯৫২ সালে তিনি ওখানে রিক্সা সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। একই সময়ে তিনি কুলি ও মাঝি সমিতির সভাপতি ছিলেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ভৈরব কচি-কাঁচার মেলার প্রথম সংগঠক ছিলেন। এ সময় তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক ও শিশু সংগঠক হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেন।
গোলাম মোস্তফা চৌধুরী রাজনৈতিক কর্মকা-ের সাথে সম্পৃক্ত হন ১৯৪৪ সাল থেকেই। ওই সময় তিনি ছাত্রকর্মী হিসেবে মুসলিমলীগের প্রচার কাজ শুরু করেন। তিনি নোয়াখালীর রায়পুরে গান্ধীর রিলিফ ওয়ার্কে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে ভৈরবে চোঙ্গা দিয়ে মুসলিম লীগের প্রচার-প্রচারণা করেন। কুমিল্লা জেলা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা, দলীয় সংবাদ ইত্তেফাকে পাঠানো সম্পর্কে তিনি মাঝে মাঝে কথা বলতেন। আমার দু:খ, সে-সব কথা আমি নোট করে রাখিনি। গোলাম মোস্তফা চৌধুরী অনেকটা চাপা স্বভাবের লোক ছিলেন। কথা কম বলতেন, কাজ বেশি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। চটে গেলেন চড়া মেজাজে গাল মুখ লাল হয়ে যেতো। অন্যায়কে তিনি সহজভাবে মেনে নিতেন না। তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করতেন।
প্রথম প্রথম মোস্তফা ভাইয়ের দিকে তাকালে ইউসুফ হাই স্কুলের নজিবুল হক স্যারের চেহারা মনে পড়তো। স্যারকে আমি ভয় করতাম যেমন তেমনি শ্রদ্ধাও করছি। নজিবুল হক স্যার বেঁচে নেই। মোস্তফা ভাইও বিদায় নিয়েছেন।  কুমিল্লায় ভারী গোফওয়ালা দু’জন শ্রদ্ধা জানানোর মানুষ নেই। নজিবুল হক স্যার আমাদের কাছে ‘মোচাওয়ালা স্যার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন আর মোস্তফা ভাই ‘মোচওয়ালা সাংবাদিক’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পোশাক ও চলন-বলনেও মোস্তফা ভাই স্বাতন্ত্রতা বজায় রাখতে পেরেছিলেন। অফিস-থানাসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে তিনি দাপটের সাথে কথা বলতেন। সবাই তাঁর সাথে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে কথা বলতেন। সাংবাদিকদের মধ্যকার বিভাজন নিয়ে তিনি দু:খ প্রকাশ করতেন। বাইরের অনেকটা কঠোর ও অনমনীয় ভাবকে প্রাধান্য দিলেও তাঁর অন্তরের কোমলমতি হৃদয়কে অনেকে অনুভব করতে পারেন নি।
রাজনৈতিক সচেতনতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সাংগঠনিক কর্মকা-ে সাংবাদিক ও শিশু সংগঠক গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর অবদান অনস্বীকার্য। সামাজিক কর্মকা-ে লিপ্ত হন তাঁরই উদ্যোগে উত্তরদা জুনিয়র মাদরাসা হাই স্কুলে উন্নয়নের মাধ্যমে। কুমিল্লা শহরে গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর নাগরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে মূলত কচি-কাঁচার মেলার কার্যক্রমের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে এ সংগঠনের কার্যক্রম শুরু হয়।
 শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে তাঁর ছিল অবদান অসামান্য। কুমিল্লা ধর্মসাগরের দক্ষিণ পাড়ে মহিলা মহাবিদ্যালয় ও ফরিদা বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠা ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। ফরিদা বিদ্যায়তনের প্রতিষ্ঠাতা, বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ কাজী জহিরুল কাইয়ুমের সাথে ছিল তাঁর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। ১৯৮০ সালের ১০ অক্টোবর বিনয় সাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠালগ্নে যখন ‘বিনয়’ নামকরণ করা হয় তখন তিনি ছিলেন অন্যতম সমর্থনকারী। কান্দিরপাড় থেকে ধীরে ধীরে হেঁটে তিনি নূরপুর চলে যান ও অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। সে-স্মৃতি আজও ভুলি নি। কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁকে স্মরণ করছি।  পেশা-নেশায় মহৎপ্রাণ এ ব্যক্তিত্বকে ঘিরে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
লেখক:
সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক
 


Loading...

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};