ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
60
মুক্তিযুদ্ধের গল্প
Published : Thursday, 7 December, 2017 at 12:00 AM
মুক্তিযুদ্ধের গল্পআনোয়ারুল হক ||
এক.
এক মুহূর্তের জন্যেও নড়ার উপায় নেই ট্রেনের গার্ড কামরার সামনে থেকে গার্ড এম হকের। তাঁর বুকের ভিতরে ভীষণ অস্থিরতা। সময় দ্রুত গড়াচ্ছে সামনের দিকে। সংযত ভাব নিয়ে চারিদিকে দৃষ্টি রাখছেন তিনি। পারতপক্ষে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা কোন সৈনিক অথবা তাঁর সহকর্মী কারো চোখের ওপর চোখ ফেলছেন না। তিনি চাইছেন না, এই সময়ে কেউ তাঁর মনোযোগ নষ্ট করে।
কেননা, যে বিষয় নিয়ে তিনি চিন্তিত সেই বিষয়টা এমন নয় যে, ফেল কড়ি মাখ তেল। কাজ শেষ তো হাত গুটাও।
বরং এমন কঠিন যে, এই ট্রেন ছেড়ে দিয়ে জায়গামত পৌঁছে তাঁকে আর ডগ বাক্সে লুকিয়ে থাকা মতিকে নিপুণভাবে তাদের ওপর অর্পিত কাজ যে কোন মূল্যে সমাধা করতে হবে। জান থাক আর যাক, তারপর অন্যচিন্তা অন্যকাজ।
আগেই জানা ছিল, তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই, সারা কুমিল্লা স্টেশনের এমাথা ওমাথা জুড়ে পাক সেনারা গিজগিজ করছে। অন্যদিনের তুলনায় আজ অতিরিক্ত সৈন্য আনা হয়েছে ময়নামতি সেনানিবাস থেকে। কামানসহ ভারী অস্ত্র, গোলা বারুদ আর নতুন আসা সৈন্য প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে হুকুম পেয়ে উঠতে শুরু করেছে। এএসএম রকিবুল সিগন্যাল রুম থেকে বের হয়ে গার্ড সাহেবের সামনে এসে দাঁড়ালেন। নি¤œস্বরে হক সাহেবকে বললেন,
-ছেলেটা কাইল রাইতে বাসায় আইসা দেখা কইরা গেল। কিছু কইল না। তার মা আর আমারে সালাম কইরা গেল। খালি কইল, বানাসুয়া কী কামে জানি আসছে।
গার্ড সাহেব সহকারি স্টেশন মাস্টার সাহেবের কথার জবাবে কেবল বললেন, হু‘।
তারপর জিজ্ঞেস করলেন,
- লাইন কিয়ার কখন দিবেন? হুকুম পাইছেন?
- যাইবেনই তো। গেলেই তো গেলেন। ভাল কথা, মেজর বোখারি আপনেরে খুঁজছিল।
গার্ড সাহেব মনে মনে শঙ্কিত হলেন। কেননা এই সময়ে তাঁর কক্ষের দরজার কাছ থেকে সরে যাওয়া মোটেই নিরাপদ নয়। একটু এদিক সেদিক হলে সমস্ত অপারেশন ভ-ুল হয়ে যাবে। রকিবুলের কথা শেষ হতে না হতেই বোখারির সেন্ট্রি এসে সামনে দাঁড়াল। রকিবুল বললো,
-আপনে যান, কোন চিন্তা কইরেন না। আমি দরজার সামনে দাঁড়ানো আছি।
কথাটা শুনে এক লহমার জন্যে হক সাহেবের মনে হল রকিবুল কি সব জানে? তা না হলে সে দরজার সামনে দাঁড়াতে চাইবে কেন ? বললেন,
-ঠিক আছে, আমি না আসা পর্যন্ত আপনি নড়বেন না।
বোখারির কক্ষে হক সাহেব ঢুকতেই সে খেকিয়ে উঠলো। সে ভীষণ উত্তেজিত।
-মতি কাহা ? ও সালে বাস্টার্ড , শুয়োর কা বাচ্চা, আভি তক্ হামারা সাপ্লাই নেহি ভেঁজা। আপ জানতে হ্যায় ? দেখা হ্যায় উসকো ?
-নেহি জনাব।
-হোল ট্রুপস্ আর রেডি টু স্টার্ট। হোয়াট দ্যা হেল আই উইল ডু নাও। সান অব এ বিচ..
-ম্যায় বাহার যা কে ঢু-ো ? হক সাহেব বললেন।
-নো নো। যানে কা ওয়াক্ত হো গিয়া, আপ যাইয়ে, ম্যায় আতা হুঁ। আওর শুনিয়ে, ফকিরহাট স্টেশন মে ট্রেন রুখনা পড়েগা, ওকে ?
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে হায়নাটার ঘর থেকে বের হয়ে এসে গার্ড সাহেব যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। ফিরে এসে দেখলেন এএসএম রকিবুল গার্ড রুমের দরজাটা বাইরে থেকে লাগিয়ে দিয়ে তার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। একটা মাছিও গলতে পারবে না ওকে ডিঙিয়ে।
এক ঝলক্ ভাবলেন, ভিতরে ডগ বাক্সে মতি আছে তো ঠিকঠাক!
কাছে এসে হক সাহেব চোখের ভাষায় সহকারিকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন তার পিঠে হাত রেখে।
বিদায় নিল রকিবুল আল্লাহ হাফেজ বলে।
এরপর কী বলতে চেয়েও সে বললো না। দ্রুত চলে গেল নিজের ঘরে।

দুই.
রাত বারোটা তিন মিনিটে হুকুম হলো ট্রেন ছাড়ার।
গার্ড হক সাহেব তাঁর ডিউটি রোস্টার, গার্ড বুকের পাতায় লিখলেন,
ডেট-৬. ১১. ১৯৭১, ৩৬ আপ, ০০০৩ অওয়ার। ডিপারচার, কুমিল্লা টু কসবা। সই করলেন। তারপর যা এই খাতায় লেখার কথা না, তাও লিখলেন, ফ্রি ড ম- লং লিভ বাংলাদেশ।
খাতাটা বন্ধ করে দরজায় দাঁড়িয়ে মুক্ত বাতাসে বড় করে একটা শ^াস নিলেন। হুইসেলটা মুখে নিয়ে বিসমিল্লাহ্ বলে ফুঁ দিলেন।
এবার নীল নিশানটা ডান হাতের কব্জির মোচড়ে আকাশে উড়ালেন বরাবরের মতো। দরজায় দাঁড়িয়ে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত নিজের স্টেশনটাকে শেষ বারের মতো দেখে নিলেন। সেই সময়ে চকিতে চোখের কোনে উঁকি দিল স্ত্রী পুত্র কন্যার মুখ।
চলতি ট্রেনের বাইরে অন্তিম দেখার সময় অদূরে দাঁড়িয়ে ডান হাত তুলে সালাম দিল এএসএম রকিবুল। পাশে দাাঁড়িয়ে ছিলেন সহকর্মী গার্ড আবদুল ওহাব। হাত তুললেন তিনিও।
স্পেশাল ট্রেনটা চলতে চলতে শাসনগাছা রেল ক্রসিং পার হয়ে ধীর গতিতে থেমে গেল। মনে হচ্ছে, নিজের কামরা থেকে ওয়াকিটকিতে বোখারি ট্রেনের ড্রাইভারকে অথবা ইঞ্জিনে থাকা সেন্ট্রিকে কোন কারণে থামাতে বলেছে। গার্ড রুমেও ইমার্জেন্সি গাড়ি থামানোর জন্যে একটা হুইল আছে। যেটা প্রয়োজনে ডান দিকে ঘুরালে দুই বগির মাঝখানের কাপলিঙ্ক খুলে গিয়ে চাকার মধ্যে প্রচ- বাতাসের চাপ পড়ে। তাতে ট্রেনের চলতি শ্লথ করে দেয়। ইঞ্জিনের ড্রাইভার টের পেয়ে তখন ট্রেন থামায়।
হক সাহেব ভাবতে বাধ্য হলেন, তিনি তো ট্রেন থামাতে বলেন নি, তাহলে ট্রেন থামলো কেন ?
একটা দম বন্ধ করা অস্বস্তি গার্ড সাহেবের চেতনাকে ঠা-া করে দিল। কী ব্যাপার ?
শঙ্কিত মনে দরজার বাইরে উঁকি দিলেন তিনি।  
ডগ বাক্সের ভিতরে বসা মতিকে চাপা গলায় প্রস্তুত থাকতে বললেন।
একটা ম্যাচের কাঠিতে ট্রেনটা হাওয়ায় উড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ইশারায় জানালো মতি। ডেটোনেটর চার্জ ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোন কাজ নেই। হক চাচা হুকুম দিলেই মতি পিছনের দরজা দিয়ে ট্রেনের ছাদে উঠে যাবে।
গার্ড সাহেব দেখলেন, জুনিয়র অফিসার পদের একজন দৌড়ে গার্ড সাহেবের কামরার দিকে আসছে। পিছনে মুখ না ফিরিয়ে তিনি মতিকে বললেন,
-তৈরি থাকিস্ । হারামজাদা এই দিকেই আসতেছে।
সৈনিকটি দৌড়ে এসে হক সাহেবের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গেল। নিচে থেকেই উচ্চস্বরে বললো,
-স্যার আপকো বোলা, ফকিরহাট স্টেশন মে রুখনা নেহি পড়েগা। ঠিক হ্যায় ?
গার্ড সাহেব মাথা নেড়ে সায় দিতে সৈনিকটি দৌড়ে তার কামরায় ফিরে গেল।
স্বস্তির শ^াস ফেলে নিশান উড়ালে ট্রেন আবার কসবামুখী চলতে শুরু করলো।
গতি নিয়ে ট্রেনটা আউটার পার হতেই হক সাহেব মতিকে ইশারা দিলেন। মতি তাঁর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে হাতটা মাথায় ছোঁয়াল। তারপর দ্রুত পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে জানালায় পা রেখে ছাদের উপরে অদৃশ্য হলো।
গার্ড সাহেব আল্লাহর নাম স্মরণ করে প্রস্তুত হলেন। ঘড়ি দেখলেন। সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। মুক্তিযুদ্ধের অপারেশন চলে ঘড়ি ধরে, চোখের ইশারায়।
বাইরে উঁকি দিলেন। দেখতে পাচ্ছেন, ইঞ্জিনের লম্বা গলা দিয়ে গলগল করে কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে দানবটা বানাসুয়া ব্রিজের ওপর উঠে যাচ্ছে।
গার্ড সাহেব আগের কথামতো দরজার বাইরে নীল বাতি দুলিয়ে দিতেই মতি ট্রেনের ছাদের উপর থেকে বোখারির কামরার জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে ভিতরে ঢুকলো।
গ্রেনেড ফাটার শব্দ শুনতে শুনতে হক সাহেব নিজের কামরায় ডেটোনেটর চার্জ করেই চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিলেন অন্ধকারে।
মাটিতে পড়ে জ্ঞান হারাবার আগে নিজের বগিটাকে তুলার মতো আগুনের গোলা হয়ে আকাশে উড়তে দেখলেন। শুধু দেখলেন না, একই সময় বানাসুয়া ব্রিজের নিচে মুক্তিযোদ্ধাদের পাতা বোমার বিস্ফোরণে দুটো পিলার ধ্বসে গেলো। গোত্তা খাওয়া ঘুড়ির মতো সেজদার ভঙ্গিতে ইঞ্জিনটা ঝুলে পড়লো নদীর উপর। প্রকৃতিতে সেই সময় বাতাসের ইন্ধন পেয়ে পুরো ট্রেনটা আগুনের খাদ্য হতে খুব বেশি সময় নিল না।
দাউদাউ করে আগুনের লেলিহান শিখা তখন উর্দ্ধমুখী।
এদিকে ব্রিজের উপরে দুইপাশের সংকীর্ণ জায়গায় হতবিহ্বল, মৃত্যুভয়ে দিশেহারা পাকসেনারা ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ে যারা বাঁচতে চাইলো তারা সামনে এবং পিছন দিক থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের অবিরাম গুলির মুখে পড়লো।
আর নিচে বানাসুয়া ব্রিজের গাঙাইলের ঢালে কভার পার্টি নিয়ে সেতুটির পতন দেখছেন গেরিলা কমা-ার ক্যাপ্টেন হায়দার। মাথার ওপরে অদূরে ব্রিজের গার্ডারে আটকে কাত হয়ে ঝুলে থাকা ট্রেনটি তখন পাটকাঠির মতো জ¦লছে। আর মাঝে মাঝে রেল লাইনের দুইদিক থেকে স্টেনগানের গুলির আওয়াজ ভেসে আসছে।
একটা ফোঁপানো কান্নার আওয়াজ শুনে গেরিলা কমা-ার পিছনে ফিরে তাকাতেই গার্ড সাহেবের ছেলে মাহিনকে দেখলেন। তিনি ওর মাথায় হাত রাখলেন। সহযোদ্ধাকে মুখে কিছু বললেন না।
পরক্ষণেই জ্ঞান হারানো পতনোন্মুখ মাহিনকে দুই হাতে জাপ্টে ধরে পরম আদরে বুকের কাছে তুলে নিলেন। আর কেউ না জানুক, তিনি জানেন কেন মাহিনের চোখে জল আর সে জ্ঞান হারালো।
ফলে গেরিলা অধিনায়কের নিজের চোখ দুটোও আর শুকনো থাকে না কিছুতেই।
০৫. ১২. ২০১৭


Loading...

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};