ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
40
মধুরীম দ্যোতনা
Published : Thursday, 7 December, 2017 at 12:00 AM
প্রেমজ গল্প----------
মধুরীম দ্যোতনাসফিকুল বোরহান ||
      
      
   বিমুর্ত শৈল্পিক সৃষ্টিতে শিল্পী তার সবটা মনন দরদী আকুলতায় ঢেলে দিয়েছে নীল পানির গভীরে আধশোয়া মৃত শিশুটির সমস্ত স্বত্বা জুড়ে। শিশুটির হাত এমনভাবে মুঠিবদ্ধ যেন ছিটকে হারিয়ে যাওয়া মায়ের তর্জনীটা শক্তভাবে ধরে রাখা। আশপাশে জলজ মাকড় কিংবা মৎস্য প্রজাতিদের কম্পিত বিচরন। কোথায় মা, কোথায় মানবিকতা, কোথায় যূথবদ্ধ ধরণীর ত্রাতারা! পলাশ আকুল ডুব-সাঁতারে সেই শিশুটির গভীরে কী অত খুঁজছিল সে কি নিজে জানে তা? অতিনিকটে গভীর প্রশ্বাসের বায়বীয় শব্দে ফিরতেই হয়।
   কতদিন পর চিনুর সাথে চমকানো দেখা। ঠোঁটকোনে সেই প্রাণকাড়া হাসি। চোখের প্রান্ত কি একটু ভারী হয়েছে? গলার নীচেওতো। শাড়ির কুচি গলে ফর্সা ধবধবে পা দামী সেন্ডেলের ফাঁক দিয়ে নখে নেইলপলিশ পরা বিন্যস্ত আঙ্গুল ঠিক আগের মতোই পলাশকে মোহিত করলো। ঘন চুলের গভীর থেকে দু’একটা রেশমি চুল জানান দিল সময় পেরিয়েছে। হালকা লিপস্টিক আকাশরঙা শাড়ির সাথে কেমন মানিয়ে গেছে। ওর সাজগোজ একটুও বদলায়নি। ওর দাঁড়ানো ভঙ্গি একটুও বদলায়নি। ওর গভীর চাহনী একটুও বদলায়নি। আলতো করে বলে উঠলো চিনু, ‘কেমন আছো পলাশ?’ পলাশ কি একটু বিবশী হয়ে উঠল? পলাশের দু’চোখ কি একটু ভিজে আসতে চাইল? পলাশ কি একটু নড়েচড়ে উঠল?
   ‘কেমন আছো পলাশ?’ আবার চিনুর নরোম উচ্চারণ।
   ‘চলো, কোথাও বসি।’
   সামনে তো বসার জায়গা নেই। এসব প্রদর্শনীতে ওরা বসার জায়গা রাখেনা। নরোম আলোর বিক্ষেপে প্রদর্শনীর মুর্তমান ছবি কিংবা ভাস্কর্যগুলো গভীরভাবে দেখতে দেখতে বসা কিংবা ক্লান্তীর কথা একেবারেই আসে না। কিন্তু এইমুহূর্তে পলাশের দু’পা, শরীর, মন কেমন নেতিয়ে আসছে।
   ‘তুমি অসুস্থ্য ফীল করছো?, চলো বেরোই।’ চিনু পলাশের বাম হাতের কনে আঙুলটা আঁকড়ে ধরে একরকম তাড়াহুড়া করে বাইরে চলে এলো। দাঁড়ানো গাড়িতে উঠেই ক্রসরোডের প্যারাডাইস গার্ডেনে ড্রাইভারকে চালাতে বললো।
   ‘কপালটা মুছে নাও, অকারণ ঘামছো।’ বলেই হাতব্যাগ থেকে গোলাপি টিস্যু বের করে দেয় চিনু। ড্রাইভারকে এসিটা বাড়িয়ে দিতে বলে।
   ‘আগের মতোই আছো। স্বাস্থ্য একটু ভাল হয়েছে। বেশ হ্যান্ডসামও হয়েছ। সব একটু পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু কথা সেই আগের মতোই কম বলো। ভাল আছো তুমি?’
   ‘হ্যাঁ, ভাল।’
   ‘তুমি?’
   ‘আমাকে তো দেখতেই পাচ্ছ, খুব ভাল আছি।’
   ‘কোথায় থাকছো?’
   ‘রিনির বাসায়।’
   ’রিনির বাসায় কেনো?’
   ‘কোথায় থাকবো?’
   পলাশ উত্তর দেয় না।
   ‘তুমি কোথায় থাক?’
   পলাশ উত্তর দেয় না।
   করিডোর পেরিয়ে লিফটে সোজা রুফটপ গার্ডেনে। হেমন্তের অবারিত খোলা আকাশে ভরা পূর্ণিমার হেলানো চাঁদ আর তারাদের ঝিকিমিকি। তিরতির হালকা ঠান্ডা বাতাস, গার্ডেনের মনোরম গোছানো মৃদু আলো আর চাঁদজোসনা মিলে অরূপ পরিবেশ যা পলাশের খুবই প্রিয়। চিনু তাড়া দেয়, ‘বসোতো।’
   গার্ডেনটা ওরা এমনভাবে সাজিয়েছে মনে হয় প্রতিটা একেকটা গাছ দেয়ালের লন। বসলে পরে ওপাশের কাউকে দেখা যায় না। টুংটাং চামচের শব্দ আর মৃদু আসা কথাবার্তা ছাড়া একরকম একান্ত পরিধি। চিনু পলাশ মুখোমুখি বসা। চিনু আবার একটা টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘চোখটা মোছো।’
   ‘আমরা এখানে দু’আড়াই ঘন্টা বসবো। টাইমিং চার্জ পেমেন্টের সাথে। সময়মতো খাবার অর্ডার দেবো। এখন দু’কাপ কড়া কফি দেবেন। চিনি আলাদা।’ সার্ভিসম্যানকে একদমে কথাগুলো বলে গুছিয়ে বসলো চিনু। ওর বসার ভঙ্গিমাটা কোনো বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা দামী উপন্যাসের দরদী প্রচ্ছদ যেন।
   চিনু, পলাশের আত্মার একটা অবিভাজিত অংশ। চিনু মানেই পলাশের জীবনের সহগামী অধ্যায়। চিনু আছে বলেই পলাশ রাতের আকাশে সন্ধ্যাতারা দেখে, শুকতারা দেখে, কালকেতু দেখে। চিনু থাকে বলেই বসন্তপাখির সুরেলা গান মধুময়ী হয়ে ওঠে। চিনুর মধুরীম দ্যোতনা পলাশের জেগে ওঠার প্রধানতম উপকরণ।
   কতদিন পর চিনুর সাথে দেখা। কত বছর পার হয়ে গেল। কী আশ্চর্য চিনু একই রকম আছে কি করে! মানুষকে কতভাবে বদলাতে দেখেছে। চিনুর একটু বয়স হওয়া ছাড়া আর কোনভাবেই বদলায়নি।
   নিজের চোখটাতে টিস্যুর হালকা চাপ দিয়ে ডান-বামের পরিবেশটায় চোখ বুলিয়ে বলে ওঠে চিনু, ‘আমি জানতাম তোমার সাথে দেখা হবেই। আমি কিন্তু তোমাকে একটুও খুঁজিনি, তুমি বলেছিলে তোমাকে যেন একবারের জন্যও না খুঁজি, কোনো যোগাযোগের চেষ্টা যেন না করি। করিনি পলাশ। যে জীবন আমার জন্য বিচ্ছিন্ন হলো, তোমাকে কেন দূরত্বের অসীমে অকারণ বাঁধার ইচ্ছা করবো। তুমিও তা-ই করেছো। তুমি তোমার জীবনকে পুড়িয়ে খাক করেও আমার কাছে কোন কৈফিয়ত চাওনি। শুধু বিষাদময়ভাবে বলেছিল কখনো যেন যোগাযোগটা না হয়।’
   ‘এসব কথা না আসলে কি নয়? তুমি ভাল ছিলে শুনেই আমি খুশি। রিনির বাসায় কেনো বললে নাতো।’
   ‘বাবা শেষদিন পর্যন্ত বলেছিলেন, দেশের বাইরে এসে তোর জীবনটা আমি নষ্ট করে ফেললামরে মা। বাবাকে বোঝাতে পারিনি বাস্তবতার পরমতম আলিঙ্গনকে অস্বীকার করা যায় না। যতই উচ্ছল হতে চাইতাম বাবা ততই আমার গভীরে প্রবেশ করে বোঝাতে চাইতেন বড়ো সর্বনাশ হয়ে গেল। কী তছনছ যে হয়ে গেল পলাশ!’
   ‘বাবা-মা, ভাই-বোনরা কোথায়?’
   ‘বাবা-মা সম্ভবত আমার জন্যই তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। মিনু বিয়ে করে আমেরিকাতেই থাকে, রুমি কানাডায়।’
   ‘তুমি?’
   ‘আমি তো এলাম তোমার কাছে।’
   চমকে ওঠে পলাশ। ‘বিয়ে করোনি কেনো? কি করছিলে এতোদিন? দেশে কেনো এলে? কীভাবে থাকছো? কবে যাচ্ছো?’
   ‘এত প্রশ্ন করছো কেনো? তুমি অনেক কথা বলা শিখে গেছো। আমার যাওয়া আটকাওনি কেনো পলাশ? তখনকার তুমি আমাকে কেনো একবারও বলোনি- থেকে যাও, যেওনা। জানি পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্যকে আবেগী হতে হয় না। আমি বুঝতাম আমাকে নেবার সময় তখন হয়ে উঠছিলো না তোমার। আমি জানতাম আমাকে নিতে গেলে তোমার অনুগামী স্বত্বার মরন হতো, তোমার পরিধি বিবর্ণ নীল হতো। ভাঙচুর হতো দুটি আত্মার সাথে চৌমুখী প্রভাগুলো।’
   ‘আমি কী, কেমন থাকছি না জেনেই চলে এলে?’
   ‘বাহ্, জানবো না কেনো? তুমি যে আমার ছায়াসঙ্গী হয়ে আজকের দিনটায় আসতে, মহুয়ার নীচে জাগরনী গান হতো, বিভাময়ী জীবনের প্রতিটা স্তরে তোমার আমার বিচরিত অধ্যায়গুলোতে তুমি থাকতে পারছো আমি পারবো না কেনো? আমি তো জানতামই না খুঁজেই আমাদের স্পর্শিত জায়গাগুলোতে তোমাকে পাওয়া যাবেই। তোমার দেয়া কথা আমি রেখেছি। আমি জানি তুমিও নিজের দেয়া প্রতিজ্ঞা থেকে একচুলও সরোনি।’
   ‘এতটা বছর পার করতে কতটা জ্বলেছো তুমি চিনু! কেনো নিজের জীবনটা গোছাওনি?’
   বাঁধভাঙ্গা কান্নায় ডুবে যায় চিনু। পলাশ অবাক হয়ে দেখছিল চিনুকে। একটুও কান্না থামাতে বাধ সাধলো না। কেঁদে হালকা হলে কথারা সহজ হয়ে আসে।
   ‘কে বলেছে গোছাইনি। একটা প্রফেশনাল কোর্স করেছি, নামকরা একটা কোম্পানীতে চাকরি করেছি, অনেক পয়সা জমিয়েছি। প্রতিটা স্পট, সেন্টার, সমুদ্র, আকাশে চড়েছি তোমাকে মনে করে। নিয়মতান্ত্রিক অধ্যায় পার হবার পর সূযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছি আমার মনে যেন শুন্যতা ভর না করে, আমি কামনা করেছি সৃষ্টিকর্তা আমাকে ফিরিয়ে দিওনা, আমি যেন কোনওভাবে পলাশকে একবারের জন্য হলেও পাই।’
   ‘আর আমি কেমন ছিলাম জানতে ইচ্ছা হয়নি একবারও। বিষণœ পলাশ বলে ওঠে- আমিওতো তন্নতন্ন করে চাঁদকণায়, ইথারে, কুয়াশা মদিরে, জোনাক ভরা রাতে হন্যে হয়ে খুঁজেছি তোমাকে। তুমি আসবে কখনোই ভাবিনি কিন্তু তোমার আরতীতেই কাটিয়ে দিলাম জীবনের মহুয়াসময়। তুমি তুমি করেই বাবা-মায়ের, ভাই-বোনের সব আর্তিকে নীরবে পাশ কাটিয়েছি। সব পূর্ণতা সবখানে বিলিয়ে দিয়ে যখন নিজের পূজার থালা পূর্ণ করার প্রয়াস এলো তখন আর নিজকে ধরে রাখতে পারছিলাম না- তখনই তুমি কোন রূপময় পরি হয়ে চলে এলে।
   ধরে এলো গলাটা, কথা আর এগুলো না। চিনুর কম্পিত মুঠিতে উঠে এলা পলাশের মুঠি। দুই স্বত্তা একপ্রাণ হয়ে নবণী গীত গেয়ে উঠলো দেখে শুন্য অতীত অনিন্দ্য হয়ে উঠলো কি?   
সফিকুল বোরহান
অন্বেষা, রানির দিঘির পূর্ব পাড়, কুমিল্লা। ০১৭১৪-৩৭২২০০
tanhaborhan@yahoo.com




Loading...

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};