ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
51
‘তোমরা পিছু হটে যাও, আমি ওদের ঠেকিয়ে রাখছি’
Published : Thursday, 7 December, 2017 at 12:00 AM
‘তোমরা পিছু হটে যাও, আমি ওদের ঠেকিয়ে রাখছি’মাকে না বলে দেশ স্বাধীন করতে ছুটে গেলেন যে তরুণ, তিনিই পরে নিজের জীবন দিয়ে বাঁচিয়েছেন ৮০০ সহযোদ্ধার প্রাণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-র ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে শহীদ একমাত্র বেসামরিক বীর-উত্তম খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়ার নামে বিজনেস ফ্যাকাল্টিতে ভবন হচ্ছে, তিনটি সড়ক আছে। তাঁর পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন  মীর হুযাইফা আল মামদূহ।

কোনো দিন মহসীন হল, কোনো দিন খালার বাসা এভাবেই থাকেন খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন এমবিএ তৃতীয় ব্যাচে পড়েন নিজাম।
দিনে চাকরি করেন ঢাকার হোটেল ইন্টারকনটিনেন্টালে, রাতে কাস করেন। ২৫ মার্চ হোটেলের বিদেশি সাংবাদিকের মুখেই হয়তো শুনেছিলেন, রাতে ঢাকা আক্রমণ করবে পাকিস্তানি বাহিনী। ফলে সেদিন হলে না ফিরে চলে গেলেন পুরান ঢাকার অভয় দাস লেনের খালার বাড়িতে। রাতভর হলের বন্ধুদের চিন্তায় ঘুম এলো না। সকালে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য কারফিউ উঠলে, হলে ছুটে গেলেন। নিথর পড়ে আছে প্রিয় মুখগুলো, রক্তে ভেসে যাচ্ছে শরীর - এ দৃশ্যই পুরোপুরি বদলে দিল তাঁকে। সেদিনই খালার পরিবারকে কুমিল্লা নিয়ে গেলেন। শহরের করবী বাগিচাগাঁওয়ের বাড়িতে মা-বাবার কাছে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। কুমিল্লা শহরের তরুণদের ডেকে ঢাকার ঘটনা বললেন, বারবার অনুরোধ করলেন, ‘আপনারা কিছু করুন।’ ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি সেনারা বেরিয়ে পড়তে পারে ভেবে দুই পরিবারকে বুড়িচংয়ে গ্রামের বাড়িতে রেখে এলেন। মাকে বললেন, ‘খালার বাড়িতে গিয়ে কয়েক দিন থাকি?’ সেখানেই তো ছেলে ছিল, নিশ্চয়ই তাঁদের জন্য মন পুড়ছে - মা আপত্তি করলেন না। খালাতো ভাই গিয়াসকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন নিজাম। আশরাফ নামের আরেক পরিচিতকে নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ত্রিপুরা চলে গেলেন। এপ্রিলের শুরুতে আগরতলা গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রটি আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গেও যোগাযোগ হলো। প্রবাসী সরকারের নানা কাজেও স্বেচ্ছাসেবা দিলেন। এরপর অস্ত্র হাতে লড়তে গেলেন তিনি। আগরতলার কাছে ইন্দ্রনগরের ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শেষে এপ্রিল অথবা মে মাসের শুরুতে মুক্তিফৌজের একজন হিসেবে চলে গেলেন সিলেটের কানাইঘাটে। তখনো সেক্টরগুলো তৈরি হয়নি। ছোট ছোট দলে অপারেশন করে সিলেট মুক্ত রাখছিলেন নিজামের মতো মুক্তিসেনারা। ৪ নম্বর সেক্টর গঠিত হলে সেক্টর কমান্ডার মেজর সি আর দত্তের অধীনে সাব-সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হলেন নিজাম উদ্দিন। তিনিই সাবেক সেনা ও ইপিআরের মধ্যে একমাত্র বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা। ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পড়ল তাঁর কাঁধে। মেধাবী ও পরিশ্রমী মুক্তিযোদ্ধাটির সহকর্মীদের প্রতি মমতা দেখে সবাই তাঁকে ভালোবেসে ফেললেন। তখনো বাড়িতে কেউ জানেন না, দেশ মুক্ত করতে গিয়েছেন তিনি। তাঁর পরিবারের অবস্থা তখন বেশ করুণ।
সরকারের রাজস্ব বিভাগের সাবডিভিশনাল ম্যানেজার বাবা, সেই যে ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছেন, আর চাকরিতে যোগ দেননি। বড় ভাই সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মোস্তফা কামাল উদ্দিন ভুঁইয়া পাকিস্তানে কর্মরত আরো অনেক বাঙালি অফিসারের মতো বন্দি। সেজো ভাই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অর্থনীতি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শাহজালাল উদ্দিন ভুঁইয়া, কাস টেনের ছাত্র আল্লামা ইকবাল উদ্দিন ভুঁইয়াও যুদ্ধে চলে গেছেন। সবই জেনেছেন তিনি। তবে নিজামের হদিস না পেয়ে মা-বাবা দুশ্চিন্তায় অস্থির। অনেক দিন পর খালাতো বোনের স্বামী বাড়ি এসে জানালেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধে গেছেন। তত দিনে অভাব তাঁদের পেয়ে বসেছে। নিজের সামান্য মাসোহারার টাকা মানি অর্ডার করে বাড়িতে পাঠাতে লাগলেন নিজাম। তবে বড়জোর দুই-তিন মাস পাঠানোর সৌভাগ্য হয়েছে।
যুদ্ধের অবসরে মায়ের জন্য মন পোড়ে। একদিন সেক্টর কামান্ডারকে বলে ফেললেন, ‘স্যার, আমাকে কুমিল্লায় পাঠান। যুদ্ধ করে মা-বাবাকে একবার দেখব।’ ‘ঠিক আছে, এই যুদ্ধ শেষে যেয়ো।’  বললেন সি আর দত্ত।
৩ সেপ্টেম্বর রাতে ৮০০ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন সাব-সেক্টর কমান্ডার খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া। সিলেটের কানাইঘাটের অষ্টগ্রাম ব্রিজ উড়িয়ে দেবেন। পাকিস্তানি বাহিনী আর এগোতে পারবে না। রাতভর যুদ্ধ করে অসম সাহসী বাঙালি তরুণদল ব্রিজ উড়িয়ে দিল। তবে যুদ্ধ থামল না। থেমে থেমে গোলাগুলি হচ্ছে। হঠাৎ তাঁরা টের পেলেন, গুলি ফুরিয়ে আসছে। পাকিস্তানি বাহিনীও পরিস্থিতি টের পেয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ধরার ছক কষল। তখনই তাঁদের নেতা এগিয়ে এলেন। হাতে সাব-মেশিনগান। সহযোদ্ধাদের বললেন, ‘তোমরা পিছু হটে যাও, আমি ওদের ঠেকিয়ে রাখছি।’
নিরাপদে সরে যেতে লাগলেন সবাই। নিজাম অনবরত গুলি ছুড়ছেন। হঠাৎ একটি গুলি এসে তাঁর হাতে বিঁধল। তবুও অস্ত্র ফেলে দেননি। রক্ত ঝরা হাত নিয়েই দম আটকে গুলি করছেন।
মুক্তিসেনারাও নিরাপদে চলে যাচ্ছেন। একটি গুলি আহত মুক্তিযোদ্ধার বুকে লাগল। তবুও দাঁড়িয়ে আছেন, গুলি করছেন। আরেকটি গুলি মাথায় বিদ্ধ হওয়ার পর আর পারলেন না। একপাশে ঢলে পড়লেন। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ পড়ার শব্দে পেছন ফিরে তাকালেন সহযোদ্ধারা। মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করে এই বীরের লাশ নিয়ে তবেই তাঁরা ফিরেছেন।
ভারতীয় সেনাবাহিনী চেয়েছিল, এই অকৃত্রিম বন্ধুর কবর ভারতেই হোক। তবে মুক্তিযোদ্ধারা আপন দেশের মাটিতেই চিরদিনের জন্য রেখে দেবেন তাঁকে। কোনোভাবেই দুই পক্ষের সমঝোতা হলো না।
অবশেষে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী বললেন, নিজাম বাংলাদেশে থাকবে। সিলেটের কানাইঘাট সড়কের বাজার পেরোনোর পর সুরমা নদী পেরিয়ে মন্তাজগঞ্জ বাজারের পাশে মোকামের টিলার চূড়ায় তিন পীর হজরত লালশাহ, হজরত পাতাশাহ, হজরত গোলাপ শাহ (রহ.)-এর কবর। তাঁদের পায়ের কাছে দাফন করা হলো নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়াকে। অন্যদের বিশ্বাস হবে না বলে স্মৃতি হিসেবে তাঁর গায়ের শার্টটি খুলে নিলেন। সেটি পরেই মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি।
৪ সেপ্টেম্বর রাতেই স্বাধীন বাংলা বেতারের ঘোষণায় মালাপাড়ার মানুষও জানল, তাঁদের গ্রামের নিজাম সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে আত্মদান করেছেন। তবে তাঁদেরও বিশ্বাস হলো না, দুই দিন আগেও তো তিনি মাকে চিঠি লিখেছেন! বিশ্বাস করতে পারেননি তাঁর মা তাবেন্দা আকতার খাতুনও। স্বাধীনতার পর সহযোদ্ধারা নিজামের শার্ট ও ঘড়ি এনে বাড়িতে দিয়ে গেছেন। তার পরও নিজাম ফিরবে - এ আশায় প্রতিটি দিন রাস্তার পাশের জানালায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন মা। ছেলের শোকে ১৯৭৭ সালেই তিনি ইন্তেকাল করেন। বাবা আবদুল লতিফ ভুঁইয়া আর কোনো দিন চাকরিতে যোগদান করতে পারেননি। তিনি মারা যান ১৯৮০ সালে।
‘মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ বীরত্বের জন্য আমার ভাইকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধির জন্য প্রস্তাব করা হলেও আলোচনার ভিত্তিতে বীর-উত্তম খেতাব দেওয়া হয়। তিনিই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ একমাত্র বেসামরিক বীর-উত্তম।’ বললেন ছোট ভাই হাসান মহিউদ্দিন ভুঁইয়া।
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট তাঁদের এই ছাত্রের স্মৃতি অম্লান রাখতে আইবিএর প্রবেশপথে তাঁর ম্যুরাল তৈরি করবে। মাস্টার্সের সেরা ছাত্রকে তাঁর নামে স্বর্ণপদক দেওয়া হবে।’ জানালেন পরিচালক ড. এ কে এম সাইফুল মজিদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বললেন, ‘বিজনেস ফ্যাকাল্টির বিশতলা ভবনটি শহীদ খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া বীর-উত্তমের নামে নির্মাণ করা হবে।’
ঢাকার মালিবাগ রেলগেট থেকে খিলগাঁও ফাইওভারের বিশ্বরোডটি তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের শহীদ মিনারটিও ‘খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া বীর-উত্তম শহীদ মিনার’ নামকরণ হয়েছে।
তাঁর ভাই বললেন, “নিজাম ভাইয়ের কবরকে এলাকাবাসী ‘ক্যাপ্টেন নিজামের কবর’ নামে চেনেন। তাঁরা এখনো তাঁর গল্প করেন। তাঁদের বিশ্বাস, সেনা অফিসার ছাড়া এত বিক্রম সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রদর্শন করা সম্ভব নয়। তাঁর কবর কমপ্লেক্সে তাঁর নামে একটি মসজিদ, মাদরাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। মালাপাড়া গ্রামে কিন্ডারগার্টেন স্কুল আছে। গ্রামের বাড়ির কবরী বাগিচাগাঁও এবং মূল কান্দিরপাড় থেকে পুলিশলাইন সড়কের নামও ‘বীর-উত্তম খাজা নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া সড়ক’ রাখা হয়েছে। ”




Loading...

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};