ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
2650
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন; পর্যবেক্ষণ ও ভাবনা
মো: জাহাংগীর আলম, জেলা প্রশাসক, কুমিল্লা
Published : Monday, 16 October, 2017 at 5:06 PM, Update: 16.10.2017 5:29:42 PM
মো: জাহাংগীর আলম ।।  

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন; পর্যবেক্ষণ ও ভাবনাঐতিহ্যবাহী কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে গত ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ইং যোগদান করার পর হতে আজ পর্যন্ত জেলার প্রত্যন্ত এলাকার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছি। এ সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় করেছি এবং ছোট ছোট প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে তাদেরকে জানতে চেষ্টা করেছি। অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাংলা-ইংরেজি দেখে দেখে পড়তে পারছে না, গণিতের খুব সাধারণ বিষয়গুলো সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা পোষণ করছে না, বিজ্ঞান বিষয় মুখস্থ করে সিলেবাস শেষ করছে। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-শিক্ষিকাগণের অনেকেই সঠিক উচ্চারণে ইংরেজি পড়াতে পারছেন না। Giant (জাইয়্যান্ট) কে পড়াচ্ছেন ‘জেইন্ট’ হিসেবে। ‘সিলেবল’ (Syllable) কী তাও বোঝাতে পারছেন না শিক্ষার্থীদের। ‘নৃবিজ্ঞান’ শব্দের অর্থ  কী তা ও বলতে পারছেন না। এ বিষয়গুলো আমাকে চিন্তিত করছে। 

একুশ শতকের বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন, যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী করার জন্য সরকার কর্তৃক নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষানীতি-২০১০ প্রবর্তন ও বাস্তবায়ন, শিক্ষা আইন প্রবর্তনের কার্যক্রম গ্রহণ, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার শিক্ষা বিষয়ক লক্ষ্য বাস্তবায়নে সফলতা, সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা চালুকরণ সহ নানা উদ্যোগে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর বর্তমান অবস্থা হতে মুক্ত করতে হলে প্রথমেই দরকার শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহীত সম্ভাবনা, চাহিদা, ঝোঁক, সীমাবদ্ধতাসহ পূর্ণ মনো-বিশ্লেষণ। পাশাপাশি প্রয়োজন শিক্ষকগণের আগ্রহ ও ইচ্ছাশক্তি। শিক্ষকতাকে অন্য দশটি পেশার মত গ্রহণ না করে দায়িত্ব ও কর্তব্যরূপে গ্রহণের  বিকল্প নেই। শিক্ষকতা কোন পেশা নয়, এটি একটি মানুষ গড়ার এক মহৎ শিল্প। শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য হতে হবে শিক্ষার্থীকে নামসর্বস্ব ভাল ফলাফল করিয়ে দেয়া নয় বরং শিক্ষার্থীর ভেতর স্বপ্নের বীজ বপন করে সে বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানব-বৃক্ষে পরিণত করতে সহায়তা প্রদান।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন; পর্যবেক্ষণ ও ভাবনাবিখ্যাত শিক্ষামনোবিদ জন ডিউই বলেছেন, 'শিক্ষা জীবন গড়ার প্রক্রিয়া নয় বরং এটি জীবনেরই একটি উপাদান।' আর শিক্ষা যদি উন্নত মানব তৈরি করতে না পারে সে শিক্ষা অর্জনের পর সে শিক্ষার্থী সমাজের সম্পদ নয় বরং হয়ে যাবে বোঝা। “যখন শিক্ষা শিক্ষার্থীদের কাছে মজার বদলে হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য তখন সে শিক্ষার্থীর আগ্রহের অপমৃত্যু ঘটে। আমরা কিন্তু এ আগ্রহের অপমৃত্যুতে ভীত হওয়া দূরে থাক, উৎফুল্ল হয়ে উঠি। আমরা ভাবি দেশে যত শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাশ করছে তত শিক্ষার বিস্তার হচ্ছে। পাশ করা ও শিক্ষিত হওয়া এক নয়, এ সত্য স্বীকার করতে আমরা কুণ্ঠিত হই”- প্রমথ চৌধুরীর ‘বইপড়া’ প্রবন্ধের এই উক্তিটি তখন প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এখন যুগ সৃজনশীলতার। মুখস্থবিদ্যা ভিত্তিক পড়ালেখার পদ্ধতি হতে উন্নত বিশ্ব বেরিয়ে এসেছে অনেক অনেক আগে। আজ সৃজনশীলতার মাধ্যমে অন্তস্থকরণ না করলে, না বুঝে অর্জিত শিক্ষার বিন্দুমাত্র মূল্য থাকবেনা সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারেও। 

এ লক্ষ্যে আমাদের করণীয় হতে পারে-

প্রথমত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। শিক্ষককে শিক্ষার্থীর অন্তর্লোকে প্রবেশ করে বুঝতে হবে শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতাকে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেককে বর্তমান সরকারের প্রদেয় সন্তোষজনক বেতন কাঠামোতে সন্তুষ্ট থেকে কোচিং টিউশনি নির্ভর বাড়তি উপার্জনের পথ থেকে সরে এসে নিজেকে নিবেদিত করতে হবে শ্রেণিকক্ষে একজন মহান শিক্ষাগুরু হিসেবে।

তৃতীয়ত, কোন বিষয় পড়ানো শুরু করার পূর্বে সে বিষয়ের পটভূমি সম্পর্কে সম্যক ধারণাটি দিতে হবে শিক্ষার্থীদের। 

ধরা যাক, একজন শিক্ষক বাক্যের রূপান্তর (Transformation of Sentence) পড়াচ্ছেন, ঐ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা যদি বাক্য সম্পর্কেই সঠিক ধারণাটি না পায় তাহলে তাদের বাক্যের রূপান্তর বিষয়টি কখনই বোঝানো যাবে না। তেমনি জ্যামিতি পড়াতে গিয়ে শিক্ষার্থীকে বোঝাতে হবে জ্যামিতি কিভাবে এলো, বাস্তব জীবনে এর কী প্রয়োগ রয়েছে ইত্যাদি। এতে শিক্ষার্থীর কাছে পঠিত বিষয়টি আর দুরবোধ্য মনে হবেনা, তারা সৃজনশীল যে কোন প্রশ্নের উত্তর সে লিখতে পারবে অনায়াসেই। সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থার একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের জ্ঞানগত ক্ষমতায়ন। পূর্বে শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া ছিল শিক্ষার্থীদের শিক্ষকের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা। কিন্তু আজকের ব্যবস্থায় শিক্ষকের ভূমিকা অনেকটাই শিক্ষাদানের চেয়ে শিক্ষার্থীকে সমর্থ করে তোলার কার্যক্রম। অর্থ্যাৎ, এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক হলেন ফ্যাসিলিটেটর। তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে মৌলিক ধারণাটি পরিষ্কার করবেন, আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হবে বিষয়টি নিয়ে প্রায়োগিক ও বিশ্লেষণমূলক চিন্তা করার ক্ষমতা। এ থেকেই শিক্ষার্থী তার জ্ঞান, মেধা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে লিখবে নিজের ভাষায়, যা প্রতিফলিত করবে তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনাবিস্কৃত সৃষ্টিশীলতা।

সনাতন ব্যবস্থায় পাঠদানের ধারণাটি ছিল, কেবল শিক্ষক বক্তা আর শিক্ষার্থী শ্রোতা। আধুনিক পাঠদান এ একমুখী ধারা থেকে বেরিয়ে এসে হয়েছে উভয়মুখী। অর্থ্যাৎ, শিক্ষার্থীরাও তাদের মতামত দেবে শ্রেণিকক্ষে, গঠনমূলক আলোচনা করবে, বিশ্লেষণ করবে। দ্বিমুখী আলোচনার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী নানা আঙ্গিকে চিন্তা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হয়ে উঠবে পারঙ্গম।

যে বিষয়টি সবচেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হলো শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে অভিভাবকদের ভূমিকা। মানব সন্তান জন্মানোর পর অভিভাবকের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে মানব শিশুটিকে যোগ্য মানুষরূপে গড়ে তোলা। প্রত্যেক শিক্ষকই কোন সন্তানের পিতা কিংবা মাতা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সাথে জড়িত প্রত্যেকেই অভিভাবক। আর তাই সকলের দায়িত্ব হলো সকল সন্তানদের জন্য যুগোপযোগী শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা এবং মানসম্মত শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করা। অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষক- এই তিন পক্ষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা শিক্ষার মানোন্নয়নে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মহান দার্শনিক এরিস্টটলের মতে, ‘যে পিতা সন্তান জন্ম দেন তার চেয়েও সম্মানিত সে পিতা যে সন্তানকে সুশিক্ষা দেন; যে পিতা জৈবিকভাবে সন্তানকে পৃথিবীতে আনেন তার চেয়েও সম্মানিত সে পিতা যিনি সে শিশুকে সুন্দর ও শৈল্পিকভাবে বাঁচতে শেখান।'

লেখক: জেলা প্রশাসক, কুমিল্লা




© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};