ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
56
ফিরে দেখা
Published : Thursday, 12 October, 2017 at 12:00 AM
ফিরে দেখাআনোয়ারুল হক ||
চতুর্থ পর্ব - আঠার

আমি যখন সরকারি চাকরি শুরু করি তখন আমার বেতন ছিলো সাড়ে সাতশত টাকার স্কেলে। সব মিলিয়ে পেতাম, বারোশ টাকার মতো। দুবছর চাকুরি করার পর স্কেল নয়শত টাকা হওয়ায় মোট টাকা আরও কিছুটা বেড়ে হলো প্রায় চৌদ্দশত টাকার মতো । তখন ভাবনায় ছিলাম, বিয়ে করলে এই টাকায় বাসা ভাড়া দিয়ে সংসার চালাতে পারবো কি না। এও ভাবছিলাম, পারি আর না পারি, যদি বিয়ে করতে হয় তাহলে এখনই সময়। বয়স তো উনত্রিশ পার হতে চললো। এখনই না হলে সময়ের হিসাবে আমাকে সংসার জীবনে পিছিয়ে পড়তে হবে। হিসাবে আমার মনোভাব তখন এমনই।
তবে সত্যি কথা বলতে কি, সরকারি কলেজে চাকুরি করে আমার যে আয় তাতে ভয় পাচ্ছিলাম বিয়ের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে। এই সময় আমার একান্ত শুভানুধ্যায়ী আলিয়া মাদ্রাসার মাওলানা জিল্লুর রহমান সিদ্দীকী আমাকে অভয় দিয়ে তাঁর ভাষায় বললেন,
-বিয়া করতা তো জলদি করি লাইন। আল্লায় চালাইয়া নিবো, টেরও পাইতা নায়। আর আফনে কুনো চিন্তা করইন না যেনো। দেখবা, এহন জোলা দিন যায় না নি, তহনও ওলা দিন যাইবো। কুনো বেশকম পাইতা নায়। হা হা হা।
মাওলানা সাহেবের এই সহজ সরল কথায় একটা সমাধান পেলাম বটে।
তবে ভাল কথা, কিন্তু মেয়ে পাবো কোথায়? চাইলেই কি আর মনের মতো মেয়ে পাওয়া যায় ?
এদিকে আমার মনের ভিতরে যে একটা গোপন ইচ্ছে বাসা বেঁধে আছে তা তো এখনও জেগে আছে। তার কি হবে? এখানে বলে রাখি, ছাত্রজীবন থেকে আমার মেয়ে বন্ধু আছে অনেকেই, কিন্তু বিয়ে করার মতো কাছেরজন নেই কেউ আমার। তাই কোন পিছুটানও নেই। ফলে আমি যদি ইচ্ছে করি তাহলে পছন্দ হলে বাংলাদেশের যে কোন জেলার মেয়ে আমি বিয়ে করতে পারি। বাবা মা কোন আপত্তি করবেন না। তাই অভিভাবকদের দিক থেকে একটা সুযোগ আছে বলেই- ‘জেলার বাইরে সিলেটি মেয়েদের আমরা বিয়া দেই না’- এখানকার এই স্থানীয় ইগোটাকে ভেঙ্গে দিতে চাইলাম আমি। এজন্যে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে সিলেটের মেয়েই বিয়ে করবো। ভাল হলেও আমার, মন্দ হলেও আমার।
এদিকে মাদ্রাসায় কাশ শেষে হাতে থাকতে লাগলো অফুরন্ত সময়। লেখালেখির অভ্যাসতো আগে থেকেই ছিলো। ফলে অবসর সময় কাটানোর জন্য অচিরেই একদিন হাতে সুযোগ এসে গেলো। আমার এক বন্ধু আমাকে নিয়ে গেলো তাঁতিপাড়ায় ‘সাপ্তাহিক সিলেট সমাচার’ পত্রিকা অফিসে। পত্রিকাটির সম্পাদক হলেন আবদুল ওয়াহিদ। খাঁটি সিলেটি মাটির মানুষ। গড়নে ছোটখাট দেখতে সুদর্শন এবং বাকপটু। একসময় ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিঞার সঙ্গে কাজ করেছেন, সাংবাদিকতা শিখেছেন। জানিয়ে রাখি, এর মাস ছয়েক আগে তাঁর পত্রিকায় একটি নিবন্ধ ছাপা হওয়ার প্রেক্ষিতে ইসলামের অবমাননা হয়েছে’ এমন গুরুতর  অভিযোগ তুলে ধর্মান্ধরা ক্ষেপে গিয়ে মিছিল করে এসে পত্রিকা অফিসটি জ্বালিয়ে দেয়। আর পত্রিকাটিও এতদিন বন্ধ ছিলো। এখন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এলে আবার কাগজটি বের করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। আমি লেখালেখি করি জেনে ওয়াহিদ সাহেব খুশিমনে আমাকে তাঁর পত্রিকায় নিয়মিত ফিচার লেখার জন্য অনুরোধ করলেন। আমিও সময় কাটানোর ভাল সুযোগ পাওয়া গেলো এই ভেবে তখন থেকেই লেগে গেলাম ঐ পত্রিকার কাজে। সেখানেই বন্ধুত্ব হলো আতাহার নামে এক যুবকের সাথে। সেই ছিলো মূলত ‘সিলেট সমাচার’ পত্রিকাটির নেপথ্য সম্পাদক, লেখক, প্রকাশক, প্রচারক অফিসের কর্মচারি সবকিছু। তাঁতিপাড়ায় ওয়াহিদ সাহেবের একটা সুবিধা ছিলো যে, তাঁর পত্রিকাটি ছাপানোর জন্যে ওনার নিজস্ব ছাপার মেশিন ছিলো। এই মেশিনটিও চালাতো আতাহার। ভীষণ করিৎকর্মা এক ছেলে সে। সদালাপি এবং সহৃদয় মানুষ।
সত্যি বলতে কি, সিলেটে এই সময়ে কোন পত্রিকাতেই কোন ফিচার পাতা ছিলো না। কেউ করতো না। আমিই প্রথম সাপ্তাহিক সিলেট সমাচারে আলাদা করে নিয়মিত ফিচার পাতা চালু করি। এর কিছুদিন পরে ওয়াহিদ সাহেব যখন দৈনিক জালালাবাদ নামে আরও একটি পত্রিকা চালু করেন তখন ঐ পত্রিকাতেও আমি প্রতিদিন ফিচার পাতায় বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখা চালু রেখেছি প্রায় দু’বছরের মতো। তো যাই হোক, এখানে কাজ করতে করতে আতাহারের সঙ্গে আমার একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যে কারণে তাকে আমি একদিন কথায় কথায় হাসতে হাসতে বলে রেখেছিলাম, আমি পছন্দ হলে সিলেটে  বৈবাহিক সম্বন্ধ করতে চাই।  আমার এই কথাটা আতহার মনে রেখেছিলো।
এদিকে আমি ভাবছিলাম, বিয়ে করলেই তো হবে না, শহরে বাসা ভাড়া সহ সংসার চালাতে গেলে আয়ের অন্য পথ বের করতে হবে। কয়দিনের মধ্যে পথ বেরিয়ে গেলো অতি সহজেই। এখানে বলে রাখি, ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে শহরে চলে এলেও আমার কিন্তু ওখানকার কারো সাথেই সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। আর এদিকে শহরেও তেমন কোন বন্ধু হয়নি বলে আমি প্রায় রোজ বিকেলে ক্যাডেট কলেজে উপাধ্যক্ষ আল আমিন স্যারের বাসায় আড্ডা দিতে চলে যেতাম।
আগের কোন এক লেখায় আমি বলেছি, ঐ সামরিক কলেজটি এয়ারপোর্ট রোডে শহর থেকে যার দূরত্ব প্রায় পাঁচ মাইল। যেতে যেতে এই পথে নয়ন মনোহর চা বাগানের মাঝখান দিয়ে মনোরম দুইপাশ যে কারো মনে শান্ত ভাব সৃষ্টি করে। কোন কোন দিন আড্ডা দিয়ে খেয়ে দেয়ে ক্যাডেট কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে আমার অনেক রাত হয়ে যেত। ফিরতে তখন কোন সিএনজি পাওয়া না গেলে আমি মনের আনন্দে ঐ পাহাড়ি পথ হেঁটে পাড়ি দিয়ে শহরে চলে আসতাম। আমার কোন ভয় কিংবা কষ্ট হতো না। এই কাজটিও আমি করেছি আল আমিন স্যার সিলেট থেকে বদলি না হওয়া পর্যন্ত। একদিন আড্ডায় তিনিই পরামর্শ দিলেন, ক্যাডেট কলেজ এডমিশন কোচিং শুরু করার জন্য। তখন ক্যডেট কলেজে এডমিশনের জন্য সহায়ক কোন প্রতিষ্ঠান সিলেটে ছিলো না। আমি রাজি হয়ে সিলেট সমাচারে বিজ্ঞাপন দিলাম। সপ্তাহ খানেক পরে তিনজন ছাত্র নিয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেয়ে একটি কক্ষে শুরু করলাম ক্যাডেট কোচিং। প্রথম বছরে এই তিনজন দিয়ে শুরু করলেও পরের বছর ভালই সাড়া পেলাম।
দিনকাল যখন এইরকম চলছে তখন একদিন সকালে এক ভদ্রলোক এলেন সমাচার পত্রিকা অফিসে। তিনি কথা বলছিলেন আতহারের টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে। আমি তার থেকে একটু দূরে অন্য টেবিলে কোন একটা বিষয় নিয়ে লিখছিলাম।
টুকটাক তাদের দুজনের কথাবার্তা আমার কানে আসছিলো। একসময় শুনলাম, আগত ভদ্রলোক আতাহারকে ক্যাডেট কলেজের আমার চেনা এক অধ্যাপকের নাম ধরে কোন কথা বলছেন।
আমি কৌতুহলবশত: ক্যাডেট কলেজের কার নাম নিয়ে তিনি কথা বলছেন, প্রশ্ন করাতে ভদ্রলোক যার নাম বললেন, শুনে তার পরে আমি আর তাঁকে কোন কথা না বলাতে তিনি নিজে থেকেই আমাকে প্রশ্ন করলেন,
-আপনি কি তাকে চিনেন ?
গত বছর কলেজটি ছেড়ে আমি চলে এসেছি। সেই কলেজের আমার কোন শিক্ষককে না চেনার তো কোন কারণ নেই। আমি ভদ্রলোকের প্রশ্নের উত্তরে হ্যা সূচক মাথা নাড়ি।
অনুকূল সাড়া পেয়ে তিনি চেয়ার টেনে আমার সামনে এসে বসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। বললেন,
-আমি মুজিবুল হক, এনএসআইয়ের ফিল্ড অফিসার, রায়নগর আমার বাসা।
পরিচয় পর্ব শেষ হওয়ার পর মুজিব সাহেব আমাকে বললেন,
-ভাই, ক্যাডেট কলেজের আমি যার নাম বললাম, ঐ প্রফেসারের শ্যালকের সঙ্গে আমার ছোট বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছে। তারিখও ঠিক হয়ে গেছে। এখন পাত্রপক্ষ যৌতুক দাবি করাতে আমরা দ্বিধার মধ্যে পড়ে গেছি, এই বিয়ে আমরা দেবো কি না। তবে আমার আব্বা ওরা যৌতুক চাইলেও কথা দিয়েছেন বলে এখন পিছিয়ে আসতে রাজি নন। কিন্তু আমরা ভাই বোনেরা মোটেই এই বিয়েতে  রাজি নই। মনে হচ্ছে, আগে কোন কিছু না বলে এখন যৌতুক চাওয়ার কারণে পাত্র পক্ষ লোভী। কি করি বলেন তো ?
মুজিব সাহেবের প্রশ্নের জবাবে প্রথমে আমি আমার নিজের পরিবারের দিকটি ভাবলাম। আমারও তো বোন আছে। এই অবস্থায় আমি হলে কি করতাম ? ভেবে তাঁকে বললাম,
-আপনি কি বরের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেছেন ? এমনো ত হতে পারে যৌতুকের মানসিকতা বরের নয় এটা তার পরিবারের চাহিদা। আপনি যদি পাত্রের  সঙ্গে কথা বলেন তাহলে অন্তত ছেলের মনের ভাব কি তা জানতে পারেন। তখন আপনারা একটা সিদ্ধান্ত নেবেন।
এই কথা শুনে তিনি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সেদিনের মতো চলে গেলেন।
সম্ভবত এই কথোপকথনের পরের সপ্তাহে আমি কুমিল্লা থেকে বাসে সিলেটে ফিরছিলাম। তখনও কুমিল্লা সিলেট রোডে আন্ত:নগর ট্রেন চালু হয়নি। ফলে দশ বারো ঘন্টা লাগিয়ে এই পথে বাসই ছিলো একমাত্র চালু যানবাহন। আমার বাসটি মৌলভীবাজারে যাত্রা বিরতি দিল এক জায়গায়। দেখলাম, মুজিব সাহেব এই বাসেই উঠেলেন। আমাকে দেখে সহাস্যে পাশের সিটে বসলেন। বাস চালু হতে তিনি আমার কুশলাদি জেনে নেওয়ার পর বললেন,
-ভাই, পাত্রের সঙ্গে কথা বলার জন্য আমরা ওদের বাড়িতে গেছিলাম। কিন্তু ছেলে আমাদের সামনে আসেনি। আমরা এখন ভাবনায় পড়ে গেলাম রে ভাই। এদিকে আব্বাতো আমাদের বলে দিয়েছেন, যদি ডিসেম্বরের ১৪ তারিখের মধ্যে অন্য কোন পাত্র না পাওয়া যায় তাহলে পাত্রপক্ষকে কথা দিয়েছেন বলে ওখানেই বিয়ে দেবেন।
বলা বাহুল্য, তখন ঐ বছরের অক্টোবর মাস চলছিলো আর ডিসেম্বরের চৌদ্দ তারিখ হচ্ছে মুজিব সাহেবের ছোট বোনের বিয়ের তারিখ।
ধহধিৎঁষযধয়ঁবপস@মসধরষ.পড়স



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};