ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
84
অন্তরালে বহুমুখী অনুসঙ্গ
Published : Tuesday, 10 October, 2017 at 12:00 AM
অন্তরালে বহুমুখী অনুসঙ্গশান্তিরঞ্জন ভৌমিক
আমাদের বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও ব্রিটিশ শাসিত ইংরেজ শাসকদের তৈরি পরিকাঠামো অনুযায়ী চলছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। যদিও দৃশ্যত কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। এ পরিবর্তন সব সময় গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেনি, ফলে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও শিক্ষা কমিশন নামক একটি সংস্থা এখনও সুস্পষ্ট বাংলাদেশ উপযোগী
শিক্ষা ব্যবস্থার সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারেনি। আর কোনো কোনো কমিশন সুপারিশ করলেও প্রয়োগ বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে বা সমকালিন সরকার  তা বাস্তবায়নের পক্ষে আন্তরিক হতে পারেনি। প্রতিটি সরকার তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি অনুগত কমিশনকর্তৃক সুপারিশ প্রত্যাশা করে বলেই বর্তমানে বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা একমুখী থাকেনি বা থাকছে না। ফলশ্রুতিতে সরকার সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের পাশাপাশি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড স্থাপন করে। এতে দেশে এখন বহুমুখী শিক্ষা প্রদানের ফলে আমাদের প্রজন্ম কোন গন্তব্যে এগিয়ে যাবে তা সিদ্ধান্ত নিতে বিব্রত অবস্থায় পতিত হচ্ছে। অভিভাবকও তার তিনটি সন্তান থাকলে একটিকে সাধারণ শিক্ষা, একটিকে কারিগরি ও একটিকে মাদ্রাসা শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহ দিয়ে থাকে। আধুনিক মনস্ক অভিভাবকরা একজন ছাত্রের স্বাভাবিক ইচ্ছা বা আগ্রহের প্রতি অনুকূল সাড়া না দিয়ে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে অতি মাত্রায় আগ্রহী হয়ে উঠে। ফলে একজন ছাত্রের আপন গতিপথ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। এখান থেকে সমস্যার সৃষ্টি।
৪০/৫০ বছর আগে মাধ্যমিক শিক্ষা একমুখী ছিল। যারা মেট্রিক পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন তারা অভিন্ন সিলেবাসে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতেন। মেট্রিক পাশের পর ছাত্রের ইচ্ছা-আগ্রহ বা যোগ্যতার প্রতি অনুকূল সাড়া দিয়ে কাউকে বিজ্ঞান, বাণিজ্য বা কলা বিভাগে পড়াশুনা করার সুযোগ করে দিত। তখনও লক্ষ্য করা গেছে, মেট্রিকে ভালো ফল করলে তাকে বিজ্ঞানে ভর্তি করিয়ে দিত অথচ সে ছাত্রটি স্বভাবগতভাবে বিজ্ঞান পড়তে আগ্রহী নয়। এভাবে অনেক ছাত্রের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে তা আমরা উপলব্ধি করেছি। সংকট বা সমস্যা হচ্ছে আমরা যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণের প্রতি আগ্রহী এবং এক্ষেত্রে শিক্ষা বাণিজ্যিক বিষয়টি আলোচনায় চলে এসেছে। দুঃখের সাথে বলতে হয়- আমরা এখনও মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার ধূ¤্রজালে আটকিয়ে আছি, সেজন্য অনেকটা পথহারা।
বর্তমানে যে বিষয়টি নিয়ে প্রচ- আলোচনা চলছে, তা হচ্ছে সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর নিয়ে। আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে আমাদের বিশেষজ্ঞগণ বিদেশি শিক্ষা ব্যবস্থার অনুকরণে দেশীয় শিক্ষাকে সাজাতে চান। তারা কিছুতেই বুঝতে চান না- আমাদের দেশটি বাংলাদেশ, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা- আমাদের সংস্কৃতিও বাঙালিয়ানা। এই স্বভাব-স্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করে যা কিছু করার চেষ্টা চলবে সেখানে সার্থকতার ঘাটতি পড়তে বাধ্য। কোনো দেশই তার জাতিসত্তা, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করেনি। প্রশ্ন- আমাদের অপপ্রচেষ্টা কেন? সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর বিষয়টির ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। যারা তা প্রবর্তনের পক্ষে উঠেপড়ে লেগেছেন তারা তা কতটুকু অনুধাবন করতে পারছেন, এখন তা প্রশ্নবিদ্ধ। এক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সত্যিকার অর্থেই অসহায়। অথচ ব্রিটিশ শাসিত শিক্ষা ব্যবস্থার ধারায় সাহিত্য বিষয়ে একজন ছাত্রকে পরীক্ষায় রচনা-পত্রলিখন-সারাংশ-ভাবসম্প্রসারণ-অনুচ্ছেদ বা পরিচ্ছেদ ইত্যদি প্রশ্নের উত্তর লিখতে হতো, তাতে ছাত্রটির মেধা বিকাশে সৃজনশীল যোগ্যতা প্রদর্শনের সুযোগ ছিল। কিন্তু এখন পদ্ধতিটি প্রবর্তনের পক্ষে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগ্রহী হয়ে উঠেছেন, তার সুফল লাভ থেকে বিভ্রান্তি বিষয়টি দৃশ্যমান অধিক। কারণ বোর্ড-কর্তৃক প্রশ্নকর্তা যাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, দু’সপ্তাহ চারজন বসেও সঠিক প্রশ্নপত্রটি প্রণয়ন করতে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। আর এ প্রশ্নের উত্তর লিখে যারা পরীক্ষা নামক বৈতরণী পার হবে, তাদের অবস্থা অনুমেয়। যারা উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন, তাদের জন্য বোর্ড কর্তৃক একটি নির্দেশনা থাকলেও পরীক্ষক কতটুকু দায়িত্বশীল ও আন্তরিক তাও প্রশ্নবিদ্ধ। বোর্ডের নির্দেশনায় আছে-
০১.সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর সংক্ষিপ্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। সৃজনশীল প্রশ্নের জন্য শিক্ষার্থীর কাছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠার উত্তর প্রত্যাশিত নয়।
০২.পরীক্ষার্থীর উত্তর হুবহু নমুনা উত্তরের মত পাওয়া প্রত্যাশিত নয়। পরীক্ষার্থীর উত্তর নমুনা উত্তরের চেয়ে ভালো সমমানের বা খারাপ হতে পারে।
০৩.নমুনা উত্তরের যে ভাবটুক দেয়া আছে, পরীক্ষার্থীর উত্তর সে ভাবের সঙ্গে মিলে গেলেই সঠিক ধরে পূর্ণ নম্বর দেয়া হবে, শব্দ-চয়ন, বাক্য-গঠন, উপস্থাপন এগুলো পরীক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক।
০৪.ভগ্নাংশে নম্বর দেয়া যাবেনা। প্রত্যাশিত দক্ষতার স্তর অনুযায়ী লিখলে পূর্ণ নম্বরই পেয়ে যাবে। খ, গ ও ঘ এর উত্তরে বানানগত ত্রুটি, ব্যাকরণগত ত্রুটি মুখ্য ব্যাপার নয়।
এক্ষেত্রে সৃজনশীল পদ্ধতি বিষয়ে পুনর্বিবেচনা এখন সময়ের দাবি।
তারপরও কোনো কোনো শিক্ষাবোর্ডে বিশেষত ২০১৭ খ্রিঃ কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের ফল বিপর্যয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তা কেন? এতদিন ছাত্র-ছাত্রীরা যে হারে পাশ করেছিল এবার শতকরা হিসেবে অনেকটাই কম, তুলনামূলক বিগত বছরের কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশের শতকরা সারণি দেয়া হল:
গ্ধ ২০১৩ সালে কুমিল্লা বোর্ডে পাশের হার ছিল ৯০.৪১ শতাংশ, জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৭ হাজার ৮৫৫ জন।
গ্ধ ২০১৪ সালে কুমিল্লা বোর্ডে পাশের হার ছিল ৮৯.৯২ শতাংশ, জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১০ হাজার ৯৪৫ জন।
গ্ধ ২০১৫ সালে কুমিল্লা বোর্ডে পাশের হার ছিল ৮৪.২২ শতাংশ, জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১০ হাজার ১৯৫ জন।
গ্ধ ২০১৬ সালে কুমিল্লা বোর্ডে পাশের হার ছিল ৮৪.০০ শতাংশ, জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৬ হাজার ৯৫৪ জন।
গ্ধ ২০১৭ সালে কুমিল্লা বোর্ডে পাশের হার ছিল ৫৯.০৩ শতাংশ, জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৪ হাজার ৪৫০ জন।
তাতে অভিভাবক-ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষ হতাশ। সাধারণ মানুষের মনোভাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। যখন শতকরা হিসাবে অধিক পাশ হতো তখন বলা হতো, বোর্ড সকলকে পাশ করিয়ে দেয়ার জন্য অলিখিত নির্দেশনা দিয়েছে, এবার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা পালনে কঠোর হওয়ায় এ বিপর্যয়। সুতরাং এটাই হয়ত সঠিক।
কিন্তু অন্যান্য বোর্ডের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে এককভাবে কুমিল্লা বোর্ডকে কাঠগড়ায় দাঁড়া করানো হয়েছে। তা কতটা যৌক্তিক?
শিক্ষা ব্যবস্থা বিশেষত মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথার কারণ অনেক। মূল কাঠামো থেকে সামান্য বিচ্যুতি ঘটলে বিতর্ক সৃষ্টি হবে। কিন্তু কারণ খুঁজতে হলে প্রাসঙ্গিকভাবে সামগ্রিক অনুষঙ্গগুলোর কথাও বলতে হয়। যেমন-
০১.শিক্ষবোর্ডের নির্দেশ আছে- যে সকল ছাত্রছাত্রী নির্বাচনী পরীক্ষায় পাশ করবে তারাই এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য যোগ্য। অথচ একটি বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে ২০০ জন ছাত্রছাত্রী থাকলে তারা সকলেই এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এখানে যে ফরম পূরণের বাণিজ্য চলে, তার সঙ্গে কমিটি- শিক্ষক অনৈতিকভাবে দায়ী। আর কমিটির অনুমোদন দেয় শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ। হলফ করেই বলা যায়- প্রতিটি বেসরকারি মাধ্যমিক  বা কলেজের কমিটি রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত। সেখানে প্রতিষ্ঠান প্রধান সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। তা ব্যর্থতা বলব, না অযোগ্যতা বলব? চাকুরির প্রতি নতজানু হলে আদর্শের প্রতি অবহেলা বা অশ্রদ্ধা এসে হাঁটু গেড়ে বসে। এ ক্ষেত্রে ফরম পূরণের বিষয়টিও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।
০২.বিদ্যালয়ের বিষয় ভিত্তিক যোগ্য শিক্ষক আছে কিনা তাও আলোচনায় এসেছে। দেখা গেছে নিয়োগ বাণিজ্যে অযোগ্য ব্যক্তির নিয়োগলাভ প্রধান সংকট। অন্তত শিক্ষাপ্রদান ক্ষেত্রে এখানে আপোষ চলেনা। এছাড়া প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষত বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনীতির সাথে জড়িত। চাকুরির প্রতি শ্রদ্ধান্বিত দায়বদ্ধতার থেকে ভিন্ন বলয়ে বিচরণ শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্যতম বিপর্যয়ের কারণ।
০৩.কোচিং বাণিজ্য বা প্রাইভেট টিউশনিও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০টা থেকে ৪টা পর্যন্ত কাসে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী অনুপস্থিত থাকলেও কোচিং ও প্রাইভেট কাসে নিয়মিত হাজিরা দেয়। তাতে নিরলসভাবে অভিভাবক প্রধান উস্কানিদাতা। অভিভাবকরা মনে করেন, তাদের সন্তানের জন্য বেশি টাকা খরচ করলেই প্রকৃত শিক্ষা, পরীক্ষায় উচ্চতম ফল এবং প্রতিষ্ঠা পাওয়া যাবে। একটু চিন্তা করলেই সর্বনাশের কালো মেঘটা দেখতে পাওয়া যায়। অভিভাবকদের প্রত্যাশা তাদের সন্তানকে অবশ্যই এ+ পেতে হবে, সে জন্য দরকার হলে কোথায় প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগে পাওয়া যায়, তার জন্য লক্ষ-লক্ষ টাকা খরচ করতে পিছপা হয় না। আত্মঘাতী শব্দটির সাথে আমরা কমবেশী পরিচিত, উদাহরণ হিসাবে উপর্যুক্ত প্রচেষ্টার কথা ভেবে নেয়া যায়।
০৪.এ কথাও চলে এসেছে- ছাত্রছাত্রীরা গাইড নির্ভর পড়াশুনা করে। পাঠ্যবই অনেকেরই নেই। এ কথাটা ঠিক বলিনি। সদাশয় সরকার বিনামূল্যে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মূল বই বছরের প্রথম দিনই ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে দেন। কিন্তু পড়ার টেবিলে তাদের স্থান অকুলান। শুধু মোটা মোটা গাইড বই মাথাভারি বাবরি চুলের বাহারের মত নানা রং এর জৌলুসে শোভা পেতে থাকে। ছাত্রজীবনে মোটা বই তথা বিশাল আকৃতির বই যে কতটা ভীতিপ্রদ তা কি আমরা কখনো ভেবে দেখেছি? ভয় কখনো জয় কে অর্জন করতে পারেনা। বই যদি ছাত্রের বান্ধব হয়, তাহলে তার আকৃতি-প্রকৃতির মধ্যে একটা সামঞ্জস্য থাকা বাঞ্ছনীয়। নোট বই ছিল, নোট বই থাকবে- কিন্তু তথা কথিত গাইড বই ছাত্রের জন্য বিব্রতকর, বিব্রতকর- বিষয়টি সূক্ষ্মভাবে ভাবতে হবে। একজন ছাত্রের বয়স, কোন শ্রেণিতে পড়াশোনা করে, কতটুকু হজম করতে পারবে- তা বিবেচনায় আনতে হবে।
০৫.এক্ষেত্রে শিক্ষা বোর্ডের ভূমিকা কি। কারণ বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেই একজন ছাত্রের পাশ-ফেলের বিষয়টি নির্ধারিত হয়। কারণ বোর্ড সিলেবাস দেয়, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করায়, উত্তরপত্র মূল্যায়ন করায়, ফলাফল প্রকাশ করে। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই একটি বিধিবিধান রয়েছে, তা বোর্ডকে যথারীতি নয়, কঠোরভাবেই মানতে হয়। সামগ্রিক বিষয়টি শিক্ষাবোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলে অথবা বিভিন্ন মাধ্যমের সহযোগিতায় সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এজন্য সকল প্রকার দায়দায়িত্ব জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে- সব কর্মকা-ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বোর্ড সিলেবাস দেয়, কিন্তু সিলেবাস প্রণয়ন করে বিশেষজ্ঞরা, বোর্ড প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করায়, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন শিক্ষকগণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন করায় বোর্ড, মূল্যায়ন করেন শিক্ষক, প্রশ্নপত্র সরকারি প্রেস থেকে জেলায় জেলায় জেলা প্রশাসকের কাছে চলে যায়- এভাবে নানা প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে বোর্ড সরাসরি জড়িত নয়। অথচ প্রশ্নপত্র প্রণয়নে সংকট হলে, উত্তরপত্র মূল্যায়নে ঘাটতি হলে, প্রশ্নপত্র আউট হলে সব দায় শিক্ষাবোর্ডের উপর বর্তানোর চেষ্টা করা হয়। এ ক্ষেত্রে যদি ফল বিপর্যয় ঘটে সেক্ষেত্রে বোর্ডের দায় কতটুকু তাও ভাবতে হবে। সুতরাং এক্ষেত্রে এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কি? আমাদের অনেক ব্যাপারেই দেরী হয়ে গেলেও সময় বয়ে যায়নি।
উত্তরণের অনুষঙ্গগুলো এভাবে ভাবা যায়-
১.একমুখী শিক্ষা অন্তত মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সরকারি নির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনায় আনা হউক। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরটি সার্বজনীন মানের মধ্যে থাকলে ভেদাভেদ দূর হতে পারে।
২.পাঠ্যপুস্তক ভিত্তিক শিক্ষা প্রদানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
৩.বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
৪.বিষয় ভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
৫.কমিটি নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। শিক্ষকতা একটি স্বাধীন পেশা, যারা শিক্ষক হবেন তারা জানবেন এ পেশায় সম্মান-শ্রদ্ধা পাওয়া যায়, টাকা পাওয়া যায় না।
৬.ফলাফল বিপর্যয় ঠেকাতে অভিভাবক অতি উৎসাহী না হয়ে সন্তানের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণের প্রতি আন্তরিক থাকবেন এটাই প্রত্যাশা। সকল ছাত্রছাত্রী এ+ পাওয়ার প্রয়োজন নেই। ছাত্রছাত্রীকে স্বাভাবিক আগ্রহের প্রতি উৎসাহিত করাই উচিত।
৭.কোচিং বা প্রাইভেট পড়া নয়, বিদ্যালয়ই হবে একজন ছাত্রছাত্রীর নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।
৮.যারা নির্বাচনী পরীক্ষায় পাশ করবেন, তারাই কেবলমাত্র এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে অন্যথায় নয়, ফলবিপর্যয় নিয়ে আর বেশী বিতর্ক সৃষ্টির সুযোগ থাকবে না। কোনো কালেই শতভাগ পাশের বিষয়টি বোর্ড, অভিভাবক, ছাত্রছাত্রী সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে না। তবে আকাক্সক্ষা পোষণ করে।
৯.পরীক্ষা- কেন্দ্র বিষয়ে বোর্ডের নির্দেশনা আছে তা যথাযথ পালন করা হয় না। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কেন্দ্র থাকলে যে বিদ্যালয়ের ছাত্র পাশের অন্য দালানে অর্থাৎ প্রথমিক বা বালক/বালিকা বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। এক্ষেত্রে যেকোনো কারণেই শিক্ষকগণ অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েন। হয়ত কমিটির চাপে, প্রাইভেট পড়ানো দায়বদ্ধতায়, আপন সন্তান বা আত্মীয় পরীক্ষার্থী হলে- সব কারণেই অতিমাত্রায় অনৈতিক কাজ চলে। আর ডিজিটেল যুগের কারসাজিও অনেক সময় চমক সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় আপোষহীন কঠোর অবস্থানে থাকা ছাড়া উপায় নেই।
১০.মনে রাখতে হবে যে, আমরা কেউ এ+ পাওয়া ছাত্র ছিলাম না। এজন্য ব্যর্থ হয়ে যাইনি। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি তৃতীয় বিভাগে মেট্রিক, কম্পার্টমেন্টে আই,এ এবং তিন বারে বি, এ পাশ করেছেন। এজন্য জীবন ব্যর্থ হয়ে যায়নি। যে কথা বলতে চাই- বাংলাদেশের সকল মানুষ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসক, পুলিশ হওয়ার দরকার নেই, হওয়াও যাবে না। লক্ষ্যটা যদি মাধ্যমিক স্তরে নির্ধারণ করা যায়, তাহলে জীবন অবশ্যই আলোকিত হবে এবং প্রতিষ্ঠা পাওয়া যাবে।
১১.কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এ বছর (২০১৭) উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় শতকরা হিসেবে অন্য বোর্ডের তুলনায় কম হওয়ায় ফল বিপর্যয় কথাটি ব্যাপকভাবে বলা হয়। উদাহরণ হিসাবে বলছি- কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে এ+ পাওয়া ৬০০ জন ছাত্র ভর্তি করা হয়। দু’বছর পর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কম বেশি ১০০ জন ছাত্র এ+ নম্বর পায়, ৩০০ জন পাশ করে, ২০০ জন ফেল করে, এ ফলাফলের দায় কি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের? আইসিটি নামে একটি বিষয় তিন গ্রুপে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সরকার এ পদে কোন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন? ইংরেজি বিষয় যারা পড়ান, তাদের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিস্তারিত বলা প্রয়াজন নেই। সামগ্রিক বিষয়টি একটির সঙ্গে অন্যটি সর্ম্পকিত। সুতরাং দায় এককভাবে কারো কাঁধে চাপানো ঠিক হবে না।
বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয়ে একজন ছাত্র ভর্তি হলে তার সামনে কতগুলো নতুন অনুষঙ্গ উপস্থিত হয়। যেমন- ছাত্র রাজনীতি, হাতে স্মার্ট ফোন, নতুন বন্ধু বা বান্ধবী, পিতামাতার আচরণ, পারিবারিকভাবে আয়ের উৎসের অন্ধগলির মায়াজাল- সব কিছু মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করে এবং একজন শিক্ষার্থীকে অজানার দিকে হাতছানি দিতে থাকে। এক্ষেত্রে এককভাবে স্কুল-কলেজের দায়বদ্ধতার চেয়ে পরিবারের ভূমিকা মুখ্য। সন্তান তখনই বন্ধু হয়, যখন প্রাণ খুলে মেলামেশা করার ক্ষেত্র রচিত হয়। শুধুমাত্র পরীক্ষায় পাশের বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা বোর্ডকে এক আঙ্গুল দেখিয়ে দিলে বাকি চার আঙ্গুল কিন্তু নিজের দিকেই নির্দেশ করে। মানুষের চোখ দুটি- একটি চোখ সরাসরি অন্যটিকে দেখতে পায় না অথচ দু’চোখ দিয়েই সব কিছু দেখা যায়। এভাবেই দেখতে হবে। দেখার অভ্যাস করতে হবে। আমি মনে করি এক্ষেত্রে বিপর্যয় কথাটি আপেক্ষিক।
পরিশেষে বলতে চাই- আসুন আমরা যে যেখানে আছি, যে দায়িত্বে আছি, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে নির্মোহভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগীর আলোকে নিজস্ব জাতিসত্তা, ভাষা- সংস্কৃতির মূল্যবোধকে আপন ঔদার্যে ধারণ করে এগিয়ে নিয়ে যাই। এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে- দেশ-জাতি যেমন আমার, আমি এখন বিশ্ব নাগরিকও। সীমাবদ্ধ শব্দটি এখন উপেক্ষিত, বৈশ্বিক ধ্যান-ধারণা এখন যাপিত জীবনের মূল অনুষঙ্গ।



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};