ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
111
যে স্মৃতি ধূসর হয়নি
Published : Saturday, 12 August, 2017 at 12:00 AM
যে স্মৃতি ধূসর হয়নিশওকত আহসান ফারুক ।।
৭৭.
দেশান্তর
১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান, যুদ্ধের পর খুব দ্রুত পট পরিবর্তন হতে লাগল, যে যায় আর ফিরে আসে না, দেশান্তর এখন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা, ভারত থেকেও মুসলমান একচেঞ্জ করে আসছে, আমরা মাইনরিটি থেকে মেজরিটি হতে শুরু করেছি, শহরের ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন এখন দৃশ্যমান।
তবুও দেশকে ভালোবেসে, জন্মভূমির টানে রয়ে গেছেন অনেকেই। মন মননে, মেধার এই অনন্য প্রতিভাবান কিছু লোকের সাহচর্য, আমাদের পরিশীলিত করেছে সতত।
জন্মভূমি সবাই কি ছাড়তে পারে?
শিকড় যাদের প্রেথিত, ডালপালায় নূতন কুঁড়ি, ফুলের সুবাস, মাটির সোঁদা গন্ধ, তাদের বেশ প্রিয়।
#
ত্রিপুরা থেকে কুমিল্লা
ত্রিপুরা জেলা গঠন ও কালেক্টরেটের সূচনা হয়, ১৭৭৬ সালে। ১৭৭৫ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, দিল্লীর সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে, সুবে বাংলার দেওয়ানী লাভ করেন।
বাংলা ও বিহাবের রাজস্ব সংগ্রহের সুবিধাদার্থে, কোম্পানি কতগুলি প্রশাসনিক বিন্যাস করেন। ত্রিপুরা, চট্টগ্রামের আওতাধীন ছিলো। ঢাকার পূর্বাংশ, নোয়াখালী, ময়মনসিংহের দক্ষিণাংশ  ও ফরিদপুরের পূর্বাংশ ত্রিপুরা জেলায় অন্তরভুক্ত ছিলো।
ক্রমানুযায়ী বিচার বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, দেওয়ানী, ফৌজদারি, ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় গুলি সাজানো হলে, ১৭৯০ সালে, ত্রিপুরা জেলা রাজস্ব বোর্ডে অনুমোদন লাভ করে। ১৭০ বৎসর পরে, ১৯৬০ সালে সেই ত্রিপুরার নাম পরিবর্তন করে কুমিল্লা করা হয়।
#
বাংলার প্রথম
শ্রী নরেন্দ্র চন্দ্র দত্ত পেশায় আইনজীবী, সমাজ সংস্কারক, সমাজের আর্থ সামাজিক অবস্থা  অনুধাবন করে, যুব সমাজের কর্ম সংস্থান, সামাজিক উন্নয়ন ও ব্যবসায় সহায়তা করার নিমিত্তে, একটি অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান, গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তাহার নিজ বাস ভবনে ১৯১৪ সালে, প্রতিষ্ঠা করেন। 'দ্য কুমিল্লা ব্যাংকিং কর্পোরেশন' এর প্রধান কার্যালয় কুমিল্লা। প্রথম বৎসর একজন কর্মকর্তা, ২৫০০ টাকা আমানত এবং রিজার্ভ ফান্ডে ছিলো ৪৫০০ টাকা নিয়ে পথচলা, এ'দেশের প্রথম ব্যাংক।
খুব দ্রুত এর ব্যাপ্তি লাভ করে। বোম্বাই, কলিকাতা, পাটনা, বাহ্মণবাড়িয়া,  কানপুর, কটক সহ সারা ভারতে এর শাখা ছড়িয়ে পড়ে। একজন মহতীর উদ্যোগ, কতো বড় প্রাপ্তি।
শ্রী নরেন্দ্র চন্দ্র দত্ত, ব্রিটিশ ভারতের ব্যাংকিং ব্যবসায়, বাংলার পথিকৃত।
#
এ ছাড়াও ইন্দু ভূষন দত্ত প্রতিষ্ঠা করেন, 'কুমিল্লা  ইউনিয়ন ব্যাংক' এটা কুমিল্লার দ্বিতীয় ব্যাংক। এই ব্যাংকের বিস্তার সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯১৫ সালে 'নিউ স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক' নামে আরো একটি ব্যাংক কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত হয়, এটা কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত  তৃতীয় ব্যাংক। ব্যাংকিং ব্যাবসায় কুমিল্লা, ব্রিটিশ ভারতে উল্যেখযোগ্য অবদান রাখে।
এ' ছড়াও  কয়েকটি ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির জন্ম হয়েছে  কুমিল্লায়। তাই কুমিল্লাকে বলা হয় ব্যাংক ও ট্যাংক এর শহর।
দেশভাগের পর, ১৯৫০ সালে পাঁচটি ব্যাংক নিয়ে প্রতিষ্ঠা হয় 'ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়া', সেই ব্যাংকের তিনটি ব্যাংকই ছিল কুুমিল্লার।
#
ঘাটের ঘটনা
কুমিল্লার প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই নিজস্ব পুকুর আছে, আমরা পুকুরেই স্নান করতে অভ্যস্ত। একটু সাতার কাটা, ডুবদিয়ে মাটি ছোঁয়া, কে কতক্ষণ ডুবদিয়ে থাকতে পারে এগুলি আমাদের নিয়মিত খেলা, আমাদের শৈশব, কৈশোর কাল এমনই আনন্দময় ছিলো।
শীতের দুপুরে স্নানের আগে, ঘাটের আড্ডার আমেজ  অন্য রকম। আর কখনো সেইদিন গুলো ফিরে আসবে না।
সারা শহর জুড়ে দিঘী। নানুয়ার দিঘী, উজির দিঘী, রানীর দিঘী, জোড়া পুকুর, রিজার্ভ ট্যাংক, লালার দিঘী, তাল পুকুর, থিরা পুকুর আরো ছোট বড় অনেক জলাধার ছিলো।
ধর্মসাগরই এর মধ্যো সবচাইতে বড়।
আবার যদি ফিরে পেতাম ঘাটের ঘটনা, অবিরাম আড্ডা, স্মৃতিময় দিনগুলি এখন ভীষণ মিস করি।
#
লাকী হাউস
শহরে একটা ব্রেকিং নিউজ।
এক টাকায়, এক লক্ষ টাকা লটারিতে  জিতেছেন, কুমিল্লার একজন ভাগ্যবান। সময়টা '৪০ দশকের শেষের দিকে। সেই টাকা দিয়ে, কুমিল্লা লাকসাম রোডে বাড়ি বানিয়ে, নাম দিলেন 'লাকী হাউস্'
তখনি সেই ভাগ্যবানের ঘরে জন্ম নিলেন তার পুত্র, নাম রাখলেন, শাহজাদা লাকী।
সেই লটারির কথা শুনেছি মায়ের কাছে, তিনি যখন স্কুলে পড়েন সেইসময়ের কথা। পরবর্তি সময়ে, লাকী আমার খুব কাছের বন্ধু হয়ে যায়। রাজনীতি এবং অন্যান্য অনেক কারণে। লাকী আমার বন্ধু জেনে মা বলেছিলেন একদিন নিয়ে এসো, লাকী হাউসের লাকী বয়কে দেখবো। একদিন নয় লাকী প্রায়ই আমার বাসায় আসে, আমার সাথে লাকীর ঘনিষ্ঠতা ভালোই, যদিও বয়সে আমার চাইতে বেশ কয়েক বছরের বড়।
বেশ সুন্দর একটা বাড়ি, সামনে বাগান, অনেকেই কুমিল্লা আসলে সেই সময় লাকী হাউস দেখতে আসেন।
এক টাকায় এক লক্ষ টাকার বাড়িটা।
#
৭৮.
হোমনাবাদ
ত্রিপুরার হোমনাবাদ (বর্তমানে লাকসাম) পরগণার জমিদার আহম্মদ আলী চৌধুরার ঘরে ১৮৩৪ সালে, ফয়জুন্নেসার জন্ম। তিনি তার বাবার প্রথম কন্যা সন্তান।
শিক্ষানুরাগী ফয়জুন্নেসার নিজের অদম্য ইচ্ছা দেখে পিতা তাজউদ্দীন নামে গৃহ শিক্ষক, নিয়োগ করে দেন।
আরবী, ফার্সি, বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। তাহার লেখনীতে মিলে তার প্রমান।
১৮৬০ সালে, জমিদার সৈয়দ মোহাম্মদ গাজীর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাহার দাম্পত্য জীবন তেমন সুখকর হয়নি এবং এক পর্যায়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। কারণ বিয়ের ১৭ বৎসর পর জানতে পারেন, স্বামীর অন্য একজন স্ত্রী আছে।
বিচ্ছেদের পর তিনি আর্থ সামাজিক, লেখালেখি, বিভিন্ন জনহিতকর কর্মকান্ডে আত্মনিয়োগ করেন।
একই সাথে জমিদারী পরিচালনা করার প্রশিক্ষণ নেন।
#
জমিদারী
১৮৭৩ সালে পিতার মৃত্যুর পর, হোমনাবাদ পরগণার জমিদারী লাভ করেন, এবং ১৮৮৫ সালে মাতা আশ্রাফুন্নেসা চৌধুরানীর মৃত্যু হলে, মাতুলালয়ের সম্পতির উত্তরাধিকারী হন। অত্যান্ত দক্ষতার সাথে ফয়জুন্নেসা, জমিদারী পরিচালনা করেন। তার দক্ষতাসম্পন্ন পরিচালনা ব্রিটিশ ভারতে প্রশংসনীয় বিধায়, ১৮৮৯ সালে মহারাণী ভিক্টোরিয়া নওয়াব উপাধিতে ভূষিত করেন।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা ব্রিটিশ ভারতে প্রথম মহিলা নওয়াব।
#
রূপজালাল
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নওয়াব ফয়জুন্নেসা  প্রথম মুসলমান লেখক। ১৮৮৬ সালে ঢাকার 'গিরিশ চন্দ্র মুদ্রন যন্ত্র' থেকে 'শ্রীমতী নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর',  'রূপজালাল' প্রকাশিত হয়।
রবীন্দ্র পূর্ব যুগে যে কয়জন খ্যাতিমান লেখক ছিলেন তার মধ্যো ফয়জুন্নেসা অন্যতম।
তিনি বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সমসাময়িক লেখক। শুধু তাই নয় প্রথম মুসলমান গদ্য ও পদ্য লেখিকা।
'সঙ্গীত লহরী' ও 'সঙ্গীত সার' নামে দুটি বই প্রকাশিত হয়েছিলো।
নওয়াব ফয়জুন্নেসার সাহিত্য সাধনা ও শিক্ষা বিস্তারের অবদান, মহীয়সী বেগম রোকেয়ার শিক্ষা বিস্তারের প্রধান  অনুপ্রেরণা।
#
নিভৃতে
ব্রিটিশ শাসন আমলে কুমিল্লার লাকসাম পশ্চিমগাঁয়ে, একজন অবরোধ বাসিনী শাসনব্যবস্থা, সাহিত্য, শিক্ষা বিস্তার, সমাজের কুসংস্কার দূর করার নিমিত্তে নিরলস কাজ করে চলেছেন।
তিনি বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারকে, জনহিতকর কর্মের জন্য সর্বদা সহযোগিতা করেছেন।
এক সময় ব্রিটিশ সরকারের প্রয়োজনে, এক লক্ষ টাকা ধার দিয়েছিলেন, এবং সেই টাকা তিনি ফেরৎ নেননি।
#
শিক্ষা
১৮৭৩ সালে কুমিল্লায় মেয়েদের জন্য প্রথম ইংরাজি স্কুল ,'নওয়াব ফয়জুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল'। বেসরকারি ভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ ভারতে মেয়েদের অন্যতম স্কুল।
আমার বাসা ঝাউতলা, দশ বছর বয়স থেকেই ঝাউতলায় থাকি, ঝাউতলার শেষ প্রান্তে, মহুয়া গাছটার বিপরীত দিকেই ফয়জুন্নেসা স্কুল, আমি তার প্রতিবেশী। এতো বড় একটা ইতিহাসের সাথে বড় হয়েছি, এটা আমার অনুভূতিতে অন্য রকম প্রাপ্তি। এখনেই উপমহাদেশের নারী শিক্ষা বিস্তারের সূচনা।
পশ্চিমগাঁয়ে একটি অবৈতনিক মাদ্রাসা স্থাপন করেন, ১৯৪৩ সালে তাঁর পরিবারবর্গ এটাকে উচ্চ মাধ্যমিক ইসলামী  কলেজে রূপান্তর করেন। এছাড়া নিজ এলকায়, তিনি ও তার মেয়ে প্রতিষ্ঠা করেন, 'নওয়ার ফয়জুন্নেসা বদরুন নেসা উচ্চ বিদ্যালয়।
এ ছাড়াও ১৪ টি প্রথমিক বিদ্যালয়, স্থাপন করেন।
#
স্বাস্থ্য
শিক্ষার পাশাপাশি  স্বাস্থ্য সেবায় নওয়াব ফাজুন্নেসার অবদান উজ্জ্বল। ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন, 'কুমিল্লা জানানা হাসপাতাল' কুমিল্লা সদর হাসপতালের গাইনি ওয়ার্ড, তাঁহার প্রতিষ্ঠিত, অসংখ্য চ্যারিটেবল  ডিসপেনসরি, সরাই খানা, এতিম খানা,নির্মান করেছেন মানবতার সেবায়।
যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে করেছেন অনেক রাস্তাঘাট। ১৮৯৪ সালে পবিত্র হজব্রত পালন করেন, তখন মক্কায়, মুসাফিরদের  জন্য নির্মাণ করেন সরাই খানা।
#
তিনি তাহার সমস্ত সম্পতি, তাহার ওয়ারিস দের বুঝিয়ে দিয়ে, নিজের অংশভাগ ওয়াকফা করে দেন মানব সেবায়।
১৯০৩ সালে আমাদের অহংকার, এই মহীয়সী ৬৫ বৎসরে, ইহলোক ত্যাগ করেন, এই স্বল্প সময়ের ব্যাপকতা, আমাদের করেছে সমৃদ্ধ।
আমরা তাঁদের উত্তরসূরি।






© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};