ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
518
অপ্রিয় ব্যক্তির কথা
Published : Tuesday, 8 August, 2017 at 1:33 AM
অপ্রিয় ব্যক্তির কথাশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
বিশ্বনাথবাবু ইদানিং সমাজপতি। এক সময় স্বাধীনোত্তর ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন, তখন থেকেই পরিচিতির ক্ষেত্রটি প্রসারিত। তার সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক পরে এক সামাজিক অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটি ছিল হিন্দু সমাজে বিবাহ উপলক্ষে যৌতুক প্রচলন রয়েছে, ফলে অনেক গরিব কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা মেয়ে বিয়ে দিতে পারে না, বা বিয়ে দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যান- সমাজের এই কুসংস্কার রোধ করার জন্য কতিপয় হিন্দু-যুবক উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং তাদের বিবেচনায় হিন্দু সমাজপতিদের আমন্ত্রণ জানায়। আমি ও বিশ্বনাথবাবু আমন্ত্রণ পেয়ে হাজির হই। ব্যক্তিগতভাবে যৌতুক বিষয়টিকে আমি তীব্র ঘৃণা করি ও প্রতিবাদ জানাই। যুবকদের এহেন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেই হবে না, কীভাবে তা সমাজে ফলপ্রসূ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যায়- এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ও অঙ্গীকার নেয়ার পক্ষে অনেক বক্তৃতা হয়। যৌতুকবিরোধী মনোভাবের উপস্থিত অনেক ব্যক্তির অভিমত পাওয়া যায়, আবার সভার মেজাজ বুঝে নি¤œকণ্ঠে তার বিরুদ্ধেও কিছু বক্তব্য প্রকাশ করা হয়। তাদের যুক্তি হলো- যেহেতু হিন্দু সমাজে মেয়েরা পৈত্রিক সম্পত্তির অংশিদারী হওয়ার সুযোগ নেই, স্বামীর সংসারে শুধুমাত্র ভোগদখলের অধিকার পায়, এক্ষেত্রে মেয়েদের সারাজীবন অসহায়ভাবে জীবনযাপন করতে হয়, তার একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত থাকা দরকার, যুক্তি হলো- এজন্যই বিয়েতে মেয়েকে যৌতুক দিতে হয়- এ বিধানটি চলে আসছে। তারপরও কথা থেকে যায়- আসলে যৌতুক দেয়া হয়, মেয়ের জামাইকে, মেয়েকে নয়। মেয়ের নামে স্বত্ব হিসেবে স্থাবর কোনোকিছুই দেয়া হয় না। সুতরাং যৌতুকের ব্যাখ্যা এরূপ নয়, অন্য পক্ষ থেকে বলা হয়- মেয়েটি যেহেতু অন্য একটি পরিবারে বিয়ের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়, তার ভরণপোষণের জন্য প্রতীকী যৌতুক প্রদানের বা দাবির বিষয়টি অগ্রাধিকার লাভ করেছে। কখনও বলা হয় না- ওই মেয়েটি স্বামীর সংসারে গিয়ে যে শ্রম দেয়, সন্তান দেয়, জৈবিক ক্ষুধা মিটায় তা কিন্তু অর্থমূল্য দিয়ে বিবেচনা করা হয়না, উল্লেখও করা হয় না, এমন কি এ শ্রম যে কোনো অবস্থায় অর্থমূল্য দিয়ে বিচার না করে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বিশ্লেষণ করে মর্যাদাশীল করা প্রয়োজন- এক্ষেত্রে পুরুষজাতি অনেকটাই ভোঁতা।
সভায় বিশ্বনাথবাবু অত্যন্ত সরব ছিলেন, যৌতুকের বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করলেন এবং ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যৌতুকহীন বিয়ে করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন- এভাবেই তার জ্বালাময়ী বক্তৃতাটি ছিল। আমি মঞ্চের কাছাকাছি বসেছি, লক্ষ করলাম কেউ কেউ  বিশ্বনাথবাবুর বক্তৃতার সময় মুখ-বিকৃত করে  নি¤œকণ্ঠে কিছু যেন বলছেন। সভা শেষ হলো। অনেক কথা হলো। কিন্তু যৌতুক বন্ধ হলো না, নারী জাতির ভাগ্যে হিন্দুসমাজে এখনও কার্যকর কোনো মর্যাদার স্থান স্থাপিত হয়েছে বলে আমার কাছে দৃশ্যমান হচ্ছে না। স্বার্থ যেখানে লোভের আভিজাত্যে প্রতিপালিত হয়, সেখানে নৈতিক বিষয়টি অন্ধ হয়ে যায়। তাহলে দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রতিভূ বিশ্বনাথবাবুর ঘটনাটি কী সমাজে কোনো প্রভাব বিস্তার করার জন্য ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হলো? পরে একটি চমৎকার তথ্য পেয়ে যাই। বিশ্বনাথবাবু যাকে বিয়ে করেছেন, এ মেয়েটির সঙ্গে তার বিয়ের আগে সম্পর্ক ছিল, কন্যা পক্ষ কিছুতেই বিশ্বনাথবাবুর কাছে মেয়ে বিয়ে  দেবেন না। তিনি তখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এ ক্ষমতায় রাতের আঁধারে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে গিয়ে কোনো এক কালীবাড়িতে মালাবদল করে তথাকথিত বিয়ের কাজ সম্পন্ন করে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে ঘর সংসার করতে থাকেন। চেয়ারম্যান বিধায় কন্যা পক্ষ নানা কারণেই চুপ থাকেন। বিয়েটি ছিল অসমবর্ণ। বিশ্বনাথবাবু নাপিত, মেয়েটি নম:শূভ্র। এ ঘটনা জানার পর বিশ্বনাথবাবু আমার কাছে রহস্যময় ব্যক্তি হয়ে গেলেন।
আবার এলাকায় একটি সমাজিক অনুষ্ঠান। যুবকদের দাবি- হিন্দু সমাজে যে অশৌচ প্রথা প্রচলিত আছে, তা সময়ের দাবিতে পরিবর্তনযোগ্য। এছাড়া চারবর্ণের জন্য চারপ্রথার বিধান। কিন্তু চারবর্ণ বিভাজনের জন্য শাস্ত্রীর ব্যাখ্যা আছে, তাতে সঠিকভাবে এ রীতি সমাজে মানা হচ্ছে না। কে ব্রাহ্মণ, কে ক্ষত্রিয়, কে বৈশ্য বা কে শূভ্র- তা কেবল জন্ম প্রক্রিয়াকে প্রাধান্য দিয়ে গোঁজামিল প্রথা প্রচলিত রয়েছে। সুতরাং শাস্ত্র চলবে শাস্ত্রীয় উক্তির আলোকে, ব্যক্তি বিশেষের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে যে রীতি চলে আসছে তা ভ্রান্ত এবং অশাস্ত্রীয়। তার পরিবর্তন ও যুগোপযোগী করার লক্ষে এক সামাজিক সভার আয়োজন। বিশ্বনাথবাবুও আমন্ত্রিত। আমাকেও বলা হয়েছে, সভাটি করার আগে যুবকগণ আমার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেই এ আয়োজন। আমিও এ সভায় উপস্থিত ছিলাম। বক্তৃতা চলছে পরিবর্তনের পক্ষে আবার অপরিবর্তনেরও পক্ষে। লক্ষ্য করলাম- যারা পরিবর্তনের ফলে সুবিধা বঞ্চিত হতে পারেন, তারাই কোনো পরিবর্তন চাচ্ছে না। বিশ্বনাথবাবু পরিবর্তনের পক্ষেই বক্তব্য দিলেন এবং বর্ণ-প্রথা বিলোপের কথাও বললেন। আমি পূর্বের সভায় বিশ্বনাথবাবুর কথা ও জীবনাচারণের শুভংকরী ফাঁকির কথা শুনে মনে মনে রুষ্ট ছিলাম। আমার বক্তৃতায় যেমনটি আমার কথা ও আচরণ জীবনে ধারণ করে চলেছি- এ নিয়েই যুক্তি উপস্থাপন করে পরিবর্তনের পক্ষে কথা বললাম। কথা প্রসঙ্গে বিশ্বনাথবাবু যৌতুকহীন বিয়ের কাহিনি এবং পালিয়ে বিয়ে করে তা উদাহরণ হিসেবে জোর গলায় আমাদের জানান দিয়ে যে শ্লাঘার বিষয়টি তুলে ধরে বিভ্রান্ত করছেন, এর সমাধান কী। প্রভাব খাটিয়ে বা ভালবাসার ফাঁকে মেয়েকে ফেলে অভিভাবকদেরকে ক্ষমতার দাপটে ¤্রয়িমাণ করে ঘটনা ঘটিয়ে এ ঘটনাকে যৌতুকবিহীন আন্দোলনের সামিল করতে চান- তাতে কী সমাজকে পরিবর্তন করা যাবে? কেন বিশ্বনাথবাবুরা আমাদের বিভ্রান্ত করছেন?
পরের ঘটনা হলো- আমাদের এলাকায় সামাজিক বা যেকোনো অনুষ্ঠান হলে আমি আমন্ত্রিত কীনা তা জেনে সভায় উপস্থিত বা অনুপস্থিত থাকেন বিশ্বনাথবাবু। তিনি আমার সম্পর্কে এখন তেমন  অনুকূল মন্তব্য করেন না।
বীরেন্দ্র দাস এখন লিখেন বা বলেন বীরেন্দ্র দাসগুপ্ত। আমি যখন বলি- বীরেন্দ্রবাবু, আপনি তো নামের শেষে ‘দাস’ লিখতেন এখন ‘দাসগুপ্ত’ লেখেন কেন? বলেন- ‘ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে উচ্চ শিক্ষিত  হয়েছে, তাদের সামাজিক পরিচয়টা একটা মানে তুলে না দিলে যে সম্মান থাকে না।’ বললাম- ‘এ কেমন যুক্তি? লেখাপড়া করে উচ্চ শিক্ষিত হলে চাষাভূষা বাবাকে ত্যাগ করতে হবে? অন্য প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত ব্যক্তিকে বাবা হিসেবে পরিচয় দিতে হবে?’ বীরেনবাবু চুপ থাকলেন। কিন্তু তিনি আমাকে আর সহ্য করতেন না। অন্যের কাছে আমার সম্পর্কে বিরোপ মন্তব্য করতেন। আমি যা মানতে পারি না, ন্যায় সংগত বিবেচনায় প্রতিবাদ করি- তাই আমি একজন অপ্রিয় মানুষ।
আমি যে পাড়ায় বাড়ি করেছি- তার সামনে (দক্ষিণ) যে বাড়িটি তা আমার বাড়ি থেকে চার ফুট উচুঁ, একতলার উপরে টিনের দোতলা, পশ্চিম দিকে তিন তলা বাড়ি, উল্লেখ্য, আমার বাড়িটি দু’তলা। সেজন্য প্রায়ই পাশের তিন তলা থেকে কিছু বর্জ্য এসে পড়ে, পূর্বদিকের বাড়িটা দু’তলা এবং উত্তরাংশে কর্পোরেশনের ড্রেন। আমার বাড়ি থেকে দক্ষিণ দিকে রাস্তা দিয়ে পাড়ার মূল রাস্তায় যেতে হয়। রাস্তার পূর্ব পাশে চারতলা দালান, তার নিচের অংশ যথারীতি এবং যতই উপরে উঠেছে ততই বিস্তৃতি লাভ করেছে এবং চারতলার ছাদ উপর দিক দিয়ে রাস্তার উপর চলে এসেছে। ফলে বৃষ্টি হলে যথা নিয়মে আমার চলাচলের নিজস্ব রাস্তার উপর জল পড়ে। আমার বাড়িটি পেছনে বলে প্রায় সাধারণের দৃষ্টিগোচর হয় না। কাজেই প্রতিবেশীরা আমার বাড়িটিকে তাদের বর্জ্য ফেলার উপযুক্ত মনে প্রায়ই অপকর্মটি করে থাকে। উল্লেখ্য, চারতলা বাড়িতে মালিকসহ ভাড়াটিয়া সাতটি পরিবার। সামনে দুটি পরিবার, পশ্চিমাংশে তিনতলা পাঁচটি পরিবার থাকে- মাঝে মাঝে তাদের আক্রমণে অতীষ্ঠ হয়ে উঠি, অসহায় বোধও করি- প্রতিবাদ করতে গেলে সামনাসামনি কিছু কথাবার্তা হলেও আমার অবর্তমানে পূর্বপুরুষসহ গোষ্ঠি উদ্ধারের কাজটি অভিধান বহিভূর্ত ভাষায় অনর্গল উচ্চ কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকে এবং জয়লাভের আনন্দে আত্মতৃপ্তি লাভ করে থাকে। পরে যখন একথাগুলো অন্য প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জানতে পারি- তখন আমার আর কোনো কথা বলার আগ্রহ থাকে না। তবে যে বিষয়টি অনুধাবন করি, তা হলো আমি উল্লিখিত প্রতিবেশীদের কাছে একজন অপ্রিয় ব্যক্তি।
নানাভাবে নিজেকে নিয়ে ভেবে দেখেছি- আসলেই আমি একজন অপ্রিয় লোক। প্রতিবাদ করতে গেলে হয়ত সে স্বরূপটিই জেগে ওঠে, চুপ থাকলে তা তো স্বীকৃতিই পায়। নীরব অত্যাচার কি মেনে নেব, প্রতিবাদ করব না? অন্যায়কে যেমন কোনোদিন প্রশ্রয় দিই না, যতই অপ্রিয় লোক হিসেবে চিহ্নিত হই না কেন প্রতিবাদ করবই।





© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};