ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
39
শৈশব থেকে কৈশোর
Published : Sunday, 16 July, 2017 at 12:00 AM
আল মাহমুদ ।।
ইদানীং চোখের সাথে সাথে মনের সমস্যাও বাড়ছে। কিছুই মনে রাখতে পারি না। যে কারণে আমার পাশে বসে যে শ্রুতিলিখন করে তাকে বারবার পড়তে হয়। যাহোক, আমার স্মৃতিকথা নিয়ে এর আগেও বহুবার লিখেছি।
আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল গ্রামের মোল্লা বাড়িতে। জন্মের পর আমার সম্পূর্ণ নাম রাখা হয় মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তবে বাড়িতে এত বড় নাম ধরে না ডেকে আমাকে ডাকা হতো ‘পিয়ারো’ নামে। আমার বাবা-দাদারা স্থানীয়ভাবে বেশ সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। এই অঞ্চলে সর্বপ্রথম আমার প্রপিতামহ মীর মুনশী নোয়াব আলী এসে বসবাস শুরু করেন। তিনি ব্রিটিশ উপনিবেশকালে ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় আদালতে চাকরি গ্রহণ করেন। এরপর স্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী মাক্কু মোল্লার কন্যাকে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বসবাস শুরু করেন।
আমি যে আমার বংশের প্রথম কবিতা কিন্তু নয়। আমার দাদাও একজন কবি ছিলেন। তার নাম ছিল আবদুল ওহাব। তিনি প্রধানত জারিগান লিখতেন। এছাড়া আরবি ও ফারসি ভাষায় সুপন্ডিতও ছিলেন। তিনি সংস্কৃতও ভালো জানতেন।
লাঠিখেলা, তরবারি চালনা ও পশু-পাখি পোষা ছিল তার শখ। ধর্মপ্রাণ হলেও তিনি গান-বাজনা ভালোবাসতেন। আমার পিতার নাম ছিল মীর আব্দুর রব। তার ছিল কাপড়ের ব্যবসা। পরবর্তীতে বেঙ্গল ফায়ার সার্ভিসের অফিসার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একদিকে ধর্মীয় চেতনার কারণে ইংরেজি ভাষার প্রতি বিদ্বেষ অন্যদিকে পারিবারিক ঐতিহ্যের আলোকে কবিতার প্রতি অসাধারণ অনুরাগ- এমনি এক দ্বন্দ্বমুখর পরিবেশে আমার বেড়ে ওঠা।
আমার মায়ের নাম ছিল রৌশন আরা বেগম। ছোটবেলায় আমি তাকে বেশ ভয় পেতাম। যে কারণে সব সময় তার কাছে ঘেঁষতাম না।
আমার অতি শৈশবের স্মৃতি বলে যদি কিছু থাকে তার মধ্যে অন্যতম প্রিয় হলো আমার দাদির পবিত্র মুখ। আমার দাদি দীর্ঘাঙ্গি, রূপসী ও অত্যন্ত ব্যক্তিত্বশালী মহিলা ছিলেন। তার পান খাওয়া লাল টুকটুকে মুখ থেকে নিঃসৃত হতো অদ্ভুত সব রূপকথা। সিলেটে মুসলিম বীরদের আগমনকালের রোমাঞ্চকর কাহিনীর ভা-ারও যেন তার কাছে গচ্ছিত ছিল। আমরা শুনতাম এবং মুগ্ধ হতাম। শৈশবে আরেকজন মানুষকে পেয়েছিলাম বন্ধু হিসেবে। তিনি আমাদের বাড়ির কাজের মেয়ে আলেক জান। আলকি ছিল আমার ক্ষণস্থায়ী যাযাবরী ভগ্নী, ধাত্রী, সঙ্গিনী আর শিক্ষয়িত্রী। আমাদের প্রাচীন মধ্যযুগীয় বাড়িটার চৌহদ্দির বাইরের পৃথিবী ও প্রকৃতির প্রধান অধ্যাপিকা। সে আমাকে শিখিয়েছিল ফড়িং আর ফুল-পাখিদের নাম। গাঁয়ের ঘরে ঘরে বারান্দায় সে আমাকে পৌঁছে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল, আমাদের পরিবারের বাইরেও অন্য ধরনের মানুষ আছে। বর্ষা-বাদলের দিনে কেয়ার ঝাড় থেকে কাঁটার ঘা অগ্রাহ্য করে সে আমাকে এ দেশের সবচেয়ে সুগন্ধি ফুল এনে দিতো। আমার ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ বইতে এগুলো নিয়ে গুছিয়ে অনেক কথা লিখেছি।
মহরম মাসটা আমার কাছে বেশ আনন্দের ছিল। এই মাসে বাড়ির মুরব্বিরা আশুরার দিন পর্যন্ত দশ দিন রোজা রাখতেন। বিশেষ করে এই মাস আনন্দের ছিল কারণ সেই সময়ে শোকগাথার পাশাপাশি জারি গান শোনা হতো। আমাদের গ্রামে এই সময় পাশের গ্রাম কাউতলী, ভাদুগড় আর সিমরাইলকান্দির লোকেরা আসতেন। আসরে যেসব গান গাওয়া হতো সব গানই আমার দাদার লেখা ছিল।
আমার শৈশব স্মৃতির একটি বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে নদী। কবিতায়ও এই নদী বেশ প্রভাব বিস্তার করেছে। আমাদের নদীর নাম ছিল তিতাস। এ আমার জীবনের প্রথম নদী। যদিও শৈশবে নৌকা বাইচের সময় ছাড়া এ নদীর কাছে আসার আমার কোনো উপায় ছিল না। অথচ এই নদী নিয়ে প্রায় সব সময়ই বিভিন্ন ধরনের গল্প শুনতে পেতাম, যে কারণে তিতাসের কাছে সব সময় যাওয়া না হলেও তিতাস আমার চিন্তার ভেতরেই বিরাজ করতো। সে সময়ের হিসাবে আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় কোয়ার্টার মাইল দূরে এর প্রবাহ। ছোটবেলায় দেখেছি এর পানি ঘুঘু পাখির চোখের মতো স্বচ্ছ।
তবে আসল গ্রাম্য পরিবেশের দেখা চাচা-চাচির সঙ্গে দাউদকান্দির জগতপুর এসে পেয়েছি। ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’তে এর বর্ণনা এভাবে দিয়েছি- ‘আমি জগতপুর এসে বুঝলাম বাংলাদেশের অকপট গ্রাম জীবন ও গ্রাম সভ্যতার হাজার হাজার বছরের অতীত উপাদান, আদান-প্রদান ও মানুষের পারস্পরিক সম্বন্ধ সূত্রগুলো আদতে কি রকম ছিল। মানুষ যে এমন সরল ও পরস্পর নির্ভরশীল হতে পারে তা যেন এ গাঁয়ে না এলে কোনো দিনই জানতামই না। আমি এখানেই প্রথম এমন অনেক গুল্মলতা, ঔষধি, ফুল, পাখি ও পতঙ্গের নাম জেনেছিলাম যা বাকি জীবন ভুলতে পারিনি। জেনেছিলাম প্রতিটি গাছ ও লতাপাতার গায়ের প্রাকৃতিক গন্ধ কেমন। প্রজাপতিদের জন্মগুটি থেকে এদের বিবর্তন ও উড়ালের পদ্ধতি দেখেছিলাম। তিলফুলের ক্ষেতে মৌমাছিদের ঝাঁক নেমে এলে আমি এদের মধু লুটের বাজারে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতাম। এখানে এসে নৌকা বাইতে, দাঁড় টানতে, জাল ছড়াতে, বড়শি বাইতে, কোঁচ বা চল দিয়ে ধাবমান মাছ গেঁথে ফেলাসহ আরো অনেক কিছু শিখেছিলাম’।
আমার পড়ালেখা শুরু হয় দাদির কাছে। তার কাছে আমি প্রথম বর্ণ পরিচয় লাভ করি। এরপর আমাকে পড়িয়েছিলেন গৃহশিক্ষক শফিউদ্দিন আহমদ। এরপর আমাকে ভর্তি করানো হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘এম ই স্কুলে’। এখানে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ভর্তি হই ‘জর্জ সিক্সথ হাই স্কুলে’ সপ্তম শ্রেণিতে। সেখান থেকে কুমিল্লার দাউদকান্দির ‘সাধনা হাইস্কুল’; চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের ‘সীতাকুন্ড হাইস্কুল’ এবং সবশেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘নিয়াজ মোহাম্মদ হাইস্কুলে’ লেখাপড়া করি।
তবে স্কুলে কখনোই সবগুলো ক্লাস করিনি কিংবা সবগুলো ক্লাস করেছি এমন দিনের কথা আমার স্মৃতিতে দুর্লভ। ছোটবেলায় স্কুল পালিয়ে যেসব কর্মকা- করতাম তার মধ্যে গুলতি নিয়ে পাখি শিকারই ছিল সব থেকে বেশি।
স্কুল পালিয়ে লোকনাথ পার্কের বিশাল কড়ই গাছের নিচে শুয়ে শুয়ে দেখতেন পাখিদের খুনসুটি, নীলিমার নীল, বৃষ্টির পতন। স্কুলে পড়ার সময় পাঠ্যবই পড়তে যতটা না ইচ্ছে হতো তার থেকে বেশি ইচ্ছে হতো গল্পের বই পড়তে। আমাদের ওখানে ‘লালমোহন স্মৃতি পাঠাগার’ নামে একটি পাঠাগার ছিল। এই পাঠাগারের উদ্দেশ্য ছিল মার্কসবাদী আদর্শে উজ্জীবিত করা এবং সে অনুযায়ী বইপত্রের ভান্ডার গড়ে তোলা। গল্প পড়ার নেশায় সে পাঠাগারে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। বলা যায় আমার প্রথম জীবনে মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ প্রভাব বিস্তার করে এই পাঠাগারের সূত্র ধরেই।
এই পাঠাগারে যাতায়াতের পর থেকে আমার চিন্তা-চেতনা বদলে যেতে থাকে। তবে মার্কসকেই যে এখানে খুঁজে পেয়েছি তা নয়। এই গ্রন্থাগারের কারণেই তিনি রবীন্দ্র-নজরুল পেরিয়ে তিরিশোত্তর কবি-লেখকদের জগতে প্রবেশাধিকার ঘটে আমার। বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, মানিক বন্দোপাধ্যায় প্রমুখের রচনাবলির সঙ্গে পরিচয় ঘটে। তবে সব থেকে আমার চিন্তায় প্রভাব বিস্তার করে জীবনানন্দ দাশের ‘মহাপৃথিবী’র কবিতাসমূহ। এই কবিতাগুলো পড়ার পর আমার মনে হয়েছিল আমারও তো বলার অনেক কিছু আছে। আমিওতো সেগুলো প্রকাশ করতে পারি। সেই কৈশোরে এই পাঠাগার হয়ে উঠেছিল আমার সব কর্মকা-ের কেন্দ্র। এই লালমোহন পাঠাগারের সন্ধান পাই যখন আমি জর্জ হাইস্কুলে পড়ি। এর পেছনেও রয়েছে এক মজাদার ঘটনা। আমাদের বাড়িটি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন লাগোয়া। স্টেশনে গভীর রাত অবধি ট্রেন চলাচল করত। মাঝে মাঝে বাবা-মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের বেলায় স্টেশনে এসে মানুষ দেখতাম। সেই বয়সে রাতের স্টেশনের চাঞ্চল্য, বিচিত্র সব মানুষের আনাগোনা আমাকে এক ধরনের আনন্দ দিতো। একদিন এক ঝড়বৃষ্টির রাতে স্টেশনে বসে আছি তখন ট্রেন থেকে দুজন মহিলা নামলেন। তাদের বেশভুষা ও আচরণ অন্যরকম। কিন্তু তাদের চোখেমুখে এক ধরনের উৎকণ্ঠা আমার চোখে পড়ে। জানতে পারি তারা যে গন্তব্যে যাবেন সেখানে যাওয়ার বাহন তারা পাচ্ছিলেন না। এ সময় তাদের সাথে আমার পরিচয় হয়, তারা আমার থেকে বয়সে অনেক বড়। তাদের আমার বাড়িতে আসতে বলি, তারা রাজি হন। আমার বাবা-মা তাদের উৎকণ্ঠার কারণ জেনে সে রাতে তাদের আমাদের বাড়িতে থাকতে দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এরা দুইজন ছিলেন সহোদর। এই সহোদর দুই মহিলা ছিলেন তখনকার নিষিদ্ধ ঘোষিত কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য। তাদের থাকতে দেয়া হয়েছিল আমার শোবার ঘরে। আমার ঘরের তাকে ছিল ছোটদের অনেক বই। আমার বইপ্রীতি দেখে সহোদরার ছোট বোন শুভা আমাকে লালমোহন পাঠাগারের খোঁজ দেন এবং বয়সে ছোট হলেও এখান থেকে বই নিয়ে আসার অনুমতি করিয়ে দেন। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা রক্ষায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে ভাষা কমিটি গঠিত হয়েছিল সেই কমিটির অনেকেই ছিলেন লালমোহন পাঠাগারের সদস্য। আর সেই সূত্র ধরেই ভাষা কমিটির লিফলেটে আমার চার লাইন কবিতা উদ্ধৃত হয়েছিল। আর সেই অপরাধে আমার ফেরার হয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় ঢাকায় আগমন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি।
১৯৫৪ সালের এক শীতের সকালে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেন থেকে যখন আমি ঢাকার মাটিতে পা দেই তখন আমি সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ ১৮ বছরের এক যুবক। পরনে খদ্দরের জামা ও পাজামা, পায়ে রাবারের স্যান্ডেল আর বগলের নিচে ভাঙা টিনের একটা সুটকেস, যার গায়ে গোলাপ ফুল আঁকা। সেখান থেকে নতুন একভাবে বেড়ে ওঠার জীবন থেকে নতুন জীবনে পদার্পণ করি।
শ্রুতিলিখন : মহিউল ইসলাম।




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};