ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
634
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের রোববারের চিত্র
Published : Tuesday, 11 July, 2017 at 12:00 AM, Update: 12.07.2017 1:45:53 AM
আবুল কাশেম হৃদয় ||
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের রোববারের চিত্ররবিবার সকাল ১১টা ২০ মিনিট। কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সম্প্রসারিত নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় ২২৮ নম্বর কক্ষের সামনে উদ্বিগ্ন হয়ে পায়চারি করছেন জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার হোসেনপুর এলাকার নুরুল ইসলাম। তাঁর মা বদরের নেসা হাসপাতালের ৪৫৩ নম্বর কেবিনে ভর্তি। শনিবার ইকো কক্ষে চিকিৎসককে দেখানোর জন্য সিরিয়াল দিয়েছেন। রবিবার ওই সময় পর্যন্ত দেখাতে পারেননি। কেবিন থেকে হুইলচেয়ারে করে সকাল ৯টায় মাকে নিয়ে এসে কার্ডিওলজি চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
ইউরোলজি বিভাগে চিকিৎসক দেখাতে সকাল ১০টা থেকে বাবা আবদুল সৈয়দকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন সদর দক্ষিণ উপজেলার চৌয়ারা এলাকার তোফায়েল হোসেন। অপেক্ষায় আছেন ক্যান্টনমেন্টের রোকেয়া বেগমসহ আরো তিনজন। চিকিৎসক আসবেন কি না, তা কেউ জানেন না। একজন ওয়ার্ড বয় জানালেন, ডা. সৈকত ওপর তলায় অপারেশন থিয়েটারে আছেন। এসে রোগী দেখে যাবেন। সেখানে গিয়ে জানা গেল, ঘণ্টাখানেক আগে অপারেশন থিয়েটার বন্ধ হয়ে গেছে। এখন এখানে কেউ নেই। অপেক্ষমাণ তোফায়েল হোসেন এ কথা শুনে নিচে নেমে তাঁর বাবাকে আস্তে আস্তে হাঁটিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকেন। বলতে থাকেন, ‘ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে তো রোগী মরে যাবে!’
এই ছিল কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের রোগীদের চিকিৎসাসেবার খণ্ডচিত্র। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কিনে যেমন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহায় সাধারণ রোগীরা, ঠিক তেমনি তার উল্টো চিত্রও আছে। কোনো কোনো বিভাগে চিকিৎসকরা যথাসময়ে রোগী দেখেছেন। বিশেষ করে চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগে রোগী ছিল উল্লেখ করার মতো। বেশ কয়েকটি বিভাগে শতাধিক রোগী ছিল। চিকিৎসকরা যথানিয়মে তাদের দেখেছেন দুপুর ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত। কেউ কেউ ২টা পর্যন্ত রোগী দেখেছেন।
যদি ‘কালের কণ্ঠ’ এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর গতকাল সোমবার পাল্টে যায় কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার চিত্র। বহি:বিভাগে রোগী দেখেছেন প্রায় সব চিকিৎসক। রোগীদের অপেক্ষা তেমন নেই। দীর্ঘ লাইনও নেই। মেডিসিন, সার্জারিসহ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, চিকিৎসকরা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। সেবিকারাও তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন।

মুক্তিযোদ্ধা ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা বুড়িচংয়ের এতবারপুরের মুক্তিযোদ্ধা আলী আজ্জমের মেয়ে শেফালী আক্তার জানালেন, তাঁর বাবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কার্ডিওলজি চিকিৎসক দেখাতে গত শনিবার সিরিয়াল দিয়েছেন। গতকাল সকাল ৯টায় হাসপাতালের বেড থেকে বাবাকে ২২৮ নম্বর কক্ষে এনে টুলে বসিয়ে রেখেছেন। চিকিৎসকের দেখা নেই।
দেবিদ্বারের বাকসার গ্রামের আবুল হাসেমের স্ত্রী মনোয়ারা বেগমেরও অবস্থা একই। গতকাল তিনি চিকিৎসককে দেখাতে সিরিয়াল দিয়েছেন। তাঁর মেয়ে সামসুন্নাহার জানান, ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন তাঁর মা। তাঁর ঠাঁই হয়েছে মেঝেতে।
কার্ডিওলজির ইলেকট্রো কার্ডিওগ্রাম (ইকো) কক্ষে চিকিৎসক দেখাতে সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ৯ জন সিরিয়াল দিয়েছে। কক্ষে ঢুকে পাওয়া গেল সেবিকা জুয়ায়রিয়া তাবাসসুম অবনীকে। তিনি জানান, সেবিকা জান্নাতুন ফেরদৌসির বদলি হিসেবে তিনি দুই দিন ধরে এখানে দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসক না এলে তো তাঁর কিছু করার নেই জানিয়ে অবনী বললেন, ‘সবাইকে আশ্বস্ত করছি। কিছুক্ষণের মধ্যে স্যার আসবেন। ’ এ সময় কোন চিকিৎসকের থাকার কথা—জানতে চাইলে তিনি তিনজন চিকিৎসকের নাম বলেন। তবে আজ (রবিবার) কার থাকার কথা, সেটা তিনি জানেন না।
কার্ডিওলজি বিভাগে গেলে একজন সেবিকা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘স্যার আছেন, রাউন্ডে গেছেন। ’ এ সময় রাউন্ড শেষ করে আসা চিকিৎসক ডা. আবদুল লতিফ মোল্লাকে ২২৮ নম্বর কক্ষে রোগীদের অপেক্ষা করে থাকার কথা জানালে তিনি বলেন, ‘ইকো রুমেই যাচ্ছি। ইকোর খুব খারাপ অবস্থা। চলেন সেদিকে যাই। ’ যেতে যেতে বললেন, ‘১১টার পর ওই রোগীদের দেখা হয়। এর আগে রাউন্ড দিই। ’
সকাল ১১টা ৫৫ মিনিট। নতুন ভবনের দোতলার ২১৩ নম্বর কক্ষের সামনে অনেক রোগীর ভিড়। মেডিসিন ও হেপাটোলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মো. ফরহাদ আবেদীন এখানে বসেন। রামগঞ্জের আবু তাহের খন্দকারের স্ত্রী রহিমা বেগমকে নিয়ে সেখানে অপেক্ষায় আছেন মেয়ের জামাই অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি (আগের বিডিআর) সদস্য আবু তাহের। তিনি জানালেন, বৃহস্পতিবার ওই চিকিৎসককে দেখিয়েছেন। তিনি কিছু পরীক্ষা দিয়েছেন। পরীক্ষাগুলো করে এনেছেন চিকিৎসককে দেখাতে, যাতে তিনি ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন। এখন তিনি নেই। চিকিৎসকের সহকারী মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘স্যার মিটিংয়ে আছেন। সকালে কয়েকজনকে দেখে গেছেন। ’
ফোন নম্বর নিয়ে কথা হয় ডা. ফরহাদ আবেদীনের সঙ্গে। তিনি জানান, মিটিংয়ে আছেন। মিটিং শেষ হলে, রোগী থাকলে দেখে যাবেন। দুপুর পৌনে ২টায় তাঁর কক্ষের সামনে আবার গিয়ে দেখা যায়, দরজায় ‘নামাজের বিরতি’র স্টিকার ঝোলানো। বাইরে তখন অপেক্ষা করছে ১০-১২ জন রোগী। অপেক্ষমাণ আবু তাহের বললেন, ‘ডাক্তারই তো আসেননি, তাহলে বিরতি কার?’
দুপুর ২টা ৮ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষার পর এই প্রতিবেদক যান নতুন ভবনের চারতলায় ইউরোলজি বিভাগে। সেখানে সুনসান। ঘড়িতে তখন ২টা ২১ মিনিট। ইউরোলজি বিভাগের সেবিকার চেয়ারে বসে রোগী দেখানোর জন্য অপেক্ষা করছেন ইন্টার্ন চিকিৎসক মায়মুনা আক্তার। কোনো সেবিকা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিকেলের ডিউটিতে যাঁরা দায়িত্বে তাঁরা এখনো আসেননি। ’ জানতে চাইলে মায়মুনা বলেন, ‘আগের ডিউটির নার্সরা কার কাছে দায়িত্ব বুঝে দিয়ে গেছেন বলতে পারব না। ’ এমন সময় শিশু কোলে আসেন সেবিকা বিউটি। বললেন, এখন দায়িত্ব তাঁরই। বাচ্চা নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে আসতে দেরি হয়েছে।
কথা বলতে হাসপাতালের পরিচালক ডা. স্বপন কুমার অধিকারীর কাছে গেলে তাঁকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখায়। তিনি বলেন, ‘রিপোর্টটা দিয়েছেন, ভালো করেছেন, আমাকে দেখিয়ে নিলে ভালো হতো। ঠিকঠাক করে দিতাম। মন্ত্রণালয় থেকে ফোন আসছে। এসব নিয়ে চিন্তা করি না। বদলি করলে করবে। ’
হাসপাতালের চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির সংকটের কথা বলে সেগুলোর যে তালিকা দিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. স্বপন, সে সম্পর্কে স্বাস্থ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শুধু চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসা সরঞ্জামাদি কেনার জন্য ১০ কোটি টাকা, মোটরযান, আসবাব, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম মেরামত, সংরক্ষণের জন্য ৩৭ লাখ এবং অন্যান্য ব্যয় বাবদ ৪০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এ টাকা পরিচালক কোথায় খরচ করেছেন?’
এর জবাবে পরিচালক ডা. স্বপন কুমার অধিকারী বলেন, ‘গজ, ব্যান্ডেজ, কাঁচি, যন্ত্রপতি ও ওষুধ বাবদ ওই ১০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকদের চাহিদা অনুযায়ী এগুলো কেনা হয়। এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলতে পারবেন প্রধান সহকারী দেলোয়ার হোসেন। তিনি ছুটিতে আছেন। ’
কোনো কোনো বিভাগে চিকিৎসক উপস্থিত না থাকার বিষয়ে ডা. স্বপন বলেন, ‘কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. কে এ মান্নানের বিদায় অনুষ্ঠানে গেছেন হয়তো। ’
এদিকে উদ্বেগের কথা জানিয়ে হাসপাতালের পরিচালক চিকিৎসক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন। তাতে লেখা রয়েছে, ‘নির্ধারিত অফিস সময় সকাল ৮টা থেকে ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত হওয়া সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা যথাসময়ে হাসপাতালে আগমন করেন না ও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন না। অনেকেই নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পূর্বে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। এটা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। এর ফলে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, যা শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি পরিপন্থী এবং শাস্তিযোগ্য। বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। ’





সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};