ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
103
নারী চিরদিন
Published : Friday, 21 April, 2017 at 12:00 AM
নারী চিরদিনরাজিয়া সুলতানা ইলি ||
সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ঘন অন্ধকারে চরাচর ঢেকে গেছে। বড় করে ঘোমটা টেনে মুখটা ঢেকে অনু দাঁড়িয়েছিলো। লোকজন যাতায়াত করছে। যদিও জায়গাটা অন্ধকার। তবু বলা যায়না। কেউ যদি চিনে ফেলে। বড় রাস্তাটা থেকে নেমে গলিটার পূর্বদিকের প্রথম দোতলা বাড়িটাতেই জাহিদ আছে। গলির এপারে দাঁড়িয়ে অনু তাকিয়েছিলো আলোকিত বাড়িটার দিকে। অনু একশভাগ নিশ্চিত জাহিদ এই বাড়িটাতেই আছে। পল্টুকে সে লাগিয়ে রেখেছে জাহিদের পিছনে। এই জন্য পল্টুকে সে টাকা দেয়। প্রায় দশ দিন ধরে জাহিদের যাতায়াত চলছে এই বাড়িতে। স্বাগতার কাছে আসে জাহিদ। স্বাগতা একটা স্কুলে চাকরি করে। সেই মিশনারী স্কুলের গভর্নিং বডির মেম্বার জাহিদ। গভর্নিং বডির মিটিংয়ে গিয়ে জাহিদ স্বাগতকে দেখে।  তেইশ কি চব্বিশ বছর বয়স হবে মেয়েটির। মাস্টার্স দিয়ে এই স্কুলে জয়েন করেছে। রেজাল্ট বেরুলে কলেজে বা ব্যাঙ্কে এ্যাপ্লাই  করবে। মেয়েটি বেশ সুন্দরী। পল্টুর কাছেই অনু এসব কথা শুনেছে। কিন্তু সে অবাক হয়েছিলো এই ভেবে যে স্বাগতাদের বাড়ির লোক কিভাবে কোন পরিচয়ে জাহিদকে বাড়িতে ঢুকতে দিলো। বিশেষ করে স্বাগতার মত সুন্দরী অল্পবয়সি মেয়ে যে বাড়িতে আছে। পরে  অবিশ্যি জানতে পেরেছে, স্বাগতা এ বাড়ির মেয়ে নয়। সে মফস্বল থেকে এসেছে। এ বাড়ির একটি রুম সাবলেট নিয়েছে। এটাচড্ বাথরুম আছে। খাওয়া দাওয়া বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে। চা নাশতার জন্য ঘরে স্টোভ রেখেছে। এসব খবর অনু জেনেছে মাত্র তিন চারদিন আগে। মাঝখানে পল্টু কিছুদিন এখানে ছিলনা। জাহিদের হাবভাবেই অবিশ্যি অনুর সন্দেহ হয়। জাহিদ ব্যবসা করে। ব্যবসার কাজে তাকে মাঝে মাঝে বাইরেও যেতে হয়। দেশে থাকলে নিজের লোকাল অফিসে যায়। দুপুরে বাড়িতে এসে লাঞ্চ করে। একটু রেষ্ট নিয়ে বিকেলে আবার বেরোয়। রাত দশটার মধ্যে বাড়িতে ফিরে আসে। ইদানিং এই রুটিনের ব্যতিক্রম হচ্ছে। এখন সন্ধ্যার পর সে অফিসে থাকেনা। অফিসে ল্যা-ফোনে ফোন করে অনু ইদরিসের কাছে জানতে পেরেছে, সাহেব অফিসে নেই। কোথায় গেছে ইদরিস বলতে পারেনি। মোবাইলে চেষ্টা করেও অনু লাইন পায়নি। জাহিদের মোবাইল বন্ধ। পরে জাহিদকে সে জিজ্ঞেস করেছে, ‘তুমি তো আজকাল সন্ধ্যার পর অফিসে থাকোনা। কোথায় যাও।’ জাহিদ বলেছে, আমার কত কাজ  থাকে। ব্যবসার ব্যাপারে অনেকের সঙ্গে এ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকে।’ অনু বলে, ‘তা বেশতো। এত বড় ব্যবসা। কাজ থাকতেই পারে। কিন্তু তুমি মোবাইল বন্ধ রাখো কেন। বাড়িতে হঠাৎ কোন জরুরি দরকার পড়তে পারে।’ বিরক্ত মুখে জাহিদ বলে, ‘দেখো, আমি ব্যস্ত মানুষ। বাড়ির সব ব্যাপারে আমাকে ইনভলব করবার চেষ্টা কোরোনা। বাড়িতে তিন চারজন কাজের লোক আছে। তেমন জরুরি কিছু হলে মফিজকে ডাকবে। মফিজ চালাক চতুর ছেলে। যে কোন সমস্যাই সামাল দিতে পারবে। অনর্থক ছোট খাটো বিষয়ে আমার সময় নষ্ট কোরো না।’ তখনকার মত অনু চুপ করে গেল। কিন্তু তার সন্দেহ দূর হয়নি। মাত্র ছয়মাস আগের ক্ষতটি এখনো শুকায়নি। উপরে প্রলেপ পড়েছে। কিন্তু ভেতরে এখনো কাঁচা গদগগে। অনুর চাচাতো বোন সীমা এসেছিলো বেড়াতে। ষোল সতেরো বছর হবে বয়স। অপূর্ব লাবণ্যময়ী একটি মেয়ে। কৈশোরের চাঞ্চল্য এখেনো রয়ে গেছে। সবতাতেই অবাক হওয়া তার অভ্যাস। জাহিদকে বলে, ‘দুলাভাই, আমাকে কিন্তু বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে। ঘরে বসে থাকতে আসিনি আমি। এই প্রথম এলাম ঢাকা শহরে। সব দেখাতে হবে আমাকে জাহিদ বললো, ‘বেশতো যাবে বেড়াতে। এটা আর কি এমন কথা।’ বিকেল জাহিদ বললো, ‘কই সীমা কোথায় গেলে। বেড়াতে যাবে বলছিলেনা? শিগগির রেডি হও।’ সীমা বললো, ‘আপা যাবেনা? জাহিদ বললো ‘তোমার আপার তো শরীর ভালোনা। ওর নড়াচড়া করা বারণ।’ অনু তখন সন্তান সম্ভবা। নানা রকম সমস্যা। ডাক্তার অনুকে কমপ্লিট বেড রেস্টে থাকতে বলেছে। অনুর চোখের সামনে ওরা দুজান সেজেগুজে বেরিয়ে গেল। এখন আর জাহিদের বিজনেসের কোন সমস্যা হচ্ছেনা। সময়েরও কোন অভাব হচ্ছে না। ওরা ফিরলো রাতপ্রায় দশটায়। সীমার হাতে অনেকগুলো প্যাকেট। সীমা ঘরে ঢুকেই অনুকে জড়িয়ে ধরলো। বললো, ‘অনু আপা, তুমি একটা বরের মত বর পেয়েছো একেবারে এক নাম্বার। বাব্বা: কি ভালো। কত জায়গায় যে ঘুরলাম। কত কিছু যে দেখলাম। ঢাকায় আসা আমার সার্থক হলো। আর এই দেখো, দুলাভাই কত কি কিনে দিয়েছে।’ আনন্দে উজ্জ্বল মুখে সে প্যাকেটগুলো খুলে অনুকে দেখাতে লাগলো। আবার কলকল করতে লাগলো, ‘দুলাভাইকে কত বললাম, আপার জন্য কিছু নিন। নইলে আপার মন খারপ হবে।’ কিন্তু দুলাভাই বললো, ‘তুমি নাকি নিজের জিনিষ নিজে পছন্দ করে কিনতে ভালোবাসো।’ অনু চুপচাপ তাকিয়ে রাইলো সীমার মুখের দিকে। সীমার সারল্যে উদ্ভাসিত উজ্জ্বল মুখটা দেখতে তার খুব ভালো লাগছিলো। এতক্ষণ অবিশ্যি একা একা ফাঁকা ঘরে তার প্রচ- মন খারাপ লাগছিলো। সীমার মুখের দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগলো তাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় দু বছর। অনুর তখন সবে এম.এ.পরীক্ষা শেষ হয়েছে। অনু তার এক বান্ধবীর বিয়েতে গেছে। সেখানেই জাহিদ তাকে দেখে। অনুকে নাকি প্রথম দর্শনেই সে ভালোবেসে ফেলেছে। পাত্র হিসেবে জাহিদও অবিশ্যি খারাপ নয়। সেও এম.এ.পাশ। দেখতে খুব সুশ্রী না হলেও তার চেহারায় একটা বুদ্ধিমত্তার ছাপ ছিল। পড়তে পড়তেই সে ব্যবসা শুরু করে। তার ভাগ্য ভালো। প্রথম থেকেই সে উন্নতি করতে শুরু করে। এখন তো সে প্রচ- সফল। দেশের বাইরেও তার ব্যবসার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। অনু ভাবছিলো যে জাহিদ তার রূপে মুগ্ধ হয়ে একেবারে পাগল হয়ে তাকে বিয়ে করেছিলো, ছমাস না যেতেই তার সেই নেশার ঘোর যেন কেটে গেছে। অথচ অনুর বয়সও তো মাত্র তেইশ চব্বিশ। তার সৌন্দর্যে ও ভাটা পড়েনি। এখন অবিশ্যি প্রেগন্যান্সির  কারণে শরীরে নানান সমস্যা দেখা দিয়েছে। চেহারাও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কিন্তু সৌন্দর্যই কি সব? ভালোবাসা বলে কি কিছু নেই? অনু জাহিদের চরিত্রের এই দিকটা এতদিন বুঝতে পারেনি। সীমা আসবার পরে সে উপলব্ধি করতে পারলো, কি বিরাট ভুল সে করেছে। জাহিদ হচ্ছে সেই ধরণের ছেলে, একে যার অতৃপ্তি। বহুতেই যার আনন্দ। ফুলে ফুলে মধু খাওয়াতেই যে অভ্যস্ত। সীমা যে কদিন ছিল সে কদিন ব্যবসা বাণিজ্য জাহিদের মাথায় উঠেছিলো। সীমা হচ্ছে সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ একটি মেয়ে। নিতান্তই সহজ সরল। জাহিদের এই আদরের আড়ালে যে অন্য কোন উদ্যেশ্য থাকতে পারে, সেটি সে একেবাইে বুঝতে পারেনি। সেই দিনটি আজো অনুর চোখে স্পষ্ট ভাসে। শরীর তো খারাপ ছিলোই। মনটাও অসম্ভব খারাপ। সীমা আসবার পরে জাহিদ অফিসেই যায়না। রাতে খাবার টেবিলে গল্প করতে করতেই বারোটা একটা বেজে যায়।  কথায় কথায় তার উচ্চকণ্ঠের হাসি অনু শোবার ঘর থেকেই শুনতে পায়। পরদিন সকালে অনেক দেরীতে ঘুম থেকে ওঠে। তবুও তার অফিসে যাবার কোন লক্ষণ দেখা যায়না। অনু বলে, ‘একি তুমি অফিসে যাবেনা? জাহিদ তাচ্ছিল্যভরে বলে, ‘আজ অফিসে তেমন কোন কাজ নেই। সেলিমকে (জাহিদের ম্যানেজার) বলে দিয়েছি। সেই সব সামলে নেবে। নাশতার টেবিলেও তার কেটে যায় দুই তিন  ঘণ্টা। সর্বক্ষণ সে সীমার পেছন পেছন ঘুরতে থাকে। সীমা যদি অনুর কাছে এসে বসে, জাহিদও তখন অনুর কাছে আসে। তার বিন্দুমাত্র চক্ষু লজ্জা নেই। দুই তিনজন কাজের লোক বাড়িতে লজ্জায় অনুর মাথা কাটা যায়। কি ভাবছে কাজের লোকগুলি। জাহিদের বাড়িটা একতলা। বিশাল বাড়ি। জাহিদ নিজে প্ল্যান করে বাড়ি করেছে। ভবিষ্যতে দোতালা তিনতলা করবার ইচ্ছে আছে। বাড়িতে অনেকগুলো রুম। বাড়ির সামনে ফুলের বাগান। গ্যারেজ। বাগানের তদারকির জন্য মালী আছে। পেছনে ফলের বাগান। বিভিন্ন সিজনে বিভিন্নরকম সবজির চাষও হয়। জাহিদের মা-বাবা মারা গেছেন কয়েকবছর আগে।  ভাই বোনও নেই। এতবড় বাড়ি। কিন্তু থাকবার লোক তারা দুজন মাত্র। ড্রাইভার মালী কাজের লোকদের থাকবার ঘর আলাদা। সীমা এই বাড়িতে এসে মুগ্ধ। এতো সুন্দর বাড়ি প্রত্যেকটি ঘর মহার্ঘ আসবাবে সাজানো। সে ছুটোছুটি করে এঘর থেকে ওঘরে। বারান্দায়। ফুলের বাগানে। পেছনের ফলবাগানে। সবজি ক্ষেতে। যা দেখে, তাতেই সে মুগ্ধ। জাহিদ ও তার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে। সীমা উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বলে, ‘দুলাভাই আপনার অনেক টাকা। তাইনা? এতবড় বাড়ি। কি সুন্দর বাড়ি। আপনারা তো মাত্র দুজন মানুষ। সব রুম তো খালিই পড়ে থাকে।’ জাহিদ হাসতে হাসতে বলে, ‘তোমার পছন্দ হয়েছে? তুমি থেকে যাওনা। এখানে থেকে কলেজে পড়বে।’ সীমা এইমাত্র এস.এস.সি দিয়েছে এখনো রেজাল্ট বেরোয়নি। সীমার আব্বার (অনুর চাচা) আর্থিক অবস্থা তেমন ভালোনা। ভাইবোনদের মধ্যে তিনিই এখনো গ্রামে পড়ে আছেন। অন্যদের অবস্থা মোটামুটি স্বচ্ছল। সীমা খুব খুশী। বলে, ‘সত্যি বলছেন? আব্বা তো আমাকে নিতে আসবেন। আব্বা রাজী হলে কি মজা হবে। আমি ঢাকায় আপনাদের কাছে থেকে পড়তে পারব।’ পরক্ষণেই ম্লানকণ্ঠে বলে, ‘এ্যাডমিশন টেস্টে টিকলে তবে তো ভর্তি হতে পারব। যে বিরাট কমপিটিশন। আল্লাহ জানেন টিকব কিনা।’ জাহিদ দুইহাতে সীমাকে কাছে টেনে নিয়ে বলে, ‘টিকবে না মানে? তোমার এই দুলাভাই আছে কি করতে? টিকিয়েই ছাড়ব।’ আবার উৎফুল্ল হয়ে ওঠে সীমা। বলে, ‘সত্যি বলছেন দুলাভাই? আপনার মতো মানুষ হয়না। ভাগ্যিস অনেক জোরাজুরি করে আপনাদের এখানে বেড়াতে এসেছিলাম। ঢাকায় থেকে পড়া তো আমার কাছে বিরাট স্বপ্ন। এদিকে শোবার ঘরে একা একা অনুর সময় কাটেনা। সারাদিন সারারাত বিছানায়। ঘুমও আসেনা। টিভি দেখতেও ভালো লাগেনা। জাহিদ অনেক ম্যাগাজিন এনে দিয়েছে। তাতেও মন বসেনা। তার কেবলি কান্না পায়। এসময়ে জাহিদের তার পাশে থাকা উচিত। তাকে সঙ্গ দেওয়া উচিত। অনু মুখ ফুটে কিচ্ছু বলেনা। দু:খের থেকেও তার অপমান লাগে বেশী। সে উৎকর্ণ হয়ে থাকে। কিন্তু জাহিদ বা সীমার কন্ঠস্বর শোনা যায়না। ওরা দুজন তখন বাড়ির পেছনের সবজিক্ষেতে। অনুর কান্না পায়। মরে যেতে ইচ্ছে করে। কাজের মেয়ে ময়না এসে বলে, ‘আফা, আপনের গোসলের সময় হইছে। বাথরুমে চলেন।’ অসীম মমতায় সে অনুকে ধরে ধরে নিয়ে যায়। অনু বলে, ‘ময়না রান্না হয়ে গেছে?’ ময়না বলে, ‘হ্যা আফা। রান্না বান্না শেষ। খালা টেবিলে খানা দিবার জোগাড় করতাছে। আমিও ঘর দোর ফার্নিচার সব মুইছ্যা ফালাইছি।’ গোসল  শেষ হলে অনু বলে, ‘ময়না, তোর সাহেবকে আর সীমাকে ডেকে নিয়ে আয়। ওদের তো এখনো গোসল হয়নি।’ এসব বলার সময় বহুকষ্টে অনু নিজেকে সংযত রাখে। বুক ফেটে তার কান্না আসতে চায়। ময়না চলে যায় ওদেরকে ডেকে আনতে। সেদিন রাতে জাহিদ আর সীমার কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে অনুর কেমন যেন সন্দেহ হয়। সে বহু কষ্টে বিছানা থেকে নামে। অন্যদিন এই সময়ে অনুর শোবার ঘরেই সবাই একসঙ্গে বসে টিভি দেখতে দেখতে গল্প করে। কিন্তু আজ ওরা কোথায়? হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তবু অনু একপা একপা করে হাঁটতে হাঁটতে বেশ দূরে গেস্টরুমের কাছে আসে। কাজের লোকেরা এই সময়টায় নিজেদের ঘরে থাকে। গেস্টরুমের ভেতর থেকে কেমন যেন চাপা শব্দ ভেসে আসছে। অনু আস্তে গেস্টরুমের ভোজানো দরজাটা ঠেলতেই খুলে যায়। ভেতরে নীল রঙের ডিম লাইট জ্বলছে। সামনের দিকে তাকিয়ে অনু স্থবির হয়ে যায়। দেখে সীমা জাহিদের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু জাহিদের শরীরে তখন অসুরভর করেছে। এক হাতে সে সীমার মুখ চেপে ধরে রেখেছে। সীমার মুখ থেকে একটা গোঙ্গাঁনীর শব্দ বেরুচ্ছে। অনুকে দেখে সে প্রচ- চমকে ওঠে। অসুস্থ অনু এতদূর আসতে পারবে, এটা সে আশা করেনি। জাহিদের হাত একটু শিথিল হওয়া মাত্র সীমা ছুটে এসে অনুকে জড়িয়ে ধরলো। কিন্তু অনু তখন জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। সেই পতনের ধাক্কা অনু সামলাতে পারলোনা। বেশ কিছুদিন যমে মানুষে টানাটানি চললো। ডাক্তারদের আপ্রাণ চেষ্টায় অনু বেঁচে গেল। কিন্তু বাচ্চাটাকে বাঁচানো গেল না। ইতিমধ্যে খবর পেয়ে অনুর বাবা-মা এসেছেন। সীমার বাবাও এসেছেন সীমাকে নিয়ে যেতে। সীমা যদিও ছেলে মানুষ, বুদ্ধি একটু কম, তবু এই  ব্যাপারে সে কারো কাছে মুখ খুললোনা। চাকর বাকররাও একটু দূরে নিজেদের ঘরে থাকায় কিচ্ছু টের পায়নি। অনু একটু সুস্থ হয়ে কিনিক থেকে বাড়িতে ফিরে আসতেই সীমা তার বাবার সঙ্গে দেশের বাড়িতে চলে গেল। সেদিনের সেই ক্ষত আজো বুকের মধ্যে দগদগে হয়ে আছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে অনুর প্রায় তিনমাস লেগেছিলো। সীমা যেমন সেদিনের ব্যাপারে কারে কাছে মুখ খোলেনি, অনুও নিজের বাবা মাকে কিছু জানায়নি। সে অনেক ভেবেছে সব জানলে বাবা মা আঘাত পাবেন। হয়তো তাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে চাইবেন। অনু নিজের মনকে প্রশ্ন করে, সে কি এরপরও জাহিদের কাছে থাকবে? কোন জবাব পায়না। আসলে জাহিদকে সে খুব বেশি ভালোবেসে ফেলেছে। সে নিজেকে নিজে আবার প্রশ্ন করে। সে কি জাহিদের টাকা পয়সা গাড়ি বাড়ি সুখ স্বাচ্ছন্দের লোভে জাহিদকে ছাড়তে চাইছেনা? কিন্তু না। সে লোভী নয়। তার বাবার যদিও এতো অঢেল টাকা পয়সা নেই, তবুও জীবনে বেঁচে থাকবার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু ঠিকই আছে। সে নিজে এম.এ.পাশ। একটা চাকরি ঠিকই জুটিয়ে নিতে পারবে সে। কিন্তু তবুও জাহিদকে একেবারে ছেড়ে চলে যেতে চাইছেনা তার মন। যে লোকটি তার ভালোবাসার কোন মূল্য দিলোনা, এতবড় অপমান করলো তাকে, তারই কাছে পড়ে থাকবে সে? জাহিদ অবিশ্যি বারবার ক্ষমা চাইছে তার কাছে। বলছে, ভুল হয়ে গেছে। আর কখনো এমন ভুল করবেনা সে। তারপর ধীরে ধীরে অনুর মনে শান্তি ফিরে এসেছে। জাহিদও প্রচ- ভালোবাসায় ভরিয়ে রেখেছে তাকে। মাঝে মাঝে মূল্যবান গিফট এনে তাকে সারপ্রাইজ দেয়। কাজের প্রেশার কম থাকলে মাঝে মাঝে বেড়াতেও নিয়ে যায় তাকে। সবঠিকঠাক চলছিলো। ছমাস আগের নির্মম দুর্ঘটনাটি একটু একটু করে সে ভুলতে শুরু করেছিলো। কিন্তু হঠাৎ তার ষষ্টেন্দ্রিয় জেগে উঠলো। জাহিদের আচরণ কিছুদিন থেকে অন্যরকম লাগছে। যদিও জাহিদ ভালোবাসায় তাকে ভরিয়ে রেখেছে, তবু বাতাসে সে যেন কোন বিপদের সংকেত পেলো। ইদানিং জাহিদের অফিসে পল্টু নামে একটি ছেলে কাজ করছে। নানা কাজে সে প্রায়ই বাড়িতে আসে। ছেলেটি বেশ চালাক চতুর। অনেক ভাবনা চিন্তা করে অনু পল্টুকে জাহিদের পিছনে লাগালো। পল্টুর কাছ অনু জানতে পারলে ইদানিং জাহিদ অফিসের পর মিশনারী স্কুলের একজন শিক্ষক স্বাগতার বাড়িতে যায়। স্বাগতার বাড়ির ঠিকানাও সে জোগাড় করে দিলো। অনু ইচ্ছে করে আজ পল্টুকে সঙ্গে আনেনি। জাহিদের চোখে পড়ে গেলে ওর চাকরি চলে যেতে পারে। বাড়ির গাড়িও সঙ্গে আনেনি। ইস সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে। জাহিদকে হাতে নাতে ধরবে বলে। পায়ে ব্যথা করছে এদিকে মশার জ্বালায় দাঁড়াবার উপায় নেই। অনু আবার গেইটের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো। ঐতো আসছে জাহিদ। তার বুকের মধ্যে ধক ধক করতে লাগলো। অনু দ্রুতপদে উল্টোদিকের বিল্ডিংটির সামনে এসে দাঁড়ালো। দেখতে পেলো বিল্ডিংটির দুটি গেইট। মাঝখানে একটি বড় গেইট। একপাশে আর একটি ছোট গেইট। ছোট গেইটটি খুলে জাহিদ এবং তার সঙ্গে একটি মেয়ে বেরিয়ে এলো। অনু জাহিদের সামনে এসে ঘোমটা ফেলে দিলো। প্রচ- বিস্ময়ে হত বিহ্বল জাহিদ প্রায় চিৎকার দিয়ে উঠলো। ‘একি তুমি এখানে? অনু হিসহিস করে অনুচ্চস্বরে বললো, ‘আশা করোনি আমাকে এখানে। তোমার নতুন লীলাখেলাটা ধরে ফেলেছি। খুব আফসোস হচ্ছে। তাইনা? এই সময়ে স্বাগতা বললো, ‘ক্ষমা করবেন। আপনাদের মাঝখানে কথা বলছি। আপনি নিশ্চয়ই জাহিদ  সাহেবের স্ত্রী। আপনি তো খুবই সুন্দরী। কিন্তু আমি তো অন্যরকম শুনেছি।’ অনু স্বাগতার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ কার কাছে শুনেছেন। ইনার কাছে নিশ্চয়ই। জানেন না পুরনো হলে সব জিনিষই বাতিল হয়ে যায়। তেমনি বউ ও পুরনো হলে বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু আপনার ব্যাপারটা কি? আপনি ও তো সুন্দরী। তার উপর আপনার প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে আপনি কুমারী। তা একজন শিক্ষিতা মহিলা হয়ে এই ম্যারেড লোকটিকে পাকড়াও করেছেন কেন? টাকার লোভে বুঝি? স্বাগতা রেগে গেল। তবু আশেপাশে তাকিয়ে নীচুস্বরে বললো, ‘দেখুন, না জেনে যা তা বলবেননা। এই ভদ্রলোককে আমি কিছুতেই এ্যাভয়েড করতে পারিনি। ইনি বলছেন, ইনার স্ত্রী বছর কয়েক যাবত শয্যাশায়ী। এই অসুখ কোনদিনও সারবেনা। আগে দেখতে ভালো ছিল। এখন তাকানো যায়না। ব্যবহারও যাচ্ছে তাই। ঘরে একমুহূর্ত তিষ্ঠানো যায়না। কিন্তু আমি যে ওনার এসব কথা শুনে ওনার প্রেমে পড়ে গেছি, তা ভাববেন না। আমি মধ্যবিত্ত ঘরে মেয়ে। যুদ্ধ করতে করতে এতদূর এসেছি। অনেক উপরে ওঠার স্বপ্ন আমার। এই লোকটিকে আমি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিতে পারিনি। শুধুমাত্রা আমার সম্ভ্রম হারানো ভয়ে। হৈ চৈ শুনে ছুটে আসবে এই ভয়ে। ওনাকে কেউ দোষ দেবেনা। দোষ দেবে আমাকে কি করে লোকটি আমার ঘরে ঢুকলো। একজন লোক কড়া নাড়তে থাকলে কতক্ষণ না খুলে পারা যায়। আর একটি লোককে তো আমি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারিনা। আমি ওনাকে বারবার নিষেধ করেছি বাড়িতে আসতে। বাড়ির মালিক এরই মধ্যেই আমাকে ওয়ার্নিং দিয়েছেন। আমার সম্পর্কে আপনি যা বলছেন তা ঠিক নয়। আমি লোভী নই। উনি গভর্নিং বডিতে আছেন। মান্যগণ্য লোক। ইন্টারভিউর দিন পরিচয়। ব্যবহার অত্যন্ত মার্জিত। তবু আমি বারবার ওনাকে ভদ্রভাবে বলেছি আমি একা থাকি। উনি বারবার এলে আমাকে অগত্যা চাকরি ছেড়ে চলে যেতে হবে।’ এক নি:শ্বাসে স্বাগতা কথা গুলো বলে থামলো। পরদিন খুব ভোরে অনু স্যুটকেস গোছাচ্ছিলো। সারারাত একফোটা ঘুম হয়নি। এবারও জাহিদ যথারীতি ক্ষমা চাইবার চেষ্টা করছিলো। ঘৃনায় অনু ফিরেও তাকায় নি। আর নয়। এবারে অনু সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। সীমার ঘটনার পরই তার উচিত ছিল চলে যাওয়া। এই লোকটির আসলে দুকানই কাটা। লজ্জাশরম বলতে কিছু নেই। অনু সারাজীবন একা থাকবে। তবু আর নয়। স্বাগতার কথা গুলো তার মনে পড়ছিলো। ‘সে শয্যাশায়ী। দেখতে কুৎসিত। তার ব্যবহারে ঘরে তিষ্ঠানো যায়না।’ তার বুকটাকে যেন কেউ অগ্নিশলাকা দিয়ে এফোড় ওফোড় করে দিচ্ছে। স্যুটকেস গোছাতে গোছাতে তার চোখ দিয়ে অবিরল জল পড়ছিলো।
মতামত জানাতে
০১৭৪১-১০২১২৯




সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};