ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
84
ফিরে দেখা
Published : Thursday, 20 April, 2017 at 12:00 AM
ফিরে দেখাআনোয়ারুল হক ||
চতুর্থ পর্ব - পাঁচ
অধ্যক্ষ আবদুস সাত্তার ম-ল সম্ভবত বিষয়টি লক্ষ্য রাখছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে মূল ভবনে ফিরতে ফিরতে আমাকে নি¤œকণ্ঠে বললেন, হ্যা-েল দি সিচ্যুয়েশন কেয়ারফুলি। ডোন্ট ওয়ারি, আই এ্যাম অলওয়েজ বিহাই- ইয়ুর ব্যাক।
মাঠ থেকে ফিরে টিচার্স কমনরুমে ঢোকার মুখে ওরা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। মাথায় চুল কম, মাঝবয়সের গোলগাল স্বাস্থ্য এবং চোখের এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসেই আমার হাত ধরে ফেললেন। ছেলেকে দেখিয়ে বললেন,
-আমি ওর বাবা। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।
মুখ ফসকে বলেই ফেললাম,
-ভীষণ বেয়াদপ এবং অবাধ্য আপনার এই ছেলে..
ভদ্রলোক আমার উষ্মা প্রকাশে বিব্রত হলেন। প্রায় মিনতির মতো বললেন,
-এই জন্যেই আমি আমার এই ছেলেকে আপনার হাতে দিয়ে যেতে এসেছি।  এ পর্যন্ত ওকে কেউ এ ভাবে শাসন করার সাহস করেনি। অহরহ নালিশ শুনতে পাই ওর নামে। ওকে আমরা আদর দিয়েছি, ওর যে কোন আবদার পূরণ করেছি কিন্তু কোন শাসন করিনি। আমার মনে হয়েছে আপনিই পারবেন ওকে ঠিক পথে নিয়ে আসতে।
তারপর ছেলেকে দিয়ে আমার পা ছুঁয়ে আনরুলি না হওয়ার প্রতিজ্ঞা করালেন।
আর চলে যাবার সময় বলে গেলেন,
-আমার ছেলে আপনাকে ভীষণ ভয় পেয়েছে। এটার দরকার ছিলো। সে কাউকে ভয় পায় না বলেই এমন হয়েছে। তার ডেম কেয়ার ভাবের গোড়াটা আপনি ভেঙ্গে দিয়েছেন। ধন্যবাদ আপনাকে।
এই ছাত্রটি এরপর থেকে স্কুলে অন্যরকম ছেলে এবং সকল এক্সট্রা কো কারিক্যুলার একটিভিটিজে আমার প্রিয় সঙ্গী হয়ে ওঠলো।
এই ঘটনার পর অধ্যক্ষ স্যার খুব খুশি মনে যা করলেন তাতে আমার দম বন্ধ আসার জোগাড়।
আমি এই প্রতিষ্ঠানে যোগদানের আগে থেকেই কাজ চলছিলো তিনতলার দক্ষিণ অংশটিতে। স্থির হয়েছে ‘কুদরত ই খোদা’ নাম দিয়ে ছাত্রাবাসটি চালু করা হবে। সুপারের দায়িত্ব দেয়া হলো আমাকে। তার মানে এখন থেকে শহর ছেড়ে ছাত্রদের সঙ্গে চব্বিশ ঘন্টা এখানেই থাকতে হবে তাদের দেখভাল করার জন্যে! তাহলে আমার নাটক, আড্ডা অনুষ্ঠান এইসবের কী হবে!
নতুন চাকুরি, নিয়ম কানুনের শিকলে সব সময় আঁইঢাই অবস্থা। দায়িত্ব নিতে পারবো না, এমন কথা বলা মানে চাকুরিচ্যুত হওয়া। তার উপর ম-ল স্যার আর একটা বোঝা চাপিয়ে দিলেন, তা হলো-দোতলায় ডান ও বাম পাশে যে দুটি ছাত্রাবাস আছে সেখান থেকে দুষ্ট, অবাধ্য, গাধা টাইপের সত্তুর জন ছাত্রকে বাছাই করে আমার হাউসে দিয়ে বলা হলো,
-আশা করি আপনি এদের ভালই সামলাতে পারবেন।
উপাধ্যক্ষ ইয়াকুব স্যার সায় দেন,
-অব কোর্স, হি ইজ আ্য জিনিয়াস স্যার। হা হা হা..
এদিকে টাউনহলে আমার নাটক মঞ্চায়ন হচ্ছে প্রতি সন্ধ্যায়।
অন্যদিকে একই সময়ে ছাত্রদের প্রেপ কাশ। আমি উপস্থিত না থাকলে পুরো হোস্টেল এরা মাথায় নিয়ে নাচবে! কী করি! এরমধ্যে একদিন অধ্যক্ষ ডেকে অনুযোগ করলেন,
-আপনার হোস্টেলের ছেলেরা মাগরিবের নামাজ পড়তে যায় না। বিষয়টি দেখুন।
এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল, এই সময়ের আমি এবং আজকের আমি’র মধ্যে বেশ ফারাক আছে। আর কিছু নীতি আমি সব সময়েই মেনে চলি আজও তা হলো, আমি নিজে যা করি না, তা অন্যকে করতে বলি না।
মানে হলো, সেই সময় আমি নামাজ পড়তাম না। রোজা রাখতামÑ আশেপাশে, বাসায় সবাই রাখে তাই আমিও রাখতাম। সেহেরি খেতাম। কিন্তু বেলা বারোটার পর ঘুম থেকে ওঠে কান্দিরপাড় সুইট হোমে এসে পর্দার আড়ালে বন্ধুদের সঙ্গে বসে চা-সিঙ্গারা ঠিকই খেয়েছি।
তো, এইরকম আমি ছাত্রদের নামাজ পড়তে যেতে বলি কি করে ?
আমি প্রিন্সিপাল স্যারকে বিনীত ভাবে বললাম,
-সরি স্যার, আমি নিজে নামাজ পড়ি না। তাদের বলতে পারবো না।
ম-ল স্যার আমার জবাব শুনে রাগ করলেন না। হা হা করে হাসলেন। বললেন,
-আরে, আপনাকে বলতে হবে কেন ? আপনার বিখ্যাত জালি বেত নিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় করিডোরের মাঝখানে দাঁড়াবেন, তাতেই কাজ হবে।
আসলেই তো! এমনটা তো ভাবিনি। এবং সত্যিই তাই হলো, মাগবিরের আজানের সময় হররোজ করিডোরের গোড়ায় আমাকে দাঁড়ানো দেখলেই- কাজ হয়েছে।
এই পদ্ধতিটা একটু অন্যরকম ভাবে কাজে লাগালাম সন্ধ্যায় শহরে আসার জন্যে।
বন্ধের দিন শুক্রবারে সকালে ছাত্রাবাসের পিয়নকে দিয়ে বাঁশঝাড় থেকে বাঁশের কঞ্চি কেটে সত্তরটা বেত বানিয়ে আনলাম। ওইগুলো দা দিয়ে চেঁছে এমন করা হলো যেন পিটুনি দিলে কেটেকুটে না যায়। তারপর ছাত্রাবাসের একেকজন ছাত্রের নাম কাগজে লিখে একেকটা বেত চিহ্নিত করে আমার টেবিলের ওপর রেখে সবশেষে হাউজ প্রিফেক্ট শরিফুলকে দিয়ে একজন একজন করে আমার কক্ষে ডাকা হলো। যে ঢুকলো তাকে বললাম,
-তোমার নামে চিহ্নিত বেতটি এখান থেকে বের করো।
বাধ্যগত ছাত্রটি তার নামের বেতটি বের করার পর তাকে বলা হলো,
-তোমরা তো জানোই আমাকে। নিয়ম ভঙ্গ করলে এটি তোমার জন্যে রাখা হলো। মনে থাকে যেনো।
খুব কাজে লেগে গেলো এই পদ্ধতি। সেদিন সন্ধ্যায় একটা মহড়া দিলাম। নিচে রাস্তার ওপর থেকে খেয়াল করলাম, রাত সাড়ে নয়টার আগে কেউ ঘর থেকে বের হলো না। প্রিফেক্টের বাঁশির হুইসেলে লাইন বেঁধে দোতলায় ডাইনিংয়ে খেতে গেলো। খেয়ে ফিরলো যার যার কক্ষে আগের মতোই নিশ্চুপ এবং শান্ত ভাবে। এই মহড়া আমি একা দেখলাম না, উপাধ্যক্ষ ইয়াকুব স্যারও দেখলেন।
তারপর সন্তুষ্ট চিত্তে বললেন,
-এবার আপনি যেদিন যেতে চান সেদিন মঞ্চে গিয়ে নাচানাচি করুন। আপত্তি নেই। তবে, কোনদিন শিল্পমেলায় গেলে আমাকে নিয়ে যেতে ভুলবেন না কিন্তু। হা হা হা।
বলতে দ্বিধা নেই, ইস্পাহনীতে আমার শিক্ষকতা জীবনের শুরুটা পরিচ্ছন্ন, নিয়মানুবর্তী স্মার্ট ছেলেমেয়েদের সংস্পর্শ এবং শক্ত প্রশাসনিক ভিতের ওপর হওয়াতে লাভই হয়েছে বলা যায়। নিজের অগোছালো জীবনে পরিবর্তন আসুক এটা যেনো মনে মনে আমিও চাইলাম। এক বছরের মাথায় কর্ণেল হান্নান মামার উৎসাহে ক্যাডেট কলেজে চাকুরির জন্যে দরখাস্ত করলাম। এর আগে ইস্পাহানী কলেজ থেকেই ওরিয়েন্টেশনে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে আমাদের কয়েকজনকে পাঠানো হলো। বলা বাহুল্য নয়, ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ নিয়ে আমার কৌতুহল ছিলো স্কুল জীবন থেকেই। কেননা স্কুলে আমাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, কুমিল্লা বোর্ডে এস এস সি’তে ফলাফলের ক্ষেত্রে কুমিল্লা জিলা স্কুলের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ। সে ক্ষেত্রে ১৯৬৯ সালে জিলা স্কুল তার মান রেখেছিলো। তখন আমাদের প্রধান শিক্ষক ছিলেন নূর আহমদ খান স্যার। ঐ বৎসর আমাদের ব্যাচ থেকে আটর্স, সাইন্স, কমার্স এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাইন্স চারটি গ্রুপ থেকেই কুমিল্লা বোর্ডে প্রথম হয়েছিলো। জানতাম, ক্যাডেট কলেজে পড়াশুনা থাকা-খাওয়াসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার মান পাবলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির তুলনায় শতভাগ উন্নতমানের। সেনা কর্মকর্তাদের অধীনে, নির্দেশে এবং রীতিতে এরা পরিচালিত হয়। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন সারা বাংলাদেশে  ফৌজদারহাট (চট্টগ্রাম), মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) ঝিনাইদাহ এবং রাজশাহী এই চারটি ক্যাডেট কলেজ ছিলো। ১৯৭৮ সালে সিলেট এবং পাবনা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজকে ক্যাডেট কলেজে রূপান্তর করে সিলেট এবং পাবনার জন্যে দুজন করে নেবে ঘোষণা দিয়ে প্রভাষক পদে দরখাস্ত চাইলে আমি সাড়া দিলাম। এও জানা হয়েছে ততদিনে, ইস্পাহানীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যডেট কলেজের নিয়ম নীতি অনুসরণ করে বলে আমার চাকুরি কাল ইন্টারভিউ বোর্ডে একটা প্লাস পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে আত্মবিশ্বাসটা আরও পোক্ত হলো।
সেপ্টেম্বরের দিকে ঢাকা সেনানিবাস, ক্যাডেট কলেজ গভর্নিং বডির সদর দপ্তর থেকে ডাক এলো। নির্দিষ্ট দিনে পৌঁছে তাদের নমুনা-সমুনা দেখে জনা পঞ্চাশেক প্রার্থীর মধ্যে থম ধরে ডাক পড়ার অপেক্ষায় বসে ছিলাম। তার আগে বিরাট এক লম্বা ফর্দের মতো প্রশ্নের এক ঘন্টার লিখিত পরীক্ষা দিয়ে এসেছি। এক একজন ভাইভা দিতে ঢুকছে, বিশ মিনিট থেকে আধা ঘন্টার পর ঝড়ে পড়া   কাকের মতো চেহারা নিয়ে বের হয়ে আসছে। দৃশ্যটা আমার কাছে মন্দ লাগছে না!
আর আমার কী হবে, না হবে না- এই ভাবনা আমার মোটেই ছিলো না। কর্ণেল মামা আমাকে  বলে দিয়েছিলেন,
-ভাইগনা, মনে রাইখো, তুমিই সেরা। তোমার ডিকশনারিতে ‘না’ বলে কোন শব্দ নেই।
যথারীতি সৌজন্য বিনয় মেনে ইন্টারভিউ বোর্ডে ঢুকলাম। সেনাবাহিনী প্রধান এরশাদের প্রতিনিধি এহজন মেজর জেনারেল আমার সোজা চেয়ারে সহ আরও চারজন বিভিন্ন পদের আমার ডানে বাঁয়ে বসে আছেন। তাঁদের মধ্যে একজন সাইকোলজিষ্ট থাকবে আমার জানা ছিলো। মাঝখানের জন কাগজপত্র দেখার পর ইংরেজিতে প্রশ্ন করলেন,
-ধরে নিন, আপনাকে আমরা নিলাম। কোথায় যেতে চান? পাবনা না সিলেট?
দেরি না করে জবাব দিলাম, সিলেট।
-কেন? পাবনা নয় কেন ?
-পাহাড়, নদী, হাওড় বিস্তীর্ণ প্রকৃতি আর তিনশত ষাট আউলিয়া সহ পূণ্যাত্মা হযরত শাহজালাল রহমতুল্লাহ আলাইহের মাটি তাই।     
ধহধিৎঁষযধয়ঁবপস@মসধরষ.পড়স





সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};