ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন অ্যাপস কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য লাইভ টিভি লাইভ রেডিও সকল পত্রিকা যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
জগন্নাথদিঘি যুদ্ধ
Published : Friday, 17 March, 2017 at 12:00 AM
জগন্নাথদিঘি যুদ্ধমোতাহার হোসেন মাহবুব ||
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানার জগন্নাথদিঘি এলাকার লোকজন মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সারাদেশে আক্রমণ করলে প্রতিরোধ হিসেবে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দসহ জনগণ ঢাকা-চট্টগাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামের হায়দার ব্রীজ, জগন্নাথদিঘি ও আমজাদের বাজার ব্রীজ ভেঙ্গে দেয়।
২৫ মার্চ সেই ভয়াবহ কালোরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে ডিনামাইট দিয়ে বেরিকেড সরাতে সরাতে চৌদ্দগ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে রাস্তার দু’পাশের গ্রামবাসীরা ডিনামাইটের বিকট শব্দে আতংকিত হয়ে পড়েন। সে-রাতেই মিয়াবাজারের অদূরে জামমুড়া নামক স্থানে চৌদ্দগ্রাম থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোজাহিদ বাহিনীর কমান্ডার আবদুল কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে বাঙ্কার করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার প্রস্তুতি নেয়া হয়। প্রকৃতঅর্থে, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ঢাকায় রেইসকোর্সের ভাষণের পরপর জগন্নাথদিঘিসহ চৌদ্দগ্রামের আশপাশের এলাকাগুলোতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিরোধের প্রস্তুতি চলতে থাকে।
২৬ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আক্রমণ প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসেন আনসার কমান্ডার মফিজ পাটোয়ারি, প্রাক্তণ সেনা সদস্য সিরাজুল ইসলাম হারুন, মমতাজ হাবিলদার, রুহুল আমিন হাবিলদার প্রমুখ। এর আগে যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এ প্রতিরোধ বাহিনী এক অভিযানের মাধ্যমে চৌদ্দগ্রাম থানা থেকে কয়েকটি রাইফেল সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ২টি রাইফেল চৌদ্দগ্রাম সারের গুদাম পাহারা দেয়ার কাজে ব্যবহার হয়। ৪ এপ্রিল সংগ্রহকৃত রাইফেলগুলো থেকে আরো ২টি রাইফেল স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে দেয়া হয়। সেদিনই লাচু মেম্বার বাড়িতে বসে দক্ষিণ চৌদ্দগ্রাম আঞ্চলিক সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। একই দিন মুক্তি সংগ্রামের কর্মীদের থাকায় জন্য ডিমাতলী (বড়টিলা) নামক স্থানে একটি ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
১৩ এপ্রিল থেকে ডিমাতলী ওয়াকার্স ক্যাম্প নামে এ ক্যাম্পের কার্যক্রম শুরু হয়। সঠিক অপারেশনের জন্য গোয়েন্দা রিপোর্ট ও রেকির ব্যবস্থা করা হতো এ ক্যাম্প থেকে। এ ক্যাম্পের সদস্যরা ওপি হিসেবেও কাজ করতো এবং সামরিক কর্তৃপক্ষ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করতো। বিলোনিয়া সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, লে. মাহবুব, লে. ইমামুজ্জামান, সুবেদার মাহাবুব, নায়েব সুবেদার কালাম ও ভারতীয় ক্যাপ্টেন আগারওয়ালের সক্রিয় সহযোগিতায় এ ক্যাম্প থেকে গেরিলা পদ্ধতিতে অপারেশনের পরিকল্পনা করা হয়।
২৬ মে রাত ১১টায় লে. ইমামুজ্জামানের প্লাটুন জগন্নাথদিঘি এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ চালিয়ে ১৯ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে।  ৩০ জুলাই সকাল ৭টায় ইমাম-উজ-জামানের একটি প্লাটুন চৌদ্দগ্রামের চার মাইল দক্ষিণে একস্থানে অ্যামবুশ পাতে। অ্যামবুশ দল সারাদিন অপেক্ষা করার পর জানতে পারে, জগন্নাথদিঘির কাছে একটি জীপ টহলে বেরোনোর জন্য তৈরি হচ্ছে। জীপটি অ্যামবুশ করার জন্য অ্যামবুশ দল তখনই তৈরি হয়ে যায়। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এ জীপ চৌদ্দগ্রামের দিকে অগ্রসর হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশ অবস্থানে পৌঁছায়। পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে অ্যামবুশ দল জীপের ওপর মেশিনগান ও হালকা মেশিন গান থেকে গুলি চালায়। গুলিতে জীপের ড্রাইভার আহত হয়। ছয়জন পাকিস্তানি সেনা জীপ থেকে লাফিয়ে নিচে নামে কিন্তু তারাও মুক্তিযোদ্ধা অ্যামবুশ দলের গুলিতে নিহত হয়। অ্যামবুশ দল একজন মৃত পাকিস্তানি সেনার পকেটে একটি চিঠি পায়। তা থেকে জানা যায়, এ পাকিস্তানি সেনারা ২৯ বালুচ রেজিমেন্টের ‘চার্লি’ কোম্পানির সেনা। নিহত পাকিস্তানি সেনাদের কাছ থেকে রাইফেলসহ যথেষ্ট গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয় ও একজন পাকিস্তানি সেনা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বন্দী হয়। এ অ্যামবুশের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে আরও সেনা চৌদ্দগ্রামে নিয়ে আগে এবং সারারাত মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান লক্ষ্য করে মর্টার ও কামানের গোলা নিক্ষেপ করে ।
পরদিন ৩১ জুলাই সকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি কোম্পানী চৌদ্দগ্রাম থেকে এবং আরেকটি কোম্পানী জগন্নাথদিঘি থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের দু’শ গজের মধ্যে পৌছায়, তখনই মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশ অবস্থান থেকে তাদের ওপর অতর্কিত গুলি চালানো হয়। গুলির আঘাতে ২০ জন পাকিস্তানি সেনা রাস্তার উত্তরে ও ছয়জন দক্ষিণে আহত ও নিহত হয়।
১৪ আগস্ট চৌদ্দগ্রামের চান্দিশকরা গ্রামে ৫ জন পাকিস্তানি সেনাসহ একটি জীপ গাড়ি এ ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়। এতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ৩ জন নিহত ও ২ জন গুরুতর আহত হয়। এ মাসেই ভাজনকরা  ব্রীজটি ধ্বংস করা হয়।
সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে পরিকোর্ট রেলওয়ে ব্রীজ-এ বোমা পাতা হয়। ডিমাতলী ক্যাম্পের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ফেনী টেকনিক্যাল ক্যাম্প থেকে এ ক্যাম্প লক্ষ্য করে সেলিং বোমা মারে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বোমাগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট থাকায় ক্যাম্পের কোনো ক্ষতি হয়নি। মুক্তিবাহিনী এ ক্যাম্প ছেড়ে পাশের আরেকটি টিলায় ক্যাম্প স্থাপন করে। ইতোমধ্যে ২ নম্বর সেক্টরের স্টুডেন্ট লিয়াজোঁ অফিসার সৈয়দ রেজাউর রহমানের অনুরোধে এ ক্যাম্প থেকে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা দেরাদুনে ট্রেনিং এ পাঠানো হয়।
২০ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গেরিলা দল চট্টগ্রাম-কুমিল্লার রাস্তায় জগন্নাথদিঘির কাছে বাজানকরা সেতুটি উড়িয়ে দিয়ে সেতু থেকে খানিকটা উত্তরে ১০ জন গেরিলা ও নিয়মিত বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের অপেক্ষায় অ্যামবুশ পেতে বসে। সেতুটি ধ্বংসের সংবাদ পেয়ে ফেণী থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি শক্তিশালী দল সেতুর দিকে অগ্রসর হয়। সেতুতে পৌঁছার আগেই পাকিস্তান সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশে পড়ে যায়।  মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর প্রচন্ড আক্রমণ চালায়। এতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একজন অফিসারসহ ২৫ জন সেনা নিহত হয়। এরপর পাকিস্তানি সেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে ফেনীর দিকে পালিয়ে যায়। 
১১ নভেম্বর রাত ১২ টার দিকে জগন্নাথ দিঘি এলাকার বেতিয়ারা নামক স্থানে ন্যাপ-কমিউন্স্টি পার্টি ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনীর একটি দল ঘন অন্ধকারে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাছে পোঁছে। গাছের আড়ালে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তিন দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর গুলি বর্ষণ শুরু করে। ঘটনাস্থলে মুক্তিযোদ্ধা এ বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ৯ জন শহীদ হন। তাঁরা হলেন: নিজাম উদ্দিন আজাদ, আওলাদ হোসেন, সিরাজুম মনির, জহিরুল হক দুলু, মশিরুল ইসলাম, মো: শহীদ উল্লাহ, কাইয়ুম, সফিউল্লাহ ও আবদুল কাদের।
এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরপরই বেতিয়ারা থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের ডিমাতলী ক্যাম্পের উদ্যোগে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর স্থানীয় কমান্ডারদের সাথে যোগাযোগ করে তাৎক্ষণিকভাবে জগন্নাথ দিঘির দক্ষিণপাড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাপ্টেন জং এর ঘাটিতে মুক্তিবাহিনী অনবরত দূরপাল্লার বোমা বর্ষণ শুরু করে। এতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়। ২৭ নভেম্বর মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে টিকতে না পেরে শেষ রাতে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন জং তার জীবিত ও মৃত সৈন্যদের নিয়ে ফেনীর দিকে পালিয়ে যায়।
২৮ নভেম্বর সকাল ১০ টায় মুক্তিযোদ্ধারা একটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘাটি জগন্নাথ দিঘি ডাকবাংলা দখল করে এবং জগন্নাথ দিঘি এলাকাকে শত্রুমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। ঘোষণার প্রাক্কালে সমবেত জনতায় উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন চৌদ্দগ্রাম এলাকার এমপিএ ও ডিমাতলী ক্যাম্পের সভাপতি মীর হোসেন চৌধুরী ও মুক্তিযোদ্ধা জসীম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাপ্টেন জং এর কার্যালয় ও তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্পে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।
লেখক: সম্পাদক: আপন
বিনয় সাহিত্য সংসদ, কুমিল্লা।






সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৬
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
কার্যালয়: কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশন, তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়,কুমিল্লা-৩৫০০, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২৪৪৩, +৮৮০ ১৭১৮০৮৯৩০২
ই মেইল: hridoycomilla@yahoo.com, newscomillarkagoj@gmail.com,  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ কাজী অহিদুজ্জামান ম্যানশান।
তৃতীয় তলা, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : hridoycomilla@yahoo.com Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};